ঢাকা, মঙ্গলবার 9 July 2019, ২৫ আষাঢ় ১৪২৬, ৫ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

শহীদ ড. মুরসি প্রেরণা যোগাবে

ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম : পৃথিবীতে নীল নদের দেশ হিসেবে খ্যাত মিসর। পিরামিডসহ অনেক ইতিহাস ঐতিহ্যের নিদর্শন রয়েছে এখানে। অনেক নবী-রাসূলের আগমন হয়েছে এই পবিত্র মাটিতে। আবার দুনিয়ার সবচেয়ে জালিম শাসক ফেরাউনও এই জনপদকে শাসন করেছে, ফেরাউন ঔদ্ধত্তের সীমা ছাড়িয়ে নিজেকে খোদা বলে দাবি করে আল্লাহর গজবে পতিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন ‘আজ আমি তোমার (ফেরাউন) দেহ রক্ষা করব, যাতে তুমি তোমার পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হয়ে থাকো। অবশ্যই মানুষের মধ্যে অনেকে আমার নিদর্শন সম্পর্কে উদাসীন।’ ( সূরা ইউনুুস: ৯২)
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আল্লাহর এই ঘোষণা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। ড. মরিস বুকাইলি লিখেছেন- “লোরেট ১৮৯৮ সালে রাজাদের উপত্যকায় (কিংস ভ্যালি) থিবিসে দ্বিতীয় রামাসিসের পুত্র ও মহাযাত্রাকালীন ফেরাউন মারনেপতাহর (মিনফাতাহ) মমি করা লাশ আবিষ্কার করেন। সেখান থেকে তা কায়রোয় নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯০৭ সালের ৮ জুলাই এলিয়ট স্মিথ এ মমির আবরণ অপসারণ করেন। তিনি তাঁর ‘দ্য রয়্যাল মমিজ’ নামক গ্রন্থে (১৯১২) এর প্রক্রিয়া ও লাশ পরীক্ষার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। কয়েকটি জায়গায় কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও মমিটি তখন সন্তোষজনকভাবেই সংরক্ষিত ছিল।”  আল্লাহ বলেন- “কাফেরদের আমি যে ঢিল দিয়ে চলছি এটাকে যেন তারা নিজেদের জন্য ভালো মনে না করে আমি তাদেরকে এ জন্য ঢিল দিচ্ছি, যাতে তারা গোনাহের বোঝা ভারী করে নেয়, তারপর তাদের জন্য রয়েছে কঠিন অপমানকর শাস্তি।” (সূরা আলে ইমরান: ১৭৮) সুতরাং আল্লাহর ওয়াদা সত্য। আজকে মিসরের ক্ষমতার মসনদে যারা অধিষ্ঠিত এরাও ইতিহাসের আস্তাকুড়ে আল্লাহর লানতে পতিত হবে।
একটি প্রবাদ আছে, “হুকমু মিসরা লা’নাতুন” অর্থাৎ - মিসরের শাসন একটি অভিশাপ। মিসরের কোনো শাসক তার শসনের পুরোটা সময় কাটিয়ে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছে এমন শাসক নেহায়েত কম। কায়রোর সিংহাসন কারো জন্য ফুল ছিটানো ছিল না। এটি ছিল যেন একটি বারুদের ডিপো, যা সবাইকে ভস্ম করে ছেড়েছিল। এই অভিশাপ থেকে ন্যায়পরায়ণ শাসকরাও রেহায় পায়নি। ১৮০৫ সালে উসমানী সালার মুহাম্মাদ আলী পাশা থেকে নিয়ে প্রেসিডেন্ট মুরসি পর্যন্ত মোট ১৮ জন শাসক মিসর শাসন করে। ড. মুরসি ছিলেন ১৮ তম প্রেসিডেন্ট।
এখানে যেমনি হযরত মূসার (আ.) ঐতিহাসিক ঘটনা রয়েছে। তেমনি সেই পথ ধরে রয়েছে সত্যপন্থীদের শাহাদাত, ত্যাগ-কুরবানির বিস্তৃত এক ইতিহাস। ১৯২৮ এক সংকটময় মুহুর্তে ইসলামের ঝা-া হাতে ছুটে আসেন শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ সন্তান ইমাম হাসানুল বান্না। মাত্র ৬ জনকে নিয়ে তিনি এক সংগঠনের যাত্রা শুরু করেন। ৮৫ বছরের আন্দোলন সংগ্রামের ও রাজপথ থেকে ক্ষমতায় এসে ইতিহাস গড়েছে মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী ইসলামী সংগঠন ইখওয়ানুল মুসলিমিন, যা সারা বিশ্বে মুসলিম ব্রাদারহুড নামে পরিচিত। কিন্তু গণতান্ত্রিকভাবে ইসলামী আন্দোলনের এতবড় বিজয়কে পশ্চিমারা কোনভাবেই মেনে নিতে পারেনি। তাই এক সাক্ষাতকারে ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনিব্লেয়ার বলেছিল ‘গণতন্ত্র মানে শুধু বেশি ভোটই নয়। সেখানের ক্ষুদ্রদেরও বাসনার দিকটিও নজরে রাখতে হবে।’ গণতান্ত্রিকভাবে মুসলমানরা বিজয়ী হলে সেই গণতন্ত্রকেও পশ্চিমারা মানতে নারাজ।
কিন্তু পশ্চিমাদের ক্রিড়নক হয়ে মিসরের সেনবাহিনী জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে  ক্ষমতায় আসার একবছরের মাথায় ২০১৩ সালে অন্যায়ভাবে ক্ষমতাচ্যুত করে। এই ন্যক্কারজনক কাজের নেতৃত্ব দিয়েছে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সেনাপ্রধান এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী সিসি সত্যপন্থীদের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালিয়ে ফেরাউনী সভ্যতা পুনরুজ্জীবনের জঘন্য অপপ্রয়াসে লিপ্ত। ইসলামের চিহ্ন মুছে ফেলার সকল আয়োজন চলছে সর্বত্র। প্রেসিডেন্টের পদ ক্ষমতাচ্যুত করার পর আটক ও প্রহসনমূলক বিচারের মুখোমুখি করা হয় ড. মোহাম্মদ মুরসিসহ হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে। প্রহসনের বিচারে মুরসিকে মৃত্যুদ-ও দেয়া হয়। প্রতিবাদ ও সারা বিশ্ববাসীর সমালোচনার মুখে মৃত্যুদ-াদেশ বাতিল করে কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয়। কিন্তু জেলখানায় অমানবিকভাকে নির্যাতন চালিয়ে তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হয়।
যিনি নিজের জীবন নিয়ে ভাবেননি কোন সময়েই। জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত তিনি জালিমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার। আল-জাজিরার খবরে বলা হয়, আদালতে শুনানির সময় মুরসি ফিলিস্তিনের পক্ষে দীর্ঘ বক্তব্য দিচ্ছিলেন মুরসি। প্রায় ২০ মিনিট বক্তব্য দেওয়ার পর এজলাস কক্ষেই হঠাৎ তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এ সময় মুরসিকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মুরসিকে মৃত ঘোষণা করে।
যুগ পরাম্পরায় চিরচেনা সেই পথ মাড়িয়ে হাফেজ শহীদ ডক্টর মোহাম্মদ মুরসি শাহাদাতের আমিয় সুধা পান করে গোটা মুসলিম বিশ্বকে কাঁদিয়ে মা’বুদের দরবারে পাড়ি জমিয়েছেন ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মানুষের জন্মের পর দুনিয়াতে অনিবার্য সত্য হলো মৃত্যু। মুমীনের মৃত্যু হলো মহান মাবুদের সান্নিধ্যেও পৌছানোর সূচনা পর্ব। আল্লাহর মেহমান হওয়ার উদ্ধোধনী আয়োজন। আমাদেও বিশ্বাস তিনিও শহীদী মিছিলে শামিল হয়েছেন।
আল্লাহর দ্বীনের এই মুজাহিদের বিদায়ে গোটা বিশ্ব মুসলিম মিল্লাতের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। বিক্ষোভ, প্রতিবাদ নিন্দায় উত্তাল ও সারা দুনিয়া। বিশেষভাবে মুসলিম বিশ্বের নেতৃবৃন্দ মানবাধিকার সংগঠন ও সংস্থা এর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে এর একটি নিরপেক্ষ তদন্ত দাবী করেছেন। প্রায় সকলেই এটিকে একটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড বলে দাবী করেছে। এর আগে তার পরিবারের পক্ষ থেকে তার জীবন সংকটাপন্ন বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু জালিম সরকার কোন কর্ণপাত করেনি।
ড. মোহাম্মদ মুরসির পুরো নাম মোহাম্মদ মুরসি ইসা আল-আইয়াত। তিনি ১৯৫১ সালের ২০ আগস্ট মিসরের শারকিয়া প্রদেশের আল-আদওয়াহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন কৃষক ও মা ছিলেন গৃহিনী। স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাগ্রহণ করার পর নিজের প্রখর মেধার জোরে ১৯৭৫ সালে মোহাম্মদ মুরসি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং (প্রকৌশল) বিষয়ে স্নাতক পড়া শুরু করেন। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রী এবং ১৯৭৮ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। তিনি ছিলেন হাফেজে কুরআন।
ছাত্রজীবন থেকে তিনি এতই মেধাবী ও সম্ভাবনাময় ছিলেন যে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জনের জন্য তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ স্কলারশিপ নিয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৮২ সালে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে তিনি পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর তিনি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৮২-৮৫ সাল পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। তিনি অত্যান্ত সুনামের সাথে নাসায় স্পেস শাটল ইঞ্জিন উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
কিন্তু দেশের মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা ও দেশ প্রেমে উদ্ভুদ্ধ হয়ে মার্কির যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে ১৯৮৫ সালে নিজ জন্মভূমিতে ফিরে আসেন। মিসর ফিরে শারকিয়া প্রদেশের জাগাজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৮৫-২০১০ সাল পর্যন্ত ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্বপালন করেন। ২০০০ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মুরসি।
২০১১ সালে মুসলিম ব্রাদারহুডের আদলে ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি (এফজেপি) গঠন করে পার্টির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মুরসি। ২০১২ সালে মিসরে দুই পর্বে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। উভয়পর্বে সর্বমোট ৫২ শতাংশ ভোট পেয়ে মিসরের ইতিহাসে প্রথমবারের মত গণতান্তিকভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
তিনি ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি (এফজেপি) থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাকে জয়ী ঘোষণার পর মুসলিম ব্রাদারহুড ও এফজেপি থেকে ড. মোহাম্মদ মুরসিকে অব্যাহতি দিয়ে মিসরের সর্বস্তরের মানুষের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করা হয়। শুরু হয় জীবনের অন্য অধ্যায়।
অসাধারণ একজন নেতা: মুরসি প্রথমবারের মত প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে পা রাখলেন, সেদিনই তিনি মনস্থির করেন, প্রেসিডেন্টের জন্য নির্ধারিত কোনো প্রাসাদেই তিনি থাকবেন না। এটা একটা অনবদ্য দৃষ্টান্ত। কেননা তার নিজের ও পরিবারের ওপর হুমকি থাকার পরও তা অগ্রাহ্য করেই তিনি অটল থাকার সিদ্ধান্ত নেন।  
প্রেসিডেন্ট ড. হাফেজ মুরসির বোন একবার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসকেরা তাকে বিমান বা হেলিকপ্টারের বাহিওে নেয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু মুরসি এই সুবিধাটুকু নিতে রাজি হননি। তিনি বলেন, তার বর্তমান পদের সুযোগ নিয়ে তার পরিবারকে সাধারণ কোনো মিশরীয় নাগরিকের চেয়ে তিনি বেশি সুবিধা দিতে পারেন না। শেষ পর্যন্ত, প্রেসিডেন্ট মুরসির বোন একটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন।
প্রেসিডেন্ট মুরসি একদিন রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলেন একজন বয়স্ক বিধবা কায়রোর সড়কে শুয়ে আছেন। তিনি গাড়ি থেকে নেমে এসে বিধবার পাশে বসলেন। এবং প্রশ্ন করলেন, তিনি কেন রাস্তায় থাকেন? মহিলা বললো বাড়ি ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় বাধ্য হয়ে বাসা ছেড়ে দিয়ে এখন রাস্তায় এসে আবাসন গড়েছেন। মুরসি জানান, তার নেতৃত্বাধীন মিশরে এভাবে কোন মহিলা থাকতে পারেন না। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সেই মহিলার জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন। সেই সাথে সরকারের তরফ থেকে মহিলার জন্য একটি ভাতা সরবরাহ করার নির্দেশ দেন যাতে তিনি বাসা ভাড়া পরিশোধ করতে পারেন। এভাবে সেই মহিলা তখন বাসা বাড়ি পেয়ে গেলেও সিসির অন্যায্য সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে তিনি আবারও গৃহহীন হয়ে পড়েন।
ড. মুরসি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর যখন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদ তাকে অভিনন্দন জানিয়ে পত্র দিয়েছিলেন, মুরসি তার উত্তরে লিখেছিলেন, “আমি আপনাকে সিরিয়ার জনগণের সত্যিকারের প্রতিনিধি বলে মনে করি না।” তিনি হাজার হাজার মানুষের খুনী বাসারের প্রতি বিনয়ী হতে রাজি ছিলেন না। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে তো বটেই, প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও মুরসি কখনোই জামায়াতে নামাজে অনুপস্থিত থাকতেন না। এছাড়া তিনি প্রায় শুক্রবারে জুমার নামাজে খুতবা প্রদান করতেন। ড.মুরসি পূর্বসরী শাসকদের পরিবর্তে সরকারি অফিসগুলোতে আল¬াহতায়ালার নামের সুন্দর সুন্দর ক্যালিওগ্রাফি লাগানোর ব্যাপারে উৎসাহিত করতেন।
আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র : ড. মুরসি কূটনৈতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষ ভূমিকা রাখেন এই অল্প সময়ে। তিনি ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন। নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ান। দখলদার ইসরাইল অবররুদ্ধ গাজাবাসীর জন্য মিশরের সীমান্ত খুলে দিয়ে জেরুজালেম ও আল আকসা মসজিদের ওপর ফিলিস্তিনিদের নিয়ন্ত্রণের পক্ষে অবস্থান নেন তিনি। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ভালো চোখে দেখেনি। বৈশ্বিক রাজনীতির এক সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে আটকে পড়েন মুরসি।
এদিকে মিসরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে ইসরাইলের জোরালো ভূমিকার কথা জানিয়ে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আরয়িহ ইলদাদ স্থানীয় এক পত্রিকা ‘ম্যারিভ’-এ প্রকাশিত নিবন্ধে এই তথ্য প্রকাশ করেন। ‘দ্য আউটব্রেক অব দ্য জানুয়ারি রেভ্যুলেশন’ শিরোনামে প্রকাশিত নিবন্ধে তিনি বলেন, মিসরের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসিকে ইসরাইল মুসলিম ব্রাদারহুডের মানুষ হিসেবেই মূল্যায়ন করত। কারণ, তিনি ইসরাইলের সাথে সম্পাদিত শান্তিচুক্তি বাতিল এবং সিনাই উপত্যকায় সেনা উপস্থিতি বাড়িয়েছিলেন, যা ইসরাইলকে ভীত করে তোলে। ফলে ইসরাইল দ্রুত ও সক্রীয়ভাবে কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং আবদুল ফাত্তাহ সিসিকে ক্ষমতায় আনার ব্যবস্থা নেয়। এই ক্ষেত্রে ওবামার মার্কিন সরকার কোনো আপত্তি করেনি।
পাকিস্তানি বিখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী ড. আবদুল কাদির খান বলেন, তার মৃত্যুতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ছাড়াও অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দারা তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ক্ষমতায় আসার পর প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি রাশিয়া, ভারত ও পাকিস্তান সফরে গিয়েছিলেন। ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ মিসরীয় পরমাণু চুলি¬ ফের চালু করতে রাশিয়ার সঙ্গে একমত হয়েছিলেন তিনি, যেটা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। ‘মিসরীয়রা কি জানেন, তাদের সাবেক প্রেসিডেন্টের এই সফর পশ্চিমাদের জন্য বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল?’ প্রেসিডেন্ট মুরসির শাসনকালে জার্মানির কাছ থেকে দুটি ডুবোজাহাজ পেয়েছিল মিসর। কিন্তু এ ধরনের ডুবোজাহাজ প্রতিবেশী দেশে হস্তান্তরে জার্মানিকে নিবৃত্ত করতে চেয়েছিল ইসরাইল। কারণ মিসরের কাছে সঠিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকলে এই ডুবোজাহাজ দিয়ে রণতরীতে আঘাত হানা সম্ভব।’ ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু স্বীকার করেছেন, তিনি জার্মানি ও মিসরের মধ্যের এই ক্রয়চুক্তিকে অনুমোদন দিয়েছিলেন। কিন্তু কেন তিনি সেটা করেছেন, তা গোপন রাখলেন। তার দাবি, এটা রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা।
তিনি মনে করেন যদি ২০১৩ সালের অভ্যুত্থান না ঘটতো তাহলে ইতিমধ্যে এমন একটি উপগ্রহের মালিক হয়ে যেতেন মিসরীয়রা।
প্রহসনের বিচার ও আন্তজাতিক প্রতিক্রিয়া : ড. মুরসির মৃত্যুতে চরম অবহেলার অভিযোগ করেছে ব্রিটিশ ইন্ডিপেনডেন্ট ডিটেনশান রিভিউ প্যানেল। তারা বলছেন, সাবেক এ প্রেসিডেন্টকে কারাবন্দী রাখার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদ- বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
ইসলাম, ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং মুসলমানদের জন্য ড. মুরসি বিশ্বব্যাপী যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ