ঢাকা, মঙ্গলবার 9 July 2019, ২৫ আষাঢ় ১৪২৬, ৫ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

দেশের বিচার বিভাগ ক্ষমতাসীন আ’লীগ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে -মির্জা ফখরুল

স্টাফ রিপোর্টার : দেশের বিচার বিভাগ ক্ষমতাসীন আ’লীগ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। গত ৩ জুন পাবনা আদালতে আদালতের রায় নিয়ে দলের বক্তব্য তুলে ধরতে গিয়ে গতকাল সোমবার দুপুরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার লক্ষ্যে বিচার বিভাগকে দলীয়করণ করছে সুচতুরভাবে। আজকে এই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বলতে কিছু নেই। এখন বিভাগটি সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। জনগণের আশ্রয়ের শেষস্থল এই বিচার বিভাগকে দলীয়করণের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা, এক নায়কতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে তারা।
৩ জুন পাবনার অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতের বিচারক রোস্তম আলী পাবনা ঈশ্বরদীতে ২৫ বছর আগে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রেনে বোমা হামলা ও গুলীর ঘটনার মামলায় বিএনপির ৯ জনকে মৃত্যুদন্ড এবং ২৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং ১৩ জনকে ১০ বছর করে কারাদন্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমরা যেকোনো সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, আমরা সবসময়ই সন্ত্রাসের ঘটনার নিন্দা করেছি, প্রতিবাদ জানিয়েছি এবং সুষ্ঠু বিচার চেয়েছি। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে।
ঈশ্বরদীতে ১৯৯৪ সালে সংঘটিত হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। একটি রাজনৈতিক দলের প্রায় সকল কর্মকর্তাকে এই ঘটনায় সম্পৃক্ত করে তিন বছর পর অভিযোগ পত্র দিয়ে ২৫ বছর পর এই আদেশ প্রমাণ করেছে যে, এই আদেশ ন্যায় বিচার পরিপন্থী ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। শুধুমাত্র ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করবার জন্য একের পর এক গণতান্ত্রিক সকল প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে, বিরোধী রাজনীতিকে ধবংস করে, বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে চিরতরে নির্বাসিত করবার আয়োজন সম্পন্ন করেছে আওয়ামী লীগ।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, পাবনার এই মামলাটি উচ্চ আদালতে বিচারাধিন ছিলো। এই অবস্থায় নিম্ন আদালত এই রায় দিলো একদিনেই। ওই ঘটনায় এক নম্বর আসামী ছিলো আওয়ামী লীগের স্থানীয় আমিনুল ইসলাম তাকে ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো, তাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। বাকী ৯জন দেয়া হয়েছে মৃত্যুদন্ড।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বর্তমান পার্লামেন্ট জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়নি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করে নির্বাচনের ফলাফল জবরদস্তি নিজেদের পক্ষে নিয়েছে, সেই কারণে জনগণের কাছে কোন প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতার কোন সুযোগ নেই, রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে নৈরাজ্য সৃষ্টি হচ্ছে। বিচার বিভাগও এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো প্রায় ভেংগে পড়েছে। আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার লক্ষ্যে বিচার বিভাগকে দলীয়করণ করছে অত্যন্ত সুচতুরভাবে। খায়রুল হকের রায়ের মধ্য দিয়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে নির্বাচনকালীন তত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে সরকারের অধীনে নির্বাচন ব্যবস্থার পুন:প্রবর্তন-একে একে সংবিধানের গণতান্ত্রিক বিধানগুলোকে বাদ দিয়ে সংশোধনী এনে একদলীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠা করা এবং রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার মারাত্মক প্রক্রিয়া তারা সম্পন্ন করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় নির্বাচন ব্যবস্থা, প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলা ব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, এমনকি বিচার ব্যবস্থাকে আজ সম্পূর্ণভাবে দলীয়করণ করা হয়েছে। ফলে জনগণের যে নূন্যতম আস্থা সেই বিচার বিভাগের নিকট মানুষ ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত রায়ে পরিষ্কারভাবে এই কথা বলেছেন যে, বিচার ব্যবস্থা দলীয়করণের শিকার হয়েছে এবং জনগণ ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নিম্ম আদালতে আইন মন্ত্রণালয়ের নিরুঙ্কুশ প্রভাব নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ন্যায় বিচার তিরোহিত হচ্ছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিলুপ্ত হচ্ছে। উচ্চ আদালতেও এর প্রভাব আমরা দুঃখজনকভাবে দেখতে পাচ্ছি। বিচারপতি সিনহাকে বল প্রয়োগের মাধ্যমে অপসারণ-দেশত্যাগে বাধ্য করার ফলে ভীতি সর্বগ্রাসী হয়েছে এবং দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগের কারণে পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি ঘটেছে।
তিনি বলেন, শুধুমাত্র ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করবার জন্য একের পর এক গণতান্ত্রিক সকল প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে, বিরোধী রাজনীতিকে ধ্বংস করে, বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে চিরতরে নির্বাসিত করবার আয়োজন সম্পন্ন করেছে আওয়ামী লীগ। জনগণের আশ্রয়ের শেষস্থল বিচার বিভাগকে দলীয়করণ করার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা, একনায়কতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভুলুন্ঠিত করে নিজেদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করবার লক্ষ্যে জনগণের সকল আশা-আকাক্সক্ষাকে পদদলিত করে করে একটি ফ্যাসিবাদী স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের দিকে এগুচ্ছে। এই ভয়াবহ প্রক্রিয়া থেকে সরে এসে জনগণের নির্বাচিত পার্লামেন্ট ও সরকার গঠনের লক্ষ্যে অবিলম্বে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অবাধ, অংশগ্রহণমূলক নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানান বিএনপি মহাসচিব।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, খুব সিম্পল কথা- পাবনার ওই ঘটনায় কারোই মৃত্যু হয়নি, তারপরে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। যেখানে কোনো মৃত্যু ঘটে নাই, কোনো হত্যা ঘটে নাই, সেখানে মৃত্যুদন্ড। তাও একজন নয়, নয় জন। এই ধরনের রায় এবং বিচার অন্তত আমরা যারা আইনজীবী এখানে আছি তাদের কারো জীবনে এটা শুনিও নাই, জানিও না। এই রায় (পাবনা আদালত) মাধ্যমে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং দেশে কোনো আইনের শাসন বলে কিছু নেই।
নয়াপল্টনে অনুষ্ঠিত এই সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার, আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট কায়সার কামালসহ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ