ঢাকা, শুক্রবার 12 July 2019, ২৮ আষাঢ় ১৪২৬, ৮ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া রিকশা বন্ধ করা উচিত নয়

স্টাফ রিপোর্টার: সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনা করে বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া রিকশা বন্ধ করা উচিত নয় বলে মত দিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। সংগঠনটির মতে, সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ও পরিকল্পনা ছাড়া যানজট ও পরিবেশ দূষণের বিরূপ প্রতিক্রিয়া সামনের দিনগুলোতে রাজধানীর মানুষের জীবনকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বীর উত্তম সি আর দত্ত রোডে বিআইপির কনফারেন্স হলে ‘ঢাকা শহরে রিকশা ও অযান্ত্রিক বাহনের চলাচল সম্পর্কে নগর পরিকল্পনার দৃষ্টিকোণ থেকে করণীয়’ শীর্ষক সাংবাদিক সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এমন মন্তব্য করা হয়। 

সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি এ কে এম আবুল কালাম আজাদ, সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান, সহ-সভাপতি আক্তার মাহমুদ, বুয়েট অধ্যাপক মুসলে উদ্দিন প্রমুখ।

দুঃসহ যানজটে ক্রমেই অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছে রাজধানীবাসী। যানজট যেভাবে বাড়ছে সেই তুলনায় রাস্তা বাড়ছে না। অপরিকল্পিতভাবে নগরীতে এমনভাবে ভবন তৈরি হয়েছে, যেখানে রাস্তা বাড়ানোর সুযোগও কম। এমন অভিযোগ স্বয়ং পরিকল্পনাবিদ ও নগরবিদদের।

পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান তার প্রেজেন্টেশনে বলেন, যানজটের কারণে ব্যয়, সময় ও মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ও পরিকল্পনা ছাড়া যানজট ও পরিবেশ দূষণের বিরূপ প্রতিক্রিয়া সামনের দিনগুলোতে ঢাকার মানুষের জীবনকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলবে।

তিনি বলেন, কম দৈর্ঘ্যরে পথে কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য রিকশাকে বেছে নিয়েছে অনেকেই। ১৯৮৬ সালের ঢাকা সিটি কর্পোরেশনে সর্বশেষ রিকশা ভ্যানের নিবন্ধন দেয়া হয়। তারপর থেকে রাজধানীতে কাগজে কলমে আর কোনো নতুন রিকশার লাইসেন্স বা অনুমোদন দেয়া হয়নি। দুই সিটি মিলিয়ে বৈধ রিকশার সংখ্যা ৭৯ হাজার ৫৪৭টি। তবে রাস্তাই চলাচলকারী রিকশার সংখ্যা বিভিন্ন তথ্যমতে ৮-১০ লাখ।

বক্তারা বলেন, একটি রিকশা যতটুক জায়গা দখল করে, তার দ্বিগুণ জায়গা দখল করে প্রাইভেট কার। একটি রিকশা সারাদিনে কমপক্ষে ৪০ জন যাত্রীবহন করে। একটি প্রাইভেট কার সারা দিনে একজন বড় জোর ২ জন যাত্রী বহন করে। রিকশায় পরিবেশ দূষণ হয় না, প্রাইভেট কারে পরিবেশ দূষণ হয়, প্রাইভেট কার চলাচল নিয়ন্ত্রণ করুন।

বিভিন্ন দাবি জানিয়ে তারা বলেন, শহরের রাস্তার সক্ষমতা বিবেচনা পূর্বক রিকশা এবং ব্যক্তিগত গাড়ির পরিমাণ ও ব্যবহার সুনির্দিষ্ট করতে হবে। জোনভিত্তিক গণপরিবহন পরিকল্পনা দরকার। চক্রাকার বাস সার্ভিসের মতো সব শ্রেণি পেশার মানুষের জন্য মানসম্মত কমিউনিটি ভিত্তিক ট্রানজিট ব্যবস্থা চালু করতে হবে যেন মানুষ রিকশা কিংবা ব্যক্তিগত গাড়ির বিকল্প খুঁজে পায়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যায়ের এক জরিপ অনুযায়ী রাজধানীতে চলাচলকারী রিকশার সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। এর মধ্যে সিটি কর্পোরেশনের নিবন্ধন রয়েছে মাত্র ৭৯ হাজার ৫৪৭ টির। বাকি রিকশাগুলো অবৈধ। মূলত যানজট নিরসনে ১৯৮৬ সালের পর থেকে রাজধানীতে রিকশার লাইসেন্স দেয়া বন্ধ করে দেয় সিটি কর্পোরেশন।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, পুরো রাজধানীতে ৮০ হাজার ৪৭৩টি রিকশার লাইসেন্স রয়েছে। এর মধ্যে ডিএসসিসি এলাকায় ৫২ হাজার ৭৫৩ ও ডিএনসিসিতে ২৬ হাজার ৭২০টি রিকশার লাইসেন্স রয়েছে।

এদিকে রিকশার নতুন লাইসেন্স দেয়া বন্ধ থাকার সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে এক শ্রেণির নাম সর্বস্ব সমিতি ও সংগঠন। তারা রিকশার লাইসেন্স স্বরূপ নম্বর প্লেট দিচ্ছে। এক একটি নম্বর প্লেটের বিপরীতে রিকশা প্রতি তিনমাস পরপর আদায় করা হচ্ছে ৪৫০ টাকা। আর লাইসেন্সের কথা বলে নেয়া হচ্ছে ১৫-২০ হাজার টাকা। রাজধানীতে সরকারিভাবে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার সুযোগে অবৈধভাবে রিকশার লাইসেন্স নিয়ে জমজমাট বাণিজ্য চলছে। বেশ কয়েকটি চক্র লাইসেন্স বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অথচ লাইসেন্স বাবদ এগুলো থেকে রাজস্ব পাচ্ছে না সিটি কর্পোরেশন।

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রিকশার আধিক্যের কারণে যানজট সৃষ্টি হয়। এ কারণে রিকশার লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে না। তবুও রাজধানীতে রিকশা বন্ধ করা যায়নি। বরং প্রতিদিনই রিকশার সংখ্যা বাড়ছে। 

জানা গেছে, অবৈধ রিকশার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে প্রায় ২৮টি সংগঠন। সংগঠনের মধ্যে রয়েছে ঢাকা বিভাগ রিকশা ও ভ্যান মালিক সমিতি, বাংলাদেশ রিকশা ও ভ্যান মালিক ফেডারেশন, মহানগর রিকশা মালিক, বাংলাদেশ রিকশা ও ভ্যান মালিক সমিতি, ফেডারেশনসহ আরও অনেক বেনামি সংগঠন। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।

এ বিষয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক বলেন, রিকশার লাইসেন্স বন্ধ এরপরও সংঘবদ্ধ চক্র লাইসেন্স বা নম্বর প্লেট দেয়ার মাধ্যেমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এতে করে রাজস্ব হারাচ্ছে সিটি কর্পোরেশন। যেহেতু রাজধানীর গণপরিবহনে বিশৃঙ্খল অবস্থা তাই স্বল্প দূরত্বে যাত্রীদের কাছে রিকশা বেশ জনপ্রিয়। তাই যাত্রীদের চলাচলে রিকশা একটা বড় ভূমিকা রাখছে। সে বিষয়টি মাথায় রেখে সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলদের সঙ্গে নিয়ে রিকশা চলাচলবিষয়ক একটি সমন্বয় কমিটি করা যেতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ