ঢাকা, বুধবার 10 July 2019, ২৬ আষাঢ় ১৪২৬, ৬ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

দেশের ছেলেদের চাকরি নাই অথচ ভারতীয় কর্মীরা প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার নিয়ে যাচ্ছে

গতকাল মঙ্গলবার লেডিস ক্লাবে ড্যাবের কেন্দ্রীয় সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : উন্নয়নের নামে ক্ষমতাসীন দলের ‘গুটিকতক’ মানুষের সুবিধার জন্যই গ্যাসের মূল্য বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের পরদিন গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ড্যাবের এক অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব এই অভিযোগ করেন। মির্জা ফখরুল বলেন, আজকে সরকার এই দেশকে একটা পরনির্ভরশীল দেশে পরিণত করতে যাচ্ছে। আজকে আমাদের দেশে শিক্ষিত যুবকেরা চাকরি পায় না, কর্মসংস্থান নিচের দিকে নামছে। অথচ একই সময়ে আজকে ভারত থেকে কর্মীরা এসে, বিভিন্ন মানুষেরা এসে তারা প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার নিয়ে যাচ্ছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, বাংলাদেশের বর্তমান যে সরকার ক্ষমতা দখল করে আছে তারা প্রকৃতপক্ষে জনগণের সরকার নয়। এরা একটা পুতুল সরকারে পরিণত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আপনারা দেখেছেন যে, এখন উন্নয়নের একটা ঢোল বাজানো হচ্ছে সবসময়ই। গত (সোমবার)ও প্রধানমন্ত্রী চীন থেকে ফেরত এসে যে সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন সেখানে তিনি বলেছেন যে, উন্নয়ন পেতে হলে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধিতে মেনে নিতে হবে। অর্থাৎ মূল্য দিতে হবে।
মির্জা ফখরুল বলেন, অবশ্যই আমরা জানি, উন্নয়নের একটা মূল্য দিতে হয়। সেই মূল্য দিতে হয় কার জন্যে? সেই মূল্যটা দিতে হবে সাধারণ মানুষের উন্নয়নের জন্যে। আমরা ভালোভাবে দেখছি আজকে যে উন্নয়নের কথা বলে যে টাকা জনগনের পকেট থেকে বের করে নেয়া হচ্ছে, সেই অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে শুধুমাত্র গুটিকতক এই ক্ষমতাসীন দলের সুবিধার জন্যেই।
গত সোমবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, দেশের উন্নতি চাইলে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি মেনে নিতেই’হবে। তিনি বলেন, এতে কেনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেখানে দাম যেটুকু বাড়ানো হয়েছে। এটা যদি না বাড়ানো হয়, তাহলে আপনাদের কাছে দুটো পথ আছে। হয় আমরা এলএনজি আমদানি কমিয়ে দিয়ে এনার্জির ক্ষেত্র সংকচিত করে ফেলব, তাতে উন্নতি হবে না। আর যদি সত্যিই অর্থনৈতিক উন্নতি চান, ...তো এটা তো মেনে নিতেই হবে। শিল্পায়ন করতে হলে, বিদ্যুতের উপাদন বাড়াতে হলে, সার উপাদন করতে হলে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে হলে, ঘরে ঘরে বিদ্যু হতে হলে সরকারকে এলএনজি আমদানি করেতেই হবে। এলএনজি আমদানিতে আমাদের খরচ পড়ে ৬১ দশমিক ১২ টাকা। সেটা আমি দিচ্ছি ৯ দশমিক ৮০ টাকায়।’
প্রশ্ন রেখে মির্জা ফখরুল বলেন, আজকে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে কেনো? এই গ্যাসের মূল্য এলএনজি আমদানি করে তার ভতুর্কি দেয়ার জন্য। এই এলএনজি কারা আমদানি করছেন? আজকে এই সরকারের সঙ্গে যারা ওতোপ্রতোভাবে জড়িত, যারা মন্ত্রী অথবা উপদেষ্টা অথবা তাদের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন তাদের জন্যই আজকে বাড়তি যে খরচ, বাড়তি যে ব্যয় জনগণকে করতে হচ্ছে।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, বর্তমানে সরকার কোনো নির্বাচিত সরকার নয়। তাদের কোনো জবাবদিহিতা নেই। এই সংসদ নির্বাচিত হতে পারেনি কারণ তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়নি। রাষ্ট্রের সমস্ত যন্ত্রগুলোকে ব্যবহার করে জোর করে ক্ষমতা দখল করে বসে আছে। এদের কোনো জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা নেই। তাই গ্যাসের দাম বাড়লেই বা কি বা ভ্যাটের পরিমাণ বা ইনকাম ট্যাক্সের পরিমাণ বাড়লেই বা কী?। এরা জনগণের প্রতিপক্ষ হিসেবে অবস্থান নিয়েছে। তাদের একটি মাত্র লক্ষ্য যেটি হচ্ছে- তারা একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। প্রকৃতপক্ষে এক ব্যক্তির শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সেজন্য গত এক দশক ধরে সমস্ত আয়োজনগুলোকে সেভাবে সম্পন্ন করেছে।
সরকার দেশে একদলীয় শাসন চালাচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, আপনারা দেখেছেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে পরে ক্রমান্বয়ে অত্যন্ত সুচতুরভাবে পরিকল্পিতভাবে তারা সংবিধান পরিবর্তন করেছে। বিচারপতি খায়রুল হকের রায়ের পরে তারা এই কাজটি শুরু করেছে, আজকে এমন একটা জায়গায় সংবিধানকে নিয়ে এসছে যে, কাটাছেঁড়া করে সেখানে গণতন্ত্রের কথা মুখে বলা হয় কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কোথাও গণতন্ত্র নেই।রাষ্ট্রের সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেঙে ফেলা হয়েছে।
বিাচর বিভাগকে দলীয়করণ করা হয়েছে মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, আজকে বিচার বিভাগের কোনো স্বাধীনতা নেই। এই বিচার বিভাগ এমন একটা পর্যায় গিয়ে পৌঁছেছে যেখানে সরকারের আইন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিচারের হুকুম বা রায় দিতে হয়। পাবনায় দেখেছেন আপনারা। প্বানাতে ‘৯৪ সালের যে বিরোধী দলের নেত্রীর ওপরে রেলে যে হামলা হয়েছিলো কোনো হতাহত হয়নি। আমরা সবসময় যেকোনো হামলা, যে কোনো সন্ত্রাস প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু যেখানে কোনো হতাহতই হয়নি এবং তিন বছর পরে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। আজকে ২৫ বছর পরে সেই মামলার রায় দিতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে ৯ জনকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। যেখানে কোনো মৃত্যুই হয়নি। ২৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং ১৩ জনকে ১০ বছর করে কারাদন্ড। এই হচ্ছে বিচার বিভাগের অবস্থা।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মামলাগুলোর দিকে তাকালে আপনারা দেখতে পারবেন সেগুলো সম্পূর্ণভাবে সাজানো মামলা। কোথাও কোনো তশরুফ হয়, কোনো কোনো টাকা বাইরে চলে যায়নি সেখানে আজকে অন্যায়ভাবে শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কারাদন্ড দেয়া হয়েছে এবং সেটাকে বাড়িয়ে আবার ৫ বছর থেকে ৭/১০ বছর করা হয়েছে। এসব মামলায় তিনি(খালেদা জিয়া) জামিন পাওয়ার যোগ্য, তিনি জামিন পাচ্ছেন না। একই ধরনের মামলায় সবাই জামিন পাচ্ছেন কিন্তু দেশনেত্রী জামিন পাচ্ছেন না। তার বিরুদ্ধে ৩৬টি মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। এমনো মামলা আছে যে, একই সময়ে তিনটি থানায় গি্েয় বোমা মেরেছেন। এগুলো দিয়ে একটা জিনিসই প্রমাণিত হয় যে, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সবচেয়ে বেশি ভয় পায় কারণ তারা জানে যে, তিনি গণতন্ত্রের প্রতীক, তিনি যদি বেরিয়ে আসেন জনগনকে নিয়ে চলতে থাকেন তাহলে কোনোভাবে তাকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না এবং তারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না। সেজন্য তাকে বে আইনিভাবে ১৬/১৭ মাস আটক করে রাখা হয়েছে।
মির্জা ফখরুল বলেন, আজকে সরকার এই দেশকে একটা পরনির্ভরশীল দেশে পরিণত করতে যাচ্ছে।আপনারা শুনেছেন আজকে আমাদের দেশে শিক্ষিত যুবকেরা চাকুরি পায় না, কর্মসংস্থান নিচের দিকে নামছে। একদিকে উন্নয়নের কথা বলে, অন্যদিকে আমাদের ছেলেদের চাকুরি নেই। অথচ একই সময়ে আজকে ভারত থেকে কর্মীরা এসে, বিভিন্ন মানুষেরা এসে তারা প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার নিয়ে যাচ্ছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, বাংলাদেশের বর্তমান যে সরকার ক্ষমতা দখল করে আছে তারা প্রকৃতপক্ষে জনগনের সরকার নয়। এরা একটা পুতুল সরকারে পরিণত হয়েছে।
এই অবস্থা থেকে উত্তরনে জনগনকে ‘জাগিয়ে’ তোলার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, এজন্য জনগনের ঐক্যের খুব প্রয়োজন। আমাদেরকে জনগনের মধ্যে চলে যেতে হবে, তাদেরকে সংগঠিত করতে হবে। সমস্ত দলমতনির্বিশেষ ঐক্যবদ্ধ করে যারা আজকে দেশের স্বাধীনতা-সারভৌমত্বকে বিনষ্ট করছে, যারা আজকে গণতন্ত্রকে ধবংস করছে তাদেরকে পরাজিত করে জনগনের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
মির্জা ফখরুল বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া হচ্ছেন গণতন্ত্রের প্রতীক। তাকে মুক্ত করতে হবে। গণতন্ত্রে মা দেশনেত্রী মুক্ত হলেই শুধুমাত্র গণতন্ত্র মুক্তি পাবে। তাই আমরা বলছি, এই সংসদ বাতিল করতে হবে এবং একটা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে হবে। তাহলেই জনগনের সংসদ ও সরকার প্রতিষ্ঠা হবে।
রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেনের লেডিস ক্লাবে বিএনপির চিকিৎসক সংগঠন ‘ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ড্যাবের ‘কেন্দ্রীয় সম্মেলন-২০১৯’ অনুষ্ঠিত হয়। দলীয় ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও একগুচ্ছ বেলুন উড়িয়ে কাউন্সিলের উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি বিএনপি মহাসচিব। এর আগে দুপুরে ড্যাবের বার্ষিক সাধারণ সভা হয়। ড্যাবের নতুন নির্বাচিত সভাপতি হারুন আল রশিদ, মহাসচিব আব্দুস সালাম, সিনিয়র সহসভাপতি আবদুস সেলিম, কোষাধ্যক্ষ জহিরুল ইসলাম শাকিল ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মেহেদী হাসানের নাম ঘোষণা করা হয়। গত ২৫ মে কাউন্সিলরদের ভোটে এই নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়। এই কাউন্সিলের মাধ্যমে ড্যাবে যে আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিলো তার বিলুপ্তি হলো।
গত ১০ ফেব্রুয়ারি ড্যাবের কমিটি ভেঙে দিয়ে অধ্যাপক ফরহাদ হালিম ডোনারকে আহবায়ক করে আহবায়ক কমিটি করে তিন মাসের মধ্যে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের সময়সীমা বেঁধে দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
ড্যাবের আহবায়ক অধ্যাপক ফরহাদ হালিম ডোনারের সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব ওবায়দুল কবির খানের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, ড্যাবের অধ্যাপক রফিকুল কবির লাবু, অধ্যাপক মোস্তাক রহিম স্বপন, একেএম মহিউদ্দিন ভুঁইয়া মাসুম, নবনির্বাচিত সভাপতি হারুন আল রশীদ, সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম, সিনিয়র সহ-সভাপতি আবদুস সেলিম, কোষাধ্যক্ষ জহিরুল ইসলাম শাকিল, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মেহেদী হাসান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে অধ্যাপক সদরুল অধ্যাপক, অধ্যাপক আখতার হোসেন খান, অধ্যাপক গোলাম কাদের দুলাল, অধ্যাপক সিরাজউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক মামুন আহমেদ, অধ্যাপক আতিকুর রহমান, অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক লুৎফর রহমানসহ শতাধিক চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ