ঢাকা,বুধবার 31 July 2019, ১৬ শ্রাবণ ১৪২৬, ২৭ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ডেঙ্গুর ওষুধ আমদানিতেও সিন্ডিকেট

রাজধানীর পাশাপাশি সারাদেশেও যখন ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার ঘটে চলেছে এবং সরকারি-বেসরকারি কোনো হাসপাতালেই যখন প্রয়োজনীয় ওষুধসহ সঠিক চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না, তেমন এক কঠিন সময়েও ডেঙ্গুর প্রতিষেধক ওষুধের আমদানি সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। কোনো এক কোম্পানির আড়ালে ওষুধ আমদানির সকল তৎপরতা চালাচ্ছে বিশেষ একটি গোষ্ঠী। গোষ্ঠীটি শুধু আমদানির কার্যক্রমই নিয়ন্ত্রণ করছে না, ওষুধের বাজারও দখল করে নিয়েছে।
গতকাল একটি জাতীয় দৈনিকের খবরে জানানো হয়েছে, কৃষিকাজে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য ব্যবহার্য বিভিন্ন রোগ-বালাইনাশক ওষুধের ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের অক্টোবরে সরকার কিছু নিয়ন্ত্রণমূলক নির্দেশনা জারি করেছিল। সে নির্দেশনার ভিত্তিতে এবং বিভিন্ন ধারা-উপধারার অপব্যাখ্যার সুযোগ নিয়ে এতদিন দেশের দুটি মাত্র ওষুধ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান সকল ধরনের রোগ-বালাইনাশক ওষুধ আমদানি ও বাজারজাত করার সুবিধা ভোগ করে এসেছে। প্রতিষ্ঠান দুটি নিজেরাও ওষুধ তৈরি করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ঘটার পর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দুটির মধ্যে একটি কোম্পানির ওষুধ শুধু ডেঙ্গু প্রতিরোধেই ব্যর্থ হয়নি, এর বিভিন্ন ওষুধ অকার্যকর বলেও প্রমাণিত হয়েছে। জনমতের চাপে সরকার তখন ওই কোম্পানির ওষুধ নিষিদ্ধ করেছে। এর ফলে ওষুধের সব কর্তৃত্ব চলে গেছে একটি মাত্র কোম্পানির দখলে। কোম্পানিটি পরিস্থিতির সুযোগের ব্যবহারও করছে যথেচ্ছভাবে।
অন্যদিকে আপত্তি ও প্রতিবাদ উঠেছে এমনকি সরকার এবং দুই সিটি করপোরেশনের কর্তা ব্যক্তিদের মধ্যেও। যেমন দক্ষিণের মেয়র প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ১৭ কোটি মানুষের দেশে দুটি মাত্র কোম্পানিই সব ওষুধ আমদানি করবে কেন ? অন্য সব কোম্পানিকে বাদ দিয়ে দুটি কোম্পানির কাছে সব কর্তৃত্ব রয়েছে বলেই একদিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না, অন্যদিকে জনগণের সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে দুই সিটি করপোরেশনকে। সিটি মেয়র প্রসঙ্গক্রমে কোম্পানি দুটির একচেটিয়া কর্তৃত্বের অবসান ঘটিয়ে ওষুধ আমদানি উন্মুক্ত করে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞসহ পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, দাবিটি বাস্তবসম্মত হলেও সমগ্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য অনেক সময় দরকার। সিটি মেয়রসহ কর্তা ব্যক্তিরা কেন এতদিন পরÑ তাও ডেঙ্গু প্রায় মহামারির আকার ধারণ করার পর সোচ্চার হয়েছেন সে প্রশ্ন যেমন উঠেছে তেমনি দূষিত পরিবেশের জন্যও দায় চাপানো হচ্ছে দুই সিটি করপোরেশনের ওপর। বলা হচ্ছে, কেবলই আমদানির বিষয়টিকে প্রাধান্যে এনে মেয়রসহ কর্তা ব্যক্তিরা নিজেদের ব্যর্থতা ও দায়দায়িত্ব আড়াল করতে পারেন না। মানুষের জীবনহানিসহ ক্ষয়ক্ষতির জন্য তারাও সমানভাবে দায়ী।
প্রকাশিত রিপোর্টে আরো জানানো হয়েছে, আমদানি স্তিমিত হওয়ার কারণে ওষুধ স্বল্পতার যুক্তি ও অজুহাত দেখিয়ে বর্তমানে যেসব ওষুধ ছেটানো হচ্ছে সেগুলো আইসিডিডিআরবি’র পরীক্ষায় সম্পূর্ণ অকার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় মহামারির মধ্যেও অকার্যকর ওষুধই ছিটিয়ে চলেছে দুই সিটি করপোরেশন। ওদিকে যেহেতু আমদানির জন্য সময় দরকার সেহেতু সব জেনেও সরকার সুকৌশলে নীরবতা অবলম্বন করে চলেছে। একই কারণে ডেঙ্গু মশার প্রকোপ তো কমছেই না, ডেঙ্গু রোগের বিস্তারও আগের মতোই ঘটে চলেছে। শুধু তা-ই নয়, ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশেও।
এ প্রসঙ্গে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো তথ্য জানা গেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে। ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, কীট নাশক ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময় পরও মশার মৃত্যুর হার যদি ৯০ শতাংশের নিচে না হয় তাহলে নিশ্চিতভাবে ধরে নিতে হবে, মশা কীট নাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। আইসিডিডিআরবি’র পরীক্ষায়ও কথাটার সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, এত বিপুল পরিমাণ ওষুধ ছেটানোর পরও এডিস ও কিউলিক্স মশার মৃত্যুর হার শূন্যের কোঠাতেই রয়ে গেছে। অর্থাৎ ডেঙ্গুর জন্য দায়ী মশা মোটেও ধ্বংস হয়নি। অথচ কোটি কোটি টাকার ওষুধ আমদানি করা ও ছেটানো হয়েছে! এখনো হচ্ছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, ডেঙ্গুর মতো প্রাণঘাতী একটি রোগের বিষয়ে এ ধরনের অবহেলা ও দায়িত্বজ্ঞানহীন কার্যক্রমকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার সুযোগ নেই। দুই সিটি করপোরেশনের ওপর দায় চাপিয়ে তাই সরকারও রেহাই পেতে পারে না। সরকারের বরং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে জরুরিভিত্তিতে মশানাশক ওষুধ আমদানি করা এবং সারাদেশে সেগুলো ছড়ানোর পদক্ষেপ নেয়া উচিত। আমরা আশা করতে চাই, আমদানির ব্যাপারেও সরকার তার নীতিতে পরিবর্তন ঘটাবে। দু’-একটি মাত্র পছন্দের কোম্পানিকে দেয়ার পরিবর্তে উপযুক্ত কোম্পানিদের ওষুধ আমদানির সুযোগ দিতে হবে, যাতে কোনো সিন্ডিকেটের পক্ষে সম্পূর্ণ বাজার দখলে নেয়া এবং জাতিকে পনবন্দী বানানো সম্ভব না হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ