ঢাকা, বুধবার 17 July 2019, ২ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৩ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত ॥ দুর্ভোগে পানিবন্দী লাখ লাখ মানুষ

গাইবান্ধায় মহাসড়কে ফাটল হুমকিতে ওয়াপদা বাঁধ

স্টাফ রিপোর্টার : দেশের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। তারা থাকা-খাওয়া, প্রাকৃতিক কাজ ও গবাদিপশু নিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। এখনো বিপদসীমার ওপরে বইছে উত্তর ও উত্তর-পূর্বে বিভিন্ন নদী। যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ৪২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যার কারণে নানা রোগবালাইয়ে এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ১২২৫ জন। বন্যার পানিতে ডুবে এ পর্যন্ত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে।  
জানা গেছে, বন্যার পানিতে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে কয়েকটি জেলার চর ও নিম্নাঞ্চল। দুর্ভোগে পানিবন্দী লাখো মানুষ। যমুনা, ধরলা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ঝিনাই, জিঞ্জিরামসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় উত্তরাঞ্চলে বন্যার আরো অবনতি হয়েছে। কুড়িগ্রাম বন্যার অবনতি হয়ে পানিবন্দী ৯ উপজেলায় ৩শ’ ৯০টি গ্রাম। দুর্ভোগে ৩ লক্ষাধিক মানুষ। সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি ৩০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৪২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নি¤œাঞ্চল ও চরাঞ্চলের কয়েক হাজার মানুষ পানি বন্দী হয়ে পড়েছে। নতুন করে প্লাবিত হয়েছে মাদারগঞ্জ উপজেলার গুনারিতলা, আদার ভিটা ইউনিয়নসহ আরো বেশ কয়েকটি বিস্তীর্ণ এলাকা। জামালপুর জেলার ৭ উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়ন ও ৩টি পৌরসভার অন্তত ৩ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। টানা বর্ষণে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে প্লবিত হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার সীমান্তবর্তী এলাকা। দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ এলাকায় ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগ করছেন দুর্গতরা। বিভিন্ন সড়কে পানি উঠায় ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। পানি উঠায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অনেকে গরু-ছাগল নিয়ে উঁচু সড়ক ও বাঁধে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। শুকনো খাবারের জন্য বন্যার্তদের মাঝে হাহাকার দেখা দিয়েছে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও তা অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। টিউবওয়েল ডুবে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। ফলে ডায়রিয়াসহ নানা পানিবাহিত রোগবালাই ছাড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢল, বানের পানি ও দেশের ভেতরকার রেকর্ড বৃষ্টিপাতের কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহে বন্যা পরিস্থিতি উন্নতির কোনো আশা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। তারা মধ্যমেয়াদি এই বন্যা ২১ জুলাই পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন।
এদিকে কুড়িগ্রাম, জামালপুর ও শেরপুরে পানিতে ডুবে ১০ শিশু মারা গেছে। এ নিয়ে গত ৭ দিনে বিভিন্ন রোগবালাই ও পানিতে ডুবে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে কয়েকশ’ বসতঘর ও বহু ফসলি জমি। বন্যায় ডুবে গেছে গ্রামীণ সড়ক, ক্ষেতের ফসল। ভেসে গেছে মাছের খামার। বিভিন্ন স্কুলে পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে। বন্যায় সৃষ্ট নানা রোগবালাইয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছেন ৬৭২ জন। সবমিলে আক্রান্ত হয়েছেন ১২২৫ জন। এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার।
পৃথক এক আদেশে বন্যার্তদের জন্য বন্যাকবলিত এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় কেন্দ্র খুলতে নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ওইসব আশ্রয় কেন্দ্রে একটি করে সেল স্থাপন করে প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে সার্বক্ষণিক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং জেলা প্রশাসকের (ডিসি) সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে বলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সার্বক্ষণিক উপস্থিত থাকতেও বলা হয়েছে। বন্যায় আক্রান্ত জেলাগুলোর মধ্যে আছে- লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা, বগুড়া, নেত্রকোনা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, কক্সবাজার, জামালপুর, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও টাঙ্গাইল। এর মধ্যে কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে। নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও সিলেটে স্থিতিশীল থাকবে। লালমনিরহাট, চট্টগ্রাম ও বান্দরবানে পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকবে। তবে উজান থেকে বানের পানি নামতে থাকায় আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জে বন্যা বিস্তৃত হতে পারে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, বন্যার মূল কারণ উজানের বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের পানি। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে আগামী ২০-২২ জুলাই থেকে বন্যার পানি কমতে শুরু করবে। তবে এটি ১৯৮৮ বা ১৯৯৮ সালের বন্যার মতো হওয়ার আশঙ্কা এখন পর্যন্ত নেই।
এফএফডব্লিউসি’র দেয়া বুলেটিনে বলা হয়, সুরমা-কুশিয়ারা নদীর অন্তত ৭টি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পুরনো সুরমা দিরাই পয়েন্টে বিপদসীমার ওপরে আছে। এছাড়া দেশের প্রধান নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। ১৪টি নদী ২৬ পয়েন্টে বিপদসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, ধলাই, খোয়াই, পুরাতন সুরমা, সোমেশ্বরী, কংস, ধরলা, তিস্তা, ঘাগট, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও সাঙ্গু।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা এখন ঘন ঘন হচ্ছে। ১৯৮৮ সালের পর ১৯৯৮ সালে বন্যা হয়। কিন্তু এরপর বড় বন্যা মাত্র ৬ বছরের মাথায় ২০০৬ সালে। আবার ২০১৬, ২০১৭ এবং এবার বন্যা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ দিক এটি।
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বন্যা পরিস্থিতির খবর জানিয়েছেন আমাদের সংবাদদাতারা-- কুড়িগ্রাম: জেলার ৫৫টি ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। প্লাবিত হয়েছে ৩৯০টি গ্রামের প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ। কুড়িগ্রাম-নাগেশ্বরী মহাসড়কের ৪-৫ জায়গায় হাঁটুপানি প্রবাহিত হওয়ায় ভারি যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। নাগেশ্বরীতে নদীতীর রক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুম সূত্রে জানা গেছে, ৩৯০টি গ্রামের ৭৩ হাজার ৫১১টি পরিবারের প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ বন্যা আক্রান্ত। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৭৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
জামালপুর : সোমবার বানের পানিতে ডুবে ৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দেওয়ানগঞ্জে তিনজন ও মাদারগঞ্জে একজন। তারা হল- দেওয়ানগঞ্জ পৌর এলাকার চর কালিকাপুর গ্রামের মনিরুর হোসেনের ২ বছরের ছেলে রিয়ামুল হক ও জহুরুল ইসলামের ৭ বছরের ছেলে নাঈম এবং সীমান্তবর্তী এলাকা ডাংধরা পাথরের চরের রাকিবুল ইসলামের ৭ বছরের ছেলে সাইমুন ইসলাম।
গাইবান্ধা : ভোরে ফুলছড়ি উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের কাতলামারিতে ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ধসে শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া ঘাঘট নদীর পানির তোড়ে সদর উপজেলার খোলাহাটি ইউনিয়নের ফকিরপাড়া এলাকায় শহর রক্ষা বাঁধের প্রায় ১৫০ ফুট এবং গোদারহাট এলাকায় সোনাইল বাঁধের প্রায় ২শ’ ফুট এলাকা ধসে গেছে। ফলে ওইসব বাঁধের পার্শ্ববর্তী ১৫টি গ্রামে আকস্মিকভাবে বন্যা দেখা দিয়েছে।
শেরপুর : ঝিনাইগাতীতে বন্যায় ৪০টি গ্রামের ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। রোববার সন্ধ্যা ৬টার দিকে মালিঝিকান্দা ইউনিয়নের ঘাঘরা সরকারপাড়া গ্রামের নুর ইসলামের এক বছরের শিশু মাহিন বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে। বন্যাকবলিত এলাকার বেশিরভাগ রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে আভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। গবাদিপশু নিয়ে কৃষকরা পড়েছেন বিপাকে। পানিবন্দী এলাকাগুলোতে কোথাও নৌকা, কোথাও কলার ভেলা দিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এদিকে দুর্গত এসব এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশু-কিশোর ও বৃদ্ধরা। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোফাখখারুল ইসলাম জানান, প্রায় ২০টি বিদ্যালয় বন্ধ রাখা হয়েছে।
নেত্রকোনা ও মদন : বন্যায় সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থা কলমাকান্দা, দুর্গাপুর ও বারহাট্টা উপজেলায়। কলমাকান্দার সঙ্গে জেলা সদরের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। পানিবন্দী মানুষ গরু-ছাগলসহ গৃহপালিত পশু নিয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। বন্যাকবলিত ওইসব এলাকায় কয়েক হাজার পুকুর ও মাছের খামার ডুবে মাছ পানিতে ভেসে গেছে। বেশকিছু গ্রামীণ বাজার পানির নিচে।
চট্টগ্রাম : সাতকানিয়ার ১৫ ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ পানিবন্দী। টানা বর্ষণে রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। হাজার হাজার মানুষ সাইক্লোন শেল্টারসহ পাড়া-প্রতিবেশীর বহুতল ভবনে আশ্রয় নিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে দেখা দিয়েছে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। শিশুদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
বগুড়া : সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলায় বন্যার আরও অবনতি হয়েছে। ৯৮টি গ্রাম জলমগ্ন হয়ে ১৬ হাজার ৪৪০ পরিবারের ৬৬ হাজার ৮০০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নদী ভাঙনে ১৪৫টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ও ২৪০টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাঁধে দুই হাজার ও অন্যান্য স্থানে ৪৯ পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। ৫৯টি প্রাথমিক ও দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্যাকবলিত হয়েছে। বন্যার পানিতে মোট আট হাজার ৬০৩ হেক্টর জমির ফসল নিমজ্জিত হয়েছে।
বরিশাল : কীর্তনখোলাসহ জেলার প্রায় সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। নগরীর নিন্মাঞ্চল পলাশপুরসহ জেলার নিন্ম এলাকা তলিয়ে গেছে। এই অঞ্চল সাগরের খুব কাছাকাছি। জোয়ার-ভাটা থাকে। এখানে এখনও বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি।
রাঙ্গামাটি : ভারি বর্ষণে রাঙ্গামাটির বিভিন্ন সড়কে পাহাড় ধসে ও দেবে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে ভারি যান চলাচল করতে পারছে না। এছাড়া রাঙ্গামাটি-বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে যোগাযোগ এক সপ্তাহ ধরে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। সড়কে জরুরি মেরামত ও সংস্কার কাজ চলছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
হবিগঞ্জ : কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নবীগঞ্জ উপজেলার ৩টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে। ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। চুনারুঘাট উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের কমপক্ষে ২০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ডুবে গেছে এসব এলাকার ক্ষেতের ফসল।
সুনামগঞ্জ : সরকারি হিসাবে ৯ উপজেলার নিুাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ১ লাখ ২০ হাজার লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির হিসেবে এ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। বন্যায় এ পর্যন্ত ২ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি প্লাবিত হয়েছে। ৪ কোটি ৬০ লাখ ৬১ হাজার ২শ’ টাকার মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন উপজেলায় ২২টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। পানিবন্দী নিুমধ্যবিত্ত ও নিু আয়ের মানুষরা বেশ কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। কৃষকরা নিজের পরিবারের পাশাপাশি গবাদিপশুর নিরাপত্তা ও খাদ্য নিয়েও বিপাকে আছেন।
সিলেট : জেলার গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ, কানাইঘাট, ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ, জৈন্তাপুর, গোলাপগঞ্জ, বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর ও সিলেট সদরের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ ও ধলাই এবং গোয়াইনঘাটের বিছনাকান্দি ও জাফলং পাথর কোয়ারির সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফলে এসব পাথর কোয়ারির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় দুই লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। পানিতে তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, পানিবন্দী মানুষের সহায়তায় এরই মধ্যে ৬৪ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। বরাদ্দ দেয়া হয়েছে আরও ১৬৪ মেট্রিক টন।
মৌলভীবাজার : কুশিয়ারা নদীর ৩টি স্থানে গ্রামীণ রাস্তা ও ধলাই নদীর ৩টি স্থানে বাঁধ ভেঙে মৌলভীবাজার সদর, কুলাউড়া, রাজনগর ও কমলগঞ্জ উপজেলার ৪৬ হাজার ৯০ জন লোক পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে ৭০টিরও বেশি গ্রাম। পানি ডুকেছে ২৫টি প্রাইমারি ও ১৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া : আখাউড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো পানিতে তলিয়ে গেছে। উপজেলার চারটি ইউনিয়নের অন্তত ৩০টি গ্রামের মানুষ ইতিমধ্যে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে কৃষকের সবজিক্ষেত, ফসলি জমি, পুকুরসহ এলাকার রাস্তাঘাট ও বাড়িঘর।
বন্যা পরিস্থিতির অবনতিতে চিন্তিত নন ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী: বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে, তবে এতে শঙ্কার কিছু নেই বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান। গতকাল মঙ্গলবার সকালে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি একথা জানান।
দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী বলেন, টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকায় পনেরটি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে। বৃষ্টি আরও বাড়বে, ব্রহ্মপুত্রের ভয়ানক অবস্থা। তাই বন্যা পরিস্থির অবনতি হতে পারে। তবে এ নিয়ে আমরা চিন্তিত নই। পর্যাপ্ত খাবার মজুদ আছে। প্রত্যেক জেলায় পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী দেওয়া আছে। আশ্রয়ের জন্য ৫০০টি করে তাঁবু পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ৬৪টি জেলায় খাদ্য গুদাম নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। তাই বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় বজ্রপাতনিরোধক টাওয়ার বসানো হবে। যাতে হতাহতের সংখ্যা কমিয়ে আনা যায়।
উল্লেখ্য, এখন পর্যন্ত দেশের ১৬টি জেলায় বন্যার পানি ঢুকেছে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। বন্যায় ডুবে যাওয়া জেলাগুলোর মধ্যে কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ জেলার বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অপরদিকে নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলার বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলেও লালমনিরহাট, চট্টগ্রাম, বান্দরবান জেলায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বন্যার্তদের পাশে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি: দেশের বন্যা কবলিত সবকয়টি জেলার দুর্গত জনগণের জন্য কাজ করছে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। সংস্থাটির জাতীয় সদর দপ্তরের সহায়তায় বেশি ক্ষতিগ্রস্থ জেলাগুলিতে রেড ক্রিসেন্ট জেলা ইউনিটের পক্ষ থেকে বন্যার্তদের মাঝে শুকনা ও রান্না করা খাবার, হাইজিন কিটস্, নিরাপদ পানি, তারপলিনসহ নিত্যে প্রয়োজনীয় দ্রব্য বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। রাঙ্গামাটি জেলায় ক্ষতিগ্রস্থ ৪০০ পরিবারের মাঝে হাইজিন কিটস ও সুনামগঞ্জে ১০০ পরিবারের মাঝে শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও বান্দরবান ১০০ পরিবার, সিলেট ২০০ পরিবার এবং জামালপুরের ৫০০ পরিবাররের মাঝে শুকনা খাবার ও ফুড প্যাকেজ বিতরণের প্রস্তুতি রয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে লালমনিরহাট জেলা রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের উদ্যোগে বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ সদর উপজেলার খোলাহাটি গ্রামের ১৫০ পরিবারের মাঝে শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়। এদিকে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মগবাজারস্থ জাতীয় সদর দপ্তর ও বন্যা কবলিত ৩২ জেলার জেলা রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। এছাড়াও তাৎক্ষণিক রেসপন্সের সুবিধার্থে শুক্র ও শনিবার অফিস খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেড ক্রিসেন্ট কর্তৃপক্ষ। সোসাইটির ডিজাস্টার রেসপন্স বিভাগ জানায়, বন্যা পরবর্তী ক্ষতিগ্রস্থ জনগনকে চিকিৎসাসেবা প্রদানে প্রস্তুত রাখা হয়েছে মেডিকেল টিম ও প্রয়োজনীয় ওষুধ। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থদের সহায়তায় তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্যে ‘ডিজাস্টার রিলিফ ইমারজেন্সি ফান্ড’ এর জন্য ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ রেড ক্রস এন্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ মাধ্যমে চালু করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ