ঢাকা, বৃহস্পতিবার 18 July 2019, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৪ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আজ বরিশাল শহরে বিএনপির সমাবেশ ॥ ধরপাকড় ও হয়রানির অভিযোগ

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল: কারাবন্দী দলের চেয়ারপার্সন ও সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আজ থেকে বিভাগীয় শহরে সমাবেশ শুরু করছে বিএনপি। আজ বৃহস্পতিবার বরিশাল বিভাগীয় শহরে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর আগামী ২০ জুলাই চট্টগ্রাম ও ২৫ জুলাই খুলনায় সমাবেশ হবে। এই কর্মসূচিগুলোর ব্যাপক প্রস্তুতির কথা জানিয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, জেলা-উপজেলায় প্রস্তুতি সভা চলছে। এই শান্তিপূর্ণ মহাসমাবেশে যোগ দিতে মানুষের আগ্রহের কমতি নেই। মহাসমাবেশকে ঘিরে সাধারণ জনগণের অভাবনীয় সাড়া দেখে সরকারের চিত্তচাঞ্চল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সরকারদলীয় নেতাদের আগ্রাসী বক্তব্যে শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ শেষ করা নিয়ে সংশয়ে রয়েছে বিএনপি। এ বিষয়ে রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদের বক্তব্যে আমরা সমাবেশ সফল করা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান। তারা নিজেরাই হামলা করে সমাবেশকে ভন্ডুল করতে চাইবে। অতীতেও আওয়ামী লীগ এটি করেছিল। জানা গেছে, খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে এসব সমাবেশের আয়োজন হলেও মূলত দল গোছানো ও সংগঠনকে চাঙ্গা করতেই এই আয়োজন। সমাবেশ শেষ করেই দলের জাতীয় কাউন্সিলের বিষয়ে মনোনিবেশ করবে বিএনপি। তৃণমূলের অবস্থা দেখেই এবার নের্তৃত্ব নির্বাচন করা হবে।
এদিকে বরিশালের সমাবেশ সফল করতে গতকাল নগরের সদর রোডের জেলা ও মহানগরী নেতাদের নিয়ে বৈঠক করে বিএনপি। দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম মহাসচিব ও বরিশাল মহানগর কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ারের সভাপতেত্বে বৈঠকে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) অ্যাডভোকেট বিলকিছ আক্তার জাহান শিরিন, বিসিসি সাবেক মেয়র আহসান হাবিব কামাল, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মাহাবুবুল হক নান্নু, উত্তর জেলা বিএনপির সভাপিত মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি এবায়েদুল হক চান, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবুল কালাম শামীন, মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক জিয়াউদ্দিন সিকদার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। পরে সাংবাদিক সম্মেলনে মজিবুর রহমান সরোয়ার বলেন,  আমরা চেয়েছিলাম বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার স্বাভাবিক মুক্তি। কিন্তু সরকার সুকৌশলে তাকে জেলে বন্দি করে রেখেছে। স্বাধীনতা রক্ষা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য খালেদা জিয়ার মুক্তির বিকল্প নেই। আমরা মনে করি, তিনি জেল থেকে বের হলেই অবরুদ্ধ গণতন্ত্র মুক্তি পাবে। অভিযোগ করে সরোয়ার বলেন, সমাবেশকে কেন্দ্র করে শুধুমাত্র বুধবারের জন্য শহরে মাইকিংয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি নেতা-কর্মীদের ধরপাকড় ও হয়রানি করা হচ্ছে।
সমাবেশের সফলতা নিয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, স্থানীয় নেতাকর্মীরা সমাবেশকে মহাসমাবেশে রূপ দিতে অপেক্ষা করছে। কিন্তু সরকার দলীয়রা যেভাবে হুংকার দিচ্ছে তাতে আমরা সমাবেশের সফলতা নিয়ে সন্দিহান। তিনি বলেন, তথ্যমন্ত্রী আগাম বলে দিয়েছেন,‘বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশের নামে অতীতের মতো কোনো বিশৃঙ্খলা বা ভাঙচুর সহ্য করা হবে না। জনগণ ও রাষ্ট্রের যে কোনো ক্ষতিসাধনের বিরূদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ তিনি বলেন, তথ্যমন্ত্রীর এমন বক্তব্যে আমরা আশংকা প্রকাশ করছি সমাবেশের সফলতা নিয়ে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিভাগীয় পর্য়ায়ে ঘোষিত সমাবেশের কর্মসূচি নিয়ে তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ‘উস্কানিমূলক’।  আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, দম বন্ধ করা বাকশালী শাসনের বহমান অন্ধকার সময়ের অবসান ঘটিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা জনগণকে সাথে নিয়ে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করবে ইনশাআল্লাহ। তথ্যমন্ত্রী  হাছান মাহমুদের বক্তব্যের জবাবে রিজভী বলেন, আমি তার উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আপনি (তথ্যমন্ত্রী) যে বিশৃঙ্খলার কথা বলছেন, সেটিই তো উস্কানিমূলক, একটা অশুভ উদ্দেশ্য নিয়েই এধরণের বক্তব্য রাখছেন। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ না থাকলে তো কোন সমাবেশই হবে না, নিজেদের আয়োজন নিজেরাই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবো এই কথা কি কেউ বিশ্বাস করবে, কোনো পাগলে বিশ্বাস করবে?এ সব কথা বলে পরিবেশ তিক্ত করছেন তথ্যমন্ত্রী নিজেই।
রিজভী বলেন, পুলিশী তান্ডব, মাস্তানদের তান্ডবের মাধ্যমে বিরোধী দলের সভা পন্ড করার ইতিহাস ঐতিহ্য আপনাদেরই। বিশৃংখলা সৃষ্টি করেন আপনারা। আমাদের সব কর্মসূচী শান্তিপূর্ণ ছিল, আছে এবং থাকবে। কোন উস্কানীমুলক কথা বলে আমাদের নিবৃত্ত করতে পারবেন না। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, দম বন্ধ করা বাকশালী শাসনের বহমান অন্ধকার সময়ের অবসান ঘটিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা জনগণকে সাথে নিয়ে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করবে ইনশাআল্লাহ।
বিএনপির একাধিক নেতা জানান, চলতি মাস থেকেই সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামতে চায় বিএনপি। প্রস্তুতি চলছে সেভাবেই। সময়ের পরিবর্তন এবং অতীত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবার শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দিয়েই সফলতা পেতে চায় দলটি। আন্দোলনে যাতে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা থাকে, সেই বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে পরবর্তী পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুসহ দলীয় কিছু ইস্যুকে সামনে রেখেই আন্দোলনের সূচনা হচ্ছে আজ।
বিএনপির সিনিয়র এক নেতা বলেন, ঢাকাসহ সারা দেশে দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন ইস্যুর আন্দোলনে রাজপথ উত্তপ্ত করা সাধারণ মানুষের সরব উপস্থিতি নিশ্চিত করে গণ-অভ্যুত্থান ঘটানোই বিএনপির পরবর্তী পরিকল্পনা। এ লক্ষ্যে দ্রুত গতিতে সাংগঠনিক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আর আন্দোলনের ধরনে পরিবর্তন আনার বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সিনিয়র ওই নেতার মতে, একসময় সরকারকে চাপে ফেলার আন্দোলন হিসেবে শুধু হরতাল-অবেরোধকেই ভাবা হতো। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরদিনই হরতালের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েক নেতার বাধায় তা বাস্তবায়ন করেনি সরকারবিরোধী জোটটি। বিএনপির ওই নেতার মতে, সময় পরিবর্তন হয়েছে। অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে চায় দেশের মানুষ। তবে সাধারণ মানুষ আর ধ্বংসাত্মক কোনো কর্মসূচি চায় না। পরিকল্পিত কোনো কর্মসূচি ও কার্যকরী দিকনির্দেশনা না থাকায় নেতৃত্বের ঘাটতির কারণে আন্দোলন সফল হচ্ছে না। তাই জনগণকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচি থেকেই জনসম্পৃক্ত আন্দোলন গড়ে তুলবে বিএনপি।
গত ২২ জুন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সারা দেশে বিভাগীয় মহাসমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপির স্থায়ী কমিটি। এর অংশ হিসেবে বিভাগীয় মহাসমাবেশ শুরু হচ্ছে। বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীম বলেন, সমাবেশের প্রস্তুতি চলছে। এই কর্মসূচি থেকে নতুন ধারার রাজনীতি শুরু হবে মন্তব্য করে শামীম বলেন, এই সমাবেশে জনগণের উপস্থিতি প্রমাণ করবে তারা সরকারকে চায় না। খালেদা জিয়ার মুক্তি চায়। প্রতিটি ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে থাকতে চায়। বিএনপিও খালেদা জিয়ার মুক্তির পাশাপাশি জনগণের অধিকারের জন্য ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ সব ইস্যুতে মাঠে থাকার ঘোষণা দেবে মহাসমাবেশ থেকে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক নেতা জানান, আসন্ন আন্দোলন কর্মসূচিতে জনগণকে সম্পৃক্ত করাই বিএনপির প্রধান লক্ষ্য। এজন্য খালেদা জিয়ার মুক্তিকে প্রধান দাবি এবং জনসম্পৃক্ত ইস্যুগুলোকে সামনে রেখেই আন্দোলন শুরু হবে। এর মধ্যে নিরাপদ সড়ক, গুম-খুন-ধর্ষণ নির্মূলে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবির পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম, নগরীতে যানজট, পানিজট, বিষয়গুলো আসবে। এই নেতা আরো বলেন, ছাত্র, শিক্ষক, পেশাজীবী, উপজাতিসহ প্রতিদিনই বিভিন্ন দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করে। লোকবল কম থাকার কারণেও অনেক বড় সমস্যার মাঝে ক্ষুদ্র সমস্যা নিয়ে ছোট পরিসরে আন্দোলন হওয়ায় মিডিয়ার দৃষ্টিতে আসে না। সেসব আন্দোলনকারীর সঙ্গেও একাত্ম হতে চায় বিএনপি। সর্বস্তরের আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলে সুনির্দিষ্ট দিনে ও সময়ে সব দাবি আদায়ের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে নামার প্রস্তাব দিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। সূত্রমতে, এবার আন্দোলন সফল করতে বিএনপি সাংগঠনিক প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করে এনেছে। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পুনর্গঠনও চলছে। সারা দেশে জেলা ও মহানগর কমিটি গঠনও দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে। দলের নেতাকর্মীদের আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির ভবিষ্যৎ আন্দোলন সম্পর্কে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আন্দোলন ছাড়া অবস্থার পরিবর্তন হবে না। তবে যে আন্দোলনের ফল পাওয়া যাবে না, সে রকম কর্মসূচিতে বিএনপি যেতে চায় না। আন্দোলনে সফল হতে হলে মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। এ জন্য মানুষকে রাস্তায় নিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেণ, জনগণকে সাথে নিয়ে ফ্যাসিস্ট এই সরকারের পতন ঘটানো হবে। দলের চেয়ারপার্সনের মুক্তির বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, দেশের মানুষ এখন অগণতান্ত্রিক পরিবেশ থেকে মুক্তি চায়। এ মুক্তি এখন পুরোপুরি একাকার হয়ে গেছে এ দেশের গণতন্ত্রের প্রতীক দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির সঙ্গে। যদি তিনি মুক্তি পান তাহলেই গণতন্ত্র মুক্তি পাবে। সেই মুক্তির জন্য শুধু আইনি লড়াইয়ের ওপর নির্ভর করলে হবে না, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সেই আন্দোলনে সব মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। আমরা এখন সেদিকেই এগুচ্ছি।
 বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে বিএনপির প্রত্যেক নেতাকর্মী। দলীয় প্রধানের মুক্তির দাবিতে বড় কোনো আন্দোলন গড়ে না উঠলেও নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি চলছে থেমে থেমে। তাই বিএনপির হাইকমান্ড নতুন করে কর্মসূচি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন ঘোষিত সেই কর্মসূচিগুলো কতটা সফল হয় সেটাই দেখার বিষয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ