ঢাকা, শনিবার 20 July 2019, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৬ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বাংলাদেশ নিয়ে ট্রাম্পের কাছে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ নেত্রীর নালিশ

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যে নিন্দার ঝড় উঠেছে। ভাইরাল হয়েছে তার গোটা বক্তব্য। তার এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা বাংলাদেশে ঘটেনি। ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশের বিপক্ষে নালিশ চক্রান্ত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
গত ১৮ জুলাই ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার ২৭ ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে ২৭টি দেশের প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহাও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান।
বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা প্রিয়া সাহা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বলেন, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বাংলাদেশে ৩ কোটি ৭০ লাখ হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান নিখোঁজ রয়েছেন। দয়া করে আমাদের লোকজনকে সহায়তা করুন। আমরা আমাদের দেশে থাকতে চাই।
এরপর তিনি বলেন, এখন সেখানে ১ কোটি ৮০ লাখ সংখ্যালঘু রয়েছে। আমরা আমাদের বাড়িঘর খুইয়েছি। তারা আমাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে, তারা আমাদের ভূমি দখল করে নিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো বিচার পাইনি।
ভিডিওতে দেখা গেছে, এক পর্যায়ে ট্রাম্প নিজেই সহানুভূতিশীলতার স্বরূপ এই নারীর সঙ্গে হাত মেলান।
কারা এমন নিপীড়ন চালাচ্ছে? ট্রাম্পের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রিয়া সাহা বলেন, ‘দেশটির মৌলবাদীরা এসব করছে। তারা সবসময় রাজনৈতিক আশ্রয় পাচ্ছে।’
প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড়: মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বলা প্রিয়া সাহার দেয়া বক্তব্যের ভিডিওটি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। বাংলাদেশের মানুষ ও বাংলাদেশ সরকারকে হেয় করে তার এই অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় বইতে থাকে।
অনেকেই বলছেন, ওই নারী এমন বক্তব্য দিয়ে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা নষ্ট করেছেন। অনেকেই বলছেন, এমন মিথ্যা কথা তিনি কীভাবে বললেন। সামাজিক মাধ্যমে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, এটা দেখি ঘষেটি বেগম। অপর একজন লিখেছেন, এটা কাদের চাল হতে পারে বুঝলাম না। আবার অনেকেই বলছেন, ট্রাম্পের করুণা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পেতেই তিনি বাংলাদেশ বিষয়ে এমন বক্তব্য দিয়েছেন।
ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিস্ট মাহমুদল হাসান তার ফেসবুক টাইমলাইনে লিখেন, এই হিন্দু মহিলার অভিযোগ শুনেন! বাংলাদেশে নাকি ৩৭ মিলিয়ন, মানে ৩ কোটি ৭০ লক্ষ হিন্দু বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান গুম হয়ে আছে!! কীভাবে মিথ্যা বলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বিচার দিচ্ছে সবাই দেখেন। এটা খুবই খারাপ কাজ করছে। আমি এই মহিলার অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ করছি। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত এই অভিযোগের জবাব দেয়া দরকার প্রয়োজন মনে করছি।
অনলাইন এক্টিভিস্ট শঙ্কর মিত্র লিখেন, প্রিয়া সাহা নামক যে মহিলা ট্রাম্পের কাছে বিচার দিয়েছেন গত মার্চ মাসে পিরোজপুরে সেই মহিলার পৈতৃক বাড়ি কিন্তু জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিলো। লুটপাট করা হয়েছিলো। তিনি কি কারণে ট্রাম্পের কাছে বিচার দিলেন বা এতোদূর যেতে পারলেন তা বোধগম্য নয়। অতীতে না হোক শেখ হাসিনার আমলে সংখ্যালঘুদের উপর হামলা নির্যাতনের বিচার হয়। নাসির নগর,রামু,নাটোরের ঘটনায় বিচার চলমান। প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে ট্রাস্পের কাছে বিচার দিলেন কেনো বুঝতে পারছি না।
 বিশিষ্ট অনলাইন এক্টিভিস্ট সুলতান মাহমুদ কনিক লিখেছেন, এই মহিলার কি এমন হয়েছিলো যে তাকে ট্রাম্প পর্যন্ত যেতে হলো? সে কি তার সমস্যার কথা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে জানিয়েছিলো? আমি মনে করি দেশের বিরুদ্ধে এটা এক বিরাট ষড়যন্ত্র। এই মহিলাকে বিচারের আওতায় আনা হোক। বাংলাদেশে নাকি ৩৭ মিলিয়ন অর্থাৎ ৩ কোটি ৭০ লক্ষ হিন্দু বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান গুম হয়ে গেছে.. বাংলাদেশের মুসলিম মৌলবাদীরা নাকি হিন্দুদের জায়গা জমি দখল ও ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে... প্রিয়া সাহা নামে এই ভদ্র মহিলা বিচার দিয়ে এসেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে এবং ট্রাম্পের সাহায্য কামনা করেছে।
কানাডা প্রবাসী সাংবাদিক শাওগাত আলী সাগর তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, বিদেশিদের কাছে অভিযোগ করা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। বড় বড় রাজনৈতিক দল, আমাদের অনুকরনীয় নেতা নেত্রীরা- এটিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। প্রিয়া সাহার আর দোষ কি? প্রিয়া সাহা কেন ট্রাম্প চাচার কাছে নালিশ দিলেন- সেই আলোচনার আগে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিটা মাথায় রাখা দরকার।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল একটি বেসরকারি টিভিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা বাংলাদেশে ঘটেনি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশের বিপক্ষে নালিশ চক্রান্ত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
নালিশকারী ওই নারীর পরিচয়: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল ট্রাম্পের কাছে ৩৭ মিলিয়ন সংখ্যালঘু বিলীন হওয়ার অভিযোগ তোলা সেই নারীর পরিচয় পাওয়া গেছে। প্রিয়া সাহা নামের ওই নারী বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক। সংগঠনটির ওয়েবসাইটে গিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির ৫৫ ক্রমিকে তার নাম পাওয়া গেছে।
তিনি এনজিও ‘শাড়ী’ এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবেও দায়িত্বরত আছেন। এছাড়া, বাংলাদেশ মহিলা ঐক্য পরিষদেরও একজন সংঘটক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রিয়া সাহা।
উল্লেখ্য, হোয়াইট হাউজের আলোচিত সেই সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ থেকে প্রিয়া সাহা ছাড়াও বিভিন্ন দেশের ২৬ জন ব্যক্তি যোগ দিয়েছিলেন। দেশগুলো হচ্ছে- মিয়ানমার, নিউজিল্যান্ড, ইয়েমেন, চীন, কিউবা, ইরিত্রিয়া, নাইজেরিয়া, তুরস্ক, ভিয়েতনাম, সুদান, ইরাক, আফগানিস্তান, ইরাক, উত্তর কোরিয়া, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, ইরান ও জার্মানিসহ আরও কয়েকটি দেশ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশের নারী প্রিয়া সাহা সংখ্যালঘুদের নিয়ে কেন অভিযোগ করেছেন, তা খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। প্রতিমন্ত্রী গতকাল শুক্রবার রাতে তার ফেসবুক পেজে এক বার্তায় এ তথ্য জানান।
শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘আমি জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থায় একাধিকবার ভরা হাউসে পৃথিবীর সব দেশের এবং বাংলাদেশ ও বাইরের দেশের এনজিওদের মানবাধিকার সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি। যেখানে শ্রদ্ধেয় রানা দাশ গুপ্তর মতো মানুষেরাও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে দেয়া প্রিয়া সাহার অভিযোগের মতো কোনো অভিযোগ বা প্রশ্ন কাউকে করতে দেখিনি।’
এই অভিযোগের তীব্র নিন্দা জানিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘তীব্র নিন্দা জানাই। তিনি কেন এটা করলেন তা খতিয়ে দেখা হবে। তার অভিযোগগুলোও সরকার শুনবে এবং খতিয়ে দেখবে। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পও জানেন যে তার কাছেও মিথ্যা অভিযোগ করা হয়। মার্কিন প্রশাসন তাদের এখানকার দূতাবাসের মাধ্যমেই প্রতিনিয়ত তথ্য পেয়ে থাকে এবং আমরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগে থাকি। প্রিয়া সাহার সমালোচনা করতে গিয়ে অনেকে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সমালোচনা করছেন। এটাও ঠিক নয়। যেমনটি নয় প্রিয়া সাহার করা অভিযোগ। সমাজের সব স্তরে যার বিচরণ এবং সরকারের বিভিন্ন মহলের সঙ্গে যার যোগাযোগ তার এইরকম আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়।’
শাহরিয়ার আলম তার বার্তায় বলেন, ‘ধর্মীয় সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃস্টান্ত বাংলাদেশ। অনেকেই ব্যক্তিস্বার্থে বা না বুঝে এটার ক্ষতি করে ফেলেন। সবার উচিত এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকা।’
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সম্প্রতি এক বাংলাদেশি সংখ্যালঘু নির্যাতন বিষয়ে যে তথ্য দিয়েছেন তা সঠিক বলে মনে করেন না ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট মিলার। শুক্রবার বিকেলে রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত মিলার এসব কথা বলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সহিষ্ণুতার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মীয় নেতা ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর অফিসে কথা বলেন। এতে বাংলাদেশি পরিচয় দিয়ে এক নারী ট্রাম্পের কাছে অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান নিখোঁজ হয়েছেন। বর্তমানে এখানে ১ কোটি ৮০ লাখ সংখ্যালঘু রয়েছে উল্লেখ করে তিনি ট্রাম্পের সহায়তা চান।
হোয়াইট হাউজের ওয়েব সাইটের বিবৃতিতে বাংলাদেশি ওই নারীকে মিসেস সাহা পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে জানা যায় ওই নারীর নাম প্রিয়া সাহা। তিনি একজন মানবাধিকার কর্মী। ওই নারীর এমন অভিযোগ সঠিক নয় বলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল আর মিলার। রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় বৌদ্ধ মন্দিরে এক অনুষ্ঠানে গিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় একে অপরকে শ্রদ্ধা করে।’
মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমার প্রথম ৮ মাসের দায়িত্ব পালনকালে আমি বাংলাদেশের আটটি বিভাগেই ঘুরেছি। মসজিদ, মন্দির ও চার্চে গিয়ে ইমাম পুরোহিতদের সঙ্গে কথা বলেছি। এখন আমি এসেছি একটি বৌদ্ধ মন্দিরে, আমার কাছে যেমনটা মনে হয়েছে, এখানকার ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসের লোকজন একে অপরকে শ্রদ্ধা করে। তাই আমি মনে করি, তার অভিযোগ সঠিক নয়, বরং ধর্মীয় সম্প্রীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি উল্লেখযোগ্য নাম। যদিও কোন দেশই সংখ্যালঘুদের অধিকার দিতে সফলতা পায়নি। তিনি আরো বলেন, ‘এ অঞ্চলের প্রধান ইস্যুগুলো কী তা যুক্তরাষ্ট্র ভালোভাবেই জানে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ