ঢাকা, শুক্রবার 12 July 2019, ২৮ আষাঢ় ১৪২৬, ৮ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

হারিয়ে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকার বিরল ও পুরাতন বৃক্ষরাজি

 

মুহাম্মদ নূরে আলম: রাজধানী ঢাকার বয়স ৪০০ বছর উদযাপন করেছে শহরটি। মানব বসতি এবং ইতিহাস-সংস্কৃতির দিক থেকে ৪০০ বছর অনেক দীর্ঘ সময়। কিন্তু এই শহরে ৪০০ বছর তো দূরের কথা, ২০০ বছরের পুরোনো বৃক্ষও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। দীর্ঘ পরাধীনতা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অসচেতনতা এবং মাত্রাতিরিক্ত লালসার করালগ্রাসে এখানকার অনেক ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রাচীন বৃক্ষ সম্পদও হারিয়ে গেছে। তাই ঢাকায় শতবর্ষী বা শতোর্ধ্ববর্ষী বৃক্ষের সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকটি। এমনই একটি শতবর্ষী বৃক্ষ হিসেবে ধারণা করা হয় ফুলার রোডের পুরোনো তেঁতুলগাছটিকে। এছাড়াও আছে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সামনে রেইন ট্রি । এই বিশাল গাছগুলোও কম পুরাতন নয়, এই গাছগুলোর রক্ষার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশকর্মীরা।

গাছের শহর ঢাকা এক সময় ছিল বিশাল মহীরূহছায়াঘন, বিচিত্র জাতের বৃক্ষের সমাহার ঢাকাকে দিয়েছিল বিরল শোভা আর সৌন্দর্য। কিন্তু এখন সে রূপ আর বৈচিত্র উধাও। দশকের পর দশক ধরে বৃক্ষ উজারের মিছিলে ঢাকা তার আগের শ্যামল রূপশোভা হারিয়ে ফেলেছে। গাছের শহর ঢাকা এক সময় ছিল বিশাল মহীরূহছায়াঘন, বিচিত্র জাতের বৃক্ষের সমাহার ঢাকাকে দিয়েছিল বিরল শোভা আর সৌন্দর্য। কিন্তু এখন সে রূপ আর বৈচিত্র উধাও। দশকের পর দশক ধরে বৃক্ষ উজারের মিছিলে  ঢাকা তার আগের শ্যামল রূপশোভা হারিয়ে ফেলেছে। আর এরই মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে অনেক দুর্লভ গাছ। যেসব দুর্লভ গাছ এখনো কোনো মতে আকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে সেগুলোও নগরবাসী ও কর্তৃপক্ষের অসচেতনতা, অপরিণামদর্শিতা, লোভ আর নগর পরিকল্পকদের ভুলে বিলুপ্ত হওয়ার পথে। অযত্ন আর অবহেলাই এসব দুর্লভ বৃক্ষের হারিয়ে যাওয়া মূল কারণ। প্রতিবছরই এসব প্রাচীন ও দুর্লভ গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে বলে জানাচ্ছে পরিবেশকর্মীরা। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কালের সাক্ষী এই তেঁতুলগাছটি এক জীবনে অনেক কিছু দেখেছে। মোকাবিলা করেছে অনেক বৈরী পরিস্থিতির। তুলনামূলকভাবে আরও কম বয়সী কয়েকটি তেঁতুলগাছ দেখা যায় বাংলাদেশ শিশু একাডেমী ও রমনা পার্কে। ফুলার রোডের এই তেঁতুলগাছ সম্পর্কে ঐতিহাসিক কোনো তথ্য খুঁজে পাওয়া না গেলেও ফুলার রোড সম্পর্কে ইতিহাসবেত্তা মুনতাসীর মামুন ঢাকা স্মৃতি-বিস্মৃতির নগরী গ্রন্থে লিখেছেন, ‘... ১৯০৫ সালে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠিত হলে এর প্রথম লে. গভর্নর ছিলেন স্যার ব্যামফিল্ড ফুলার। মুসলিম সম্প্রদায়ের তিনি ছিলেন প্রিয়ভাজন।’ উল্লিখিত তথ্য থেকে স্পষ্ট যে স্যার ব্যামফিল্ড ফুলারের নামানুসারে এই সড়কটির নামকরণ এবং সেই সূত্রে সড়কটিও বেশ পুরোনো। তেঁতুলের বৃদ্ধি মন্থর। সেই অর্থে পুরু কা-ের গাছ হতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। 

সামান্য ঝড়ে রাজধানী ঢাকার সড়কের পাশে ও সড়ক বিভাজকসহ বিভিন্ন স্থানে লাগানো গাছপালা ভেঙে পড়ছে। এসব গাছের কোনও পরিচর্চা করা হয় না। অতিরিক্ত ডালপালা ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশও অপসারণ করা হয় না। প্রতিটি গাছের ঢালপালা বেড়ে উঠছে আপন গতিতে। এসব কারণে সামান্য ঝড়ের কবলে পড়লেই ভেঙে পড়ছে গাছগুলো। এক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করার বলেছেন উদ্ভিদ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, গাছ ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ মাটির গুণগত মান পরীক্ষা না করে গাছ লাগানো। তাছাড়া গাছের সঠিক পরিচর্চা না করা, ঝড়ের মাত্রা বেড়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ডালপালা না কাটা এবং ভূপৃষ্ঠে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় গাছ ভেঙে পড়ছে। এজন্য প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গাছের পরিচর্চা নেওয়া। তাপামাত্রা বাড়ায় মাটি থেকে বাতাস উপরে চলে যাচ্ছে।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন-পবা’র চেয়ারম্যান আবু নাসের বলেন, নগরীর পুরনো গাছের অবস্থান ও বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে মূলত ঐতিহাসিকদের মত মেনে। ১৮২৫-১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে রমনায় রোপিত বিভিন্ন প্রজাতির গাছই এখন নগরীর পুরনো ও দুর্লভ গাছ। সেগুলো দিয়ে করা যেতে পারে জাদুঘর। অনেক দেশেই তা আছে। তিনি বলেন, নগরীর পুরনো গাছ সংরক্ষণ প্রসঙ্গে তাঁর দবৃক্ষ তুমিঃ আদিপ্রাণদ নিবন্ধে মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে, বিশেষ করে ঢাকায়, যেসব পুরনো বৃক্ষ আছে যা দল্যান্ডমার্কদ হিসেবে বিবেচিত সেগুলোর সঠিক তালিকা প্রণয়ন করে সংরক্ষিত ঘোষণা করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কোনও সরকারই আজ পর্যন্ত সে প্রস্তাব বাস্তবায়ন করেনি। রমনা পার্ক, বলধা গার্ডেন, বোটানিক্যাল গার্ডেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, গণভবন ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর বাগানে এখনো টিকে আছে বেশ কিছু দুর্লভ গাছ। 

সরজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং বিভিন্ন সূত্রে জানাযায়, একটি শতবর্ষী মহুয়া আছে শহরে। অবস্থান মোহাম্মদপুর রেসিডেন্সিয়াল স্কুল ও কলেজে। এখানে আছে বেশ কিছু বয়সী শিরীষ, দাঁড়িয়ে আছে আওরঙ্গজেব রোডের কোল ঘেঁষে। পাখিফুলের দেখা মেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবনের সামনে ও শিশু একাডেমীর বাগানে একটি করে। কনকচাঁপা ফুলের মাত্র তিনটি গাছ এখন পর্যন্ত টিকে আছে এই শহরে। গাছ তিনটি আছে বলধা গার্ডেন, রমনা পার্ক ও শিশু একাডেমীর বাগানে একটি করে। বনপারুলের দেখা বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর বাগান ছাড়া আর কোথাও পওয়া যায়না। 

পাদাউক গাছের দেখা মেলে হেয়ার রোডে কয়েকটি। দুই-তিনটি পীত পাটনা গাছ আছে রমনা পার্কে। টিএসসি, রমনা পার্ক এবং বঙ্গভবনের প্রাচীরঘেঁষে দিলকুশায় কয়েকটি বুদ্ধ নারকেল গাছ আছে। কয়েকটি আকাশনিম বা হিমঝুরি গাছের মধ্যে ঢাবি বিজ্ঞান গ্রন্থাগারের প্রবেশপথে, খ্রিস্টান কবরস্থানে এবং শিশু একাডেমীর বাগানে কয়েকটি দেখা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলের সামনে সবচেয়ে বয়সী সিলভার ওক গাছের অবস্থান। মাধবীলতার দেখা মিলবে রমনা পার্ক, শিশু একাডেমী, বোটানিক্যাল গার্ডেন ও বলধা গার্ডেনে । কানাইডিঙ্গা নামের এক বিরল গাছের অবস্থান ঢাবি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে, ঢাবি বোটানিক্যাল গার্ডেনে এবং মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ-উদ্যানে। মৎস্যভবন থেকে রমনা থানা পর্যন্ত সড়কের ফুটপাতে আছে কয়েকটি তেলসুর। বেইলি রোডের ক্রসিংয়ে একটি খইয়া বাবলা আছে। মাত্র তিনটি জহুরিচাঁপা গাছ আছে রমনা ও বলধা গার্ডেনে। ক্রিমফ্রুট প্রজাতির মাত্র ২টি গাছ আছে বলধা ও রমনায় একটি করে। গাছটি রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনার পাশের ব্লাকবি নামেমাত্র একটিমাত্র গাছ ঢাকায় আছে । ধানমন্ডি ৩/এ রোডে একটি এবং বলধা গার্ডেনে একটি করে ট্যাবেব্যুইয়া গাছের দেখা পাওয়া যায়। রমনা ও ধানমন্ডি লেকের পাড়ে একটি করে দুটি বাওবাব গাছ আছে। ঢাবি উপ-উপচার্যের বাসার সামনে পৃথিবীর সর্বশেষ প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া তালিপামের চারা রয়েছে। 

সূত্রে আরও জানাযায়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে ঢাকা সিটি করপোরেশন নগরীতে গাছ লাগানো শুরু করে। পাশাপাশি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), গণপূর্ত বিভাগ, পরিবেশ অধিদফতর, সড়ক ও জনপদ বিভাগসহ বিভিন্ন সংস্থার লাগানো গাছ রয়েছে। এসব গাছের সঠিক কোনও হিসাব বর্তমান দুই করপোরেশনের কাছে নেই। ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকার আয়তন ৩০৪ বর্গকিলোমিটার। এই আয়তনের ঠিক কত ভাগ গাছ আছে তার কোনো হিসাব নেই বনবিভাগ বা সিটি করপোরেশনে। জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান বা বোটানিক্যাল গার্ডেনে বেশ কিছু দেশি-বিদেশি বিরল প্রজাতির গাছের দেখা পাওয়া যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অ্যানথোনিয়া, আগর, রেড ফ্রুট, পুনর্নভা, আকন্দ, ওল্ডম্যান ক্যাকটাস, কর্পূর, খরগোশ ফার্ন, তমাল, ডামবিয়া, ভূজ্জপত্র, মাধবী, কানাইডিঙ্গা, ট্যাবেব্যুয়া, কালোকেশি, অনন-মূল, সাদা রঙ্গন, বড় চম্পা, কারিলিফ, ছোট মুসান্ডা, রামবুতাম, ক্যান্ডল গাছ প্রভৃতি। বলধা গার্ডেনে ক্যামেলিয়া, স্বর্ণ অশোক, প্যাপিরাস, চামেলি, হাপারমালি, হংসলতা, আফ্রিকান টিউলিপ, লতা গন্ধরাজ, কনকচাঁপা, জহুরিচাঁপা, ক্রিমফ্রুট, কুরচি, মাধবী, হলুদ, নীল, লাল ও সাদা জাতের শাপলা, বিরল প্রজাতির ক্যাকটাস ও অর্কিড, ভূজ্জপত্র। 

রমনা পার্কেও কয়েকটি বিরল প্রজাতির গাছ হলো পাদাউক, পলাশ, ধারমার, কাউয়াতুতি (বনপারুল), আগর, জ্যাকারান্ডা, তমাল, বাওবাব, গ্লিরিসিডিয়া, কর্পূর, স্কারলেট কর্ডিয়া, জহুরিচাঁপা, ক্যাশিয়া জাভানিকা, মাধবী, মালতী, আফ্রিকান টিউলিপ, কেয়া, অশোক, ট্যাবেবুয়া, পাখি ফুল, কফি, উদয়পদ্ম, সহস্রবেলী, গোল্ডেন শাওয়ার, পালাম, কাউফল, ঝুমকো, লতা পারুল, স’লপদ্ম, মহুয়া, কুর্চি, বন আসরা, চন্দন, মাকড়িশাল, দুলিচাঁপা, কনকচাঁপা ইত্যাদি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আছে গাছ হচ্ছে মিলেশিয়া, নাগলিঙ্গম, বুদ্ধ নারিকেল, পলাশ, সেতু শিমুল, হিজল, কদম, স্বর্ণচাঁপা, কদবেল, বিলেতি গাব, বড়বেল, আমলকি, হরিতকি, বহেরা, নাগেশ্বরচাঁপা।

বঙ্গভবনের উল্লেখযোগ্য গাছ হচ্ছে, কদবেল, গুলানচি, কাজুবাদাম, বিলিম্বি, মিষ্টি তেঁতুল, কাউফল, নাগেশ্বর, ফাইকাস, কেশিয়া সায়মা, একাশিয়া, রাবার প্লান্ট, শিমুল, বোতলব্রাশ, অপরাজিতা, উইপিং দেবদারু, নীলমনি লতা, নীল কণ্ঠ, মোসেন্ডা, সোনালু, ম্যাগনোলিয়া, কাঞ্চন, হৈমন্তী, সাইকাস পাম প্রভৃতি। চন্দ্রিমা উদ্যানের জারুল, বোতল ব্রাশ, কৃষ্ণচূড়া, ও ক্যান্টিয়া পামগাছ আছে। সংসদ ভবনের উত্তর প্লাজায় আছে রানীচূড়া, মুসুন্ডা, একজোড়া, রঙন, কাঞ্চন ,পলাশ, ফিসটেইল পাম গাছ। এসব দুর্লভ গাছের সংখ্যাও ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে । বৃক্ষপ্রেমিকদের দাবি, সরকার এসব সংরক্ষণে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।

উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ গণমাধ্যমকে একবার এই বিষয়ে বলেন, নানা স্থানে ঢাকায় গাছ লাগানো হচ্ছে। কখনও রাস্তার পাশে, কখনও সড়ক বিভাজক, আবার কখনো ফুটপাতে। এসব স্থানে পর্যাপ্ত মাটি নেই। গাছের মূল শিকড় মাটির গভীরে যেতে পারে না। ফলে শক্তিহীন হয়ে পড়ে গাছ। আবার যদি লালমাটি হয় সেখানে গাছ শক্তি পায় না। সামান্য বৃষ্টিতে মাটি খুব নরম হয়ে পড়ে। তখন ডালপালাও শক্তি হারায়। বাতাসে ভেঙে পড়ে। এজন্য মাটির গুণগত মান পরীক্ষা করে উপযুক্ত গাছ লাগানো উচিত।

জানতে চাইলে পরিবেশ আন্দোলন গ্রীণ ভয়েস প্রতিষ্ঠাতা আলমগীর কবির বলেন, একটা গাছ লাগানোর পর সবাই মনে করে এর দায় শেষ। এরপর কোনও পরিচর্চা করা হয় না। গাছের অতিরিক্ত ডালপালা কাটা হয় না। ফলে গাছের মূল থেকে মাথা পর্যন্ত অনেক ভারী হয়ে পড়ে। সে বাতাসের গতিবেগ রোধ করতে পারে না। অনেক সময় বিনাবাতাসেও গাছ হেলে পড়ে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ