ঢাকা, রোববার 21 July 2019, ৬ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৭ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

পদ্মায় পানি বাড়ছে ॥ ডুবছে মধ্যাঞ্চল

বাঁধভাঙ্গা বন্যার পানিতে গোবিগঞ্জসহ ১২টি ইউনিয়ন তলিয়ে গেছে। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় কলার ভেলাই এখন চলাচলের একমাত্র ভরসা

ইবরাহীম খলিল : পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় দেশের মধ্যাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হচ্ছে। প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। বন্যায় বাড়িঘর ফসল হারিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে আশ্রয়  কেন্দ্রে যাচ্ছে হাজার হাজার পরিবার। অপরদিকে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি কমলেও এখনও বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে দুর্ভোগের সঙ্গেই লড়াই করতে হচ্ছে লাখ লাখ মানুষকে। গতকাল শনিবার কয়েকটি নদ-নদীর পানি কমলেও এর অনেকগুলোর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
গতকাল শনিবার ‘বৃষ্টিপাত ও নদনদীর অবস্থা’ নিয়ে দেয়া প্রতিবেদনে সতর্কীকরণ কেন্দ্র  জানিয়েছে, গঙ্গা-পদ্মা এবং ঢাকার চারপাশের নদ-নদী ছাড়া অন্যান্য সব প্রধান নদ-নদীর পানি কমছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর ও ভারত আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের উজানের প্রদেশগুলোতে আগামী ২৪ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই। এ জন্য আগামী ২৪ ঘণ্টায় ব্রক্ষপুত্র-যমুনা এবং সুরমা-কুশিয়ারা নদ-নদীগুলোর পানি কমতে পারে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া জানান, আগামী ২৪ ঘণ্টায় পদ্মা নদীর পানির বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় পদ্মা নদী সুরেশ্বর পয়েন্টে পানি বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। পদ্মার পানি বৃদ্ধির কারণে মধ্যাঞ্চলের মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও মুন্সিগঞ্জ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।
বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, যমুনা নদীর পানি ফুলছড়িতে ১২৯ সেন্টিমিটার, বাহাদুরাবাদে ১৩৭ সেন্টিমিটার, সারিয়াকান্দিতে ১১৬ সেন্টিমিটার, কাজিপুরে ১১১ সেন্টিমিটার ও সিরাজগঞ্জে ৯৩ সেন্টিমিটার বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্রের পানি নুনখাওয়া ও চিলমারী পয়েন্টে এবং পদ্মা নদীর পানি গোয়ালন্দ ও ভাগ্যকূল পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জ, কুশিয়ারার পানি শেরপুর-সিলেট, পুরনো সুরমার পানি দিরাই, তিতাসের পানি ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মেঘনার পারি চাঁদপুর, ধরলার পানি কুড়িগ্রাম, ঘাঘটের পানি গাইবান্ধা, করতোয়ার পানি চকরহিমপুর, আত্রাইয়ের পানি বাঘবাড়ি, ধলেশ্বরীর পারি এলাশিন পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে দেশের ভেতরে ও উজানের বেসিনে (আসাম) ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের কারণে চলতি জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহের প্রথমার্ধে দেশের উত্তরাঞ্চলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার পানি সবকয়টি পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করে জামালপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় ভয়াবহ রূপ দিয়েছে, যা উত্তর-মধ্যাঞ্চলের বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইলসহ মানিকগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। যমুনা নদী বাহাদুরাবাদ ও ফুলছড়ি পয়েন্টে এবং তিস্তা নদী ডালিয়া পয়েন্টে পূর্বে রেকর্ডকৃত সবোর্চ্চ সীমা অতিক্রম করেছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। পরবর্তী সময়ে এর প্রভাব পড়ে পদ্মায়ও। বিস্তৃত অঞ্চলে বন্যার কারণে লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে দুর্বিষহ জীবন-যাপন করছেন।
ফরিদপুর : পদ্মার পানি বেড়ে যাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতি হচ্ছে ক্ষেতের ফসল। এতে জেলার তিন উপজেলার নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলের ক্ষেত তলিয়ে গেছে। এতে বিপাকে পড়েছেন পদ্মাপাড়ের কৃষকরা।
গত চার দিনে শুধু জেলা সদর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নে বোনা আমান ক্ষেত দুই হাজার ৪৬ এবং আউশ ধানের ক্ষেত এক হাজার ৯৮ হেক্টর জমি বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। সবজি ক্ষেত তলিয়েছে ১২৪ হেক্টর। ফরিদপুরের গোয়ালন্দ পয়েন্টের গেজ রিডার ইদ্রিস আলী জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ওই পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানি আরও ১২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে শনিবার সকাল ৬টায় ওই পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানি বিপদসীমার (৯ দশমিক ৩১) উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যা বিদৎসীমার ৬৬ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে। জেলার নর্থচ্যানেলের কৃষক আলম সরকার, ছমির শেখ জানান, আউশ-আমন ধান বুনেছিলাম, বন্যায় সব তলিয়ে গেছে। পানিতে আমাদের নিঃস্ব করে দিয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রোকসানা রহমান জানান, কৃষি ক্ষেত্রে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাদের তালিকা করে বন্যার পরে পুনর্বাসন করা হবে। সরকারের এ বিষয়ে নিদের্শনা রয়েছে।
মানিকগঞ্জ : যমুনা নদীর পানি আরিচা পয়েন্টে ২০ সেন্টিমিটার বেড়ে গতকাল শনিবার সকাল নয়টার দিকে বিপদসীমার ৪২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে মানিকগঞ্জের পাঁচটি উপজেলার ৩০টি  ইউনিয়নের ৭০টি গ্রামের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বন্যায় আক্রান্ত হয়েছেন। দেখা দিয়েছে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কালীগঙ্গা, ধলেশ্বরী ও ইছামতি নদীর পানিও বাড়ছে। জেলা বন্যা নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সূত্রে জানা গেছে, দৌলতপুর, শিবালয়, ঘিওর, হরিরামপুর ও সাটুরিয়া উপজেলার অন্তত ৩০টি প্রতিষ্ঠানে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। নদী তীরবর্তী এলাকায় শুরু হয়েছে ভাঙন। গৃহহীন হয়েছে তিন শতাধিক পরিবার।
ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. বাবুল মিয়া বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভাঙনকবলিত মানুষের মধ্যে আট মেট্রিকটন চাল দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও কয়েক টন চাল ও শুকনা খাবার বিতরণের ব্যবস্থা চলমান রয়েছে।
রাজবাড়ী : পদ্মার পানি বৃদ্ধির কারণে রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ও কালিকাপুর ইউনিয়নের প্রায় ১২ হাজার মানুষ তাদের গবাদিপশু নিয়ে পানিবন্ধী হয়ে পরেছে। পানিবন্ধী মানুষরা পাশের উঁচু রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছে। দুর্গতরা এপর্যন্ত কোন ত্রাণ বা কোন সাহায্য পায়নি। বিশুদ্ধ পানি ও স্যনিটেশনের সংকটে তাদের জীবন হাহাকার অবস্থায়। দেখা দিয়েছে পানিবাহিত রোগ। একই সাথে রোগ, শোক আর বিষধর সাপের ভয় তো আছেই। শনিবার বন্যার পানিতে ধবপুর, হরিনবাড়ীয়া, লস্করদিয়া, কৃষননগর, ভবানীপুর, হরিনাডাঙ্গা, চররাজপুর, বিজয়নগর, নারানপুর, আলোকদিয়া, বল্লভপুর, ভাগলপুর, বাগঝাপা, গংগানন্দপুর, কামিয়া, কালুখালী, পাড়াবেলগাছী ও গতমপুর গ্রাম ডুবে গেছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য ইদ্রিস আলী মনো জানালেন, নারানদিয়া এলাকার ২ শতাধিক পরিবার পানিতে ডুবে গেছে। রতনদিয়া লস্করদিয়া নারায়নপুরের বিল্লাল হোসেন বললেন, বৃহস্পতিবার দুপুরে পদ্মা নদীর পানি বিপদসীমার কাছ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ভেবেছিলাম বিপদসীমা অতিক্রম করতে ২/৩ দিন লাগবে। রাতেই তা বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২ ফুট উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পদ্মাপার থেকে চরাঞ্চল আরো ৩ ফুট নিচু। তাই চরাঞ্চলের কোন কোন জায়গা বন্যার পানিতে ৪/৫ ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
গাইবান্ধা : গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ঘাঘট ও তিস্তা নদীর পানি কমতে শুরু করলেও গতকাল আবার নতুন করে করতোয়া নদীর পানি বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে করতোয়া নদীবেষ্টিত গোবিন্দগঞ্জ ও সাঘাটা উপজেলা চত্বরসহ নতুন করে ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
গাইবান্ধার সাতটি উপজেলার ৫১টি ইউনিয়নের ৪ শতাধিক গ্রাম ও গাইবান্ধা পৌরসভার বেশির ভাগ অংশ বন্যার পানিতে তলিয়ে আছে। সরকারি হিসাবে, গাইবান্ধায় পৌনে ৫ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। জেলা সদরের সঙ্গে উপজেলার সড়ক যোগাযোগ ও গাইবান্ধার ওপর দিয়ে ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ আছে ।
গত সপ্তাহের বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যায় গাইবান্ধায় ৫টি বাঁধের ১৫টি অংশে ধসে যাওয়ায় সদর উপজেলার সঙ্গে সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সাদুল্যাপুর উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। গতকাল  শনিবার দিনভার নতুন করে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে সাঘাটা উপজেলা পরিষদের প্রশাসনিক বিভিন্ন ভবন। যে কোনো সময় সাঘাটার বোনারপাড়া খাদ্য গুদামে বন্যার পানি প্রবেশ করতে পারে।
সিরাজগঞ্জ: সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি বাড়ছেই। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি সিরাজগঞ্জ হার্ডপয়েন্ট এলাকায় ১৮ সেন্টিমিটার বেড়ে সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার ৯৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে জেলার পাঁচটি উপজেলার ৩৬টি ইউনিয়নের দুই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। যমুনাসহ অভ্যন্তরীণ নদীগুলোতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বন্যার্ত মানুষ উঁচু বাঁধ, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে বন্যার্তদের মাঝে সীমিত আকারে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। যোগ দিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও। সীমিত আকারে ত্রাণ তৎপরতা শুরু হওয়ায় বানভাসি মানুষ রয়েছে খাদ্য সংকটে।
সিরাজগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্রে জানা যায়, বন্যায় সিরাজগঞ্জ সদর, কাজিপুর, শাহজাদপুর, বেলকুচি ও চৌহালী উপজেলার ৩৬টি ইউনিয়নের দুই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এদের মধ্যে ৩৫৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই পেয়েছে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার বন্যার্ত মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৪টি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও ৫৫ হাজার ৭২৪টি পরিবার। এদের মধ্যে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ৯৫৯টি। ১ হাজার ৩৪৭টি বাড়িঘর সম্পূর্ণ এবং ২৭ হাজার ৬৩৩টি বাড়িঘরের আংশিক ক্ষতি হয়েছে। ১৬৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে আরও ৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
শেরপুর : পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পানি শেরপুর ফেরিঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ১৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জেলায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের শাখা মৃগী নদীতে পানির চাপ বাড়ায় সদর উপজেলার বেতমারি-ঘুঘুরাকান্দি ইউনিয়নের বেতমারি বেড়িবাঁধ প্রায় ২০০ ফুট ভেঙে গেছে। এতে চরপক্ষীমারী, কামারেরচর, বলাইয়েরচর, বেতমারি-ঘুঘুরাকান্দি ও চরশেরপুর ইউনিয়নের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এদিকে, পোড়ার দোকান ও শিমুলতলি ডাইভারশনের ওপর দিয়ে প্রায় ৮ ফুট উচ্চতায় বন্যার পানি প্রবাহিত হওয়ায় শেরপুর-জামালপুর মহাসড়কে দ্বিতীয় দিনের মতো যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বেতমারি এলাকার বাসিন্দা রমজান আলী, সোরহাব উদ্দিন, ফকির মাহমুদসহ অনেকে জানান, হঠাৎ বেড়িবাঁধে ভাঙায় বাড়ি-ঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। তারা খুবই কষ্টে আছেন।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুর রউফ জানান, এপর্যন্ত জেলার ৩৫টি ইউনিয়নের ১৭২টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ৬৩ হাজার মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছেন। ১৫৩ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা, ২ দশমিক ৭ কিলোমিটার বাঁধ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলায় বন্যার্তদের মাঝে ৩৫ মেট্রিক টন চাল বিতরণের পর আরও ৭০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে শেরপুর সদর উপজেলায় ৫০ মেট্রিক টন ও ঝিনাইগাতী উপজেলায় ২০ মেট্রিক টন চাল বিতরণের প্রস্তুতি চলছে। এ ছাড়া, সদরে আরও নগদ একলাখ টাকা বিতরণ করা হবে।
টাঙ্গাইল : বন্যার কারণে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে ৭২ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৫২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ৬টি দাখিল মাদ্রাসা। উপজেলার গাবসারা ও অর্জুনা ইউনিয়নের প্রায় সবক’টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলে গেছে পানির নিচে। বেশিরভাগ বিদ্যালয় বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। আবার অনেক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ ও অফিস কক্ষে হাঁটু থেকে কোমড় পর্যন্ত পানি। পানির স্রোতের কারণে অনেক বিদ্যালয়ের আসবাবপত্র ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যালয়ের মাঠগুলোতে চলছে মাছ মারার ধুম। পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ থাকায় পিএসসি, জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে বিঘ্ন ঘটছে।
কুড়িগ্রামে জনদুর্ভোগ চরমে ত্রাণের জন্য হাহাকার
মোস্তাফিজুর রহমান কুড়িগ্রাম থেকে : জেলায় উজান থেকে নেমে আসা ভারতীয় পানিতে কুড়িগ্রামের ৮ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। জেলার উলিপুর উপজেলার বজরা হাতিয়া গুনাইগাছ ধামশ্রেণী সাহেবের আলগা বেগমগঞ্জ ইউনিয়ন আগে থেকে প্লাবিত হলেও, তবকপুর, ধরনীবাড়ীসহ ভিভিন্ন ইউনিয়নের নতুন নতুন এলাকায় পানি ওঠে প্রায় ৬শতাধিক গ্রামের ২ লক্ষাধিক পরিবারের বসতভিটায় পানি ঢুকে পড়ায় বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার তাদের তলিয়ে যাওয়া বসতবাড়ী ছেড়ে বিভিন্ন উঁচু স্থানে স্থানে আশ্রয় নিলেও সেখানেও তারা নিরাপদ নয়। সেখানে রয়েছে বিষধর সাপের ভয়।বন্যাকবলিত এলাকায় নলকুপগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ওইসব এলাকায় খাদ্য এবং বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখাদিয়েছে। পাশাপাশি জেলার প্রায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। জেলার উলিপুর উপজেলার যেসব এলাকায় ৮৮সালের বন্যায়ও পানি ওঠেনি সে-সব এলকাতেও ব্রক্ষপুত্রের পানি ঠুকে পড়েছে।ফলে বন্যা সংক্রান্ত তাদের কোন প্রস্তুতি না থাকায় ওইসব এলাকার পানিবন্দী মানুষজন বেশী বেকায়দায় পড়েছে।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার ধরলা নদীর পানি সেতু পয়েন্টে বিপদসীমার-৫৭ সেন্টিমিটার এবং ব্রহ্মপুত্র নদের নুনখাওয়া পয়েন্টে-৫৩ সেন্টিমিটার ও চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার-৮৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার সবগুলো নদ-নদী টইটুম্বুর। চারিদিকে শুধু পানি আর পানি।
এদিকে কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার ৮৫ভাগ, চিলমারী, রাজিবপুর ও রৌমারী উপজেলার সম্পুর্ন পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ওইসব এলাকার অবস্থা খুব খারাপ। ফলে ওই এলাকার মানুষের মাঝে চরম দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। পানিবন্দী মানুষজনের মাঝে বিশুদ্ধ পানি আর খাবার এবং গো-খাদ্যের তীব্র সংকট চলছে।
অন্যদিকে সরকারী ও বেসরকারীভাবে কিছু-কিছু এলাকায় ত্রাণ দেয়া হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা একেবারেই অপ্রতুল। নাগেশ্বরী উপজেলায় জামায়াতের পক্ষথেকে ত্রাণ দিয়েছেন উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মজিবুল ইসলাম খন্দকার বেলাল মাস্টারসহ নেতৃবৃন্দ। জেলার পানিবন্দী মানুষজনের মাঝে বিষধর সাপের চরম আতংক ও খাদ্য সংকট চলছে বলে জানিয়েছে বানভাসি মানুষ।
অপরদিকে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ উপলক্ষে ৩ দিন ব্যাপি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারবাড়ী কেন্দ্রে মৎস্য মেলার আয়োজন করা হয়েছে। ভাসিয়েগেছে পুকুর ও ঘেরের মাছ।নষ্ট হয়েছে আমন বীজতলা শাকসবজি ও তরিতরকারির ক্ষেত।
দুর্গম চরের বাসিন্দারা ত্রাণ পাচ্ছে না
বগুড়া অফিস : বগুড়ায় যমুনা নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। তবে ধীরগতিতে পানি কমায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও মানুষের দুর্ভোগ কমছে না। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নেয়া মানুষ আর গবাদি পশু একসঙ্গে বসবাস করছে। দুর্গম চরগুলোতে পানিবন্দী মানুষ পর্যাপ্ত ত্রাণের অভাবে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। বিশুদ্ধ পানি এবং গোখাদ্যের সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে। শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত যমুনা নদীর পানি ১২ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ১১৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নেয়া মানুষগুলো ত্রাণ পেলেও দুর্গম চরে আটকে পড়া লোকজন পর্যাপ্ত ত্রাণ পাচ্ছে না। সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনার দুর্গম চর কাজলা ইউনিয়নের বেনুপুর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য পুটু মিয়া জানান, এই গ্রামের ১৬০ পরিবার গবাদি পশু নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। শনিবার পর্যন্ত তারা কোনো প্রকার ত্রাণ সহযোগিতা পায়নি। তিনি জানান, পানিবন্দী মানুষগুলো এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ভাত খেতে পারছে না। অন্যদিকে গবাদি পশুগুলো খাবারের অভাবে হাড্ডিসার হয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও জানান, কাজলা ইউপি চেয়ারম্যান রাশেদ সরকার গত সাড়ে তিন বছরে একবারও চরে আসেননি। তবে কাজলা ইউপি চেয়ারম্যান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, কাজলা ইউনিয়নে ঘরে ঘরে ত্রাণ পৌঁছানো হয়েছে। তিনি জানান, অনেকে বার বার ত্রাণ নেয়ার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছে। বোহাইল চরের বাসিন্দা লিটন সরকার জানান, তাদের এলাকার মানুষ এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছে। এখনো অনেকেই ত্রাণ পায়নি। বোহাইল ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ জানান, ত্রাণ পৌঁছানো হচ্ছে। কিন্তু মানুষের বড় সমস্যা হচ্ছে বিশুদ্ধ পানি এবং স্যানিটেশন নিয়ে। সারিয়াকান্দি উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান মতি জানান, প্রতিদিনই ত্রাণ দেয়া হচ্ছে। দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো যাচ্ছে না। তিনি জানান, এ পর্যন্ত ৫ হাজার পানিবন্দী পরিবারকে শুকনো খাবার এবং ১৫ হাজার পরিবারকে ১৫ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে। বগুড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বন্যা কবলিত সোনাতলা, সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলায় ৩১ হাজার ৫৮৫ পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তিন উপজেলায় দুই হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার, ৩৩৭ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আরও ৫০০ মেট্রিক টন চাল এবং ১০ হাজার শুকনো খাবার প্যাকেট বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
শেরপুরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি
শেরপুর সংবাদদাতা : পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শেরপুর সদর উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের ৪৫টি গ্রামের নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় ১০ হাজার পরিবার।  কাঁচা ঘর-বাড়ি, রাস্তাঘাট, রোপা আমন ধানের বীজতলা, সবজি, শতাধিক পুকুরের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। শেরপুর-জামালপুর সড়কের পোড়ার দোকান এলাকার কজওয়েটি ৬-৭ ফুট পানির নীচে তলিয়ে যাওয়ায় গতকাল শুক্রবার থেকে শেরপুর-ঢাকা এবং উত্তরবঙ্গের সঙ্গে এ পথে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে এ পর্যন্ত ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। অপরদিকে ঝিনাইগাতী উপজেলার মহারশী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার ভোগাই ও চেল্লাখালী নদীর পানি কমে যাওয়ায় ওই দুই উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের ৪৫টি গ্রামের প্রায় দশ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। বিশেষ করে গৃহপালিত পশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন। বাড়িতে পানি উঠায় চুলা জ¦ালাতে পারছেন না প্লাবিত এলাকার মানুষ।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি উঠায় জেলার ৪২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। জেলায় ত্রাণ তৎপরতা অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন বানভাসি মানুষ। এ পর্যন্ত জেলার দুর্গতদের মধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৩৫ মেট্রিক টন চাল প্রদান করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোন চিকিৎসা সেবা ও আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়নি। শেরপুর- জামালপুর সড়কের ব্রহ্মপুত্র বীজ পয়েন্টে পানি বিপদ সীমার দশমিক ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
শেরপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পিকন কুমার সাহা জানান, উজান থেকে নেমে আসা পানিতে সৃষ্ট বন্যায় উপজেলার ১৫ হাজার একশত কৃষকের রোপা আমন বীজতলা, আউশ ধানের ক্ষেত, সবজি ও পাটের আবাদকৃত এক হাজার তিনশত ত্রিশ হেক্টর জমি বন্যার পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে।
চৌহালীর বন্যাদুর্গত মানুষের দুর্ভোগ এখন চরমে
বেলকুচি (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা : যমুনায় পানি কিছুটা কমলেও বিপদসীমার ৯২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সিরাজগঞ্জের নিম্নাঞ্চল চৌহালী উপজেলার চরাঞ্চল জুড়ে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।
উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন এখন পুরোটাই বন্যা আক্রান্ত। পানিবন্দী হয়ে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ এখন চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। বিশেষ করে সদিয়াচাঁদপুর, উমরপুর, খাষপুখুরিয়া, বাঘুটিয়া, স্থল ও ঘোরজান ইউনিয়নের মানুষেরই দুর্ভোগ বেশি।
সদিয়াচাঁদপুরের বিনদহ, বেতিল, আহশানগর, ধুলিয়াবাড়ি, এনায়েতপুর চর, মুরাদপুর, রেহাই কাউলিয়া, ধীতপুর, খাষপুখুরিয়া, চরসলিমাবাদ, চাঁদপুরসহ আশপাশের পুরো গ্রাম জুড়ে বাড়িতে-বাড়িতে ১ থেকে ৩ ফুট পানি গত ৮ দিন ধরে বিরাজমান। এখানকার কয়েক হাজার মানুষ বাশের মাচা করে বসবাস করছে। টিউবয়েল তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ খাবার পানি ও শুকনা খাবারের চরম সংকট দেখা দিয়েছে।
বিনদহ গ্রামের জহুরুল শেখের স্ত্রী পানিবন্দী হুসনে আরা খাতুন জানান, আমরাই বেশি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত। ৮ দিন ধরে কষ্টে চলছি। এখনও কোন সহায়তা পাইনি।
ঘোরজান ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ রমজান আলী জানিয়েছেন, আমার ইউনিয়নে প্রায় ৯০% লোক পানি বন্ধি।  যে বরাদ্দ পাচ্ছি তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। নিজে থেকেও কিনে দিয়ে এখন কুলাতে পারছি না।
এদিকে অপ্রতুল ত্রাণের কথা স্বীকার করে চৌহালী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মজনু মিয়া জানান, ৭টি বন্যা দুর্গত ইউনিয়নের জন্য আমরা ৪৩ টন ৩০০ কেজি চাল ও ৪শ প্যাকেট শুকনা খাবার পেয়েছিলাম। তা প্রত্যেক ইউনিয়নে দেওয়া হয়েছে।
গোবিন্দগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি
গোবিন্দগঞ্জ (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা : গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে।  উপজেলার রাখালবুরুজ ইউনিয়ন সংলগ্ন চরবালুয়া নামক স্থানে বাঙ্গালী নদী রক্ষা বাঁধের বেশ কয়েকটি স্থানে ভেঙ্গে যাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এর ফলে উপজেলার হরিরামপুর, রাখালবুরুজ, শিবপুর, নাকাই, তালুককানুপুর, মহিমাগঞ্জ, শালমারাসহ নতুন করে কামারদহ, কোচাশহর ইউনিয়ন বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এসব ইউনিয়নের মওসুমি ফসল সহ আমন বীজতলা পানিতে তলিয়ে গেছে। গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় ৫৭০ হেক্টর জমির আমন বীজতলা, ৩৬০ হেক্টর জমির রোপা আউশ, ১২০ হেক্টর জমির পাট এবং ৯০ হেক্টর জমির শাকসবজি বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল হামিদ জানান, বন্যার পানি প্রবেশ করায় ও আশ্রয় কেন্দ্র খোলার কারণে ৩১টি বিদ্যালয়ের পাঠ কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার রামকৃষ্ণ বর্মন জানান, বন্যার্তদের জন্য এ উপজেলায় সরকারীভাবে মোট ৩৫ মেঃটন চাল ও এক লক্ষ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। শনিবার দুপুরে  পৌর শহরের কুঠিবাড়ি মডেল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও গোলাপবাগ দাখিল মাদ্রাসায়  আশ্রয় কেন্দ্র ও বোয়ালিয়া বাঁধ এলাকার  বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরন করেন উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র আতাউর রহমান সরকার। এ সময় উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকতা জহিরুল ইসলাম, উপজেলা আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহসভাপতি প্রধান আতাউর রহমান বাবলূ, পৌর কাউন্সিলর রিমন কুমার তালুকদার, জোবাইদুর রহমান বিশা, গোবিন্দগঞ্জ প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান প্রধান টুকু, মহিলা কাউন্সিলর গোলাপী বেগম, মারুফা বেগম,জহুরা বেগম, সাবেক কাউন্সিলর আলহাজ্ব আবু হেনা আসাদুজ্জামান রানু, পৌরসভার সার্ভেয়ার আনোয়ার হোসেন আকন্দসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।
নড়িয়া-জাজিরা সড়কে যান চলাচল বন্ধ
শরীয়তপুর সংবাদদাতা : উজানের বন্যার পানি নামতে শুরু করায় শরীয়তপুর জেলার নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে পদ্মা নদীর তীরবর্তী জাজিরা ও নড়িয়া উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এ সব নিম্মাঞ্চলের অনেক বাড়ীর আঙ্গিনায় পানি ঢুকে পড়েছে। নড়িয়া উপজেলার কেদারপুর, মোক্তারেরচর ও রাজনগর ইউনিয়নের নিম্মাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়েছে। জাজিরা উপজেলার পূর্বনাওডোবা ইউনিয়নের পাইনপাড়া এলাকায় চরাঞ্চলের অনেক বাড়ির আঙ্গিনায় পানি ঢুকে পড়েছে। নড়িয়া-জাজিরা সড়কের পোড়াগাছা এলাকায় সড়কের অনে স্থানে পানিতে তলিয়ে গেছে। একই সড়কের পাচুখারকান্দি এলাকায় একটি সেতুর নির্মাণ কাজের জন্য তৈরি বিকল্প সড়কটি ভেঙ্গে গেছে। ফলে ওই সড়কে গতকাল শুক্রবার থেকে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। পদ্মার পানি বৃদ্ধির ফলে নড়িয়া উপজেলার শেহের আলী মাদবর কান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঈশরকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, টেবেকা গফুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর জপসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিদ্যালয় মাঠে পানি প্রবেশ করায় পাঠদান সাময়িক ভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। জাজিরা উপজেলার পাইনপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইয়াছিন মাদবর কান্দি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বড় কান্দি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাজিয়ারচর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কাজিয়ার চর ছমির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয় মাঠে পানিতে প্লাবিত হওয়ায় বিদ্যালয় বন্ধ করে অন্যত্র পাঠদান চলছে।
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকাশ কৃষ্ণ সরকার বলেন, পদ্মার নদীর পানি প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। কয়েক দিনে পদ্মার পানি সুরেশ্বর পয়েন্টে ১২০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এখনো বিপদ সিমা অতিক্রম করেনি। পানি বৃদ্ধির ফলে নদীর তীরবর্তী কিছু কিছু নিম্নাঞ্চাল প্লাবিত হয়েছে। আমরা সার্বিক পরিস্থিতির উপর সার্বক্ষণিক নজরদারি করছি। জরুরি অবস্থা মোকোবেলার জন্য আমরা প্রস্তুত আছি।
নেত্রকোণায় ভোগান্তিতে মানুষ
দিলওয়ার খান (নেত্রকোনা) : নেত্রকোনায় বন্যার পানি কমতে থাকলেও বন্যায় প্লাবিত ৬টি উপজেলার ৩২ টি ইউনিয়নে অধিকাংশ  এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে পানিবাহিত রোগ। বিশেষ করে শিশুরা ডায়রিয়া আর ঠান্ডাজনিত রোগ সর্দি, কাশিতে আক্রান্ত হচ্ছে। গত আট দিনে ১২৬ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৯ জন। বন্যার্তের জন্য নেই পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী।
 জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জেলার দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী, কলমাকান্দার উব্ধাখালি, খালিয়াজুরীর ধনু ও বারহাট্টার কংশ নদীর পানি বেড়ে এসব নদীর পার্শ্ববর্তী ৪ শতাধিক গ্রামের লক্ষাধিক মানুষের ঘর-বাড়ি প্লাবিত হয়েছে। বানভাসীদের মাঝে এখনও পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছেনি তেমন। নেত্রকোনার র্দূগাপুর, কলমাকান্দায় বারহাট্টা ও নেত্রকোণা সদর উপজেলা থেকে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানির চাপ কম থাকায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করলেও কমছেনা দুর্ভোগ। ইতোমধ্যে নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বন্যা পরিস্থিতির আরো উন্নতি হবে বলে জানিয়েছেন। শনিবার দুপুরে সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্রামের রাস্তা-ঘাট ভেসে উঠতে শুরু করেছে। তবে ওইসব এলাকায় সড়কের অধিকাংশই ভেঙে গেছে। শনিবার পর্যন্ত বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে এক শিশু। বন্যার কারণে বাঁধ, অন্যান্য উঁচু স্থান ও সড়কে আশ্রয় নেয়া মানুষের খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাব মিটছে না। নেত্রকোনার ৬ টি উপজেলার ৩২ ইউনিয়ন বন্যা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও  যে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয় বলে ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম জানান, এপয্যন্ত নেত্রকোণায় বন্যা ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য সরকারী বাবে ১২৫ মেট্রিকটন চাউল ১লক্ষ ৮০হাজার নগদ র্অখ,৩৩০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। বন্যা কবলিত এলাকায় ১০২ মেডিকেল টিম কাজ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ  বন্যা দুর্গত এলাকায় পানি কমার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা দিয়েছে চর্মরোগ ও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ। স্থানীয়দের অনেকে পানির তোড়ে বিধ্বস্ত হওয়া ঘর এবং ভেতরে জমে থাকা বালু-কাদার স্তুপ সরাতে ব্যস্ত রয়েছেন। একদিকে ক্ষতিগ্রস্ত ঘর, অন্যদিকে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বৃদ্ধি ও কাঁচামালের আমদানি না থাকায় খাদ্যসংকটে অনেকে দিশেহারা। আর কর্মহীন হয়ে পড়েছে নিম্নআয়ের মানুষ।
এদিকে উপজেলার ১৪৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় জরুরি সেবা দপ্তরের সবার ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
নেত্রকোণা সিভিল র্সাজন মো, তাজুল ইসলাম খান জানান, বন্যা পরবর্তী সময়ে চর্মরোগ ও ডায়রিয়া, ঠান্ডাজনিত জ্বর, কাসি  বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তবে বন্যা পরর্বতি মহামারি আকারে এখনো দেখা দেয়নি। তবে  দুর্গত এলাকার লোকজনকে সচেতন করতে পারলে পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ