ঢাকা, সোমবার 15 July 2019, ৩১ আষাঢ় ১৪২৬, ১১ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বাজারের পাস্তুরিত দুধ চার প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার নির্দেশ হাইকোর্টের

স্টাফ রিপোর্টার : বাজারে থাকা বিএসটিআই অনুমোদিত বিভিন্ন কোম্পানির পাস্তুরিত (প্যাকেটজাত) দুধে অ্যান্টিবায়োটিকসহ ক্ষতিকর কোনো উপাদান আছে কিনা তা চারটি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
একটি রিট আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে গতকাল রোববার বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
বিএসটিআই অনুমোদিত পাস্তুরিত দুধে অ্যান্টিবায়োটিক, ডিটারজেন, ফরমালিন, ব্যাকটেরিয়া, কলিফর্ম, অ্যাসিডিটি, স্টাইফলোকাস্টেস ও ফরমালিন আছে কিনা তা পরীক্ষা করে চারটি গবেষণাগারকে এক সপ্তাহের মধ্যে আলাদাভাবে প্রতিবেদন দিতে বলেছে আদালত।
আদালত আগামী ২৩ জুলাই পরবর্তী শুনানির জন্য রেখেছে।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর), ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডাইরিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) ও সাভারের বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণাগারে বাজারের এসব দুধ স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে।
এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে বিএসটিআইকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে বাজার থেকে দুধের নমুনা সংগ্রহ করতে বলেছে হাইকোর্ট।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুকের নেতৃত্বে দুই দফা গবেষণায় বাজারে থাকা বিভিন্ন কোম্পানির দুধে অ্যান্টোবায়োটিকের উপস্থিতি ধরা পড়ার পর আদালতের এই নির্দেশ এলো।
গত ২৫ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক ফারুক বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সাতটি প্যাকেটজাত (পাস্তুরিত) দুধের নমুনা পরীক্ষায় সেগুলোতে মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহৃত শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পাওয়ার কথা জানান।
এরপর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে ওই গবেষণার সঙ্গে সম্পর্ক নেই বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান।
প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তরও তাদের ওই গবেষণা নিয়েই প্রশ্ন তোলে। সরকারি কর্মকর্তাদের পাশে রেখে সংবাদ সম্মেলনে দুগ্ধ ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, এই গবেষণা দেশের দুগ্ধ শিল্পের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক।
এই প্রেক্ষাপটে শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দ্বিতীয় দফা পরীক্ষায়ও বাজার থেকে ১০টি নমুনা নিয়ে ১০টিতেই অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়ার কথা জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টারের সদ্য সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ফারুক।
গতকাল আদালতে বিএসটিআইয়ের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন ব্যারিস্টার সরকার এম আর হাসান। অন্যদিকে রিটের পক্ষে ছিলেন রিটকারী আইনজীবী মো. তানভীর আহমেদ ও ব্যারিস্টার অনিক আর হক।
শুনানির শুরুতে আদালত দুধে অ্যান্টিবায়োটিক আসার সোর্স এবং এসব পেলে মানব শরীরে কী কী ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে? বিএসটিআই কি কখনও দুধের অ্যান্টিবায়োটিক পরীক্ষা করে দেখেছে কি না সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং বিস্ময় প্রকাশ করেন। জবাবে বিএসটিআইএয়ের আইনজীবী বলেন, বিভিন্ন সোর্স থেকে দুধে অ্যান্টিবায়োটিক প্রবেশ করে। অনেক কৃষক গরু মোটাতাজাকরণ এবং দুধ বেশি পাওয়ার জন্যও ইনজেকশন ব্যবহার করে। দুধের অ্যান্টিবায়োটিক পরীক্ষা করার প্যারোমিটার বিএসটিআইতে আগে ছিল না। কিন্তু এখন মান পরীক্ষার বিষয়ে প্যারোমিটার অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। একটি কমিটি করে দুধের মান পরীক্ষা করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আদালত এ সময় জানতে চান, আদৌ পাস্তুরিত করার মধ্য দিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক রোধ করার সুযোগ কি রয়েছে? জবাবে আইনজীবী বলেন, যে তাপমাত্রায় হিট দেয়া হয় তাতে অ্যান্টিবায়োটিক থেকেই যাচ্ছে।
আদালত বলেন, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা প্রতিবেদনের বিষয়ে কোন ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে? জবাবে আইনজীবী বলেন, মানুষের শরীরের অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। হয়তো এ কারণেই। পাস্তুরিত করার পরও যদি অ্যান্টিবায়োটিক থাকে তাহলে পাস্তুরাইজড করুক আর না করুক সেই দুধতো মানুষ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে বিস্ময় প্রকাশ করেন আদালত।
আদালত বিএসটিআইয়ের আইনজীবীর উদ্দেশে আরও বলেন, এসব দুধ কেন এখনও বাজারজাত করা হচ্ছে? হাইটেক ল্যাব রেখে লাভ নেই, যদি খাদ্য সিকিউরড না করতে পারে? আদালত বলেন, আমরা এক ঘণ্টা সময় দেব। এই সময়ের মধ্যে কি জানাতে পারবেন?
বিএসটিআইয়ের আইনজীবী আদালতকে জানান, বিএসটিআইয়ের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে। ছয় মাসের মধ্যে নিরাপদ খাদ্য অধিদফতরের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি কমিটি করে আইসিডিডিআরবি, সায়েন্স ল্যাবরেটরি এবং বিএসটিআইয়ের ল্যাবে একই দুধে নমুনা পরীক্ষা করবে।
তখন আদালত বলেন, তার প্রতিবেদন কবে দেয়া হবে, সেটাও কি ছয় মাস পরে জানাবেন? দুই ঘণ্টার মধ্যে জানাবেন পরে আদেশ দেব। পরে হাইকোর্ট আবার বলেন, আজ দিনের শিষে আদেশ দেব।
এরপর রিট আবদেনের পক্ষের আইনজীবী অনিক আর হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টারের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক আ ব ম ফারুকের দুধ পরীক্ষার প্রতিবেদন আলোচনা করে আদালতকে বলেন, যেভাবেই হোক না কেন দুধে বিন্দুমাত্র অ্যান্টিবায়োটিকের অস্তিত্ব থাকতে পারে না। এছাড়াও দুধে ভেজিটেবল অয়েল রয়েছে। সেই অয়েল কমাতে ডিটারজেন্ট ব্যবহার করা হয়।
শুনানি নিয়ে আদালত অধ্যাপক আ ব ম ফারুকের পৃথক দুটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিএসটিআইএয়ের পক্ষ থেকে যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে সে বিষয়ে আইনজীবীর কাছে জানতে চাইলে আদালত বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, দুধে জিটারজেন্ট ব্যবহার করা হয় কেন? তখন রিটকারী আইনজীবী বলেন, ব্যবহার করা হয় তবে সেটা মাত্রার বেশি হওয়া যাবে না।
প্রসঙ্গত, পাস্তুরিত দুধ নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিস রিসার্চ, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) গবেষণা প্রতিবেদন বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাজারে থাকা ৭৫ শতাংশ পাস্তুরিত দুধেই ভেজাল ধরা পড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি।
এই প্রতিবেদন সংযুক্ত করে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানভীর আহমেদ। পরে গত বছরের ২১ মে বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের নিয়ে কমিটি করে বাজারে থাকা পাস্তুরিত দুধ পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
খাদ্য ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সচিব এবং বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালককে দেয়া এই নির্দেশের পর গত ২৫ জুন বিএসটিআইয়ের আইনজীবী ব্যারিস্টার সরকার এম আর হাসান আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ