ঢাকা, মঙ্গলবার 23 July 2019, ৮ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৯ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

উত্তরাঞ্চলে কমছে মধ্যাঞ্চলে বাড়ছে

সিরাজগঞ্জে বন্যাকবলিত এলাকা

ইবরাহীম খলিল : উত্তরাঞ্চলের বন্যার পানি সামান্য কমলেও দুর্ভোগ বেড়েছে বন্যা কবলিত মানুষের। এখনও পানিবন্দী হয়ে আছেন অন্তত ৩৮ লাখ মানুষ। ঘর ছাড়া হয়ে আশ্রয়কেন্দ্র ও বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন আরও সোয়া দুই লাখ মানুষ। পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়েছে বন্যার্তদের মাঝে। সঙ্কট দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও চিকিৎসা সামগ্রীর। ফসলি জমি ডুবে যাওয়া এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বেড়েছে সবজি সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম। এদিকে, সিরাজগঞ্জে বন্যাকবলিত হয়েছে ১৮১টি গ্রাম। বন্যার্তদের অভিযোগ বেশিরভাগ এলাকায় এখনও পৌঁছায়নি ত্রাণ। টাঙ্গাইলে যমুনা নদীর পানি এখনও প্রবাহিত হচ্ছে বিপদসীমার ওপরে। জামালপুরে পানি কিছুটা কমলেও বেশিরভাগ মানুষ রয়েছে পানিবন্দী। দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী এবারের বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার মানুষ। বন্যা দুর্গত অঞ্চলে পানিতে ডুবে গতকয়েকদিনে মারা গেছে শিশুসহ অন্তত ৫৭ জন।
সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি কিছুটা কমলেও এখনও বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গাইবান্ধায় বিপদসীমার উপরে থাকা ব্রহ্মপুত্র নদ ও ঘাঘট নদীর পানি কমতে শুরু করলেও বাঁধের ভেঙে যাওয়া অংশগুলো দিয়ে পানি ঢুকে প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা।
মানিকগঞ্জ : মানিকগঞ্জের যমুনা নদীর আরিচা পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ২২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি কমতে শুরু করলেও জেলার পাঁচ উপজেলার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি ওঠায় শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। রাস্তায় পানি ওঠায় হরিরামপুরে সঙ্গে উপজেলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, জেলার সাত উপজেলার মধ্যে পাঁচটি উপজেলা দৌলতপুর, শিবালয়, হরিরামপুর, ঘিওর ও সাটুরিয়া বেশি বন্যার কবলে পড়েছে। বন্যায় বেশি আক্রান্ত হয়েছে দৌলতপুর, শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলা। এই তিন উপজেলার মধ্যে দৌলতপুরে ৩৩হাজার, হরিরামপুরে ৫হাজার এবং শিবালয় ৮হাজার মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে। দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাবরিনা শারমিন জানান, বানভাসি মানুষের জন্য তিনটি  আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এছাড়া বর্ন্যাতদের মাঝে নিয়মিত ত্রাণ ও নগত অর্থ বিতরণ করা হচ্ছে। দৌলতপুর উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম রাজা বলেন, উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে দৌলতপুর উপজেলার জিয়নপুর ইউনিয়নের আমতলী গ্রামে বন্যাকবলিত ১৬০পরিবারকে ৫০০ টাকা করে মোট ৮০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। আরো যারা ক্ষতিগ্রস্ত আছেন তাদের নামের তালিকা পাওয়া মাত্র ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দুর্গত মানুষদের এরই মধ্যে ৬৭হাজার মেট্রিক টন চাল এবং ১লাখ ৯০হাজার টাকা বরাদ্দ এসেছে।
মাদারিপুর : মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার পদ্মা নদী বেষ্টিত বিস্তৃণ জনপদ তলিয়ে গেছে বন্যার পানিতে। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রবল ভাঙন শুরু হয়েছে প্রমত্ত পদ্মায়। এতে ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে অর্ধশতাধিক পরিবার। পদ্মা নদীর চরাঞ্চল নিয়ে গঠিত বন্দোরখোলা ইউনিয়নের মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে। তলিয়ে গেছে বিদ্যালয়ের চারপাশসহ পুরো চরাঞ্চল। ওই এলাকায় ত্রাণ তৎপরতাও শুরু হলেও তা খুবই সীমিত বলে অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগীরা।
জানা গেছে, মাদারীপুরের শিবচরে পদ্মা নদীর পানি স্থিতিশীল থাকলেও আড়িয়াল খাঁ নদের পানি ৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়ছে চরাঞ্চলের কয়েক হাজার পরিবার। শিবচরের মূল ভূ-খ-ের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে চরাঞ্চলের। বিদ্যালয়ের মাঠসহ আশেপাশের এলাকায় থৈ থৈ পানি। চলতি বর্ষা মৌসুমে পানিতে ডুবে গেছে পুরো চরাঞ্চলের মানুষের বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট, বাজারসহ নানা স্থাপনা। বন্যা ও নদীভাঙনের কবলে পড়ে প্রায় ৫০টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার আশ্রয় নিয়েছে খোলা আকাশের নিচে। কোনরকমে চিড়া-মুড়ি খেয়ে দিন যাপন করছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।
পদ্মা নদী থেকে সামান্য দূরত্বে অবস্থিত এস ই এস ডি পি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়টি রয়েছে ভাঙনের ঝুঁকিতে। অন্যদিকে পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনের মুখে পড়েছে ৫টি স্কুল, ২টি স্বাস্থ্য কেন্দ্র-কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন হাট-বাজারসহ ৩ ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও হাজারো বসতবাড়ি। অনেকেই পানির মধ্যেই বাড়িতে অবস্থান করছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভাঙনের মুখে পড়ায় শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার জানায়, বন্যা ও নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে তারা বাধ্য হয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন। বন্যা ও নদীভাঙনে তাদের ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ত্রাণ সহায়তা থাকলেও তা খুবই সীমিত।
জামালপুর : পাহাড়ী ঢলে জামালপুরেও বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদর এবং যমুনার পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জেলায় পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী। রেল লাইন তলিয়ে যাওয়ায় বন্ধ রয়েছে দেওয়ানগঞ্জ-জামালপুর রেল যোগাযোগ। ঝুকি এড়াতে জামালপুর থেকে যমুনা সেতুর পূর্ব পাড় পর্যন্ত রেল যোগাযোগও বন্ধ রাখা হয়েছে। এ পর্যন্ত জেলায় পানিতে ডুবে আটজনের প্রাণহানি হয়েছে।
বগুড়া: বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনার পানি কমলেও ব্যাপক হারে বাড়ছে বাঙ্গালী নদীর পানি। এর ফলে পৌর এলাকা সারিয়াকান্দি সদর, নারচী, ফুলবাড়ী, কুতুবপুর এবং ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
নতুন করে ফসলের মাঠ তলিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক পরিবারের সংখ্যা আরও বেড়েছে। বানভাসি মানুষের দুর্ভোগের পাশাপাশি গবাদী পশুর খাদ্য সংকট প্রকট আকার ধারন করেছে।
স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি কমে সোমবার (২২ জুলাই) বিপৎসীমার ৫৫ সেন্টিমিটার এবং বাঙ্গালী নদীর পানি ২৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৮০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
বাঙ্গালী ও করতোয়া নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বগুড়ার সাহেবাড়ী বন্যা নিয়ন্ত্রণবাঁধে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। এতে আতঙ্কে রয়েছে ২০টি গ্রামের মানুষ। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, বাঁধটি দ্রুত মেরামত করা হবে। শঙ্কার কোন কারণ নেই।
 জেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা গেছে, বগুড়ার যমুনা ও বাঙ্গালী নদী বেষ্টিত সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলায় ২০টি ইউনিয়নের ১৩৮টি গ্রামের ১লাখ ২৮ হাজার ৯৭০জন পানিবন্দী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদী ভাঙ্গণে ৩ উপজেলায় আংশিক ক্ষতি হয়েছে ৬৩০ ঘরবাড়ির। বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন ২ হাজার ৯০০ পরিবার। অন্যান্য স্থানে আশ্রয় নিয়েছে ৯২৩ পরিবার।
বন্যায় ৭৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ১২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পানি প্রবেশ করায় এসব স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বন্যায় ৯হাজার ৬৫৯ হেক্টর জমির পাট, আউস ধান, বীজতলা, মরিচ, আখ ও বিভিন্ন সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায়ন ২ হাজার ৩৩০টি ল্যাট্রিন ও ২ হাজার ৭৩৬টি টিউবয়েল নষ্ট হয়ে গেছে। এর মধ্যে ৯৬টি নলকূপ মেরামত ২৪টি নলকূপ পুনস্থাপন ও ২৭টি ল্যাট্রিন স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া ১০ হাজার ৮৫০ পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে বন্যা কবলিত এলাকায় ২ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার, ৪৬৭ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ১০ লক্ষ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
 শেরপুর : পুরাতন ব্রহ্মপুত্র ও মৃগী নদীর পানিবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় শেরপুর পৌর এলাকার কয়েকটি মহল্লার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, শেরপুর সদর উপজেলার পোড়ার দোকান এলাকায় কজওয়ের (ডাইভারশন) ওপর দিয়ে প্রবল বেগে বন্যার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এজন্য গত বৃহস্পতিবার থেকে শেরপুর-জামালপুর মহাসড়ক দিয়ে জামালপুর হয়ে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।
এদিকে, ব্রহ্মপুত্রসহ মৃগী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শেরপুর পৌর এলাকার মোবারকপুরের কইনাপাড়া, দমদমা কালীগঞ্জের উত্তরপাড়া, উত্তর গৌরীপুর, মীরগঞ্জ বারাকপাড়া (নিমতলা), কসবা শিবউত্তর, কাচারীপাড়ার নামাপাড়া, ভাটিপাড়া, পূর্ব শেরী, দিঘারপাড়, তাতালপুর ও শেখহাটির কামারিয়া মহল্লার বেশ কিছু অংশ প্লাবিত হয়ে পড়েছে। জেলা কারাগার মোড় থেকে থানাঘাট রাস্তার ব্রিজ দিয়ে মৃগী নদীর পানি প্রবেশ করায় উত্তর গৌরীপুর এলাকায় প্লাবিত ঘরবাড়ির সংখ্যা বাড়ছে। ওই এলাকাসহ নিমজ্জিত পৌর এলাকায় পানিবন্দী মানুষের দুর্ভোগও বাড়ছে।
সাতপাকিয়া, নতুন ভাগলগড়, চরভাবনা ও শহরের গৌরিপুর এলাকায় বন্যার পানিতে ডুবে একই দিনে আরও চার শিশুর মৃত্যুতে জেলায় মৃতের সংখ্যা ১১ জনে পৌঁছেছে।
কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রাম জেলার সাড়ে ৯ লাখ বানভাসির দুর্ভোগ এখন চরমে। বন্যায় এত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী নেই। পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়নি। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছে বানভাসিরা। রাস্তায় রেলওয়ে স্টেশন ও বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছে বন্যাদুর্গত মানুষ। বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে তাদের মধ্যে। সেই সঙ্গে দেখা দিয়েছে পানিবাহিত নানা রোগ। সব মিলে দুর্বিষহ জীবন-যাপন করছে সাড়ে নয় লাখ বানভাসি।
 জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুম থেকে জানা যায়, বন্যার কারণে তিনটি পৌরসভাসহ ৬০টি ইউনিয়নের ৮৯৪টি গ্রামের দুই লাখ ৩৮ হাজার ৬৭২টি পরিবার পানিবন্দী। প্রতি পরিবারের চারজন বানভাসি। সে হিসাবে বন্যাদুর্গত মানুষের সংখ্যা নয় লাখ ৫৪ হাজার ৬৮৮। বন্যায় পানিবন্দী হয়ে এসব মানুষ গত ১০ দিন ধরে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। এদের মাঝে দেখা দিয়েছে খাবারের হাহাকার। বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট পাশাপাশি রয়েছে পানিবাহিত নানা রোগ।
সেই সঙ্গে বন্যায় ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৩ হাজার হেক্টর। এক হাজার ২৪৫ কিলোমিটার রাস্তা, ৪০ কিলোমিটার বাঁধ ও ৪১টি ব্রিজ-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নয় হাজার ৭৩৪টি। দুই লক্ষাধিক গবাদিপশু পানিবন্দী রয়েছে। বন্যার কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয়, মাদরাসা ও কলেজ মিলে এক হাজার ২৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে।
কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন বলেন, বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমরা কাজ করছি। এ পর্যন্ত জেলা প্রশাসন থেকে ৮০০ টন চাল, ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা, সাত হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার ও ঈদুল আজহা উপলক্ষে ছয় হাজার ৪২৮ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বন্যায় নিহতদের পরিবারকে ২০ হাজার করে তিন লাখ ২০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে।
অপরদিকে জেলা পরিষদের উদ্যোগে ১০ লাখ টাকার শুকনা খাবার, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি কর্তৃক চিলমারীতে ৫০০ পরিবারকে সাড়ে চার হাজার টাকা করে ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ডব্লিউএফপি কর্তৃক সদর উপজেলায় এক হাজার ২৫১টি, উলিপুরে ৮৫৫টি এবং চিলমারীতে দুই হাজার ৩০৮টি পরিবারকে সাড়ে চার হাজার করে এক কোটি ৯৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
গাইবান্ধা: গাইবান্ধার ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি কমা অব্যাহত থাকলেও এখনও বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। বাঁধ ভাঙা পানি এখনও নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৩২৮ জন। বন্যা কবলিত এলাকার পানিবন্দী পরিবারগুলোর মধ্যে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি সংকট, স্যানিটেশনের অব্যবস্থপনাসহ গবাদি পশুর খাদ্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। সরকারি-বেসরকারি ভাবে যে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
 সোমবার সকালে গাইবান্ধার ফুলছড়ি পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ২১ সেন্টিমিটার  কমে বিপদসীমার  ৬৮ সেন্টিমিটার, শহরের ব্রিজরোড় পয়েন্টে ঘাঘট নদীর পানি ১০ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার  ৩৬ সেন্টিমিটার ওপরে বইছে। এছাড়া করতোয়া নদীর পানি নতুন করে বৃদ্ধি না পেলেও এখনও বিপদসীমার ৩ সে. মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানান জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গাইবান্ধা ও গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভা এবং ৪৯টি ইউনিয়নের ৩৮৩টি গ্রাম বন্যা কবলিত হয়ে পড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৩২৮ জন। ৪৪ হাজার ৭৯২টি বসতবাড়ি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৮০টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৭৪ হাজার ১০৪ জন অসহায় মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।
সিরাজগঞ্জ : সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। গেল ২৪ ঘণ্টায় সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি ২৩ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৫৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি কমতে শুরু করলেও দুর্ভোগ কমেনি বানভাসিদের। চলতি বন্যায় জেলার পাঁচটি উপজেলার ৫২টি ইউনিয়নের চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের ৯০ হাজার পরিবারের প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ে। এর মধ্যে কাজিপুর উপজেলায় বন্যার ভয়াবহতা বেশি দেখা দিয়েছে। এই উপজেলার অধিকাংশ ইউনিয়ন যমুনার চরাঞ্চলে অবস্থিত। চরাঞ্চলের বাড়িগুলো এখনও পানিতে নিমজ্জিত থাকায় বানভাসি মানুষ গবাদি পশু নিয়ে উঁচু স্থান ও আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ এলাকার বানভাসিদের অভিযোগ, তাদের কাছে এখনও কোনও ত্রাণসামগ্রী পৌঁছায়নি। গত ১১ দিনে জেলায় পানিতে ডুবে মৃতের সংখ্যা ১৩ জনে পৌঁছেছে।
আমাদের সংবাদদাতারা জানান-

চৌহালী-এনায়েতপুরে বন্যায় ৯১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত
আব্দুস ছামাদ খান, বেলকুচি (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা : বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও সিরাজগঞ্জের চৌহালী ও এনায়েতপুর জুড়ে বেড়েছে বন্যা দুর্ভোগে আক্রান্ত মানুষের হতাশা। গত ৪৮ ঘণ্টায় নদীর পানি ৫০ সেন্টিমিটার কমে তা বিপদ সীমার ৫৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যায় এ দুটি থানার ১০টি ইউনিয়নের প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রাম তলিয়ে যাওয়ায় লাখো মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে বিরাজ করছে হাহাকার। সদিয়াচাঁদপুর, স্থল,ঘোরজান, উমরপুর, খাষপুখুুরিয়া,খাষকাউলিয়া ইউনিয়নের অধিকাংশ এবং খুকনী, জালালপুর ইউনিয়নের যমুনা তীরবর্তী এলাকার ঘরবাড়ি ১ থেকে ৩ ফুট পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া নলকুপ তলিয়ে বিশুদ্ধ খাবার পানি ও খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে অনেকেই এনায়েতপুর-পাঁচিল ওয়াপদা বাঁধে পলিথিন টাঙিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। তারা এ বন্যায় দুর্বিষহ জীবন কাটালেও যথাযথ সহায়তা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন। চরজাজুরিয়া দাখিল মাদরাসায় আশ্রয় নেওয়া হাবিবুর রহমান ও মর্তুজ আলী খান জানান, আমরা বন্যায় কাজ হারিয়েছি। মাদরাসায় আশ্রয় নিলেও এখানে খেয়ে না খেয়ে কাটছে আমাদের জীবন। এখন পর্যন্তও কেউ আমাদের খোঁজ-খবর নেয়নি। এদিকে চলমান বন্যায় চৌহালী,এনায়েতপুরের ৬০টি প্রাথমিক স্কুল, ২৯টি মাধ্যমিক স্কুল মাদরাসা ও ২টি কলেজ তলিয়ে পাঠদানে নতুন দুর্ভোগ যোগ করেছে। এর মধ্যে ক্লাসরুমগুলোতে ১ থেকে ৩ ফুট পানি থাকায় সেখানে পাঠদান কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে। এছাড়া বাকি স্কুলগুলোতে ক্লাস চলমান থাকলেও রাস্তা-ঘাট তলিয়ে যাওয়ায় উপস্থিতির সংখ্যা একেবারেই নগণ্য বলে জানিয়েছে শিক্ষকরা। সোমবার সকালে সরেজমিনে চৌহালী উপজেলাধীন সুম্ভূদিয়া বহুমূখি উচ্চ বিদ্যালয়ে পরিদর্শনকালে দেখা যায়, ১ টি পাকা ভবন সহ ৪টি ঘর তলিয়ে যাওয়ায় পাঠদান বন্ধ রয়েছে। মুরাদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ লতিফুল ইসলাম জানান,পহেলা আগষ্ট থেকে আমাদের স্কুলে দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা। এ অবস্থায় আমাদের প্রস্তুতি থাকলেও শিক্ষার্থীরা কোন প্রস্তুতিই নিতে পারছেনা। তাই কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি থাকবে, বন্যা দুর্যোগের জন্য যেন পরীক্ষা পেছানো হয়। এ ব্যাপারে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ মনিরুজ্জামান খান জানান,বন্যা আক্রান্ত এ উপজেলার ১২৮টি প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬০টি তলিয়ে যাওয়ায় পাঠদানে সমস্যা হচ্ছে। এ কারণে ২য় সাময়িক পরীক্ষা নিয়ে কিছুটা সংসয় রয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষের সাথে পুনঃসিদ্ধান্তের বিষয়ে আমরা আলাপ করবো। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ শাহদৎ হোসেন প্রামানিক জানান, স্কুল মাদরাসা মিলে ৩৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৯টি আর ৫টি কলেজের মধ্যে ২ টি তলিয়ে গেছে যা ছাত্র/ছাত্রীদের পড়ালেখার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বন্যা পরবর্তী সময়ে এ ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হবে।

সিরাজগঞ্জে খোলা আকাশের নিচে বসবাস ॥ জনদুর্ভোগ চরমে
বেলকুচি (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতাঃ সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলায় বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও গবাদি পশু নিয়ে এলাকাবাসীর দুর্ভোগ কমেনি। বাঁধে আশ্রিত শত শত গরু-ছাগল আর মানুষ এক সাথে খোলা আকাশের নিচে অথবা পলিথিন টানিয়ে বাস করছে। এতে জনদূর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। গত ১ সপ্তাহ ধরে কৈজুরি ইউনিয়নের জয়পুরা থেকে জগতলা পর্যন্ত প্রায় ৪ কিলোমিটার নতুন বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধে গবাদি পশু নিয়ে আশ্রিত মানুষ এমন মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তাদের ভাগ্যে এখনো পর্যন্ত জোটেনি কোন ত্রাণ সহায়তা। শত শত মানুষ তাদের শিশু সন্তানের পাশাপাশি গবাদি পশু নিয়ে বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। সাধ্যমত কেউ পলিথিন টানিয়ে,কেউ টিনের চালা বানিয়ে,কেউ আবার একেবারে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। সোমবার দুপুরে কৈজুরি ইউনিয়নের জগতলা এলাকার নতুন বন্যানিয়ন্ত্রণ এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এচিত্র। এ ব্যাপারে শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হুসেইন খান জানান, বাঁধে আশ্রিতদের জন্য ২ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আথচ এলাকাবাসি বলছেন, এ পর্যন্ত কোন রকম ত্রাণ সহায়তা তো দূরে থাক প্রশাসনের কোন কর্তা ব্যক্তিই তাদের খোজ খবর নেয়নি। এ বিষয়ে জগতলা বাঁধে আশ্রয় নেওয়া ভোলা ব্যাপারীর ভাই সেলিম হোসেন(২০) জানায়,বন্যায় বাড়িঘরে পানি ওঠায় নিরুপায় হয়ে গত এক সপ্তাহ ধরে ১২টি গরু নিয়ে নতুন বাঁধে আশ্রয় নিয়েছি। একই ভাবে ওই এলাকার নাসিন উদ্দিন(৬৫) ৩টি গরু ও ৩টি ছাগল,আলাউদ্দিন(৫৪) ৩টি গরু,রজিনা খাতুন(২৪) ৩টি গরু,হাঁস-মুরগী ও ২টি ছাগল, জালাল উদ্দিন (৬০) ২টি গরু, আলামিন হোসেন (৩০) ৪টি গরু,,নজির মোল্লা(৫৫),৩টি গরু ও আবু বক্কার(৫০) ৪টি গরু নিয়ে বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের ভাগ্যে জোটেনি কোন ত্রাণ সহায়তা। বাঁধ ঘুরে দেখা যায়,বন্যায় হতদরিদ্রদের পাশাপাশি ধর্নাঢ্য গরু ব্যবসায়ীরাও বাড়িঘর বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় একক জন ১০/১২টি থেকে শুরু করে ২০/২৫টি গরু নিয়ে বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। এ সব গরু আসন্ন কোরবানির ঈদে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন পশুরহাটে নিয়ে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করছে। এর মধ্যে আলমাস আলী ও মোজাম্মেল হক জানান,পানির মধ্যে গরু গুলোকে দার করিয়ে রাখতে না পেরে বাধ্য হয়ে বাঁধে এসে আশ্রয় নিয়েছি। ভোলা ব্যাপারী জানান,বন্যার কারণে এরই মধ্যে পানির দরে ১২টি গরু বিক্রি করে দিয়েছি। এখনও ২২টি গরু রয়েছে। তার মধ্যে ১২টি গরু নিয়ে বাঁধে আশ্রয় নিয়েছি। রহম আলী জানান,তিনি ১৪টি গরু নিয়ে বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। অপরদিকে জামিরতা গ্রামের হাজী জহুরুল ইসলাম জানান, বন্যার কারণে ৮টি গরু মাত্র সাড়ে ২৬ লাখ টাকায় বিক্রি করেছি। কোরবানির হাটে নিয়ে এ গুলো বিক্রি করলে এর দাম হোত কমপক্ষে ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা। এ পরিমাণ টাকা বন্যার কারণে আমার লোকসান হয়েছে।এ বিষয়ে কৈজুরি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম জানান, বন্যাদূর্গতদের জন্য মাত্র ৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে। চাহিদার তুলনায় তা খুবই অপ্রতুল। এর মধ্যে আগে যমুনা নদীর চরের বানভাসিদের মধ্যে বিতরণ শুরু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাঁধে আশ্রিতদেরও ত্রাণ সহায়তা দেয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ