ঢাকা, রোববার 21 July 2019, ৬ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৭ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মিন্নিকে আইনি সহায়তা দিতে ঢাকার ৪ আইনজীবী বরগুনায়

স্টাফ রিপোর্টার : বরগুনা সদরে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার মামলায় আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে ফাঁসানো হচ্ছে বলে ফের দাবি করেছেন মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর। প্রশাসনকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছেন, ‘আমার মেয়েকে না ফাঁসিয়ে আপনারা সঠিক তদন্ত করেন, তাহলে রিফাত হত্যার মূল রহস্য বেরিয়ে আসবে।’ একইসঙ্গে তিনি হুমকিও দিয়েছেন, ‘আমার মেয়ের কিছু হলে আত্মহত্যা করবো।’ গতকাল শনিবার বেলা ১১টার দিকে বরগুনা জেলা কারাগারে মিন্নির সঙ্গে দেখা করেন তার বাবা-মা, ভাই-বোন ও চাচা-চাচি। পরে সাংবাদিকদের কাছে এসব কথা বলেন মোজাম্মেল হোসেন কিশোর।
 মোজাম্মেল হোসেন কিশোর দাবি করেন, ‘মিন্নি আমাদের জানিয়েছে, রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে ও জোরজবরদস্তি করে তাকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিতে বাধ্য করা হয়েছে। প্রশাসনের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে খুনিদের আড়াল করতে আমার মেয়েকে ফাঁসাচ্ছে শম্ভু (বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু) ও শম্ভুপুত্র সুনাম (জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুনাম দেবনাথ)।’
কিশোর আরও অভিযোগ করেন, ‘হত্যাকান্ডের সঙ্গে আমার মেয়ে কোনোভাবেই জড়িত নয়। ঢাকা থেকে আইনজীবীরা আসবে শুনে নির্যাতন করে তড়িঘড়ি আমার মেয়েকে দিয়ে মিথ্যা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী রেকর্ড করিয়েছে পুলিশ। হত্যাকান্ডের মামলাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে আমার মেয়েকে গ্রেফতার করে মামলায় জড়ানো হয়েছে; স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীও রেকর্ড করানো হলো। এর মাধ্যমে প্রকৃত সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা হচ্ছে।’
মিন্নিকে নির্দোষ দাবি করে তিনি আরও বলেন, ‘সারাদেশবাসী দেখেছে, আমার মেয়ে তার স্বামীকে বাঁচাতে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। রিফাত হত্যা নিয়ে শুরু হয়েছে নোংরা রাজনীতি।’
মিন্নিকে অসুস্থ দাবি করে তার বাবা বলেন, ‘দুই মাস আগেও তার (মিন্নি) মানসিক চিকিৎসার জন্য ডাক্তার দেখিয়েছি। জেলখানায় তাকে দেখে আমার কান্না পেয়েছে; আমার মেয়েটা ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। আমার মেয়ে এখন খুব অসুস্থ, তার চিকিৎসার প্রয়োজন।’
মোজাম্মেল হোসেন কিশোর দাবি করেন, ‘আমার মেয়েকে সাক্ষী থেকে আসামি বানানো হয়েছে। পুলিশ ও প্রভাবশালী মহল যৌথভাবে আমার নিরীহ মেয়েকে ফাঁসিয়ে ফায়দা লুটতে চাইছে।’
এসময় মিন্নির মা মিলি আক্তার দাবি করেন, ‘আমার মেয়েকে ওরা মারতে মারতে অসুস্থ বানিয়েছে। আমার মেয়ের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। আল্লাহ, আমি আর সইতে পারছি না। আমার মেয়েকে ফাঁসিয়ে কাদের রক্ষা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে পুলিশ, সেটা এখন দেশবাসী জানে। আমার মেয়ের এই হত্যার সঙ্গে কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই।’
মিন্নির চাচা আবু সালেহ দাবি করেন, ‘মিন্নি আমাদের বলেছে, তাকে দিয়ে পুলিশ জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করেছে। আমরা জেলখানাতে মিন্নির সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলতে পারিনি। এসময় সেখানে সাদা পোশাকে অনেক অপরিচিত লোক আমাদের ফলো করছিল। আমরা ঠিকমতো মিন্নির সঙ্গে কথা বলতে পারিনি।’
এ বিষয়ে বরগুনা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘মিন্নির বাবা যে অভিযোগ করছে, সম্পূর্ণ মিথ্যা ও অমূলক। এর কোনও ভিত্তি নেই। মিন্নি সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছাতেই জবানবন্দি দিয়েছে।’
এর আগে শুক্রবার (১৯ জুলাই) বিকাল ৩টার দিকে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মোহাম্মাদ সিরাজুল ইসলাম গাজীর কাছে রিফাত হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি।
রিফাত হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত মিন্নিসহ ১৫ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ২ জুলাই মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। এখন পর্যন্ত ১৩ আসামি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় হত্যাকান্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে।
২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে রামদা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে রিফাত শরীফকে। তখন তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি হামলাকারীদের থামানোর চেষ্টা করেও সফল হননি। গুরুতর আহত রিফাতকে ওইদিন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে বিকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এ ঘটনায় রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ৫ থেকে ৬ জনকে আসামি করে বরগুনা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ মামলার এজাহারে উল্লেখ থাকা ৭ আসামিসহ সন্দেহভাজন আরও ৭ জনকে পুলিশ এর আগে গ্রেফতার করে। এরমধ্যে মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়। বাকিদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়ে বিভিন্ন মেয়াদে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

মিন্নিকে আইনি সহায়তা দিতে ঢাকার ৪ আইনজীবী বরগুনায়
রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী ও নিহতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে আইনি সহায়তা দেয়ার জন্য আইন ও সালিশ কেন্দ্রের একটি টিম বরগুনায় পৌঁছেছে। গতকাল শনিবার বিকেল ৩টার দিকে চার সদস্যবিশিষ্ট মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) আইনজীবীরা বরগুনায় পৌঁছান।
এরপর মিন্নির বাড়িতে গিয়ে মিন্নির বাবার সঙ্গে কথা বলেন চার আইনজীবী। সেখান থেকে ফিরে এসে মিন্নিকে আইনি সহায়তা দেয়ার জন্য বরগুনা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. মাহবুবুল বারী আসলামের সঙ্গে কথা বলেন তারা।
মিন্নিকে আইনি সহযোগিতা দেয়ার জন্য আইন ও সালিশ কেন্দ্র থেকে আসা টিমের সদস্যরা হলেন- আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র স্টাফ অ্যাডভোকেট আবদুর রশীদ, কেন্দ্রের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবীর, সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান ও কেন্দ্রের তদন্ত কর্মকর্তা হাসিবুর রহমান।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র স্টাফ অ্যাডভোকেট আবদুর রশীদ বলেন, আমরা মূলত মিন্নিকে আইনি সহায়তা দেয়ার জন্য ঢাকা থেকে এখানে এসেছি। আমরা মিন্নির বাবার সঙ্গে কথা বলেছি। একজন আইনজীবীর সঙ্গেও কথা বলেছি আমরা। আমরা মিন্নিকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব।
এ বিষয়ে বরগুনা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. মাহবুবুল বারী আসলাম গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় বলেন, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের টিমের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আগামীকাল রোববার আদালতে মিন্নির জামিনের জন্য আমি দাঁড়াব। একই সঙ্গে মামলার শুনানিতে অংশ নেব আমরা। আমাকে সহযোগিতা করবেন আইন ও সালিশ কেন্দ্র থেকে আসা টিমের সদস্যরা।
গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বরগুনার মাইঠা এলাকার বাবার বাসা থেকে বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরসহ মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তার বক্তব্য রেকর্ড করতে বরগুনা পুলিশ লাইন্সে নিয়ে যায় পুলিশ। এরপর দীর্ঘ ১০ ঘণ্টার জিজ্ঞাসাবাদ ও বিভিন্ন মাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ ও পুলিশের কৌশলী এবং বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আটকে যান মিন্নি। বেরিয়ে আসে হত্যাকান্ডে তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ। এরপরই তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
বুধবার বিকেল ৩টার দিকে বরগুনার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মিন্নিকে হাজির করে সাতদিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। পরে শুনানি শেষে মিন্নির পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালতের বিচারক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম গাজী। পরদিন বৃহস্পতিবার বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন জানিয়েছিলেন, মঙ্গলবার দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ ও বুধবার রিমান্ড মঞ্জুরের পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে রয়েছেন আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি। ইতোমধ্যে মিন্নি স্বামী রিফাত শরীফ হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। এ হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ