ঢাকা, সোমবার 29 July 2019, ১৪ শ্রাবণ ১৪২৬, ২৫ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ভোট-অংকের মারপ্যাঁচে হাতছাড়া ধানের শীষের ‘নিজস্ব’ আসনগুলো

সরদার আবদুর রহমান : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কেন্দ্রভিত্তিক ফলের সুরতহাল রিপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ধানের শীষের ‘নিজস্ব’ আসন বলে দীর্ঘকাল ধরে চিহ্নিত অনেক আসনেই ভোটের বিপন্ন দশা দেখা গেছে। কোনো কোনো আসনে ভোট প্রাপ্তিতে ধানের শীষকে কার্যত ‘নাই’ করে দেয়া হয়েছে।
নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, অতীতের বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যেসব আসনে বিএনপি ক্রমাগত জয়লাভ করেছে কিংবা পরাজিত হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ভোট পেয়েছে, সেসব আসনে এবার ভোটের বিশাল পার্থক্য সৃষ্টি করা হয়েছে। ফলে এসব আসন ধানের শীষের হাতছাড়া হয়ে গেছে।
কয়েকটি আসনের উদাহরণ : ১৯৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ভোটের প্রাপ্ত চিত্রে দেখা যায়, বরাবর ধানের শীষ শীর্ষস্থান ও বিজয় পেয়ে এসেছে এমন বহু আসন ২০১৮ সালের নির্বাচনে খোয়া গেছে। এর মধ্যে কেবল ২০১৪ সালের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলো না। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জয়পুরহাট-১ আসনে ১৯৯১ সালে ধানের শীষের প্রাপ্ত ভোটের শতকরা হার ছিলো, ৫০.৪৭% ভাগ, ১৯৯৬-এ ৪৭.৯%, ২০০১-এ ৫৭.৪৭%, ২০০৮-এ ৫০.১২% ভাগ। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তা নেমে দাঁড়ালো ১০.১৪%। বগুড়া-৩ আসনে এই ভোট প্রাপ্তির হার ছিলো যথাক্রমে ৩৪.২৩%, ৪৩.৭৬%, ৫২.৪৫% ও ৪৮.৮৬%। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তা নেমে দাঁড়ায় ২৬.২৯%। খুলনা-২ আসনে ধানের শীষের ভোট প্রাপ্তির হার ছিলো যথাক্রমে ৪৪.৪৭%, ৪৬.৮৯%, ৫৭.৭৮% ও ৪৯.৩১%। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তা নেমে যায় ১৮.৮৪%। বরিশাল-৫ আসনে ভোট প্রাপ্তির হার ছিলো যথাক্রমে ৪৩.৭১%, ৪৫.৭৫%, ৫৯.৬৫% ও ৪৪.৭৪%। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তা নেমে দাঁড়ায় ১১.৩৯%। কুমিল্লা-২ আসনে ভোট প্রাপ্তির হার ছিলো যথাক্রমে ৫৭.৭৩%, ৪৩.৯৯%, ৬০.৬৮% ও ৫৩.৬%। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তা নেমে দাঁড়ালো ৮.৯৮%। চাঁদপুর-৪ আসনে ভোট প্রাপ্তির হার ছিলো যথাক্রমে ৩২.২১%, ৪৯.২৬%, ৫৬.৯৮% ও ৫০.৮৫%। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তা নেমে যায় ১৪.৪৭%-এ। ফেনী-১ আসনে ভোট প্রাপ্তির হার ছিলো যথাক্রমে ৩৮.৬৫%, ৫৫.৫৬%, ৭২.২১% ও ৬৫.০৫%। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তা নেমে দাঁড়ালো ১০.৭৭%। ফেনী-৩ আসনে ভোট প্রাপ্তির হার ছিলো যথাক্রমে ৪৫.১৪%, ৫২.০৭%, ৬৮.৩৭% ও ৫৬.৯৭%। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তা নেমে দাঁড়ালো ৪.৭৭%। নোয়াখালী-১ আসনে ভোট প্রাপ্তির হার ছিলো যথাক্রমে ৩১.৯৭%, ৪৬.২৯%, ৬১.৮৮% ও ৫৪.৬৫%। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তা নেমে দাঁড়ালো ৫.৬৯%। নোয়াখালী-২ আসনে ভোট প্রাপ্তির হার ছিলো যথাক্রমে ৪১.২৯%, ৪৫.৮১%, ৬২.১৫% ও ৫৫.৬২%। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তা নেমে দাঁড়ালো ১২.৩১%। নোয়াখালী-৩ আসনে ভোট প্রাপ্তির হার ছিলো যথাক্রমে ২২.২৩%, ৪৫.০৪%, ৫৮.৪৮% ও ৪৩.৪১%। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তা নেমে দাঁড়ালো ১৯.৪%। লক্ষ্মীপুর-১ আসনে ভোট প্রাপ্তির হার ছিলো যথাক্রমে ৪০.৫৬%, ৪৩.৯২%, ৬৫.৯২% ও ৫৫.৬৭%। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তা নেমে দাঁড়ালো ২.০২%। লক্ষ্মীপুর-২ আসনে ভোট প্রাপ্তির হার ছিলো যথাক্রমে ৫৩.৫%, ৫১.৬৫%, ৭২.২৩% ও ৫৮.১৮%। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তা নেমে দাঁড়ালো ৯.৬৩%। লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে ভোট প্রাপ্তির হার ছিলো যথাক্রমে ৩১.৬৫%, ৪৩.৭১%, ৬৮.০২% ও ৫৬.৪৫%। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তা নেমে দাঁড়ালো ৫.৬৮%।
এই সঙ্গে তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিভিন্ন আসনে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থীরা যে পরিমাণ ভোট পেয়েছিলেন, ২০১৮ সালে সেটি অবিশ্বাস্যরকম মাত্রায় কমে গেছে। নমুনা হিসেবে দেখা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জোট প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট ছিলো ৮৬,৫৮৭। এবারের ২০১৮ সালে এই ভোট নেমে যায় ৪,৬৭৭টিতে। নোয়াখালী-৪ আসনে জোট প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট ছিলো ১,১৮,৯৫৬টি। ২০১৮ সালে দাঁড়ায় ২৩,২৫৭ ভোট। সিরাজগঞ্জ-১ আসনে ছিলো ৪০,৮১৪ ভোট। ২০১৮ সালে নেমে দাঁড়ায় ১,১১৮ ভোটে। যশোর-১ আসনে জোট প্রার্থীর ভোট ছিলো ৮৮,৭০০। ২০১৮ সালে নেমে দাঁড়ায় ৪,৯৮১ ভোটে। রাজশাহী-৪ আসনে ছিলো ৮৩,৬৩৩ ভোট। ২০১৮ সালে দাঁড়ায় মাত্র ১৪,১৬০ ভোটে। বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে ফেনী-৩ আসনে। এই আসনে আওয়ামী লীগ এর আগে কখনোই জয়লাভ করতে পারেনি। কিন্তু এবারের নির্বাচনে এই আসনে বিএনপির প্রার্থী পেয়েছেন মাত্র ৫,৭৮৪ ভোট। অন্যদিকে মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির প্রার্থী সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদউদ্দিন চৌধুরী লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ২,৯০,৬৮৯ ভোট। অর্থাৎ ধানের শীষের সঙ্গে লাঙ্গলের ভোটের ব্যবধান প্রায় ২,৮৫,০০০।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এই ফলাফল বিশ্লেষণ করে এর নানা অসঙ্গতি তুলে ধরে ‘সুজন’ সম্প্রতি এক সাংবাদিক সম্মেলনে দাবি করে বলে, এ নির্বাচন অনিয়মের খনি, একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। এতে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। মানুষের মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এখন পুরোপুরি যদি ভেঙে যায় শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা বদলের পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ