ঢাকা, বৃহস্পতিবার 18 July 2019, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৪ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ওজোপাডিকোর দেড় লাখ গ্রাহকের জামানতের ছয় কোটি টাকা হাওয়া

খুলনা অফিস : রিবেটের দু’কোটি টাকা তিন বছর রেখে দেয়ার পর এবার দেড় লাখ গ্রাহকের জামানতের অন্তত ছয় কোটি টাকা হাওয়া করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে ওয়েষ্ট জোন পাওয়ার ডিষ্ট্রিবিউশন কোম্পানী বা ওজোপাডিকোর বিরুদ্ধে। প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের পর পূর্বের মেনুয়াল অথবা ডিজিটাল মিটারের জামানতের টাকা ফেরত দেয়ার বিইআরসির (বাংলাদেশ এনার্জি লেগুলেটরি কমিশন) নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করে ওই জামানতের টাকা আত্মসাতের চেষ্টা চলছে।
ওজোপাডিকোর সূত্র মতে, এ পর্যন্ত কোম্পানীতে এক লাখ ৫৪ হাজার ৮৬৪টি প্রি পেইড মিটার স্থাপন করা হয়। যার সামান্য কিছু নতুন সংযোগ হলেও সিংহভাগই প্রতিস্থাপন। এগুলোকে সর্বনিম্ন অর্থাৎ সিঙ্গেল ফেজ আবাসিক গ্রাহক পর্যায়ে মিটার ধরা হলেও আর্থিক হিসাব দাঁড়ায় প্রায় ছয় কোটি টাকা। যদিও ওজোপাডিকো কর্তৃপক্ষ বলছেন কোন গ্রাহক চাইলেই জামানতের টাকা ফেরত দেয়া হবে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের(বিইআরসি) ৪এর (গ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রি-পেইড মিটার দ্বারা বিদ্যমান মিটার প্রতিস্থাপন করা হলে পূর্বের নিরাপত্তা জামানত ফেরত প্রদান করতে হবে’। অথচ এ পর্যন্ত প্রতিস্থাপিত কোন প্রি-পেইড গ্রাহককেই জামানতের টাকা ফেরত দেয়া হয়নি। গত ২৪ জুন খুলনা প্রেসক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন এবং ২৬ জুন খুলনা সিটি কর্পোরেশনের সভা কক্ষে অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে ওজোপাডিকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. শফিক উদ্দিন বলেন, ওই সময় পর্যন্ত ওজোপাডিকোতে এক লাখ ৫৪ হাজার ৮৬৪টি প্রি-পেইড মিটার স্থাপন করা হয়েছে। কোম্পানীর মোট ১৩ লাখ ৬১ হাজার প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের লক্ষ্য রয়েছে বলেও তিনি জানান। অর্থাৎ বর্তমানে ১১ লক্ষাধিক গ্রাহক থাকায় আরও বাড়তি অন্তত দেড় লাখ নতুন গ্রাহককে প্রি-পেইড মিটার দেয়া হবে। সে অনুযায়ী নতুন গ্রাহকদের কাছ থেকে জামানত না নেয়া হলেও পুরাতন গ্রাহকদের জামানতের টাকার ব্যাপারে কোন স্পষ্ট কথা বলা হচ্ছে না। এমনকি এ পর্যন্ত দেড় লক্ষাধিক পুরাতন গ্রাহকের প্রি-পেইড মিটার প্রতিস্থাপন করা হলেও তাদের জামানতের টাকা (এলটি-এ ২ কি.ও. পর্যন্ত এর ক্ষেত্রে ৪শ’ টাকা, এলটি-এ ২ কি.ও.এর উর্ধ্বে ৬শ’ টাকা, এলটি সি ৮শ’ টাকা এবং এমটি, এইচটি এর ক্ষেত্রে এক হাজার টাকা) ফেরত দেয়া হয়নি। এর মধ্যে সর্বনিম্ন জামানত ধরা হলেও দেড় লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে নেয়া জামানতের ছয় কোটি টাকা না দিয়ে কোম্পানী আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ব্যাপারে ওজোপাডিকোর প্রধান প্রকৌশলী ও ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক(প্রকৌশল) মো. আবু হাসান বলেন, কোন গ্রাহক আবেদন করলে তাকে জামানতের টাকা ফেরত দেয়া হবে।
একই কথা বললেন, বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমুদুর রহমানও। তিনি বলেন, জামানতের টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য সংযোগকালীন কাগজপত্রসহ আবেদন করতে হবে।
এ ব্যাপারে অবশ্য ওজোপাডিকোর প্রি-পেইড মিটারে বিদ্যমান দুর্নীতি প্রতিরোধে সংগ্রাম কমিটি খুলনার আহবায়ক ডা. শেখ বাহারুল আলম বলেন, প্রথমত বিইআরসির নির্দেশনা অমান্য করে জামানতের ছয় কোটি টাকা না দিয়ে ওজোপাডিকো একটি অপরাধ করেছে দ্বিতীয়ত টাকা না দেয়ার ফন্দি হিসেবে সংযোগকালীন কাগজপত্র চাওয়া হচ্ছে। তাছাড়া প্রত্যেক গ্রাহকের নামীয় ফাইল প্রতিটি বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগে যেহেতু রক্ষিত আছে সেহেতু গ্রাহকের কাছে কাগজপত্র চাওয়ার কোন মানে হয় না। অফিসে রক্ষিত গ্রাহকের কাগজপত্র দেখেই প্রি-পেইড মিটার প্রতিস্থাপনের সময় জামানতের টাকা ফেরত দেয়ারও দাবি জানান তিনি। প্রকৃতপক্ষে বিইআরসির সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে ঠিকই কিন্তু সেটি থাকছে কাগুজে চুক্তিতে। যে সিদ্ধান্ত ওজোপাডিকোর পক্ষে যায় সেটি বাস্তবায়ন হলেও গ্রাহকের স্বার্থে কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। এক কথায় ওজোপাডিকো গ্রাহক বান্ধব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ, বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির অন্যতম সংগঠক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, বিইআরসির আদেশ না মেনে ওজোপাডিকো লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করছে। জনগণের পকেট কেটে পদ্মার এপারের এ কোম্পানীটি বিইআরসিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। তিনি জামানতের ছয় কোটি টাকা অবিলম্বে ফেরত দেয়া এবং বিইআরসিকেও সক্রিয় হওয়ার আহবান জানান। কেননা বিইআরসি শুধুমাত্র নির্দেশ দিয়েই চুপ থাকলে চলবে না। চুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না সেটি তদারকিও করতে হবে। বিগত দু’বছর আগে করা বিইআরসির আদেশ এখনও বাস্তবায়ন কেন হচ্ছে না সে দায়ভার শুধু ওজোপাডিকোরই নয়, বিইআরসিরও। এছাড়া রিবেটের টাকা গ্রাহককে না দিয়ে ওজোপাডিকোর কাছে প্রায় তিন বছর ধরে রাখা এবং পূর্বের মিটারের জামানতের টাকা ফেরত না দিয়ে প্রি-পেইড মিটার বসানোর বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তোলার জন্যও তিনি খুলনাবাসীর প্রতি আহবান জানান।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব এডভোকেট মো. বাবুল হাওলাদার বলেন, ওজোপাডিকো যে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান সেটি বার বারই প্রমাণিত হচ্ছে। প্রথমে রিবেট না দিয়ে আত্মসাতের চেষ্টা এরপর জামানতের টাকা না দিয়ে হজম করার অপচেষ্টা এসবই দুর্নীতির বাস্তব চিত্র। এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি দুদকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ