ঢাকা, মঙ্গলবার 16 July 2019, ১ শ্রাবণ ১৪২৬, ১২ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ডিআইজি মিজান ও বাছিরের বিরুদ্ধে শিগগিরই মামলা করবে দুদক

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : নানা ফন্দি-ফিকির করেও বাঁচতে পারছেন না হালের ঘুষ কেলেংকারী কাণ্ডের দুই হোতা। তাদের একজন পুলিশের আলোচিত কর্মকর্তা মিজান, অপরজন দুদকের বাছির। শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে মামলা করবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রমাণ অনুসন্ধান দলের হাতে চলে এসেছে।
মামলা থেকে বাঁচিয়ে দেয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একজন পরিচালককে ঘুষ দিয়েছেন দাবি করে অডিও প্রকাশ করে মামলায় ফেঁসে যাচ্ছেন পুলিশের সাময়িক বরখাস্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমান। বাদ যাচ্ছেন না ঘুষ নেওয়ায় অভিযুক্ত দুদকের সাময়িক বরখাস্ত হওয়া পরিচালক এনামুল বাছিরও। এই দুজনের বিরুদ্ধে শিগগিরই মামলা হচ্ছে বলে জানিয়েছে দুদকের উচ্চ পর্যায়ের একাধিক সূত্র।
তবে এ বিষয়ে দুদকের কেউ উদ্ধৃত হতে রাজি হননি। চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের কাছে জানতে চাইলে তিনিও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি। বলেছেন, অনুসন্ধান চলছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পরই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এক নারীকে জোর করে বিয়ের পর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ ওঠায় গত বছরের জানুয়ারিতে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনারের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয় মিজানকে। এর চার মাস পর তার সম্পদের অনুসন্ধানে নামে দুদক; এক হাত ঘুরে সেই অনুসন্ধানের দায়িত্ব পান কমিশনের পরিচালক এনামুল বাছির। সেই অনুসন্ধান চলার মধ্যেই এনামুল বাছিরকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দেয়ার কথা নিজেই একটি বেসরকারি টেলিভিশনে ফাঁস করেন ডিআইজি মিজান। এ ঘটনায় শেখ মো. ফানাফিল্যাকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি করে দুদক।
সূত্র জানায়, ঘুষ কেলেঙ্কারির ঘটনা অনুসন্ধান ইতিমধ্যেই শেষ করে এনেছে দুদকের অনুসন্ধান দল। খুব দ্রুত অনুসন্ধান প্রতিবেদন কমিশনে উপস্থাপন করা হবে। কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে শিগগিরই মামলা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সূত্রমতে, মামলায় ডিআইজি মিজান ও দুদক পরিচালক এনামুল বাছির দুজনই আসামি হচ্ছেন।
অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় গতকাল সোমবার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার গেটে ডিআইজি মিজানুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদকের অনুসন্ধান দল। আদালতের আদেশ নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এর আগে ডিআইজি মিজানের অফিসের আর্দালি সুমনকে ২৬ জুন, দেহরক্ষী হৃদয় হাসান ও গাড়িচালক সাদ্দাম হোসেনকে ৭ জুলাই জিজ্ঞাসাবাদ করে অনুসন্ধান দল। অন্যদিকে এনামুল বাছিরকে গত ১০ জুলাই দ্বিতীয় দফায় তলব করা হলেও তিনি হাজির না হয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে দুদকে লিখিত বক্তব্য জমা দেন। দুদক সূত্র জানিয়েছে, বাছিরের লিখিত বক্তব্যকে আমলে নিয়ে অনুসন্ধান কাজ শেষ করা হবে। তাঁকে আর জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না।
সূত্র বলছে, ডিআইজি মিজান যে অডিও রেকর্ড প্রকাশ করেছেন সেটার ফরেনসিক প্রতিবেদনও দুদকের হাতে এসেছে। সেই প্রতিবেদনও বিশ্লেষণ করে দেখেছে দুদকের দলটি। গত ৪ জুলাই ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) থেকে ফরেনসিক প্রতিবেদনটি দুদকে আসে। সেই প্রতিবেদনের সূত্র ধরে দুদক অনেকটাই নিশ্চিত হয়েছে মিজান ও বাছিরের কথোপকথনের বিষয়ে।
অন্যদিকে এনামুল বাছির দুদকে যে বক্তব্য জমা দিয়েছেন তাতে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, যে প্রক্রিয়ার ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়েছে তা যথাযথ নয় বলে দাবি করেছেন তিনি। এ ছাড়া পরীক্ষার জন্য তাঁর কোনো ‘স্যাম্পল ভয়েস’ নেয়া হয়নি বলেও উল্লেখ করেন বাছির। তাঁর দাবি, তাঁকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানো হয়েছে।
ডিআইজি মিজানের সরবরাহ করা অডিও রেকর্ডের সূত্র ধরে দুদকের পরিচালককে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার সংবাদ প্রকাশ করে বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন নিউজ।
দুদকের উচ্চ পর্যায়ের একাধিক সূত্র বলছে, এনামুল বাছির ঘুষ নিয়েছেন এটা অডিও রেকর্ডে প্রমাণ আছে। আর ডিআইজি মিজান নিজেই ঘুষ দেওয়ার কথা প্রকাশ্যে বলে নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিজেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সূত্রের তথ্যমতে, এনটিএমসির বিশেষজ্ঞ দল সময় নিয়ে ওই কথোপকথন ছাড়াও এ সংক্রান্ত পারিপার্শ্বিক অন্যান্য বিষয় পরীক্ষা করে দেখেছে। তাদের মধ্যে কতবার কথা হয়েছে, কোথায় কোন টাওয়ারের অধীনে কথা হয়েছে, দুদকের মামলা থেকে রেহাই পেতে ডিআইজি মিজান কী কী করেছেন, অনুসন্ধান কর্মকর্তার সঙ্গে একান্ত বৈঠকে কী কী বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন, তারা কতবার এসএমএস বিনিময় করেছেন ইত্যাদিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অডিও রেকর্ডের নিবিড় পরীক্ষায় দুজনের কথোপকথনের প্রমাণ মেলায় তাদের দুজনের বিরুদ্ধেই মামলা করা হবে বলে সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।
কারাফটকে জিজ্ঞাসাবাদ ডিআইজি মিজানকে : দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে ডিআইজি মিজানুর রহমানকে কারাফটকে দুই ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুর্নীতি দমন সংস্থাটি। গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অনুসন্ধান কর্মকর্তা দুদকের পরিচালক শেখ মো. ফানাফিল্যা এই পুলিশ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
‘ঘুষ লেনদেনের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায়’ দুদকের এই সংক্রান্ত অনুসন্ধান দলের নেতা ফানাফিল্যার আবেদনে ডিআইজি মিজানকে কারাফটকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছিল আদালত।
দুদকের উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) প্রনব কুমার ভট্টাচার্য্য বলেন, “পুলিশের ডিআইজি মিজানকে জিজ্ঞাসাবাদে অনুসন্ধান দলের নেতা ফানাফিল্যাকে দলের আরেক সদস্য দুদকের সহকারী পরিচালক সালাহউদ্দিন সহযোগিতা করেন।” জিজ্ঞাসাবাদের সময় অনুসন্ধান তদারক কর্মকর্তা দুদকের পরিচালক নিরু শামসুন নাহারও উপস্থিত ছিলেন বলে জানান তিনি।
এর আগে ১ জুলাই ডিআইজি মিজান অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় আগাম জামিন নিতে আবেদন করলে হাই কোর্ট তা নাকচ করে ডিআইজি মিজানকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পরদিন তাকে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। এ মামলার আরেক আসামী ডিআইজি মিজানের ভাগ্নে পুলিশের এসআই মাহমুদুল হাসান নিম্ন আদালতে গত ৪ জুলাই আত্মসমর্পণ করলে তাকেও কারাগারে পাঠানো হয়।
গত ২৪ জুন মিজান, তার স্ত্রী সোহেলিয়া আনার রতœা, ভাগ্নে মাহমুদুল হাসান এবং ছোট ভাই মাহবুবুর রহমানকে আসামী করে মামলা করেন দুদকের পরিচালক মনজুর মোরশেদ। মামলায় আসামীদের বিরুদ্ধে ৩ কোটি ২৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ৩ কোটি ৭ লাখ ৫ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়।
এক নারীকে জোর করে বিয়ের পর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ ওঠায় গত বছরের জানুয়ারিতে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনারের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় মিজানকে। এর চার মাস পর তার সম্পদের অনুসন্ধানে নামে দুদক; এক হাত ঘুরে সেই অনুসন্ধানের দায়িত্ব পান কমিশনের পরিচালক এনামুল বাছির। সেই অনুসন্ধান চলার মধ্যেই এনামুল বাছিরকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার কথা নিজেই একটি বেসরকারি টেলিভিশনে ফাঁস করেন ডিআইজি মিজান। এ ঘটনায় শেখ মো. ফানাফিল্যাকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি করে দুদক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ