ঢাকা, সোমবার 22 July 2019, ৭ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৮ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

গল্প সাজানো ওদের পুরানো অভ্যাস

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : গত ১৬ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সহিষ্ণুতা বিষয়ে বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মীয় নেতা ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে হোয়াইট হাউজে কথা বলেন। এতে বাংলাদেশী পরিচয়ে প্রিয়া সাহা নামের এক হিন্দু মহিলা উপস্থিত হয়ে ট্রাম্পের কাছে অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বাংলাদেশে ৩ কোটি ৭০ লাখ হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান নিখোঁজ রয়েছেন। দয়া করে আমাদের লোকজনকে সহায়তা করুন। আমরা আমাদের দেশে থাকতে চাই। এরপর তিনি বলেন, এখন সেখানে ১ কোটি ৮০ লাখ সংখ্যালঘু রয়েছে। আমরা আমাদের বাড়িঘর খুইয়েছি। তারা আমাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে, তারা আমাদের ভূমি দখল করে নিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো বিচার পাইনি’। তার এমন আবেগঘণ বক্তব্যের পর ট্রাম্প নিজেই সহানুভূতিশীলতার স্বরূপ এই নারীর সঙ্গে হাত মেলান। এ সময় ট্রাম্প প্রশ্ন করেন, ‘কারা জমি দখল করেছে, কারা বাড়ি-ঘর দখল করেছে?’ ট্রাম্পের প্রশ্নের উত্তরে প্রিয়া সাহা বলেন, ‘তারা মুসলিম মৌলবাদি গ্রুপ এবং তারা সব সময় রাজনৈতিক আশ্রয় পায়। সব সময়ই পায়।’ মার্কিন টিভি চ্যানেলে সেই সাক্ষাৎকারের ভিডিও প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বক্তব্যটি ব্যাপক ভাইরাল হয়। যার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দেশ-বিদেশে বাংলাদেশীরা নানা ধরণের মন্তব্য করছেন। চারদিকে শুরু হয় সমালোচনার ঝড়। বাংলাদেশ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্তা ব্যক্তিরা বলছেন, এটি দেশ নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্রেরই একটি অংশ। এর সাথে কেউ জড়িত কিনা বা কারো ইন্ধনে করা হয়েছে কিনা সেটি তারা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবেন।
জানা গেছে, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ -খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সাংগঠনিক সম্পাদক এ প্রিয়া সাহা। এছাড়াও তিনি বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ‘শারি’-এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবেও দায়িত্বরত । তার গ্রামের বাড়ী পিরোজপুর জেলার চরবানিরীর মাটিভাঙ্গা নাজিরপুর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন প্রিয়া। রোকেয়া হলে থাকতেন তিনি। সে সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি ‘মহিলা ঐক্য পরিষদ’এর কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বর্তমানে ‘শারি’ এনিজিও সংস্থার মাধ্যমে প্রিয়া নিজ এলাকার দলিত সম্প্রদায়কে নিয়ে কাজ করেন। তার স্বামী মলয় সাহা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপ-পরিচালক। কয়েক বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে প্রিয়া সাহার দুই মেয়ে বসবাস করছেন। কিছুদিন পূর্বে সেখানে যান প্রিয়া সাহা।
অতীত ইতিহাস থেকে জানা গেছে, দেশ স্বাধীন হবার পর থেকে বাংলাদেশে অবস্থানরত সংখ্যালঘুদের বিষয়ে এমন অভিযোগ প্রায়শ: শোনা যেত। তবে এর ব্যাপক ব্যাপ্তি ঘটেছিল ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত চার দলীয় জোট সরকারের সময়ে। এই সময়ে জমি-জমা বা ব্যক্তিগত কোনো বিষয়ে ঝগড়া বিবাদ হলেও সেটিকে সংখ্যালঘু নির্যাতন হিসেবে চালিয়ে দেয়া হতো। যে এলাকায় ঘটনা ঘটতো, সেই এলাকার মানুষও সংখ্যালঘুদের উপর হামলা বা নির্যাতনের বিষয়টির প্রতিবাদ জানাতো। বিরোধী রাজনীতিক দল ও সরকারপন্থী সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে বারবার অভিযোগ করার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ ও মানবাধিকার সংস্থা তদন্ত দল পাঠায়। তারা অভিযোগকৃত এলাকায় গিয়ে সরেজমিনে তদন্ত শেষে যে সব রিপোর্ট দিয়েছিল তাতে সংখ্যালঘু নির্যাতন বা হামলার কোনো সত্যতাই পাননি। তারা রিপোর্টে বলেছে, যেভাবে ঢালাওভাবে অভিযোগ করা হয়েছে সেরকম কোনো ঘটনাই ঘটেনি। ২/১টি ঘটনা যেগুলো ঘটেছে, সেগুলো হচ্ছে ব্যক্তিগত আক্রোশ বা জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধের জের। এগুলোকে কোনভাবেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে তুলনা করা চলেনা।
সূত্র মতে, পারিবারিক ও জমি জমা সংক্রান্ত বিরোধকে সাম্প্রদাািয়ক রুপ দেয়ার প্রয়াস তীব্র হয়েছিল ২০০১ সালের পর থেকে। নির্বাচিত পরাজিত দল বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রতিশোধ হিমেসবে সংখ্যালঘু নির্যাতনের শ্লোগানকে একটা ট্রাম্প কার্ড হিসেবে সামনে নিয়ে আসে। এই অস্ত্র প্রয়োগের প্রধান বাহন হিসেবে এগিয়ে আসে তথাকথিত হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান পরিষদ। প্রতিমাসে তারা একটি বুলেটিন বের করে তাতে সত্য-মিথ্যার প্রলেপ দিয়ে সংবাদ প্রচার করতো। এই বুলেটিনে তারা হিন্দুদের সাথে মুসলিম প্রতিবেশীদের ঝগড়া-ঝাটি, মারামারি, মামলা-মোকদ্দমার যে ঘটনা এবং হিন্দুদের বাড়িতে যেসব চুরি ডাকাতি হতো সেগুলো মানবাধিকার লংঘন বলে তুলে ধরে গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিত। হিন্দুদের উপর এইসব ঘটনার ফলাও করে তুলে ধরতো তথাকথিত সুশীল সমাজ। বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনার ফলাও করে প্রচার পেত ভারতের মিডিয়াগুলোতে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালের ৫ই জুর ভারতের জনৈক লেখক ড. আনন্দ কুমার তার নিবন্ধে লিখেছিলেন, বাংলাদেশে সংখ্যলঘুরা ইসলামপন্থীদের আক্রমণের শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশী সংখ্যালঘুরা তাদের সম্পদ ও সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রায় একই সময়ে বাংলাদেশী লেখক প্রফেসর আবুল বারাকাত তার এক নিবন্ধে লিখেছেন, প্রায় দুই লাখ হিন্দু পরিবার তাদের বসতবাড়ি, হাজার হাজার বিঘা জমি-জমা হারিয়েছে। ২০০১ থেকে ২০৬ সালের মধ্যে চারদলীয় জোট সরকারের রাজনৈতিক ক্ষমতাবানরা এসব জমি-জমা দখল করে নিয়েছে।
জানা গেছে, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সংখ্যালঘুদের উপর হামলা নির্যাতনের যে অভিযোগ বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ও তাদের দোসরদের পক্ষ থেকে আনা হয়েছিল তা সরেজমিনে তদন্তে বাংলাদেশে এসেছিলেন তৎকালীন মার্কিণ কংগ্রেসের প্রতিনিধি নিউইর্য়কস্থ জন জে কলেজ অব ক্রিমিনাল জাস্টিসের অধ্যাপক ও মার্কিন অপরাধ এবং মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ম্যাকেল গোমেজ। তিনি দীর্ঘ ২৫ দিন ধরে বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে, বিশেষ করে অভিযোগের স্পট গুলোতে ব্যাপক সফর করেন। এর ভিত্তিতে তিনি একটি দীর্ঘ রিপোর্ট তৈরী করেন। তিনি রিপোর্টের সার সংক্ষেপে লিখেছিলেন’, ২৫ দিন ধরে আমি বাংলাদেশে অবস্থানকালে প্রত্যন্ত অঞ্চলের তৃণমূল পর্যায়ের গ্রামবাসীদের কাছে পৌঁছে তাদের সাথে কথা বলি। আমি বরিশাল,পটুয়াখালী, বাকেরগঞ্জ, ঋষিপুর, খুলনা, যশোর, কুমিল্লা, চান্দিনা, ইকরাশি, হাসনাবাদ, দোহার, কালিগঞ্জ, আড়িখোলা, নোয়াখালী, চট্গ্রাম-ওইসব শহর এবং গ্রামে গিয়েছি। নির্যাতিত হিসেবে প্রচারিত হিন্দু, খ্রীষ্টান এবং বৌদ্ধ পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছে এ ব্যাপারে তাদের বক্তব্য উদ্ধার করাই ছিল আমার লক্ষ্য। মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি আদৌ সত্য কিনা, নাকি অতিরঞ্জিত- সেটাই ছিল মুখ্য। তাদের বেশীর ভাগের কথোপকথনই আমি ভিডিও টেপে ধারণ করি। ছবি তুলি অনেকের। তাদের কেউই খুন, ধর্ষণ, গুম, আঘাত, বাড়িঘরে আগুন দেয়া কিংবা লুটতরাজের মতো বড় কোন ঘটনার কথা বলেন নি, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে। তাদের বক্তব্য থেকে আমার মনে হয়েছে তা হলো, নাম ধরে কাউকে গালি দেয়া, বাড়িতে ঢিল মারা, জমি জমা সংক্রান্ত মামলা, ব্যক্তিগত বিরোধী, ব্যবসায়ীক কোন্দল, আগে থেকে চলে  আসা বংশানুক্রমিক দ্বন্দ্ব ইত্যাদিকে নির্যাতন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, এ জাতীয় ঘটনা যখনই মুসলমান ও হিন্দুর মধ্যে ষংঘটিত হয়েছে, তখনই এটিকে ধর্মীয় নির্যাতন এবং সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের নামে অতিরঞ্জন করা হয়েছে।
জানা গেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহা যে অভিযোগ করেছেন তা তার নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকজনের ভাষ্য, প্রিয়া তার ভাইয়ের জমি নিয়ে বিরোধের জেরে স্থানীয় কয়েকজন হিন্দু ও মুসলমানকে হয়রানি করে আসছেন। নাজিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান বলেন, নাজিরপুরে কোনো সংখ্যালঘু নির্যাতন বা গুমের ঘটনা নেই। প্রিয়া সাহার বক্তব্য নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য ও উসকানিমূলক। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকজন জানান, চলতি বছরের শুরুতে চরবানিয়ারিতে প্রিয়ার ভাই জগদীশ চন্দ্র বিশ্বাসের একটি অব্যবহৃত ঘরে অগ্নিকা-ের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। প্রিয়া তার নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য তার ভাইয়ের জমি নিয়ে বিরোধের জেরে স্থানীয় কয়েকজন হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের লোককে হয়রানি করে আসছেন। এই ঘটনাকে মিথ্যাভাবে সাজিয়ে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে উপস্থাপন করেছেন, তা মিথ্যা ও বানোয়াট। এ ঘটনায় স্থানীয় কয়েকজন নিরীহ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোককে আসামি করে তিনি হয়রানি করছেন বলেও অভিযোগ তাদের।
জানা গেছে, বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি নিয়ে ষড়যন্ত্র নতুন কিছু নয়। প্রতিবেশী একটি দেশের ইন্ধনে বাংলাদেশীদের একটি অংশ এর সাথে কাজ করে যাচ্ছে। কিছু দিন আগে নিউইয়র্কে ভারতীয় তারকাদের একটি বৈঠকে বাংলাদেশকে পশ্চিবঙ্গের সাথে এক করার দাবি জানানো হয়। আবার কেউ কেউ বলেছেম পশ্চিবঙ্গের সাথে বাংলাদেশের কোনো বর্ডার তারা দেখছেনা। এছাড়া নিউইয়র্কে একটি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানেও একইধরণের বক্তব্য দেয়া হয়েছে। বসে নেই বাংলাদেশী সংখ্যালঘুরাও। ২০১৬ সালের নবেম্বর মাসে বাংলাদেশের হিন্দুদের রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সেখানে বসবাসকারী বাংলাদেশী সংখ্যালঘুরা। পাশাপাশি বাংলাদেশে একটি প্রতিনিধিদল পাঠানোর জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন তারা। এনআরবি নিউজ পরিবেশিত খবরে আরো বলা হয়- ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা এবং মন্দির ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে ১১ নবেম্বর নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃস্টান ঐক্য পরিষদের যুক্তরাষ্ট্র শাখা আয়োজিত মানববন্ধন থেকে ওই আহ্বান জানানো হয়। উল্লেখ্য যে, এবার আমেরিকার নির্বাচনে বাংলাদেশ ও ভারতের অধিকাংশ হিন্দুই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন করেছেন। নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ গ্রহণের পাশাপাশি তারা নগদ অর্থও প্রদান করেছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঐতিহাসিক কারণেই এই উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার সমস্যাটা এখনও রয়ে গেছে। তবে এই সমস্যার মাত্রা সব দেশে এক রকম নয়। উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক সমস্যার মাত্রা ভারতে সবচেয়ে বেশি। আর এর মাত্রা সবচেয়ে কম বাংলাদেশে। এ কারণেই বাংলাদেশকে বলা হয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর যে হামলা হয়েছে তার লক্ষণ কিন্তু সাম্প্রদায়িক নয়। বরং পত্র-পত্রিকার খবর ও বিশ্লেষণে রাজনৈতিক চরিত্রটি উঠে এসেছে। ক্ষমতাসীন দলের কোন্দল, পদবঞ্চনাসহ রাজনৈতিক বিত-া মুখ্য বিষয় বলে এলাকার মন্ত্রীও উল্লেখ করেছেন। নাসিরনগরসহ দেশের জনগণ হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সাথে সাথে রুখে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশে এটাই স্বাভাবিক। সেই অভিযোগের তিন বছর পর আবারো বাংলাদেশের হিন্দুদের রক্ষায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প কি বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট?  হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বাংলাদেশের সব নাগরিকের জান-মাল-ইজ্জতের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারের। এক্ষেত্রে কোনো ত্রুটি লক্ষ্য করা গেলে তা বলতে হবে বাংলাদেশ সরকারকেই। আর সরকার যদি এক্ষেত্রে ভূমিকা পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়, তাহলে সংবিধানের আলোকে যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের অধিকার রাখে মজলুম সম্প্রদায়সহ দেশের জনগণ।
কিছুদিন আগে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেছেন, বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দুর্বৃত্তদের কাউকে কাউকে আটকও করেছে, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এতে সংখ্যালঘু ও জনমনে আশা ও আস্থা ফিরে আসতে শুরু করেছে। নির্বাচনে বিজয়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ সুনির্দিষ্টভাবে তার নির্বাচনী ইশতেহারে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক নির্মূলের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের অঙ্গীকার করেছে। তা আক্ষরিকভাবে কার্যকর করতে হবে। তিনি আরও বলেন, সরকারি ও বিরোধী দল ধর্মীয় এবং জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় সুস্পষ্টভাবে যে অঙ্গীকারসমূহ নিজেদের ইশতেহারে ঘোষণা করেছে, পার্লামেন্টের ভিতরে ও বাইরে যেন তা যথাযথভাবে পালন হয়।
সূত্র মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশ বিষয়ে প্রিয়া সাহা নামের এই নারীর নালিশে সোশ্যাল মিডিয়া সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বাংলাদেশ বিষয়ে এমন বক্তব্যকে মিথ্যা ও বানোয়াট বলে তার বিচার চাইছেন সবাই। প্রিয়া সাহার এমন বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। এ বিষয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট মিলার বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দেয়া ওই নারীর অভিযোগ সত্য নয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় একে-অপরকে শ্রদ্ধা করে। হিন্দু বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-ঐক্য পরিষদের সভাপতি রানা দাশগুপ্ত বলেন, প্রিয়া সাহা যে বক্তব্য প্রদান করেছেন তা তার একান্তই ব্যক্তিগত মতামত। এ বিষয়ে তিনিই ভালো ব্যাখা দিতে পারবেন।
নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, প্রিয়া সাহা নামে এক মহিলা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে যে অভিযোগ করেছেন তা তিনি ব্যক্তি স্বার্থেই করেছেন। নিশ্চয়ই এর পিছনে তার বা কোন গোষ্ঠীর স্বার্থ আছে।  সংখ্যালঘুদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে করা অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি আরও বলেন, প্রিয়া যা বলেছেন সম্পূর্ণ অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কেন অন্য রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির কাছে এসব কথা বলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার অপচেষ্টা করেছেন সে বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এর পরই তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। মন্ত্রী যোগ করেন, এ ধরনের খবর দেয়ার পেছনে ওই নারীর নিশ্চয়ই একটি কারণ ও উদ্দেশ্য রয়েছে। দেশে আসলে নিশ্চয়ই আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করব। এটাই এখন আমাদের দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহা সংখ্যালঘু নিপীড়নের যে অভিযোগ করছেন, সেটি অসত্য এবং কোনোভাবেই তা গ্রহণযোগ্য না। দেশদ্রোহী বক্তব্য দেয়ায় প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। সেতুমন্ত্রী বলেন, তার এ ধরনের বক্তব্য শুধু নিন্দনীয়ই না, এর মধ্য দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে লুক্কায়িত সাম্প্রদায়িক শক্তিকে আরও উৎসাহিত করবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহা ধর্মীয় সংখ্যালঘু নিপীড়নের যে অভিযোগ করেছেন, তা প্রত্যাখ্যান করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন। শুক্রবার হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে এক সমাবেশে যোগ দিয়ে লন্ডন রওনা হওয়ার আগে গণমাধ্যমের এক প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি এমন আচরণের নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানাচ্ছি। বিশেষ মতলবে এমন উদ্ভট কথা বলেছেন তিনি।   

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ