ঢাকা, শনিবার 20 July 2019, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৬ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

দেশের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা

পানিতে ডুবে গেছে প্রায় পুরো কুড়িগ্রাম। ঘরে ঘরে হাহাকার। জেলার ৯ উপজেলার ৫৬টি ইউনিয়নের প্রায় ২ লাখ পরিবারের সাড়ে ৭ লাখ মানুষ পানিবন্দী জীবন-যাপন করছে। বন্যায় দুর্ভোগে পড়া মানুষ কোন ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছেন না। তাদের খোঁজ নিতেও যাচ্ছে না কেউ। ছবিটি শুক্রবার কুড়িগ্রামের চিলমারী থেকে তোলা -স্টার মেইল

* উত্তরাঞ্চলে পানি কমলেও দুর্ভোগ বেড়েছে
ইবরাহীম খলিল : ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জ এই চার জেলায় বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ২৪ ঘন্টার মধ্যে এই চার জেলা প্লাবিত হবে। এ নিয়ে মোট ২২টি জেলা বন্যায় আক্রান্ত হবে। বন্যা পূর্বাভাস এবং সতর্কীকরণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা মো. শাহেদ কাওসার জানান, উজান থেকে পানি বিভিন্ন নদনদী দিয়ে এখন এসব এলাকা প্লাবিত করবে। তিনি বলেন, ‘উজান থেকে যে পানি আসছে বিশেষ করে জামালপুর, কুড়িগ্রামের তিস্তা নদী- সেখান থেকে পানি এখন মধ্যাঞ্চলে চলে আসছে।’ যে চারটি নতুন জেলা প্লাবিত হবে তার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে ফরিদপুরের।
গতকাল শুক্রবার শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত অব্যাহত পানি বৃদ্ধির ফলে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে ফরিদপুর সদর উপজেলার ডিক্রীরচর, নর্থচ্যালেন, আলীয়াবাদ, চরমাধবদিয়া ও ঈশান গোপালপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা। ফলে দুর্ভোগে পতিত হয়েছে এসব এলাকার হাজার হাজার মানুষ। প্রতি মিনিটে মিনিটে বাড়ছে পদ্মা নদীর পানি। পদ্মা নদীর পানি গোয়ালন্দ পয়েন্টে বর্তমানে বিপদসীমার ৫৪ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পদ্মার গোয়ালন্দ পয়েন্টের গেজ রিডার ইদ্রিস আলী জানান, গত ২৪ ঘন্টায় ওই পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানি আরও ২০ সেমি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে শুক্রবার সকাল ৬টায় ওই পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ৫৪ সে. মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এছাড়া আরও ২২ পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে দেশের বিভিন্ন নদীর পানি। শুক্রবার বিকেলে যমুনা নদীর পানি বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে ১৫৮, ফুলছড়িতে ১৪৭, সারিয়াকান্দিতে ১২৬, কাজিপুরে ১২১ ও সিরাজগঞ্জে ৯৯ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন নদীর আরও ১৩ পয়েন্ট পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে একই সময়ে বগুড়া, জামালপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নেত্রকোনা, সিলেটে ও সুনামগঞ্জ জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীগুলোর পানি একটু কমার সম্ভাবনা থাকলেও বন্যার্ত মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়েছে। যমুনা, গঙ্গা-পদ্মা ছাড়া প্রধান প্রধান নদীর পানি সমতলে হ্রাস পাচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি সমতল হ্রাস পেতে পারে।
জানা গেছে, যমুনা নদীর পানি জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ও গাইবান্ধার ফুলছড়ি এবং তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে গত ৫০ বছরের সব রেকর্ড ভেঙে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত যমুনার পানি বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে ১৫৮, ফুলছড়িতে ১৪৭, সারিয়াকান্দিতে ১২৬, কাজিপুরে ১২১ ও সিরাজগঞ্জে ৯৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন নদীর পানি আরও ১৩ পয়েন্ট বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে বৃহস্পতিবার রাত ১২টায় অর্ধেক সেন্টিমিটার পানি বেড়ে বিপৎসীমার ১২৮.৫০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও এরপর থেকে নদীর পানি অপরিবর্তিত ছিল। তবে শুক্রবার সকাল ৯টায় নদীতে পানির পরিমাণ ৩.৫০ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ১২৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে।
ফরিদপুর : ফরিদপুরের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। দ্রুত গতিতে জেলার নিম্নাঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে বন্যার পানি। অব্যাহত পানি বৃদ্ধির ফলে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে ফরিদপুর সদর উপজেলার ডিক্রীরচর, নর্থচ্যালেন, আলীয়াবাদ, চরমাধবদিয়া ও ঈশান গোপালপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা। ফলে দুর্ভোগে পতিত হয়েছে এসব এলাকার হাজার হাজার মানুষ। প্রতি মিনিটে মিনিটে বাড়ছে পদ্মা নদীর পানি। পদ্মা নদীর পানি গোয়ালন্দ পয়েন্টে বর্তমানে বিপদসীমার ৫৪ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পদ্মার গোয়ালন্দ পয়েন্টের গেজ রিডার ইদ্রিস আলী জানান, গত ২৪ ঘন্টায় ওই পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানি আরও ২০ সেমি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে শুক্রবার সকাল ৬টায় ওই পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ৫৪ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
শুক্রবার বিকেলে আলীয়াবাদ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে পানিবন্দী মানুষের অসহায় অবস্থা চোখে পড়েছে। পানিতে ডুবে গেছে সাদীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও গদাধরডাঙ্গী প্রাথমিক বিদ্যালয়। গদাধরডাঙ্গী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য ইট বিছানো সড়কটির বড় একটি অংশ পানি তোড়ে ধ্বসে গেছে। সেখান দিয়ে তীব্র বেগে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। গবাদী পশু নিয়ে বন্যা দুর্গত মানুষ বিভিন্ন উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। সদর উপজেলার আলীয়াবাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম ওমর ফারুক জানান, তার ইউনিয়নে পদ্মা নদী সংলগ্ন এলাকায় দ্রুত গতিতে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় ইউনিয়নের সাদীপুর, গদাধরডাঙ্গী ও আলিয়াবাদ এলাকায় প্রায় পাঁচ শতাধীক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
সদর উপজেলার ডিক্রীরচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান জানান, তার ইউনিয়নের প্রায় ৮০ ভাগ এলাকায় বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। এ ইউনিয়নের পূর্বডাঙ্গী, মুন্সিডাঙ্গী ও ব্যাপারী ডাঙ্গীতে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ক্ষেতের ফসল ও গবাদিপশু নিয়ে মানুষ চরম বিপাকে পড়েছে। সদর উপজেলার চরমাধবদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মির্জা সাইফুল আজম জানান, তার ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের বাঘেরটিলার প্রধান সড়কটি বন্যার পানির তোরে ভেসে যাওয়ায় ঐ এলাকার প্রতিটি বাড়ীতে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। ফলে কয়েক শ’ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। সদর উপজেলার ঈশান গোপালপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মজনু জানান, তার ইউনিয়নের দূর্গাপুর, জমাদ্দারডাঙ্গী ও বগেরটিলা এলাকায় বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় প্রায় ৫০টি পরিবার পানিবন্দী হয়ে পরেছে।
বন্যায় সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত ফরিদপুর সদরের নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোস্তাকুজ্জামান মোস্তাক জানান, শুক্রবার তার ইউনিয়নে ৬ ইঞ্চি পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে কয়েক শত বাড়ি-ঘর, মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিচ্ছেন।
শেরপুর : পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শেরপুর জেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। শেরপুর-জামালপুর মহাসড়কের ওপর দিয়ে প্রবল বেগে বন্যার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে শুক্রবার সকাল থেকেই শেরপুর থেকে জামালপুর হয়ে রাজধানীসহ উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি শেরপুর ফেরিঘাট পয়েন্টে ২ মিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পুরাতন ভাঙনের অংশ দিয়ে বন্যার পানি দ্রুতবেগে প্রবেশ করায় চরাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শেরপুর-জামালপুর মহাসড়কের কজওয়েতে মোটরসাইকেল ও ছোট ছোট যানবাহন নৌকা করে পার হতে দেখা গেছে।
জেলা ত্রাণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, টানা বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় শেরপুরের ৫টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের ১৭২টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে অন্তত ৬৩ হাজার লোক পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। জেলায় ৫২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি ওঠায় ৭ দিন ধরে স্কুল বন্ধ রয়েছে। এ পর্যন্ত বন্যা দুর্গতদের মাঝে ৩৫ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় জেলার ১২৫ হেক্টর সবজি ক্ষেত এবং ৭৪৭ হেক্টর রোপা আমন ধানের বীজতলা এবং ১৬৫ হেক্টর জমির আউশ ধানের ক্ষেত পানিতে ডুবে গেছে। গত ৫ দিনে শেরপুরে বন্যার পানিতে ডুবে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নওগাঁ : নওগাঁর রানীনগরের ছোট যমুনা নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে নতুন করে তিনটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। শুক্রবার ভোররাতে উপজেলার মালঞ্চি গ্রামের ছোট যমুনা নদীর বেড়িবাঁধ প্রায় ৫০ হাত ভেঙে যায়। এতে পানিতে তলিয়ে গেছে কয়েকশ পুকুর, আমন ধান ও শতাধিক হেক্টর সবজির ক্ষেত।
অপরদিকে মান্দা উপজেলার আত্রাই নদীর পানি কমে যাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আত্রাই নদীতে বিপৎসীমার ৩২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। উজান থেকে নেমে আসা ঢলে জেলার আত্রাই ও ছোট যমুনা নদীতে পানি হঠাৎ করে বৃদ্ধি পেয়েছিল। পানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় গত বুধবার ভোরে উপজেলার বিষ্ণপুর ইউনিয়নের চকবালু নামক স্থানে আত্রাই নদীর ডান তীরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের প্রায় ১০০ ফুট ভেঙে প্রসাদপুর-জোকাহাট যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এতে এ উপজেলার ২২টি গ্রামের অর্ধলক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। গরু-ছাগল নিয়ে অসংখ্য মানুষ সড়ক ও বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছে।
নওগাঁ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, ৭২ ঘণ্টার ব্যবধানে জেলার আত্রাই নদীর পানি বিপৎসীমার ৩২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া এ উপজেলার জোতবাজার পয়েন্টে ১৬ দশমিক ৬৪ মিটার, মহাদেবপুর আত্রাই নদীতে ১৭ দশমিক ৮২ মিটার ও ধামইরহাট উপজেলার শিমুলতলী পয়েন্টে বিপদসীমার ২০ দশমিক ৮০ মিটার সমানভাবে প্রবাহিত হচ্ছে।
বগুড়া: বগুড়ায় যমুনা নদীর পানি দুই সেন্টিমিটার কমলেও সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি এখনও অপরিবর্তিত রয়েছে। পাশাপাশি বাঙালী নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় আরও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। বৃহস্পতিবার রাতে সারিয়াকান্দি পয়েন্টে যমুনার পানি বিপদসীমার ১২৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও শুক্রবার দুপুরে তা দুই সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ১২৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
জেলা ত্রাণ ও পুর্নবাসন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। এই পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩১ হাজার পরিবারের সোয়া লাখ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া বীজতলা পাট, আউশ ও মরিচসহ বিভিন্ন ধরণের প্রায় সাড়ে ৯ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদী ভাঙনে গত এক সপ্তাহে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৮শ’ বাড়িঘর। বন্যা কবলিত হয়েছে ৮৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বানের পানিতে থাকা বগুড়ার যমুনা তীরবর্তী সারিয়াকান্দী, ধুনট ও সোনাতলা উপজেলার বন্যার্তদের দুর্ভোগ বেড়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সরবরাহ করা হলেও বন্যা দুর্গত এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট রয়েছে। অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রান পৌঁছায়নি বলেও অনেকে অভিযোগ করেছেন। তবে উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, খবর পাওয়া মাত্রই প্রয়োজনীয় সব জায়গায় ত্রান পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। তবে অনেক এলাকায় গো-খাদ্যের সংকট রয়েছে।
কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামে নামতে শুরু করেছে বন্যার পানি। সেই সঙ্গে বেড়েছে দুর্ভোগ। এখনো ঘরে ফিরতে পারছে না বন্যা দুর্গতরা। গত ১০ দিনে ৮ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়েছে। বানভাসিদের জন্য অপ্রতুল ত্রাণের কারণে হাহাকার দেখা দিয়েছে। বিশাল এলাকা জুড়ে বন্যা হওয়ায় জনপ্রতিনিধিরা পড়েছেন চরম বিপাকে। তারা বন্যাকবলিত সবার কাছে পৌঁছাতে পারেননি। এ অবস্থায় আজ শনিবার কুড়িগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি দেখতে দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে আসছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন এমপি।
এদিকে শুক্রবার সকালে বন্যার পানিতে পরে সীমা খাতুন নামে দেড় বছরের একটি শিশু মারা গেছে। সে উলিপুর পৌরসভার খাওনারদরগা গ্রামের ভাটিয়াপাড়ার সাদেক মিয়ার কন্যা। ৮নং ওয়ার্ডের পৌর কমিশনার সোহরাব হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এনিয়ে গত ১০ দিনে পানিতে ডুবে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো ১৫ জনে। জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুম সূত্রে জানা যায়, বন্যার ফলে ৫৭টি ইউনিয়নের ৮৯৪টি গ্রাম পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এতে প্রায় দুই লাখ পরিবারের ৮ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়েছে। ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে প্রায় দুই লাখ। ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২০ হাজার হেক্টর। বন্যায় ৫শ কিলোমিটার রাস্তা, ৪০ কিলোমিটার বাঁধ ও ৪১টি ব্রিজ/কার্লভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৬৪ হাজার মানুষ ১৮৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৯ হাজার ৭৩৪টি।
কুড়িগ্রামের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান জানান, বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এ পর্যন্ত জেলা প্রশাসন থেকে ৮০০ মেট্রিক টন জিআর চাল, ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ৩ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার ও ঈদুল আজহা উপলক্ষে ৬ হাজার ৪২৮ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ : সিরাজগঞ্জের যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি সিরাজগঞ্জ হার্ডপয়েন্ট এলাকায় ১৮ সেন্টিমিটার বেড়ে সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে বিপৎসীমার ৯৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে জেলার পাঁচটি উপজেলার ৩৬টি ইউনিয়নের দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। যমুনাসহ অভ্যন্তরীণ নদীগুলোতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বন্যার্ত মানুষেরা উঁচু বাঁধ, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিচ্ছে। ইতোমধ্যে বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেছে জেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা। তবে সীমিত আকারে ত্রাণ তৎপরতা শুরু হওয়ায় অধিকাংশ বন্যার্ত মানুষের ভাগ্যে ত্রাণ জুটছে না। ফলে বানভাসি মানুষ খাদ্য সংকটে রয়েছে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী রণজিত কুমার সরকার জানান, শুক্রবার সকালে সিরাজগঞ্জ হার্ডপয়েন্টে যমুনার পানি রেকর্ড করা হয়েছে ১৪.৩৫ মিটার। যা বিপৎসীমার ৯৯ সেন্টিমিটার ওপরে। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৮ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরদিকে কাজিপুর পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৩৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। তবে এদিনে পানি বৃদ্ধি অনেকটা কমেছে।
মেঘাই, নতুন মেঘাই, পাইকড়তলী, কুনকুনিয়া ও পলাশপুর গ্রামের দেড় হাজার পরিবারকে রক্ষায় নির্মিত রিং বাঁধটি গত মঙ্গলবার মেঘাই আটাপাড়া অংশে ধীরে ধীরে বিস্তৃতি হয়ে বাঁধটির প্রায় ৭০ মিটার এলাকা ভেঙে গেছে। এতে প্রবল বেগে পানি ঢুকে পড়ে ওই পাঁচটি গ্রাম মুহূর্তেই প্লাবিত হয়ে যায়। ইতোমধ্যে পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। পানিবন্দি পরিবারের ঘরে শুকনো খাবার নেই। নেই রান্নার জ্বালানিও। নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় মিলছে না বিশুদ্ধ খাবার পানি। শৌচাগারের ব্যবস্থা না থাকায় বাড়ছে বিড়ম্বনা। এদের বেশির ভাগ মানুষই বন্যার পানির মধ্যে নৌকায় ও ঘরের ভেতর মাচান উঁচু করে অতি কষ্টে দিন-রাতযাপন করছেন। শুকনো খাবারের তীব্র সংকটে পড়েছে পানিতে আটকে থাকা পরিবারগুলো।
টাঙ্গাইল : বন্যার পানির তীব্র স্রোতে ভেঙ্গে গেল টাঙ্গাইলের ভুঞাপুর-তারাকান্দি সড়ক। বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ৮টার দিকে সড়কটির বেশ কিছু অংশ ভেঙে পানি ঢুকে যায়। এতে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে আরো ১০টি গ্রাম। ভূঞাপুর-তারাকান্দি সড়কে মোতায়েন করা হয়েছে সেনাবাহিনী। বঙ্গবন্ধু সেনানিবাসের ১৮ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটালিয়নের সেনা সদস্যরা ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ এ বাঁধটি রক্ষার জন্য সেনা মোতায়েনের দাবী উঠছিল বেশ কয়েকদিন ধরেই। সড়কটি ভাঙার আগে সেনা মোতায়েন করা হলে হয়তো এতো বড় সমস্যার সম্মুখীন হতে হতো না।
এদিকে যমুনা নদীর পানি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৯১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে উপজেলার শতাধিক গ্রামের কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। পানিতে তলিয়ে গেছে চরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি গ্রাম, তলিয়ে গেছে ফসলি জমি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঝোটন চন্দ জানান, বন্যাকবলিতদের দুর্ভোগ লাঘবের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অস্বাভাবিক হারে পানি বৃদ্ধির ফলে ভূঞাপুর-তারাকান্দি সড়ক ভেঙে গেছে। সড়কটিতে কাজ করছে সেনাবাহিনী। এছাড়া ভাঙন অংশে পানি উন্নয়ন বোর্ডও (পাউবো) কাজ করে যাচ্ছে।
এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী তাজমিল খান বলেন, রাস্তা যেটা ভেঙেছে সেটা সংশ্লিষ্টদের নিয়ে রক্ষার জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। তাছাড়া মানুষের যোগাযোগের জন্য বাঁশের সাঁকো তৈরি করা হবে।
গোবিন্দগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি॥ শিশুসহ ২ জনের মুত্যু
গোবিন্দগঞ্জ (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা : গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে গত চব্বিশ ঘন্টায় বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। বাঙ্গালী নদী রক্ষা বাঁধের ৩টি স্থানে ভেঙ্গে যাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। ইতিমধ্যেই উপজেলার হরিরামপুর, রাখালবুরুজ, শিবপুর, নাকাই, তালুককানুপুর, মহিমাগঞ্জ, শালমারা ও কোচাশহর ইউনিয়ন বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। এসব ইউনিয়নের মওসুমি ফসল সহ আমন বীজতলা পানিতে তলিয়ে গেছে। এদিকে বন্যার পানিতে ডুবে এক শিশুসহ দু’জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। শুক্রবার দুপুরে মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নের মনু মিয়ার মেয়ে মুন্নি খাতুন বন্যার পানিতে গোসল করতে গিয়ে ¯্রােতে ভেসে গিয়ে মারা যায়। হরিরামপুর ইউনিয়নের দুর্গপুর গ্রামের সোলায়মান আলী (৫৫) নামে এক ব্যক্তি মাছ ধরার জন্য বৃহস্পতিবার বিকেলে বন্যার পানিতে নামলে কিছুক্ষণ পর তিনি নিখোঁজ হন। পরে রংপুর থেকে ডুবুরীদল এসে গভীর রাতে সোলায়মানের মৃত্যুদেহ উদ্ধার করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ