ঢাকা, বৃহস্পতিবার 11 July 2019, ২৭ আষাঢ় ১৪২৬, ৭ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

পাবনার তরুণ ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবের নকশায় ঢাকার ৬০ ভাগ যানজট কমানো সম্ভব!

কামরুল ইসলাম (পাবনা): বিভিন্ন সমস্যার ভারে জর্জরিত আমাদের ঢাকা শহর। এর মধ্যে যানজট এই শহরের প্রতিদিনের প্রধান আলোচনার বিষয়বস্তু। যানজটকে বাস্তবতা মেনে নিয়েই যেন রাজধানীর মানুষ তাদের দিনের কর্মসূচি ঠিক করে থাকে। যানজটের কারণে মৌলিক কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে আমাদের। এটা নিয়ে অনেক বছর ধরে বলা হচ্ছে অনেক কথা মাঝে মধ্যেই শোনা যায় নানা রকমের উদ্যোগের কথাও, কিন্তু সমাধান হচ্ছে না এ সমস্যার, বরং দিনে দিনে আরও প্রকট হচ্ছে অসহ্য এই সমস্যা। ভবিষ্যতের কথা ভেবে এগুলোর প্রতিকারের উপায়ও নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এই যানজট প্রতিদিন নষ্ট করছে লাখ লাখ কর্মঘণ্টা। এবার এই সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেমের নকশা তৈরি করেছে পাবনার কৃতি সন্তান ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবুর রহমান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নকশা দিয়ে ঢাকার রাস্তার যানজট প্রায় ৬০ ভাগ কমিয়ে আনা সম্ভব। যানজটের কবল থেকে মুক্তি পাবে ঢাকার শতভাগ জনগণ।
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার ভদ্রকোলার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবুর রহমান। ঢাকার এই যানজট সমস্যা নিরসনে ২০১৩ সাল থেকে ঢাকার রাজপথে পায়ে হেটে হেটে কাজ করে তৈরি করেছেন ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেম নকশা। যেটা এক অভিনব আবিষ্কার বলছে সাধারণ জনগণ।
এখানে প্রত্যেকটি গাড়ির জন্য আলাদা লেন ব্যবহার করা হয়েছে যাতে করে ইউলুপ টার্নের মাধ্যমে গাড়ির গতি সামান্য কমিয়ে সেপারেশন রোডের মাধ্যমে নির্দিষ্ট লেনে পৌঁছাতে পারবে। যেখানে ট্রাফিক পুলিশের কন্ট্রোল ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে চলতে পারবে গাড়িগুলো। মাহবুবুর রহমান ট্রাফিক কন্টোল সিস্টেম সম্পর্কে এ প্রতিবেদককে বলেন, নানা সমস্যায় জর্জরিত ঢাকার শহর। এর মধ্যে যানজট এই শহরের প্রধান সমস্যা। এ্যাম্বুলেন্স এর ভিতরে রোগীর স্বজনদের আর্তনাত। যানজটে আটকে পরে পরিক্ষার্থীর মৃত্যু। এগুলো যেন নিত্যদিনের খবর। এ সমস্যা সমাধানের জন্য গ্রহণ করা হয়েছে নানা রকম উদ্যাগ পরিকল্পনা। কিন্তু এর সঠিক সমাধান আজ পর্যন্ত হল না। আর এ সমস্যার সমাধান নিয়ে আমার কিছু প্রস্তাব রাখছি, আর তা বাস্তবায়িত হলে আশাকরি ৬০/৭০ ভাগ যানজট কমে যাবে ঢাকা শহর থেকে। ঢাকা হবে পরিকল্পিত যানকট মুক্ত শহর। অপরদিকে বিশ্বের ব্যবসায়ীদের কাছে ব্যবসার প্রাণ কেন্দ্র হয়ে উঠবে রাজধানী ঢাকা। দেশ হবে অর্থনীতিতে সমৃদ্ধ।
এই নকশায় তিনটি প্রধান কম্বিনেশনে কাজ করা হয়েছে। (১) প্রাইভেট ও পাবলিক গাড়ির জন্য আলাদা লেন ব্যবহার করা হয়েছে। (২) আরটিফিশিয়াল ক্যামেরার মাধ্যমে গাড়ির নেমপ্লেট এ ফোকাসিং করে টোল ট্যাক্স কাটার ব্যবস্থা থাকবে। (৩) ইউ (ট) লুপ ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রাইভেট ও পাবলিক গাড়ির জন্য আলাদা লেন ব্যবহার করা এ পদ্ধতিটা ইজঞ (ইঁং জধঢ়রফ ঞৎধহংরঃ) থেকেও প্রায় ৪০ ভাগ বেশি লাভজনক হবে। ইজঞ -এ অনেক ব্যয় ও মেইটেনেন্স কস্টও বেশি। এর জন্য টার্মিনাল, বাস ডিপো প্রয়োজন, যেটা অনেক ব্যয়বহুল বলে আমি মনে করছি। আর আমার নকশায় ইজঞ এর মত আলাদা লেন রেখেছি এতে শুধু প্রাইভেট কার চলাচল করবে। প্রাইভেট কারের নেমপ্লেটগুলো ডিজিটালাইজেশন করতে হবে। আরটিফিশিয়াল ক্যামেরার মাধ্যমে গাড়ির নেমপ্লেট এ ফোকাসিং করে টোল ট্যাক্স কাটা হবে। আমি লক্ষ্য করে দেখেছি টোল ট্যাক্সে টোল ফি’র টাকা দিয়ে রশিদ নিতে কমপক্ষে ৯০/৯৫ সে. সময় লাগে। ম্যানুয়ালী টোল ট্যাক্স দিতে কোন কোন সময় একটি গাড়িকে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এতে প্রায় ১ থকে ১.৩০ ঘন্টা সময় নষ্ট হয়।আর যদি ডিজিটালাইজেশন পদ্ধতিতে এই টোল কাটা হয় তাহলে এর কারনে হওয়া যানজট ফেস করতে হবে না। যদিও সরকার প্রাইভেট কারকে প্রাধান্য দিতে নারাজ, তারপরও আমার প্রস্তাবের করাণ হলো (৬ী১২) ৭২ স্কয়ার ফ্টি জায়গা নিয়ে ১টি কার যে পরিমাণ রাস্তা ব্যবহার করে ঠিক একই পরিমাণ জায়গায় ৩৪/৩৬ সিটের ১টি পাবলিক বাস চলাচল করে। সামান্য কিছু বাড়তি ফ্সি দিয়ে প্রাইভেট কারগুলোকে যদি স্পেশাল সুবিধা দেয়া হয় তাহলে রাস্তায় সুশৃঙ্খল পরিবেশ আসবে। এতে সড়ক দুর্ঘটনা অনেক কমে যাবে। কারণ প্রাইভেট কারগুলোকে যদি আলাদা করে দেয়া হয় তাহলে পাবলিক গাড়িগুলোর মধ্যে অটোমেটিক্যালি সুশৃঙ্খল পরিবেশে চলে আসবে। গাড়ি চালকদের মধ্যে আগে যাওয়ার জন্য ওভারটেকিং করার প্রবণতা কমে যাবে। তবে পাবলিক গাড়িগুলোকে যদি এক নিয়মের মধ্যে যেমন- কয়েকটা কোম্পানীতে নিওয়া যেত তাহলে অনেক ভাল হতো। এ পদ্ধতি অনুসরণ করলে সরকারের দিনে কোটি টাকা ইনকামের সুযোগ তৈরি হবে। আর এ পদ্ধতিতে প্রাইভেটকারের জন্য কোন সিগন্যালের প্রয়োজন হবে না। তবে লেন থেকে বের হওয়ার জন্য পাবলিক লেন দিয়ে যেতে কিছুটা ধীরগতি বা সিগন্যালের সম্মুখীন হতে হবে। যাখন নেমপ্লেট এ ফোকাসিং করে টোল ট্যাক্স কাটা হবে। তখন গাড়ির মালিকের মোবাইলে টোলে ফি কেটে নেয়ার ঝগঝ যাবে। এ লোট ফি সরকার নির্ধারিত করে দিবে। তবে এর কোন অপব্যবহার হচ্ছে কিনা তা খেয়াল রাখতে হবে। যেমন- রাইট শোয়ারিং কোম্পানির গাড়ি গুলো তো সারাদিন চলাচল করবে। তাদের জন্য ফি কত হবে তা নির্ধারণ করবে সরকার। তবে আমি মনে করি রাজধানী ঢাকার যানজট সমস্যার সমাধান পলিটিক্যালি করতে হবে।
 ড্রেইনেজ সিস্টেম : আমাদের শরহগুলোতে যে পদ্ধতিতে ড্রেইনেজ করা করা হয়, এটা সঠিক নয়। এতে প্রতি বছর মেরামত বা পুনঃনির্মাণ করা লাগে। এতে যেমন নির্মাণ ব্যয় বাড়ে ফলে প্রচুর অর্থের অপচয় হয়। আমি দেখেছি এভাবে কাজ পরিচালনা করা শুধু অর্থ আর শ্রমেরই অপচয় নয় বরং যানজরেটর সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে দেখা যায় ড্রেইন মেরামত করার জন্য প্রথমে এর সিওয়েজ তুলে রাস্তায় শুকানের জন্য রাখা হয়। তারপর ১৫/২০ দিন পর তা নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর নোংরা পানির মধ্যে রড বোধে ঢালাইয়ের কাজ করা হয। এতে দেখা যায় যে অংশটুকু পানির নিচে থাকে তা সঠিক ভাবে শক্তি অর্জন করে না। এমনও হয় সিমেন্ট-বালি পানি তে ধুঁয়ে তলানীতে জমে যায় আর শুধু রড খাড়া থাকে আর উপরের অংশ দেখে মনে হয় কাজ ঠিকই আছে। এ কারনে প্রতি বছর মেরামত কাজ করতে হয়। আর নোংরা পরিবশে কাজ করতে পারিশ্রমীক ব্যয়টা বেশি লাগে। এ সব কিছুর সমাধান হিসেবে আমরা যদি পি-কাস্ট পদ্ধতিতে কাজ করি এতে করে মিনিমান ১৫/২০ বছরের মধ্যে মেরামত/পুন-নির্মাণ কাজ করতে হবে না। প্রথমে এই নমুনা অনুযোয়ী পি-কস্ট প্যানেল ঢালাই করে নিব। তারপর স্কাভেটর এর সাহায্যে মাটি কেটে অন্য স্কাভেটর দিয়ে প্যানেল গুলো বসিয়ে কাজ সম্পূর্ণ করা হলে প্রতিদিন মিনিমাম ১ কি.মি. ড্রেইনেজ কাজ করা সম্ভব। আমার দেয়া প্রস্তাব অনুযায়ী কাজ করা হলে কনস্ট্রাকশন ব্যয়/মজুরী ব্যয় ও প্রতি বছর মেরামত/পুনঃনির্মাণ কাজের কারণে সৃষ্ট যানজটের সমস্যা হবে না।
ছাদে পার্কিং : বিশেষ করে সুপার মল এলাকাতে কেনাকাটা করতে আসা অতিরিক্তি গাড়ির চাপে যানজটের সৃষ্টি হয়। এ কারণে যদি পার্কিং সিস্টেম ছাদে করা হয় তাহলে যানকট কমানো সম্ভব। এতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। গাড়ি গলো কার্গো লিফ্টের মাধ্যমে উপরে উঠে যাবে। সূর্যের তাপ থেকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ছায়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে বিভিন্ন উৎসবের সময় যে যানজট সৃষ্টি হয় তা অনেকটাই কমে যাবে।
 পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলী তন্ময় দাস বার্তা বাজারকে বলেন, স্মার্ট পদ্ধতিতে ডেমো তৈরির এই রাস্তায় কোনও রকম ট্রাফিক সিগন্যাল ছাড়াই চলতে পারবে প্রাইভেট কার ও যাত্রীবাহী বাস। মাহবুবুর ২০১৬ সালে নরসিংদী সরকারী পলিটেকনিক্যাল কলেজ থেকে সিভিল ডিপ্লোমা শেষ করে। এরপর ভারতের দিল্লী এমডিইউ ইউনিভার্সিটি থেকে বি.এস.সি শেষ বর্ষে পড়াশুনার সময়ে ঢাকার যানজট নিয়ে কাজ শুরু করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ