ঢাকা, সোমবার 22 July 2019, ৭ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৮ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ভারতের পাশাপাশি চীনের বন্যার পানি প্রবেশের আশঙ্কা

শরীয়তপুর : নড়িয়া-জাজিরা সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে

ইবরাহীম খলিল : ভারতের পাশাপাশি চীনের বন্যার পানি বাংলাদেশে আসার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে দেশের বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তবে বন্যার বিষয়ে সরকারের সার্বিক প্রস্তুতি রয়েছে। গতকাল রোববার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির  বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি ক্যাপ্টেন এ বি তাজুল ইসলাম এসব কথা বলেন।
বর্তমানে দেশের ২৮টি জেলা বন্যাকবলিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, চীনের পানি যখন পুরোদমে আসা শুরু করবে তখন বন্যা ভয়াবহ হতে পারে। সরকার আশঙ্কা করছে এবারের বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। সেইভাবে আগাম প্রস্তুতিও সরকারের আছে। বন্যা যেন দীর্ঘস্থায়ী না হয় সেটা আমরা কামনা করি। তবে হলেও যেন আমরা মোকাবিলা করতে পারি।
তাজুল ইসলাম জানান, আগামীকাল সোমবার (আজ)  মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বন্যা উপদ্রুত এলাকা সফরে যাওয়া হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে যেখানে যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার তা নেবে। সংসদীয় কমিটির সদস্যের মধ্যে আগ্রহী কেউ থাকলে ত্রাণ তৎপরতায় অংশ নিতে পারেন।
এদিকে দেশের উত্তর থেকে মধ্যাঞ্চলে বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ইতিমধ্যে রাজধানীর চারপাশের জেলাগুলোতে বন্যার পানি চলে এসেছে। তবে দু-এক দিনের মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাত বেড়ে উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা আছে। সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাসে এসব কথা বলা হয়েছে।
বন্যা ও পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে পানি সহজে নামবে না। কুড়িগ্রাম দিয়ে প্রবেশ করা ব্রহ্মপুত্র নদের পানি যমুনা হয়ে এখন দেশের মধ্যাঞ্চল পর্যন্ত চলে এসেছে। গতকাল রোববার থেকে পদ্মাপারের জেলা শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর ও রাজবাড়ীতে বন্যার পানি বাড়তে শুরু করেছে। পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পানিও বাড়ছে। ওই নদের তীরবর্তী জেলা শেরপুরে ইতিমধ্যে বন্যা শুরু হয়ে গেছে। পানি বৃদ্ধির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ময়মনসিংহ জেলায় বন্যার পানি চলে আসতে পারে। এই পরিস্থিতিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধগুলো ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বন্যায় আক্রান্ত এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণ ও ওষুধের মজুত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। মূলত উজান থেকে আসা ঢল ও মৌসুমি বৃষ্টিপাতের কারণে বছরের জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসে দুই–তিন দফায় বন্যা হয়। এসব বন্যা ৩ থেকে ১০ দিন স্থায়ী হয়। এবার জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় কুড়িগ্রামে বন্যা শুরু হয়ে তা এখন রাজধানীর আশপাশের জেলাগুলোতে পৌঁছেছে। দুই সপ্তাহ পার হলেও সেই পানি নামেনি, বরং প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। গত শুক্রবার থেকে পদ্মা ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের পানিও বাড়ছে।
সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূইয়া বলেন, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার পাঁচ-ছয়টি জেলায় বন্যার পানি নামতে কিছুটা দেরি হতে পারে। সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জ থেকে বন্যার পানি নামতে মাসের বাকি সময়ের পুরোটা লেগে যেতে পারে। রোববারের মধ্যে ঢাকার নিম্নাঞ্চল ডেমরায় বন্যার পানি চলে আসতে পারে।
 দেশের চলমান বন্যা পরিস্থিতি এবং সরকারের প্রস্তুতি সম্পর্কে কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, নদীগুলো পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় এবং উজান থেকে অল্প সময়ে অনেক বেশি পানি চলে আসায় বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে। যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রে এবার অনেক বেশি পানি এবং স্রোতও বেশি। ফলে অনেক স্থানে বাঁধ ভেঙে গ্রামের পর গ্রাম ভাসিয়ে দিচ্ছে। তবে মাঠে এখন বড় ফসল নেই উল্লেখ করে কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা প্রতিটি জেলার উঁচু স্থানে আমনের চারা তৈরির জন্য বরাদ্দ পাঠিয়ে দিয়েছি। পানি নেমে গেলে কৃষকদের মধ্যে তা বিতরণ করা হবে।
জুলাইয়ের শুরু থেকে বাংলাদেশের উজানে ভারতের আসাম, নাগাল্যান্ড, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। এই বৃষ্টিপাতের ফলে ইতিমধ্যে চীন, ভারত ও নেপালে বন্যা দেখা দিয়েছে। এই বন্যার পানি নেমে বঙ্গোপসাগরে পড়ার প্রধান পথ বাংলাদেশের নদীগুলো। মূলত ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা ও যমুনা দিয়ে এই পানি নেমে যায়। কিন্তু উজানের পানির বড় অংশ এখনো নামেনি।
এ বিষয়ে নদী বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, এখন পর্যন্ত পানি বৃদ্ধির ধরন ও উজানের বন্যা পরিস্থিতি বিবেচনা করে মনে হচ্ছে, এই বন্যার পানি নামতে আগস্টের পুরো সময় লেগে যেতে পারে। এরই মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে সুরক্ষিত এলাকাতেও পানি ঢুকে পড়েছে। এটা কেন হচ্ছে, সরকারকে তা দ্রুত খতিয়ে দেখতে হবে। অন্য জায়গায় যাতে এই পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে।
জামালপুর : পানি নামতে শুরু করলেও দুর্ভোগ কমেনি জামালপুরের বানভাসিদের। এখনও পানিবন্দি হয়ে আছে এখানের ১২ লাখ মানুষ। একদিকে খাদ্য সংকট অপরদিকে বিশুদ্ধ পানির অভাবে বন্যার পানি পান করে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে বন্যা কবলিত এলাকার লোকজন। অনেকেই এই দুর্যোগে বাঁচা-মরার লড়াই করে যাচ্ছে। যমুনাপাড়ের দুর্গত এলাকাগুলোতে ত্রাণের জন্য হাহাকার চলছে। যেটুকু ত্রাণ দেওয়া হয়েছে তাতে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও অনাহারিদের অধিকাংশই বাদ পড়েছে।
তবে বিভিন্ন উপজেলার আশপাশে মেডিক্যাল টিম কাজ করলেও দুর্গম এলাকাগুলোতে যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন ইসলামপুর উপজেলার চিনাডুলি, পাথর্শী, কুলকান্দি, সাপধরী ও নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের। জানা গেছে, যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের পানি হ্রাস পেতে শুরু করলেও জামালপুরে বন্যার সার্বিক পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। যমুনার পানি বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে বিপদসীমার ১১৪ সে.মি. ও ব্রহ্মপুত্রের পানি ফেরিঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ১৬ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি ছড়িয়ে পড়ছে নতুন নতুন এলাকায়।
জামালপুর: এখনো বিপদসীমার ১৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি। সদর উপজেলার তিতপল্লায় জামালপুর-টাঙ্গাইল সড়কের ওপর দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে চলছে যানবাহন।
গতকাল রোববার সকালে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি জামালপুর ফেরিঘাট পয়েন্টে ১ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার ১৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ, সরিষাবাড়ি, জামালপুর সদর ও বকশীগঞ্জ উপজেলার ৬১টি ইউনিয়ন ও ৮টি পৌরসভার ১৩ লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দি। জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, বন্যার পানিতে ডুবে ও সাপের কামড়ে এখন পর্যন্ত অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। পানিবন্দি মানুষ বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্র এবং উঁচু বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ত্রাণ সমাগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত ৯৮০ মেট্রিক টন চাল, ১৭ লাখ ৩০ হাজার নগদ টাকা ও ৪ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ বরাদ্দ পাওয়া গেছে।
এদিকে বন্যায় সদর উপজেলার কেন্দুয়া কালিবাড়িতে সড়ক ভেঙে যাওয়ায় সরিষাবাড়ির সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। রেল লাইনের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় গত চারদিন যাবৎ জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ এবং জামালপুর-তারাকান্দি-যমুনা সেতুর পূর্ব স্টেশন পর্যন্ত ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। বন্যার কারণে জেলার ১ হাজার ১২০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তলিয়ে গেছে প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর ফসলি জমি।
মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, রংপুর অফিস : গত কয়েকদিনে বন্যায় তিস্তা নদীর অব্যাহত তীব্র ভাঙনে নদীর বাম তীরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ একটি বাঁধের অর্ধেক অংশসহ হাজার হাজার একর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
ভাঙন রোধে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে গঙ্গাচড়ার শেখ হাসিনা সেতু সংযোগ সড়কসহ লক্ষ্মীটারী ও কোলকোন্দ ইউনিয়নের চরাঞ্চলের ৪-৫টি গ্রাম নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিস্তার বাম তীর ভাঙন কবলিত এলাকা গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকোন্দ ইউনিয়নের চর বিনবিনা, লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের চর ইচলী, চর শংকরদহ এলাকায় তিস্তার তীব্র ভাঙনে চর বিনবিনা গ্রামের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অর্ধেকাংশসহ পার্শ্ববর্তী ৩-৪টি গ্রামের হাজার হাজার একর ফসলী জমি বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিনবিনা গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা হাফিজুর রহমান, মনোয়ার হোসেন, গাজিউর রহমান সবুজ জানান, গত সপ্তাহের বন্যার পানি কমে যাওয়ার সাথে সাথে তিস্তায় তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। গত ৫ দিনের ভাঙনে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অর্ধেকাংশসহ চর বিনবিনা, চর ইচলী, চর শংকরদহ গ্রামের হাজার হাজার একর ফসলী জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। তারা দ্রুত ভাঙ্গন রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি পদক্ষেপ কামনা করেছেন। এদিকে গত  শনিবার রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী জ্যোতি প্রসাদ ঘোষ, রংপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সৈয়দ এনামুল কবীর, গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাসলীমা বেগম, লক্ষ্মীটারী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী ভাঙ্গন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এসময় ভাঙ্গন কবলিত লক্ষ্মীটারী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী সাংবাদিকদের বলেন, নদী শাসনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অপরিকল্পিত কাজ করার কারণে প্রতিবছরই নদী ভাঙ্গছে। তিনি পরিকল্পনা মাফিক নদীর বাম তীরে নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান জানান, ভাঙ্গন রোধে কাজ চলমান রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে তিস্তার বাম তীরে নদী শাসনে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
জনদুর্ভোগ চরমে  ত্রাণের জন্য হাহাকার
কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা : বন্যা দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় শুকনো খাবার ও গুড়ের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। মজুত খাদ্য ফুরিয়ে যাওয়ায় ত্রাণের জন্য তাকিয়ে থাকে পানিবন্দি নারী-শিশুরা। কুড়িগ্রামের ধরলা ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তাসহ ১৬টি নদ-নদী তীরবর্তির বিস্তীর্ণ এলাকার ৮লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ায় জনদুর্ভোগ চরমে। স্বজনরা ফোনালাপে শুধু কাঁদে। তাদের কাছে যাওয়ার কোন উপায় না থাকায়। জেলার ৭৬টি ইউনিয়নের ৫৭টি প্লাবিত। উলিপুর উপজেলার তবকপুর ও ধরনীবাড়ীসহ যেসব ইউনিয়নে এর আগে কখনোই বন্যার দেখা মেলেনি সেইসব এলাকায় বন্যার পানি ঢুকে পড়ে বিভিন্ন নতুন-নতুন এলাকা পানিবন্দি হওয়ায় ওই মানুষগুলো অবর্ননীয় কষ্টে দিনকাটাচ্ছে। জেলার প্রায় ৯ শতাধিক গ্রামের ২ লক্ষাধিক পরিবারের বসতভিটায় পানি ঢুকে দীর্ঘমেয়াদী হওয়ায় বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার তাদের তলিয়ে যাওয়া বসতবাড়ী ছেড়ে বিভিন্ন উঁচু স্থানে আশ্রয় নিলেও সেখানেও তারা নিরাপদ নয়। সেখানে রয়েছে বিষধর সাপের ভয়। বন্যাকবলিত এলাকায় নলকূপগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ওইসব এলাকায় খাদ্য এবং বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। জেলার উলিপুর উপজেলার যেসব এলাকায় ৮৮সালের বন্যায়ও পানি ওঠেনি সে-সব এলকাতেও ব্রহ্মপুত্রের পানি রাস্তা ভেঙ্গে ঢুকে পড়েছে। ফলে বন্যা সংক্রান্ত তাদের কোন পুর্ব প্রস্তুতি না থাকায় ওইসব এলাকার পানিবন্দি মানুষজন বেশী বেকায়দায় পড়েছে।
 জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ধরলা নদীর পানি সেতু পয়েন্টে বিপদসীমার-২১ সেন্টিমিটার এবং ব্রহ্মপুত্র নদের নুনখাওয়া পয়েন্টে-২১ সেন্টিমিটার ও চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার-৬১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার সবগুলো নদ-নদী টইটুম্বুর। চারিদিকে শুধু পানি আর পানি।
এদিকে কুড়িগ্রামের উত্তরের ৩ উপজেলার পানি কমে গেলেও দক্ষিণে উলিপুর উপজেলার ৭০ভাগ, চিলমারী, রাজিবপুর ও রৌমারী উপজেলার প্রায় সম্পুর্ন এখোনো পানিতে তলিয়ে থাকায় ওইসব এলাকার অবস্থা খুব খারাপ। ফলে ওই এলাকার মানুষের মাঝে চরম দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। পানিবন্দি মানুষজনের মাঝে বিশুদ্ধ পানি আর খাবার এবং গো-খাদ্যের তীব্র সংকট চলছে। দেখাদিয়েছে পানিবাহিত নানা রোগ।
অপরদিকে সরকারী ও বেসরকারীভাবে কিছু-কিছু এলাকায় ত্রাণ দেয়া হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। বিশিষ্ট শিল্পপতি আলহাজ্ব মো: আজাদ হোসেন সরকার গতকাল শনিবার উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ও বুড়াবুড়িতে ব্যাক্তিগতভাবে ত্রাণ বিতরণ করেছেন। এছাড়াও জেলা জামায়াতের পক্ষথেকে জেলার নাগেশ্বরীসহ বিভিন্ন স্থানে ত্রাণ দেয়ার খবর পাওয়া গেছে। জেলার পানিবন্দি মানুষজনের মাঝে বিষধর সাপের চরম আতংক ও খাদ্য সংকট চলছে বলে জানিয়েছে পানিবন্দি মানুষজন।
জেলা ত্রাণ ও দুরযোগ ব্যাবস্তাপনা শাখা সূত্রে জানা যায়, জেলায় প্রস্তুতকৃত আশ্রয় কেন্দ্রের সংখ্যা ৪০৯টির মধ্যে ব্যাবহুত আশ্রয় কেন্দ্রের সংখ্যা ১৮৬টি। আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রিত পরিবারের সংখ্যা ১০ হাজার পরিবার। বন্যায় আক্রান্ত ফসলি জমির পরিমান ১৯ হাজার ৬৩৮ হেক্টর। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জেলায় পানিতে ডুবে  মৃতের সংখ্যা শিশু-১১ বৃদ্ধ-৩। মোট-১৪।
এখনো লালমনিরহাটে ২৮ হাজার পরিবার পানিবন্দী
লালমনিরহাট সংবাদদাতা : ত্রাণ বিতরণ অব্যহত এখনো লালমনিরহাটের ৫ উপজেলায় ২৮ হাজার ৩শত ৯০টি পরিবার পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে। অনেক রাস্তা পানির নীচে থাকায় চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে পানি কমে যাওয়ায় জেলার কয়েকটি রাস্তা দিয়ে মানুষ চলাচল করতে পারছেন। অপরদিকে বন্যা কবলিত এলাকায় যাতে কোন মানুষ রোগ বালাইয়ে আক্রান্ত না হয়, সেজন্য মেডিকেল টিম কাজ করছেন। লালমনিরহাট জেলার ত্রাণ কর্মকর্তা আলী হায়দার রোববার জানান, এখনো ২৮ হাজার ৩শত ৯০টি পরিবার পানি বন্দী। এসব বন্যা কবলিতদের মাঝে ৪১০ মে. টন চাল এবং নগদ ৮ লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে জেলা ত্রাণ শাখার পাশাপাশি জেলা পুলিশসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ত্রাণ ও খাবার বিতরণ অব্যহত রখেছেন। জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমান জানাতে পারেনি। রোববার দুপুর পর্যন্ত তিস্তার পানি ১৫ সে. মিটার নিচে দিয়ে এবং ধরলার পানি ১১২ সে. সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্চে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানান। শনিবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আদিতমারী উপজেলা শাখার উদ্যোগে জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ বিভিন্ন চর এলাকার ৬ শতটি পরিবারের মাঝে খাবার ও ত্রাণ বিতরণ করেছেন কেন্দ্রী নির্বাহী সদস্য মাও. আ: হালিম। এসময় উপস্থিত ছিলেন জেলা আমীর এ্যাড. আ: বাতেন, জেলা সেক্রেটারি আতাউর রহমান,সাবেক উপজেলা ভাইন্স চেয়ারম্যান ফিরোজ হায়দার লাভলু।
গাইবান্ধা  সংবাদদাতা : ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ঘাঘট ও তিস্তা নদীর পানি কমতে শুরু করলেও  নতুন করে করতোয়া নদীর পানি বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে করতোয়া নদীবেষ্টিত গোবিন্দগঞ্জ ও সাঘাটা উপজেলা চত্বরসহ নতুন করে ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।গাইবান্ধার সাতটি উপজেলার ৫১টি ইউনিয়নের ৪ শতাধিক গ্রাম ও গাইবান্ধা পৌরসভার বেশির ভাগ অংশ বন্যার পানিতে তলিয়ে আছে। সরকারি হিসাবে, গাইবান্ধায় পৌনে ৫ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। জেলা সদরের সঙ্গে উপজেলার সড়ক যোগাযোগ ও গাইবান্ধার ওপর দিয়ে ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ আছে ।
বন্যায় গাইবান্ধায় ৫টি বাঁধের ১৫টি অংশে ধসে যাওয়ায় সদর উপজেলার সঙ্গে সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সাদুল্যাপুর উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। শনিবার (২০ জুলাই) দিনভার নতুন করে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে সাঘাটা উপজেলা পরিষদের প্রশাসনিক বিভিন্ন ভবন। যে কোনো সময় সাঘাটার বোনারপাড়া খাদ্য গুদামে বন্যার পানি প্রবেশ করতে পারে।
এছাড়াও সাঘাটা উপজেলার জুমারবাড়ী ইউনিয়নের থৈকরের পাড়া, আমদির পাড়া, বাদিনারপাড়া মেছটসহ ১০ গ্রাম এবং কামালেরপাড়া ইউনিয়নের শাহবাজেরপাড়া, হাসিলকান্দি, ছিলমানেরপাড়া, গড়গরিয়াব, ভগবানপুর,ফলিয়াসহ ১০ গ্রাম ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রাম নতুন করে বন্যার কবলে পড়েছে ।
অপরদিকে বন্যার পানিতে ডুবে গত দুই দিনে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নের সুগার মিল কলোনি এলাকায় মনু মিয়ার মেয়ে মুন্নি (৭) ও সাঘাটা উপজেলার মুক্তিনগর ইউনিয়নের জাহেদুল ইসলামের মেয়ে জান্নাতী খাতুন (১০) মারা গেছে।
কামালেরপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা দৌলতুজ্জান  জানান, শনিবার সকালে বন্যার পানি ছিলমানেরপাড়া প্রবেশ করায় এই গ্রামের শতাধিক মানুষ কয়েক ঘণ্টায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে । গরু-ছাগল দিয়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিলেও সাপের ভয়ে রাতে জেগে থাকতে হচ্ছে।জুমারবাড়ী ইউনিয়নের বাসিন্দা মিনহাজুর রহমান  জানান, মাত্র দুই ঘণ্টায় কয়েক কিলোমিটার তলিয়ে গিয়ে জুমারবাড়ী ডিগ্রি কলেজ মাঠে পানি প্রবেশ করেছে। এতে কয়েক বিঘা জমির কাঠ কচু পানিতে তলিয়ে গেছে ।
গাইবান্ধা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হোসেন আলী জানান, স্কুলগুলোতে পানি ওঠায় এবং বন্যার পাঠ দানের পরিবেশ না থাকায় ২৩৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ২৬৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। নদী ভাঙনে ইতোমধ্যে সদর উপজেলার একটি এবং ফুলছড়ি উপজেলার ৩টিসহ মোট ৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান  জানান গত ১২ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি ৭ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ১৩২ সেন্টিমিটার এবং ঘাঘট নদীর পানি ১২ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ৭১ সেন্টিমিটার ওপর বইছে। অপরদিকে তিস্তা নদীর পানি স্থিতিশীল অবস্থায় থাকলেও করতোয়া নদীর পানি ১৮ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসিমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ।
গাইবান্ধার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মোছা. রোখছানা বেগম  জানান, বন্যায় এ পর্যšত জেলার সাতটি উপজেলার ৫১টি ইউনিয়নের ৩৮৩টি গ্রামের ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৩৫০ জন মানুষ পানিবন্দি। ৪৪ হাজার ৭৯২টি বসতবাড়ি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । ১৮০টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৭৪ হাজার ১০৪ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।
জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া মিয়া  বলেন, বন্যাকবলিত মানুষের কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। সরকারের কাছেও পর্যাপ্ত ত্রাণ আছে। তাই দেশে কোনো ত্রাণ সংকট হবে না । বন্যাকবলিত কোনো মানুষ যাতে অনাহারে না থাকে সেদিক খেয়াল রেখে আমরা চারদিন থেকে চাল, ডাল, তৈল শুকনো খাবার ও নগদ অর্থ দিয়ে আসছি। বন্যাকবলিত মানুষদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।
গোবিন্দগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি
গোবিন্দগঞ্জ (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা : গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি দিন দিন অবনতি ঘটছে। এতে করে উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে । পৌরসভা সহ ১২টি ইউনিয়ন বাঁধ ভাঙ্গা বন্যার পানিতে এখন ভাসছে। প্রতিদিনই বন্যার পানি বাড়া অব্যাহত থাকায় জনদূর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। বাড়ি-ঘর ছেড়ে বানভাসী মানুষেরা উঁচু এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিলেও গবাদী পশু নিয়ে তারা বিপাকে পড়েছে। বাড়ি-ঘর সহ সব জায়গায় বন্যার পানি উঠায় গবাদী পশু রাখার কোন জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। গোবিন্দগঞ্জ - মহিমাগঞ্জ পাকা সড়কে পানির ¯্রােত তীব্র হওয়ায় ভারী যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া হরিরামপুর, রাখালবুরুজ, শিবপুর, নাকাই , তালুককানুপুর, মহিমাগঞ্জ, শালমারা ইউনিয়নের সকল সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। ওইসব ইউনিয়নের মানুষ নৌকা অথবা ভেলায় চড়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। বন্যার্তদের মাঝে খাদ্য সংকট দেখা দেয়া সহ গো খাদ্যর সংকট  তীব্র আকার ধারণ করেছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার রামকৃষ্ণ বর্মন জানান, বন্যার্তদের জন্য এ উপজেলায় সরকারীভাবে মোট ৩৫ মেঃটন চাল ও এক লক্ষ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এদিকে রোববার  উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র আতাউর রহমান সরকার পৌর এলাকার খলসী, স্লুইচগেট ও পুরাতন বন্দর এলাকায় ব্যাপক হারে ত্রাণ বিতরণ করেন। এসময় উপজেলা আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি প্রধান আতাউর রহমান বাবলু, পৌরসভার মহিলা কাউন্সিলর মারুফা বেগম,জহুরা বেগম, সাবেক কাউন্সিলর আলহাজ্ব আবু হেনা আসাদুজ্জামান রানু গোবিন্দগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান প্রধান টুকু,  সহ আওয়ামীলীগের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
কুষ্টিয়ায় ভাঙন আতঙ্কে পদ্মা তীরবর্তী মানুষ
কুষ্টিয়া সংবাদদাতা  : কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলায় পদ্মা নদীর তীরবর্তী তালবাড়িয়া ইউনিয়নের ৮টি গ্রাম নদী ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন ওই এলাকার বাসিন্দারা। নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেখা দিয়েছে ভাঙন। পরিস্থিতি সামাল দিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডও জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী প্রতিরক্ষা কার্যক্রম হাতে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী পীযুষ কৃষ্ণ কু-ু।
গতকাল শনিবার সরেজমিনে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
 জেলা প্রশাসক পরিদর্শন শেষে বলেন, পদ্মা-গড়াইয়ের বন্যা ও সমূহ সম্ভাব্য ভাঙনসহ বিপর্যয় মোকাবিলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যেকোন মূল্যে সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য সহযোগিতার প্রাথমিক প্রস্তুতিও রয়েছে।
তালবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বলেন, আক্রান্ত ইউনিয়নের ৮টি গ্রাম, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে উত্তরবঙ্গের একমাত্র যোগাযোগ মহাসড়কসহ বিভিন্ন স্থাপনা রক্ষায় এখনও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এলাকাবাসীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। দ্রুত প্রতিরক্ষার দাবি করেছেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান।
এসময় সেখানে সংশ্লিষ্ট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
শেরপুরে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি
শেরপুর সংবাদদাতা : পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শেরপুর সদর উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের শেরপুর অংশের বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভাঙ্গন দিয়ে পানি প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। শেরপুর সদর, শ্রীবরদী ও নকলা উপজেলার আরো ১৫টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। এতে ১৫টি ইউনিয়নের ৬০ গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। শেরপুর-জামালপুর সড়কের পোড়ার দোকান এলাকার কজওয়েটি ৬-৭ ফুট পানির নীচে তলিয়ে যাওয়ায় তিনদিন থেকে শেরপুর-ঢাকা এবং উত্তরবঙ্গের সঙ্গে এ পথে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে আরো দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অপরদিকে ঝিনাইগাতী উপজেলার মহারশী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার ভোগাই ও চেল্লাখালী নদীর পানি কমে যাওয়ায় ওই দুই উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির আরো উন্নতি হয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি উঠায় জেলার ৫০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। জেলায় ত্রাণ তৎপরতা অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন বানভাসি মানুষ। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৭০ মেট্রিকটন চাল ও নগদ এক লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা বন্যার্তদের মধ্যে বিতরণের জন্য বরাদ্ধ প্রদান করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোন চিকিৎসা সেবা ও আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়নি। শেরপুর-জামালপুর সড়কের ব্রহ্মপুত্র বীজ পয়েন্টে পানি বিপদ সীমার দশমিক ১৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় হুইপ মো. আতিউর রহমান বেতমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের বেরিবাঁধ ভাঙ্গন এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
শনিবার বিকালে জেলা প্রশাসক আনার কলি মাহবুব সদর উপজেলার কামারেরচর ইউনিয়নে দুর্গতদের মধ্যে নগদ টাকা ও চাল বিতরণ করেন। এসময় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো: হাবিবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় মো. আতিউর রহমান ভাঙন এলাকা পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের জানান, মানুষের ঘরে ধানের অভাব নাই। কিন্তু তা চাল করা যাচ্ছেনা। তাই সরকারের পক্ষ থেকে শুকনো খাবার ও চাল ডাল বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুর্গতদের ভয়ের কোনো কারণ নাই, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা তাদের পাশে আছি।
উল্লাপাড়ায় বন্যায় ৫১ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত
পবলকুচি (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা : সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির কারণে রোববার পর্যন্ত ৫১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৩টি, মাদরাসা ২টি, কলেজ ১টি এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৪৫টি। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত প্রায় ৪৫ হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে ।
আবার কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আংশিক বন্যার পানি উঠেছে । বন্যার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বাকি স্কুল-কলেজ গুলোও বন্ধ হয়ে যাবে । এ দিকে সরকারিভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের কোন নির্দেশনা না থাকায় অভিভাবকরা উভয় সংকটে পড়েছেন। তারা তাদের কোমলমতি সন্তানদের দুঃচিন্তা নিয়ে বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছেন। যে সকল বিদ্যালয়ে বন্যার পানি উঠেনি সেখানেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে। বিদ্যালয়ে আসতে বন্যার পানি অতিক্রম করে আসার কারনেই শিক্ষার্থীদের উপস্থিত কম ।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ শফিকুল ইসলাম  জানান, বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় উপজেলার মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও কলেজের মধ্যে ৬টিতে বন্যার পানি উঠেছে। এর মধ্যে ৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ২টি মাদ্রাসা ও ১টি কলেজের মাঠে ও শ্রেণী কক্ষে বন্যার পানি ঢুকে পাঠদান সাময়িক বন্ধ রয়েছে ।  যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে সেখানে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির সাথে সাথেই পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়ে যাবে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার এম. জি. ইজদানি জানান, উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২৭৮টি । যে সকল বিদ্যালয়ের শ্রেণী কক্ষে বন্যার পানি ঢুকেছে সেখানে বিদ্যালয় সংলগ্ন উচুঁ বাড়িতে স্বল্প পরিসরে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য শিক্ষকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বন্যার পানি নেমে গেলে স্বাভাবিক ভাবে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হবে ।
মানিকগঞ্জে বন্যা দুর্গত এলাকায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট
ঘিওর (মানিকগঞ্জ) সংবাদাতা : মানিকগঞ্জে পদ্মা-যমুনাসহ জেলার অভ্যন্তরীণ সব নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গতকাল রোববার সকাল ৬টা পর্যন্ত আরিচা পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি বিপৎসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
 জেলা বন্যা নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্যানুযায়ী, মানিকগঞ্জের ঘিওর, দৌলতপুর, শিবালয়, হরিরামপুর ও সাটুরিয়া উপজেলা বন্যা কবলিত। এসব উপজেলার ৩০টি ইউনিয়নের ৭০ হাজার গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। শ্রেণি কক্ষে পানি ঢুকে পড়ায় ৩০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন চরাঞ্চলের পানিবন্দি লাখো মানুষ।
সরেজমিনে হরিরামপুরের রামকৃঞ্চপুর ইউনিয়ন ও শিবালয়ের তেওতা ইউনিয়নের আলোকদিয়া চরে গিয়ে দেখা গেছে, বেশির ভাগ বাড়ি-ঘরেই পানি। ঘরের ভেতর মাচা করে বসবাস করছেন অনেকে। আবার অনেকেই ঘর-বাড়ি রেখে উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। পানির তোড়ে ভেঙে যাচ্ছে রাস্তা-ঘাট বেড়ি বাঁধ। বন্যা দুর্গত এলাকায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিলেও এখনও কোনো ত্রাণ সহায়তা পৌঁছায়নি।
 তেওতা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের জানান, চরাঞ্চলের বাড়ি ঘরে চাল সমান পানি। ঘর থেকে মানুষ বাইরে বের হতে পারছে না। পরিবার-পরিজন নিয়ে খুবই মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন তারা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নির্দেশে বন্যার্তদের তালিকা করা হচ্ছে। আশা করি শিগগিরই ত্রাণ সহায়তা পাওয়া যাবে।
তিনি বলেন, চরের প্রতিটি বাড়িতেই গবাদি পশু বিশেষ করে কোরবানির গরু রয়েছে। বর্ষা এলে চোর-ডাকাতের উপদ্রব বেড়ে যায়। তাই গরু চুরি ঠেকাতে তিনি চরে পুলিশি টহলের দাবি জানান।
মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. বাবুল মিয়া জানান, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভাঙন কবলিত মানুষের মধ্যে ৮ মেট্টিক টন চাল বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েক টন চাল ও শুকনো খাবার বিতরণের ব্যবস্থা চলমান রয়েছে।
শরীয়তপুর সংবাদদাতা : শরীয়তপুরের পদ্মার পানি বৃদ্ধি পেয়ে পদ্মা নদীর তীরবর্তী জাজিরা, নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার চরাঞ্চলেরর নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। গত ২দিনে এ সব নিম্মাঞ্চলের অনেক বাড়ীতে পানি প্রবেশ করেছে। রোববার জোয়াড়ের সময় সুরেশ্বর পয়েন্টে পদ্মার পানি বিপদ সিমার ১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাতি হয়েছে। তলিয়ে গেছে ৩টি উপজেলার নিম্মাঞ্চলের অনেক ফসলী জমি। ঢাকা-শরীয়তপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের উত্তর ডুবুলদিয়া নামক স্থানে নির্মানাধিন ব্রীজের পাশের বিকল্প সড়কটি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এই সড়কের জাজিরার কাজীরহাট থেকে মঙ্গলমাঝিরঘাট পর্যন্ত যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এদিকে নড়িয়া-জাজিরা ও নড়িয়া বিলাশপুর সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি ওঠে খানাখন্দ হয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এসব রুটে চলাচলকারী স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসাগামী শিক্ষার্থীসহ যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। অপর দিকে নড়িয়া উপজেলার নশাসন মালতকান্দি দেলোয়ার হোসেন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ৬টি বিদ্যালয়ে পানি প্রবেশ করায় ও মাঠ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় পাঠদান বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়াও ভেদরগঞ্জ উপজেলার ৬টি ও জাজিরা উপজেলার ৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বিদ্যালয়ের মাঠে পানি প্রবেশ করায় পাঠদান সাময়িক ভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের গেজ রিডার মোঃ গোলাম মাওলা বলেন পদ্মার নদীর পানি প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। রোববার জোয়ারের সময় বিপদ সিমার ১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাতি হয়েছে। পুবাল বাতাস হলে যে কোন সময় শরীয়তপুরে বন্যা দেখা দিতে পারে।
শরীয়তপুর সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার শরিফুল আলম বলেন, পানি কমে গেলে বিকল্প রাস্তাটি মেরামত করে এ রুটে সরাসরি যানবাহন চলাচলের ব্যস্থা করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ