ঢাকা, বৃহস্পতিবার 18 July 2019, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৪ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

দুই যুগ ধরে পদবী বৈষম্যের শিকার সরকারি কর্মচারীরা

মুহাম্মদ নূরে আলম : দুইযুগ ধরে বৈষম্যের শিকার সচিবালয়ের বাইরে বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত প্রধান সহকারী ও উচ্চমান সহকারী পদাধিকারীগণ। অথচ একই পদে সচিবালয়ে কর্মরতদের পদ পরিবর্তন করে তাদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা করা হয়েছে এবং ১০ গ্রেডে বেতনভাতা দেয়া হচ্ছে। বৈষম্যের শিকার কর্মচারীদের সংগঠন বাংলাদেশ প্রশাসনিক কর্মকর্তা বাস্তবায়ন ঐক্য পরিষদ এই পদবী বৈষম্যের অবসান চান। স্বাধীন বাংলাদেশে দীর্ঘ দিন ধরে চলা এ বৈষম্য বিলোপের দাবিতে বঞ্চিতরা সক্রিয় রয়েছেন। সচিবালয়ে কর্মরতদের মতো তাদেরও উচ্চমান সহকারী, প্রধান সহকারী, সহকারী ইত্যাদি পদবি পরিবর্তন করে প্রশাসনিক কর্মকর্তা করার দাবিতে আন্দোলন করে আসছে বঞ্চিতদের সংগঠন বাংলাদেশ প্রশাসনিক কর্মকর্তা বাস্তবায়ন ঐক্য পরিষদ।
২০১২ সালে এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপির প্রদানের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তার দপ্তর থেকে ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০১২ তারিখে নির্দেশনা প্রদান করা হয়। তখন থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয় শুধু মিটিং করেই যাচ্ছে, কোন ফলাফল পাওয়া যাচ্ছেনা। বৈষম্য রিসনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগনের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার অভাব রয়েছে বলে সংগঠনের মহাসচিব আবু নাসির খান অভিযোগ করেন। বৈষম্য নিরসনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে মিটিং চলছে গত ৭ বছর ধরে কিন্তু কোনো সুফলের মুখ দেখেনি উচ্চমান সহকারী, প্রধান সহকারী, সহকারী ইত্যাদি পদবি পরিবর্তন করে প্রশাসনিক কর্মকর্তা করার দাবিতে আন্দোলনরত সরকারি কর্মচারীরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ১৭মে সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রী এবং একই মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সচিবকে ডিও লেটার দিয়েছিলেন বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদ, তিনি এতদবিষয়ে পদবী পরিবর্তনের জন্য জাতীয় সংসদে বক্তব্যের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন। গত বছরের ৭ জুন তারিখে সচিবালয়ের ন্যায় পদবী পরিবর্তনের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত  সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির নির্দেশনা অনুযায়ী তার দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য সিনিয়র সচিব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে পত্র দেয়া হয়। কর্মচারীদের এ প্রাণের দাবি বাস্থবায়নের জন্য হাজার হাজার কর্মচারী সকল বিভাগীয় শহরে মানববন্ধন করে বিভাগীয় কমিশনারসহ সকল জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি প্রদান করেন। চলতি বছরের গত ৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী ও তার কার্যালয়ের মূখ্য সচিবকে স্মারকলিপি দেন বঞ্চিতরা।
সূত্রে আরও জানা যায়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ৩২ ও ৩৩ তম সভায় পদবী বৈষম্য নিরসনের জন্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সর্বশেষ গত ৯ মে ২০১৯ তারিখেও বাংলাদেশ সচিবালয়ের ন্যায় অন্যান্য দপ্তরের উচ্চমান সহকারী প্রধান সহকারী, সহকারী ও সমপদগুলো পদবী পরিবর্তন করে প্রশাসনিক কর্মকর্তা করাসহ বেতন গ্রেড ১০ এ উন্নীত করার বিষয়ে সুপারিশ প্রদান করেন সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
এদিকে সচিবালয়ের বাইরে কর্মরত প্রধান সহকারী ও উচ্চমান সহকারীদের বঞ্চনার বিষয়টি নিয়ে সর্বশেষ গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর ও চলতি বছরের ২৮ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মুয়াজ্জেম হোসেনের সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়। যদিও সেই সভার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি।
অন্যদিকে চলতি সপ্তাহের গত শনিবার বাংলাদেশ প্রশাসনিক কর্মকর্তা বাস্তবায়ন ঐক্য পরিষদের সভাপতি কেএম বদিউজ্জামানের সভাপতিত্বে বঞ্চিতদের একটি সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ডাক ভবনে বিভিন্ন দপ্তর-অধিদপ্তরের প্রধান সহকারী, উচ্চমান সহকারী, সহকারী সহ সমপদের কর্মচারীরা এতে উপস্থিত ছিলেন। সভায় সচিবালয়ে কর্মরতদের মতো তাদেরও প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে উন্নীতকরণের দাবি জানান নেতারা।
পরিষদের নেতারা জানান, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ১৯৭৭ সালের ঘোষিত জাতীয় বেতন স্কেলে সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চমান সহকারী পদ জাতীয় বেতন স্কেলের একই গ্রেডে-১৪ নির্ধারিত ছিল। শুধু বাংলাদেশ সচিবালয়ে কর্মরত প্রধান সহকারী ও উচ্চমান সহকারী পদধারীদের দায়িত্ব, সুবিধা, বেতন স্কেল, কর্মপরিধি ও পদমর্যাদা অপরিবর্তিত রেখে  প্রশাসনিক কর্মকর্তা করা হয় ১৯৯৫ সালে। এরপর ১৯৯৭ সালে তাদের গ্রেড ১১-এ উন্নীত করা হয়। এর দু’বছর পর ১৯৯৯ সালে তাদের গ্রেড ১০-এ উন্নীত করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংরাদেশ সরকারী কর্ম কমিশন (পি এস সি), বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট এবং বাংলাদেশ  বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের উচ্চমান সহকারী পদবিধারীদেরও একইভাবে প্রশাসনিক কর্মকর্তা করা সহ গ্রেড ১০-এ উন্নীত করা হয়, একই ভাবে তাদের চেয়ে কম শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন ও নিম্ন বেতন স্কেলের অনেক কর্মচারীদেরও বর্নিত পদের উচ্চ পদবী ও বেতন স্কেল দেয়া হয়েছে বলে নেত্রীবৃন্দ অভিযোগ করেন।। অথচ সচিবালয়ের বাইরে বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত উচ্চমান সহকারী ও প্রধান সহকারীদের পদের কোন পরিবর্তন হয়নি। তাদের বেতন স্কেলও সেই গ্রেড-১৪ তেই রয়ে গেছে। ফলে একই সঙ্গে চাকুরীতে প্রবেশের পর সচিবালয়ে কর্মরত থাকার সুবাদে কেউ প্রশাসনিক কর্মকর্তা হয়ে ১০ গ্রেডে বেতনভাতা পাচ্ছেন আর সচিবালয়ের বাইরে কর্মরত প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কর্মচারী আগের পদে ও গ্রেডেই বহাল আছেন। সঙ্গত কারণেই এ নিয়ে ক্ষুদ্ধ বঞ্চিতরা। তারা ১০ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয় ও মন্ত্রী পরিষদ বিভাগে তাদের বঞ্চনার বিষয়গুলো উল্লেখ পুর্বক স্মারকলিপি দিয়ে আসছেন।
বাংলাদেশ প্রশাসনিক কর্মকর্তা বাস্তবায়ন ঐক্য পরিষদের মহাসচিব আবু নাসির খান বলেন, ১৯৯৫ সালে সরকার সচিবালয়ে কর্মরত উচ্চমান সহকারী ও প্রধান সহকারীদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে উন্নীত করে। কিন্তু সচিবালয় ও হাইকোর্টের বাইরে অন্যান্য দপ্তরের একই পদাধিকারীদের এ উন্নীতকরণ থেকে বঞ্চিত করা হয়। খোদ তৎকালীন সরকার বৈষম্য বিলোপের পরিবর্তে এ বৈষম্যবাদের সৃষ্টি করে। এটি সংবিধানের ২৭ ও ২৯ অনুচ্ছেদের চরম লঙ্ঘন। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার। আমাদের বিশ^াস, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বৈষম্যমুলক  বিষয়টির অবসানে ইতিবাচক উদ্যোগ নিবেন। তিনি চাইলেই সারাদেশের হাজার হাজার উচ্চমান সহকারী ও প্রধান সহকারী পদে কর্মরতরা বৈষম্যমুলক এ অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ