ঢাকা, বুধবার 24 July 2019, ৯ শ্রাবণ ১৪২৬, ২০ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বিচার না হওয়ায় গণপিটুনির মত নৃশংসতা বাড়ছে

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : গণপিটুনির ছোটখাটো থেকে চাঞ্চল্যকর আলোচিত যত ঘটনা, তার মধ্যে কোন একটার বিচার হয়েছে-জড়িতরা সাজা পেয়েছে এমন দৃষ্টান্ত এ দেশে বিরল। একটি ঘটনার জন্ম হলে সে থেকে একাধিক ঘটনার জন্ম হয়ে দেশজুড়ে যে বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়, তা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। কখনও গুজব, অপপ্রচার, মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রবাদ বাক্যের ‘হুজুগে বাঙালি’ নৃশংসতায় মেতে উঠছে। সম্প্রতি পদ্মা সেতু নিয়ে ছড়ানো ‘মাথা কাটা-কল্লা কাটা’র মতো হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো তথ্যের গুজবে একের পর এক গণপিটুনির ঘটনা ঘটছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। এর মধ্যে এমন একটি তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যাকে এই ধরনের ঘটনার কারণ হিসেবে দেখছেন সমাজবিজ্ঞানী আর আইনজীবীরা। গণপিটুনিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হলেও বিচারের উদাহরণ নেই বললেই চলে। আর পুলিশ শত শত মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করলেও অপরাধীদের শনাক্ত করতে পারে কমই।
গণপিটুনির এসব ঘটনায় মানবাধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারহীনতায় আইনের প্রতি মানুষের যখন আস্থা কমে যায় তখন মানুষ নিজ হাতে আইন তুলে নেয়। তাই আস্থা বাড়িয়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজ করে যেতে হবে। ছোট বড় প্রত্যেকটি ঘটনার জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তবেই গণপিটুনির মত অপরাধ থেকে মানুষ সরে আসবে। গণপিটুনিতে বছরে কত জনকে প্রাণ হারাতে হয় অকালে, তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। আর মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছেও তাৎক্ষণিক হালনাগাদ হিসাব পাওয়া যায় না। তবে মানবাধিকার সংস্থা অধিকার এবং আইন ও সালিশকেন্দ্রের তথ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গণপিটুনিতে মৃত্যুর একটি হিসাব পাওয়া যায়। এই ছয় বছরে ৮৩৫ জনের মৃত্যুর খবর এসেছে একাধিক গণমাধ্যমে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ১২৭, ২০১০ সালে ১৭৪, ২০১১ সালে ১৬১, ২০১২ সালে ১৩২, ২০১৩ সালে ১২৫ এবং ২০১৪ সালে ১১৬ জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এসব ঘটনায় কোনো একটির মামলার রায় প্রকাশ হয়েছে, এমন উদাহরণ পাওয়া যায়নি।  সাভারের আমিন বাজারে শবেবরাতের রাতে ডাকাত বলে ছয় কিশোরকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে আলোচিত হয়েছিল। ওই ঘটনায় মামলাও হয়েছে। বিচারকাজও চলছে। তবে ২০১১ সালে শুরু হওয়া মামলাটি এখনো চলছে। কবে নাগাদ নিষ্পত্তি হবে তাও বলা মুশকিল। একই বছর ২৭ জুলাই নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জে ডাকাত সন্দেহে পুলিশের গাড়ি থেকে নামিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় শামছুদ্দিন মিলনকে। তখনো দেশে সেভাবে স্মার্টফোনের বিকাশ হয়নি।
তবে এই ঘটনাটির ভিডিও সে সময় ফেসবুকে ছড়ায়। সেখানে কারা কারা পিটিয়েছে সেটা ছিল স্পষ্ট। তবু আট বছরে মামলাটি তদন্তেই আটকে আছে।
গণপিটুনিতে মৃত্যুর বিষয়টি ঘটে বছরজুড়েই। আর সারা বছরের পরিসংখ্যান রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। এসব ঘটনায় মামলা হয়, কিন্তু তাতে সুনির্দিষ্ট আসামী থাকে না। চারশ, পাঁচশ, ছয়শ থেকে শুরু করে এক থেকে দেড় হাজার আসামীও থাকে। আর এত আসামীকে কখনো শনাক্ত করা যায় না। তবে নানা সময় পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, গ্রেপ্তার দেখিয়ে টাকা আদায় চেষ্টার।
আর কোনো মামলার প্রতিবেদন আদালতে গেলে সাক্ষী পাওয়া যায় না সেভাবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারাও আদালতে আসতে সেভাবে আগ্রহী হন না। আর বিচার চলতে থাকে বছরের পর বছর ধরে।
সম্প্রতি দেশজুড়ে আলোচিত ও আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে গণপিটুনি। ফেসবুক ও ইউটিউবে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, পদ্মা সেতু নির্মাণে এক লাখ মানুষের মাথা লাগবে। আর সারা দেশে ৪২টি দল কাজ করছে। তারা প্রধানত শিশুদের মাথা সংগ্রহ করবে।
সরকারের পক্ষ থেকে এই প্রচারে কান না দেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, যারা গুজব ছড়ায়, তাদের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। গ্রেপ্তার হয়েছে ১০ জনের বেশি। কিন্তু গুজব থামছে না। উল্টো প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে তা।
গত দুই সপ্তাহে সারা দেশে গণপিটুনীর একাধিক ঘটনায় কমপক্ষে মারা গেছে ১০ জন। আহতের সংখ্যা অর্ধশতাধিক ছাড়িয়েছে। প্রতিটি ঘটনায় স্থানীয়রা ভুক্তভোগীকে চিনতে পারছিল না। কোথাও কোথাও শিশুর পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন ভুক্তভোগী, কোথাও শিশুকে আদর করতে গিয়েছিলেন।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে সারা দেশে ৩০টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে শনিবার বাড্ডায় দুই সন্তানের জননীকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ছুঁয়ে গেছে জাতিকে। দুটি সন্তান রেখে গেছেন ওই নারী। তার তিন বছরের শিশুর ‘আমার মা নেই’ বক্তব্য কাঁদিয়েছে দূরের মানুষকেও।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ধরনের ঘটনা থেকে উত্তরণের জন্য বেশি বেশি প্রচারণা, জনমত গঠন করতে হবে। মানুষের মধ্যে নৈতিকতাবোধ জাগ্রত করতে হবে।
আইনজ্ঞরা বলছেন, অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে দিয়ে তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে মানুষের মধ্যে এই বোধ জাগ্রত হবে যে, দল বেঁধে কিছু করলেও শাস্তি পেতে হবে। সেটা হয় না বললেই কেউ ভয় পায় না। আর দলবদ্ধ হয়ে পিটুনি শুরু করলে তারা নিজেদেরও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আর এক সঙ্গে বহু মানুষ পেটালে মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকা কঠিন।
২০১৩ সালের ৩১ আগস্ট নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার জাহাজমার ইউনিয়নের হিলটন বাজার এলাকায় গণপিটুনিতে পাঁচজন নিহত হয়। ২০১৬ সালের ১১ মার্চ একই উপজেলার চেয়ারম্যান ঘাট এলাকায় ডাকাত সন্দেহে চারজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
ঘটনা দুটির অগ্রগতি নিয়ে হাতিয়া থানার ওসি আবুল খায়ের জানান, ‘মামলার চার্জশিট হয়ে গেছে। এখন সেটা আদালতে বিচারাধীন।’
নোয়াখালীর আলোচিত মিলন হত্যার ভিডিও প্রকাশ হলেও আট বছরেও তদন্ত শেষ হয়নি। বিচারের অপেক্ষায় দিন গুনতে গুনতে মারা গিয়েছেন কিশোরের বাবা। তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, ‘দ্রুতই মামলার প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে।’
কোম্পানীগঞ্জের চর কাঁকড়া ইউনিয়নের বিক্ষুদ্ধ লোকজন ২০১১ সালের ২৭ জুলাই ছয় ডাকাতকে পিটিয়ে হত্যা করে। কিশোর মিলন ওই দিন সকালে চর ফকিরা গ্রামের বাড়ি থেকে উপজেলা ফিরছিলেন। পথে চর কাঁকড়া একাডেমি উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে একদল লোক তাকে ডাকাত সন্দেহে আটক করে। তবে সে ডাকাত নয় এটা নিশ্চিত হয়ে তাকে পুলিশের গাড়িতে তুলে দেয়া হয়।
পথে টেকের বাজারে আসলে পুলিশের উপস্থিতিতেই উত্তেজিত জনতা মিলনকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। এর কয়েক দিন পর মোবাইল ফোনে ধারণ করা এই ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে তা সাড়া ফেলে। এই ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার জন্য চার পুলিশ সদস্যকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। ওই ভিডিও থেকেই গণপিটুনিতে অংশ নেয়া ২৭ জনকে শনাক্ত করা হয়। ওই ২৭ জন ও চার পুলিশ সদস্যকে আসামী করে মামলা করা হয়। কিন্তু কারো কোনো শাস্তি হয়নি।
২০১১ সালের ৭ জুলাই শবেবরাতের রাতে আমিন বাজারের বড়দেশী গ্রামসংলগ্ন কেবলার চরে বেড়াতে যান ঢাকার সাত ছাত্র। ডাকাত বলে তাদের ছয়জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
ওই ঘটনার পর নিহতদের বিরুদ্ধে ডাকাতির অভিযোগে মামলা করেন স্থানীয় বালু ব্যবসায়ী আবদুল মালেক। পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাত গ্রামবাসীকে আসামী করে আরেকটি মামলা করে। পরে বিচার বিভাগীয় তদন্তে নিহত ছাত্ররা নিরপরাধ প্রমাণ হন। আর পুলিশের করা মামলাটি তদন্ত শেষে ২০১৩ সালের ৭ জানুয়ারি র‌্যাব কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিন আহমেদ আদালতে প্রতিবেদন দেন।
২০১৩ সালের ৮ জুলাই ৬০ আসামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করে আদালত। হত্যা মামলার আসামীদের মধ্যে ছয়জন পলাতক, একজন কারাগারে, ৫২ জন জামিনে এবং এক আসামী মারা গেছেন।
২০১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় ডাকাত সন্দেহে আটজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় থানায় দুটি মামলা হয় অজ্ঞাত ১২০০ আসামীর বিরুদ্ধে। কিন্তু মামলার অগ্রগতি জানাতে পারেনি পুলিশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক খায়রুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘শুধু আইনকানুন দিয়েই সমাজ চলে না, সমাজের একটি মূল্যবোধ থাকে। বিচারহীনতা, নৈতিক অবক্ষয়সহ নানা কারণে সমাজে এই ধরনের সমস্যার তৈরি হচ্ছে। গণপিটুনির বিষয়টি আগেও ছিল। তবে এখন একটা গুজবকে কেন্দ্র করে এটা বেড়েছে। নামকাওয়াস্তে প্রজ্ঞাপন বা গুজবে কান না দেয়ার কথা বললে সমস্যা কমবে না। তাই জোর দিতে হবে জনমত গঠনে। বিষয়টিকে সিরিয়াসলি নিয়ে প্রচার প্রচারণা চালাতে হবে।’
বিচারে দীর্ঘসূত্রতা কমানোর তাগিদও দিয়েছেন এই সমাজবিজ্ঞানী। বলেন, ‘এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো বড় উদ্দেশ্য হতে হবে। যদি বিচার শেষ হতে দীর্ঘদিন লেগে যায় বা বিচারই না হয় তাহলে পরোক্ষভাবে হলেও যারা এই ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে তারা কেন উৎসাহিত হবে না?’
কেন বিচারে দীর্ঘসূত্রতা? আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী বলেন, ‘গণপিটুনির মামলা প্রমাণ করাটা কঠিন। যেহেতু ঘটনার পর অজ্ঞাত আসামী দেয়া হয় অসংখ্য মানুষকে, তারমধ্যে অনেককে ধরলেও পরে অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ায় ছেড়ে দেয়া হয়। তাই অভিজ্ঞ তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়াটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’
মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলছেন, ‘কাউকে অপরাধী হিসেবে সন্দেহ হলে তাকে পুলিশে দিতে হবে। নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে নির্যাতন করা ঠিক না। এই সচেতনতাটা মানুষের মধ্যে জাগাতে হবে, মানুষকে বোঝাতে হবে।’ শতশত এমনকি হাজার লোকের নামে মামলাও ঠিক নয় বলে মনে করেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান। বলেন, ‘এত লোককে পুলিশ ধরবে, তাদের কাছ থেকে স্টেটমেন্ট নেবে? এসব কারণে আসল অপরাধী পার পেয়ে যায়। এটার জন্য নজর রাখতে হবে।’ ‘পুলিশ কত লোককে আসামী করছে আর দিন শেষে কত লোকের সাজা নিশ্চিত হচ্ছে সেটার একটা পরিসংখ্যান নিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের কাজ করা উচিত।’
সাড়ে আট বছরে গণপিটুনিতে নিহত ৮২৬
এদিকে অপর এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে , ২০১১ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন ঘটনায় গণপিটুনি দিয়ে সারাদেশে হত্যা করা হয়েছে ৮২৬ জনকে। ২০১৮ সালে সারা দেশে গণপিটুনিতে ৩৯ ও ২০১৭ সালে ৫০ জন লোক মারা গেলেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই নিহত হয়েছেন ৩৬ জন। আর চলতি মাসের দুই সপ্তাহে ছেলে ধরা সন্দেহে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে ১০ জনকে। এসব ঘটনায় মারাত্বকভাবে আহত হয়েছেন আরও অর্ধশতাধিক।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ি ২০১১ সাল থেকে ২০১৯ সালের জুন মাস পর্যন্ত মোট সাড়ে আট বছরে সারা দেশে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে ৮২৬ জনকে। এর মধ্যে ২০১১ সালে ১৩৪ জন, ২০১২ সালে ১২৬ জন, ২০১৩ সালে ১২৮জন, ২০১৪ সালে ১২৭ জন, ২০১৫ সালে সবচেয়ে বেশি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। ওই বছর সারাদেশে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয় ১৩৫ জনকে। এছাড়া ২০১৬ সালে ৫১ জন, ২০১৭ সালে ৫০ জন, ২০১৮ সালে ৩৯ জন ও জুন ২০১৯ পর্যন্ত গণপিটুনি দিয়ে ৩৬ জনকে হত্যা করা হয়েছে। আসকের দেয়া তথ্য পর্যালোচনা করে আরও জানা গেছে, এই সাড়ে আট বছরে গণপিটুনির সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে ঢাকা অঞ্চলে। এই সময়ে ঢাকা অঞ্চলে গণপিটুনির শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৩৫০ জন। এর পরেই রয়েছে চট্টগ্রামের অবস্থান। এই সময়ে চট্টগ্রামে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ১৯৬ জন, খুলনায় ৯৫ জন, রাজশাহীতে ৭৫ জন, বরিশালে ২৯ জন, রংপুরে ২৩ জন ও সিলেটে ২১ জন।
গণপিটুনিতে অপরাধী ব্যক্তিদের পাশাপাশি অনেক সময় নিরপরাধী ব্যক্তিরা নিহত হন। ২০১৫ সালের ২৫শে আগস্ট পাবনায় অপহণকারী সন্দেহে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয় তিন ব্যক্তিকে। পরবর্তীতে জানা যায়, ওই তিনজনই ছিলেন ব্যবসায়ী। অপহণকারী গুজব রটিয়ে একটি মহল তাদেরকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করেছিল। ওই তিনজনই পেশায় ব্যবসায়ী ও একে অপরের আত্মীয়।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় হত্যাকা-ের ঘটনাকেও গণপিটুনি বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। এমনই একটি ঘটনা ঘটে ২০১৬ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি। এদিন রাজধানীর কাজিপাড়া এলাকায় তিন তরুণ গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে বলে পুলিশ দাবি করে। তবে পরবর্তীতে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে যে, ওই এলাকায় কোনো গণপিটুনির ঘটনা ওইদিন ঘটেনি। তাছাড়া পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নিহত তিন তরুণের শরীরে মোট ৫৪টি গুলীর দাগ ছিলা।
কোন এলাকায় ঘটনা বেশি
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে গত ছয় মাসে যে ৩৬ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন, তার মধ্যে চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি, ১৭ জন। এ ছাড়া ঢাকায় নয়জন, খুলনায় পাঁচ, সিলেটে দুজন, বরিশালে দুজন এবং রাজশাহীতে একজন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন।
গবেষণা বলছে, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো ঘনবসতির শহরে ছোটখাটো ঘটনায় গণপিটুনির ঘটনা ঘটলেও নিম্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে এমন ঘটনা বেশি হয়। যেমন নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, উত্তরবঙ্গ ও চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত উপজেলায় গণপিটুনির প্রবণতা বেশি।
গতকালও একাধিক ঘটনা ঘটে বলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জানিয়েছেন আমাদের সংবাদদাতারা। তার মধ্যে সিরাজগঞ্জে ছেলেধরা সন্দেহে এক যুবককে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে হস্তান্তর করেছে স্থানীয়রা। গতকাল মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৩ টার দিকে সদর উপজেলার পাইকপাড়া দারুল কোরআন কওমী মাদরাসা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে সদর থানার এসআই এম হাসান মাহমুদ জুয়েল জানান। আহত ৩৫ বছর বয়সী আলম পৌর এলাকার গয়লা বটতলা এলাকার আব্দুর রহিমের ছেলে। তাকে সিরাজগঞ্জ বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সে ‘ছিঁচকে চোর’ ও ‘মাদকাসক্ত’ বলে পুলিশ জানায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে এসআই বলেন, “আলম মাদরাসার জানালা দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করছিল। এ সময় শিক্ষার্থীরা হঠাৎ তাকে দেখে ভয় পেয়ে ‘ছেলে ধরা’ সন্দেহে চিৎকার শুরু করে। এ সময় গ্রামবাসী ও সকল ছাত্ররা তাকে আটক করে গণধোলাই দেয়। পরে মাদরাসার অধ্যক্ষ থানায় খবর দিলে পুলিশ গিয়ে তাকে আলমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে বলে জানান তিনি।
এসআই বলেন, এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মাদরাসার অধ্যক্ষ হাফিজুর রহমান, পাইকপাড়া গ্রামের আয়নাল হক, মোকলেছুর রহমান ও আব্দুল আওয়াল নামে চারজনকে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে।
ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলায় ছেলেধরা সন্দেহে এক নারীকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে এলাকাবাসী।
নবাবগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ গোলাম নবী শেখ জানান, গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে উপজেলার কলাকোপা ইউনিয়নের বাগমারা বাজার এলাকা তাকে আটক করে পুলিশে দেয় স্থানীয়রা। ২৫ বছর বয়সী ওই নারীর বাড়ি খুলনায়। তিনি কেরানীগঞ্জের রুহিতপুরে ভাড়া বাসায় থাকেন।
বাগমারা এলাকার বাসিন্দা মো. মোজাদ্দেদ হোসেন খান নয়ন বলেন, ওই নারী বেলা ১১টার দিকে বাগমারা বাজারের সেতুর ঢালে অবস্থান করছিলেন। তার গতিবিধি দেখে সন্দেহজনক মনে হলে কয়েকজন তার সঙ্গে কথা বলেন। এখানে কার জন্য অপেক্ষা করছেন জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘আমার ছোট আম্মার জন্য। সে আমাকে এখানে অপেক্ষা করতে বলেছে।’ আমরা আড়ালে গিয়ে তার গতিবিধি লক্ষ্য করি। এরপর ওই নারী স্থান পরিবর্তন করে বাগমারা লাইসিয়াম ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সামনে গিয়ে দাঁড়ান। তাতে আমাদের সন্দেহ হয়। আমরা তার কাছে গিয়ে তার ছোট আম্মার মোবাইল নম্বর চাই। তিনি তা দিতে পারেন নাই। আমাদের সন্দেহ হলে তার সঙ্গে থাকা ব্যাগে কী রয়েছে দেখতে চাই। তিনি শিশুদের কয়েকটি জামা দেখান। তারপর তাকে বিভিন্নভাবে প্রশ্ন করা হলে তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি।” এ সময় তাকে আটকে রেখে পুলিশে খবর দেয়া হয় বলে তিনি জানান।
পরিদর্শক গোলাম নবী শেখ বলেন, তাকে নিরাপদে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ছেলেধরা সন্দেহে মানসিক ভারসাম্যহীন এক বৃদ্ধাকে গণপিটুনির অভিযোগে ২০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
উপজেলার রিফাইতপুর ইউনিয়নের শিতলাইপাড়া গ্রাম থেকে সোমবার রাতে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছেন দৌলতপুর থানার ওসি আজম খান। তিনি বলেন, সোমবার সকালে মানসিক ভারসাম্যহীন এক বৃদ্ধা বাড়ি থেকে বের হয়ে শিতলাইপাড়া গ্রামে গেলে এলাকবাসী তাকে গণপিটুনি দিয়ে গুরুতর আহত করে। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেয়।
এ ঘটনায় দৌলতপুর থানায় মামলা করেন বৃদ্ধার জামাতা রনি হোসেন। মামলার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে ২০ জন গ্রেপ্তার করে বলে জানান ওসি আজম খান।
রাস্তায় স্বামী-স্ত্রী ঝগড়া করে একে-অন্যকে ‘ছেলেধরা’ বলে গণধোলাই খেয়েছেন উভয়ে। এ সময় গণধোলাই থেকে রেহাই পাননি তাদের সঙ্গে থাকা স্বামীর বন্ধুও। গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে গাজীপুরের শ্রীপুরের নয়নপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর স্ত্রীকে আটক করে থানায় নিয়ে গেছে পুলিশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রিকশায় উঠেছেন স্বামী-স্ত্রী। তাদের সঙ্গে ছিলেন স্বামীর এক বন্ধু। তিনজনকে নিয়ে যখন রিকশাটি চলছিল তখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বাধে। একপর্যায়ে তা হাতাহাতিতে রূপ নেয়। তাদের ঝগড়ার বিষয় হলো দ্বিতীয় বিয়ে। স্ত্রী অভিযোগ তুলেছেন, তার স্বামী আরেকটি বিয়ে করেছেন। স্বামী অস্বীকার করছিলেন বিষয়টি। এ নিয়ে রিকশায় বসে ঝগড়া করেন স্বামী-স্ত্রী। বার বার চেষ্টা করেও তাদের ঝগড়া থামাতে পারেননি স্বামীর বন্ধু।
এ অবস্থায় রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে রিকশা থেকে লাফ দিয়ে নেমে ‘ছেলেধরা-ছেলেধরা’ বলে চিৎকার শুরু করেন স্ত্রী। স্বামীও তখন স্ত্রীকে ইঙ্গিত করে পাল্টা ‘ছেলেধরা-ছেলেধরা’ বলে চিৎকার শুরু করেন। তাদের চিৎকার শুনে আশপাশে থাকা লোকজন দৌড়ে আসেন। সেই সঙ্গে কিছু লোকজন স্বামী এবং কিছু লোকজন স্ত্রীকে মারধর শুরু করেন। এ সময় মারধর থেকে বাদ পড়েননি রিকশায় থাকা স্বামীর বন্ধুও। গণধোলাইয়ের একপর্যায়ে পালিয়ে যান দুই পুরুষ। তবে ওই নারীকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে স্থানীয়রা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুই পুরুষ গণপিটুনি খেয়ে পালিয়ে গেলেও স্ত্রী জনতার হাতে ব্যাপক মারধরের শিকার হয়েছেন। বার বার ওই নারী আমি ‘ছেলেধরা’ না বললেও ছাড়েনি জনতা। পরে তাকে পুলিশে তুলে দেয়া হয়।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে শ্রীপুর থানা পুলিশের এসআই আমিনুল হক বলেন, শ্রীপুরের বেড়াইদেরচালা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা এবিএম তাজউদ্দিনের মেয়ে তানিয়া। তানিয়ার স্বামীর সঙ্গে কথাকাটাকাটির সময় ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে দুজনকে পিটিয়ে আহত করে এলাকাবাসী। ঘটনাস্থলে গিয়ে তানিয়াকে উদ্ধার করলেও তার স্বামী ও বন্ধু পালিয়ে যায়।
পটুয়াখালীতে ছেলেধরা সন্দেহে এক নারী (৩৫)-কে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে স্থানীয়রা। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে কলাপাড়া উপজেলার মিঠাগঞ্জ ইউনিয়নের জয় বাংলা বাজার এলাকা থেকে ওই নারীকে আটক করা হয়।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, মিঠাগঞ্জ ইউনিয়নের জয় বাংলা বাজার এলাকায় এক নারী ঘোরাঘুরি করছিল। এসময় তাকে দেখে সন্দেহ হলে আটকে রেখে পুলিশে খবর দেয় স্থানীয়রা। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় তাকে।
কলাপাড়া থানার ওসি মো. মনিরুল ইসলাম জানান, ওই নারী মানসিক ভারসাম্যহীন। তিনি তার নাম-ঠিকানা কিছুই বলতে পারেন না। সমাজসেবা অফিসাররের কাছে তাকে হস্তান্তর করা হবে। এলাকার লোকজন সন্দেহ থেকে ওই নারীকে আটকে রেখে পুলিশে সোপর্দ করেছে। তবে তাকে মারধর করা হয়নি বলেও জানিয়েছে ওসি।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার পাইকপাড়ায় ছেলেধরা সন্দেহে আলম নামের এক যুবককে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছে এলাকাবাসী। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধারের পর সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে পুলিশ। এই ঘটনায় মাদরাসা অধ্যক্ষসহ চারজনকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে পাইকপাড়ার দারুল কোরআন কওমি মাদরাসায় এই ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা জানায়, ভুক্তভোগী আলম পৌর এলাকার গয়লা বটতলার আব্দুর রহিমের ছেলে। সে একজন মাদকাসক্ত। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. ফয়সাল আহম্মেদ জানান, আলম এখন চিকিৎসাধীন রয়েছে।
সদর থানার ওসি মোহাম্মদ দাউদ জানান, ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে আহত আলম আসলে মাদকাসক্ত ও ছিচকে চোর। এই ঘটনায় অধ্যক্ষসহ চার জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনা হয়েছে।
পঞ্চগড়ে ছেলেধরা সন্দেহে মানসিক ভারসাম্যহীন তিন যুবককে গণপিটুনি দিয়েছে উন্মত্ত জনতা। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের জীবন রক্ষা করে। বর্তমানে তারা থানা পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। সোমবার (২২ জুলাই) রাতে জেলা শহরের ডোকরোপাড়া ও তুলারডাঙ্গা এলাকায় দুজনকে এবং বিকালে দেবীগঞ্জে আরেক যুবককে গণপিটুনি দেয়া হয়। তাদের একজনের পরিচয় জানা গেছে। দেবীগঞ্জে হামলার শিকার যুবকের নাম সাজেদুল ইসলাম। তার বাড়ি নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার সাহাপুর গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের মন্টুর ছেলে।
দেবীগঞ্জ থানার ওসি রবিউল হাসান সরকার জানান, সাজেদুলের পরিবারকে খবর দেয়া হয়েছে। পরিবারের লোকজন আসলে তাদের কাছে সোপর্দ করা হবে।
পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইউসুফ আলী বলেন, গণপিটুনি দেয়া তিনজনই মানসিক ভারসাম্যহীন। সন্দেহ হলেই কেউ অপরাধী নয়। “মাথাকাটা” বা “ছেলেধরা” এটা একটি গুজব মাত্র। অপরিচিত কাউকে কোনও সন্দেহ হলে আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে নিকটের থানা পুলিশকে খবর দিন। তিনি আরও বলেন, সন্দেহ করে কোনও ব্যক্তিকে মারপিট করা হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ