ঢাকা, বুধবার 10 July 2019, ২৬ আষাঢ় ১৪২৬, ৬ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

দ্বিতীয় দিনের অবরোধে যান চলাচল বন্ধ ॥ জনদুর্ভোগ

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীতে তিনটি রাস্তায় রিকশা চলাচল বন্ধের প্রতিবাদে বাংলাদেশ রিকশা ও ভ্যান মালিক ফেডারেশনের উদ্যোগে রামপুরা এলাকায় রাস্তায় শুয়ে রাস্তা অবরোধ করে রাখে -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীর তিনটি সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের মধ্যে রিকশাচালক প্রতিনিধিদের চায়ের আমন্ত্রণে ডেকেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন। তবে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মেয়রের এ আমন্ত্রণের পর বিকাল পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি বলে জানিয়েছেন মেয়র। বিকাল ৪টায় সাঈদ খোকন গণমাধ্যমকে বলেন, “এখন পর্যন্ত কেউ আসেনি। আজ মাত্র দাওয়াতটা দিলাম। এখন পর্যন্ত কেউ আসেনি। দেখি কাল তাদের প্রতিনিধিরা কেউ আসে কিনা।”
অন্যদিকে মেয়রের আমন্ত্রণ না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন রিকশা শ্রমিক ও মালিক সংগঠনের দুই নেতা।
‘ঢাকা মহানগরীর অবৈধ যানবাহন দূর/বন্ধ, ফুটপাত দখলমুক্ত ও অবৈধ পার্কিং বন্ধে গঠিত’ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৭ জুলাই (রোববার) থেকে রাজধানীর কুড়িল-সায়েদাবাদ, গাবতলী-আজিমপুর ও সায়েন্সল্যাব-শাহবাগ রুটে রিকশা চলাচল বন্ধ রাখার কথা।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রথমদিন রিকশাচালক ও মালিকদের তৎপরতা চোখে না পড়লেও সোমবার থেকে রাস্তায় বিক্ষোভ করছেন তারা। গতকাল মঙ্গলবারও দ্বিতীয় দিনের মতো কয়েক হাজার রিকশাচালক ও মালিক সকাল থেকে কুড়িল, বাড্ডা, রামপুরা ও বৌদ্ধমন্দির , মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ সড়কের বড় একটি অংশ বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষ। আশপাশের সড়কগুলোতেও সৃষ্টি হয়েছে তীব্র যানজট, যা ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো রাজধানীজুড়ে।
প্রতিবাদ-বিক্ষোভের মধ্যে দুপুরে রিকশাচালক ও মালিক প্রতিনিধিদের চায়ের আমন্ত্রণে ডাকেন মেয়র সাঈদ খোকন। তিনি বলেছেন, রাস্তা বন্ধ করা কোনো সমাধান নয়, সবার সঙ্গে কথা বলে কিভাবে সমস্যা সমাধান করা যায় এজন্যই রিকশা মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।“রাস্তা বন্ধ করে তো কোনো সমাধান আসবে না। আর প্রতিবাদের ভাষাও পরিবর্তন হওয়া দরকার। রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া প্রতিবাদের সেকেলে পদ্ধতি। রাস্তা ব্লক করা, মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করা এসব থেকে সরে আসতে হবে।“তাদের দাবি আছে সেটা ঠিক আছে। তারা আসুক, কথা বলে দেখি তাদের জন্য কি করতে পারি। তারাও আমাদের কিভাবে সহায়তা করতে পারেন, সবাই মিলে একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। সমস্যা সবার, সমাধানও আমাদেরই করতে হবে।”
এ প্রসঙ্গে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন রিকশামালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক মমিন আলী ও জাতীয় রিকশা ভ্যান শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ইনসুর আলী জানিয়েছেন, তারা মেয়রের দাওয়াত পাননি।
মমিন আলী বলেন, “দাওয়াতের কথা এখনও জানি না। তবে দাওয়াত পেলে যাব। শুনেছি একনেকের সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সড়কে রিকশা চলাচলের জন্য আলাদা লেইন তৈরির কথা বলেছেন। এখন তার বাস্তবায়নের জন্য আমরা কথা বলব।”
ইনসুর আলী বলেন, “কাকে দাওয়াত দিয়েছে, কেন দাওয়াত দিয়েছে, তা আমরা কিছু জানি না।”
গত ৩ জুলাই নগর ভবনে মেয়রের সভাপতিত্বে ‘ঢাকা মহানগরীর অবৈধ যানবাহন দূর/বন্ধ, ফুটপাথ দখলমুক্ত ও অবৈধ পার্কিং বন্ধে গঠিত’ কমিটির বৈঠকে রাজধানীর তিনটি সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরে ৭ জুলাই কুড়িল থেকে বাড্ডা, রামপুরা, খিলগাঁও হয়ে সায়েদাবাদ, গাবতলী থেকে আসাদগেট, সায়েন্সল্যাব হয়ে আজিমপুর পর্যন্ত ও সায়েন্সল্যাব থেকে শাহবাগ পর্যন্ত সড়কে কোনো রিকশা চলাচল বন্ধ থাকে। সোমবার থেকে আন্দোলনে নামেন রিকশাচালকরা। তাদের সঙ্গে যোগ দেন মালিকরাও।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে কুড়িল, বাড্ডা, রামপুরা ও মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার কয়েক জায়গায় জড়ো হয়ে কয়েক হাজার রিকশাচালক বিক্ষোভ করেছে। তাদের এই বিক্ষোভের কারণে প্রগতি সরণি হয়ে মালিবাগ থেকে রামপুরা হয়ে কুড়িলের দিকে যান চলাচল বন্ধ থাকে বলে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (ট্রাফিক পূর্ব) মুহাম্মদ কামারুজ্জামান জানিয়েছেন।
এ সময় আন্দোলনরত রিকশা চালকরা ওই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বিভিন্ন স্লোগান দেয় অবরোধ থেকে। প্রগতি সরণিতে রিকশা মালিকরাও অবরোধে যোগ দেয়। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের বড় একটি অংশ বন্ধ থাকায় সকালে রাস্তায় বেরিয়ে অফিসগামী যাত্রীরা পড়েন ভোগান্তিতে। আশপাশের সড়কগুলোতেও সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। বাধ্য হয়ে অনেকে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।
রামপুরা টেলিভিশন স্টেশনের সামনে ইউলুপের নিচে রিকশাচালকদের অবস্থানের মধ্যে কথা হয় হিরণ নামে একজনের সঙ্গে। তিনি বলেন, মাগুরা থেকে কাজের আশায় ঢাকা এসে এখন তিনি রিকশা চালাচ্ছেন। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে বনশ্রী এলাকার ভাইয়াপাড়ায় থাকেন তিনি। আর বাবা-মা থাকেন মাগুরায়। পরিবারে তিনিই উপার্যনক্ষম একমাত্র ব্যক্তি। হিরণ বলেন, “আমাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে এভাবে রিকশা বন্ধ করে দিতে পারে না। আমরা তো ছেলে-মেয়ে নিয়ে না খেয়ে মরবো।”

বিকল্প ব্যবস্থা না করে রিকশা উচ্ছেদ
নিষ্ঠুরতা ও মানবতার পরিপন্থী
-রিকশা শ্রমিক ঐক্য পরিষদ
বিকল্প ব্যবস্থা না করে রিকশা উচ্ছেদ নিষ্ঠুরতা, মানবতার পরিপন্থী। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে এ উচ্ছেদ গরিবের পেটে লাথি মারার শামিল।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে রিক্সা চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষনার প্রতিবাদে বাংলাদেশ রিক্সা শ্রমিক ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক হারুনুর রশিদ খান ও সাধারণ সম্পাদক লস্কর মোঃ তসলিম এক যৌথ বিবৃতিতে এক কথা বলেন।
তারা আরো বলেন, দেশ আজ দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে লুটেরা শক্তি, অন্যদিকে মেহনতি মানুষ। সরকার লুটেরা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করছে বলেই মেহনতি মানুষের পেটে লাথি পড়ছে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, আমরা দৃরভাবে বিশ্বাস করি আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে রিকশা ভ্যান শ্রমিকদের অবদানের বিষয়টি অনস্বীকার্য, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে  অবদান রেখে যাচ্ছে রিক্সা ভ্যান শ্রমিকরা,তাই রিক্সা ভ্যান শ্রমিকদের মর্যাদা দিতে হবে।
কেহ কেহ রিক্সাকে জানজটের কারন দেখাতে চায়, পরিবেশবান্ধব ঐতিহ্যবাহি এই বাহনকে নিষিদ্ধ করতে চায়,স্বাভাবিক চলাচলে বাধার সৃষ্টি করতে চায়, আমরা এক্ষেত্রে সকলের দূরদর্শী গঠনমূলক দায়ীত্বশীল  ভূমিকা কামনা করি।
তারা আরো বলেন, বাংলাদেশে রিকশা শ্রমিক  অবহেলিত, অধিকার বঞ্চিত, নির্যাতিত,নিপীড়িত, রিকশা ভ্যান শ্রমিকদের তাদের ব্যক্তিগত সামাজিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধানে সরকারের ভূমিকা রাখা উচিত, যাতে বৈষম্য দূরীভূত হয়। তাই এ লক্ষ্যে পৌছাতে আমরা শ্রমিক-জনতার ঐক্যবদ্ধ সহযোগিতা কামনা করি।
বিবৃতিতে বাংলাদেশ রিক্সা শ্রমিক ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে নিন্মক্ত দাবী জানানো হয়, (এক) রিকশা পরিবেশবান্ধব বাহন। কোন অজুহাত দাড় করিয়ে তা নিষিদ্ধ করা যাবে না। (দুই) রিকশা চালককে একটি সম্মানজনক পেশা হিসেবে মর্যাদা দিতে হবে। (তিন) রিকশাকে পরিবেশবান্ধব বাহন হিসাবে মর্যাদা দিয়ে রিকশা শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। (চার) নিরাপদ চলাচলের জন্য সড়ক পরিকল্পনায় অবশ্যই আলাদা রিকশা লেন রাখতে হবে। প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ