ঢাকা, শুক্রবার 12 July 2019, ২৮ আষাঢ় ১৪২৬, ৮ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

টাকা ফেরত পেতে চরম উদ্বেগে পিপলস লিজিংয়ের ৬ হাজার আমানতকারী

 

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান: পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের (পিএলএফসিএল) অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। টাকা ফেরত পেতে চরম উদ্বেগে দিনাতিপাত করছে পিপলস লিজিংয়ের ৬ হাজার আমানতকারী। তাদের প্রায় সবারই প্রশ্ন আমানতের টাকা কে দেবে? কবে দেবে? কীভাবে দেবে?। অবসায়নের কারণে এইসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানিক আমানতকারীরা কবে নাগাদ আমানতের টাকা ফেরত পাবেন বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তা বলতে পারছেন না। তবে আমানতকারীদের আতঙ্কিত বা উদ্বিগ্ন না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তারপরও আমানতকারীদের মাঝে দেখা দিয়েছে চরম উদ্বেগ। এদিকে চাকরি হারাচ্ছে বলে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন পিপলস লিজিংয়ের কর্মীরাও। প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মকর্তা-কর্মচারী সব মিলিয়ে প্রায় আড়াইশ’র মতো।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অবসায়ন হতে যাওয়া এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আটকে পড়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যাক্তি আমানতকারীদের ২ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা রয়েছে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের। অবশিষ্ট ৭০০ কোটি টাকা ৬ হাজার সাধারণ গ্রাহকের।

গতকাল বৃহস্পতিবার সরজমিনে দেখা গেছে, অবসায়নের (লিকুইডেশন) খবরে প্রতিদিন শত শত গ্রাহক ভিড় করছেন রাজধানীর মতিঝিলে সিটি সেন্টারে অবস্থিত পিপলস লিজিংয়ের প্রধান কার্যালয়ে। যেসব আমানতকারী অফিসে এসেছেন তাদের টাকা ফেরতের কোনো তথ্য দিতে পারেননি পিপলস লিজিং কর্তৃপক্ষ। শুধু একটি টোকেন হাতে নিয়েই বাড়ি ফিরছেন আমানতকারীরা। 

শফিকুর রহমান নামের এক আমানতকারী জানান, পেনশনের টাকায় আমানত রেখেছি। ছয় থেকে সাত মাস হলো আমানতের টাকার জন্য ঘুরছি। কিন্তু টাকা দিচ্ছে না। এখন প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে আমানতের টাকা কে দেবে? কবে দেবে? কীভাবে পাবো এমন নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সকাল থেকে পিপলস লিজিংয়ের মতিঝিল অফিসে বসে আছেন। তিনি বলেন, সাত মাস ধরে ঘুরাচ্ছে। টাকা পাইনি। একবার চেক দিয়েছিল। উঠানো যায়নি। এখন খুব দুশ্চিন্তায় আছি।

এদিকে চাকরি হারাচ্ছে বলে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন পিপলস লিজিংয়ের কর্মীরাও। প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মকর্তা-কর্মচারী সব মিলিয়ে প্রায় আড়াইশর মতো। গত দুদিন অফিসে না এলেও বৃহস্পতিবার সকাল থেকে অফিস করছেন পিপলস লিজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামি হুদা। পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমাদের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা। তারা অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিষয়টা এখন সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমানতকারীর অর্থ কীভাবে ফেরত দেবে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকই সিদ্ধান্ত নেবে। এখন এ বিষয়ে কথা বলা বা সিদ্ধান্ত নেয়ার কোনো ক্ষমতা আমাদের নেই। যারা কর্মরত তাদের ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে জানতে চাইলে পিপলস লিজিংয়ের এমডি বলেন, এখন আমারই তো চাকরি নেই। অন্যদের বিষয়ে কী বলবো।

নানা অনিয়ম, দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনায় চরম সংকটে থাকা পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের (পিএলএফএসএল) অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে আমানত ফিরে না পাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন আমানতকারীরা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, টাকা পেতে আমানতকারীদের কোনো সমস্যা হবে না। কারণ পিপলস লিজিংয়ের আমানতের চেয়ে সম্পদের পরিমাণ বেশি।

পিপলস লিজিংয়ের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ২০১৪ সালে তদন্ত করে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য জানা যায়। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা বোর্ডের অনেকেই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক চিঠি দিয়ে পরিচালনা বোর্ড ভেঙে নতুন বোর্ড গঠন করে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংককে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়। এরপর অনেক চেষ্টার পরও প্রতিষ্ঠানটি উন্নতি করতে পারেনি। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি অবসায়নের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় চিঠি দেয়া হয়। গত ২৬ জুন মন্ত্রণালয় অনুমতি দেয়। এখন প্রতিষ্ঠানটি অবসায়নের জন্য আদালতে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তিনি বলেন, অবসায়ন হলেও আমানতকারীদের আতঙ্কের কিছু নেই। আমাদের কাছে যে হিসাব রয়েছে তাতে প্রতিষ্ঠানটির আমানতের তুলনায় সম্পদের পরিমাণ বেশি। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমানে আমানত রয়েছে দুই হাজার ৩৬ কোটি টাকা। বিপরীতে সম্পদ রয়েছে তিন হাজার ২৩৯ কোটি টাকা।

পিপলস লিজিংয়ের মতিঝিল অফিসে প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট কাজী আহমেদ জামান বলেন, আমানতকারীদের মতো আমরাও দুশ্চিন্তায় রয়েছি। কারণ অবসায়নের সংবাদ আমরা আগে জানতাম না। পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জেনেছি। এরপর থেকে অফিসে আমানতকারীরা আসছেন। তাদের কী বলবো কিছুই বুঝতেছি না। পিপলস লিজিংয়ে সব মিলিয়ে প্রায় ছয় হাজার আমানতকারী রয়েছেন। এছাড়া অফিসের কর্মী রয়েছে আড়াইশ’র মতো। আমানতকারীদের পাশাপাশি আমরাও এখন হতাশায় রয়েছি কারণ আমাদেরও চাকরি নেই। নিজেদের ভবিষ্যত নিয়েও আমরা উদ্বিগ্ন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক নির্বাহী পরিচালক মো. শাহআলম বলেন, কোম্পানির কয়েকজন পরিচালক বিধি বর্হিভূতভাবে ঋণ নেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি দুর্বল হয়ে পড়ে। যার কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে অবসায়ন করতে হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালের ২৪ নভেম্বর পিপলস লিজিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে অনুমোদন লাভ করে। ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারবাজারে তালিকাভূক্ত হয়। মোট শেয়ারের মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ৬৮ শতাংশ, উদ্যোক্তাদের ২৩ শতাংশ এবং প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে মোট আমানতের পরিমাণ ২ হাজার ৩৬ কোটি ২২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা রয়েছে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বাকি ৭০০ কোটি টাকা রয়েছে ৬ হাজার সাধারণ গ্রাহকদের আমানত। প্রতিষ্ঠানটির ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭৪৮ কোটি টাকা খেলাপিঋণ। খেলাপি ঋণের বড় অংশই নিয়েছে কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ