ঢাকা,বুধবার 31 July 2019, ১৬ শ্রাবণ ১৪২৬, ২৭ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

রাষ্ট্রযন্ত্রের বিচ্যুতি ও আমাদের ভাগ্যবিড়ম্বনা

ইবনে নূরুল হুদা : একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, দেশে অবক্ষয় ও অনৈতিকতার  শেকড়-বাকর সম্প্রসারিত হয়েছে বা এখনও হচ্ছে। মূল্যবোধের সঙ্কট আমাদের জাতিসত্ত্বাকেও হীনবল করে তুলেছে। রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবন-কোন ক্ষেত্রই এই সর্বনাশা প্রবণতা থেকে মুক্ত নয়। কিন্তু এসব প্রতিরোধ বা প্রতিবিধান করে সমাজ-রাষ্ট্রে স্বচ্ছতা, শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা যাদের দায়িত্ব তারা নিজেরাই এসব মুদ্রদোষ থেকে মুক্ত নয় বলে বেশ জোরালো অভিযোগ রয়েছে। আর এর বিস্তৃতিও ঘটেছে আশঙ্কাজনকভাবে। ফলে জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছি না বরং যত দিন যাচ্ছে ততই আমাদের অবনোমনই ঘটছে বলতে হবে। বস্তুত যার নিজেরই শুদ্ধতা নেই সে অন্যকে বিশুদ্ধ করবে কীভাবে? শুদ্ধাচারী হতে হলে তো সবার আগে নিজেকেই সংশোধন হতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতা আকাশচুম্বীই বলতে হবে। আসলে আমরা আয়নায় নিজেদের অবয়ব দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠিনি। নিজেদের কর্মের বৈধতা না থাকলেও অন্যের কাজের শুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে আমরা খুবই করিৎকর্মা। তাই আমাদের সমাজে অশুচীই এখন রীতিমত শুদ্ধাচারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। দুর্গন্ধ দূর করতে সুগন্ধীর পরিবর্তে কদর্যতাকেই অবলম্বন করা হচ্ছে। তার ফলাফলও হচ্ছে অন্তসারশূন্য। সকল ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রযন্ত্রের শুদ্ধতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার কারণেই আমাদের ভাগ্যবিড়ম্বনাও ক্রমেই বাড়ছে বৈ কমছে না।
সাম্প্রতিক সময়ে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে নির্বাচনে পক্ষপাতিত্ব এবং নির্বাচনী ফলাফল জালিয়াতির অভিযোগ ও সাবেক প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অর্থপাচারের দায়ে মামলা সে অভিযোগকে আরও জোরালো ভিত্তি দিয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে সংবিধান ও আইন লঙ্ঘন, বিরোধী দলের উপর জুলুম-নির্যাচন, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধ্বংসের অভিযোগ তো আগে থেকেই রয়েছে। মূলত দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাংবিধানিক দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। আর সংবিধান সংরক্ষণ করে গণমানুষের অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিচার বিভাগের। কিন্তু আমাদের চরম দুর্ভাগ্য যে, সেই নির্বাচন কমিশনের প্রধানকর্তা সিইসি ও বিচার বিভাগের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি সাবেক প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনজনিত গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা আবার উল্টো অভিযোগ করেছেন যে, তিনি নিজেও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বা বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন। তাই তিনি নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভে ব্যর্থ হয়ে এখন কানাডায় নতুন করে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। যা আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্রিয়াশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তার অভিযোগে একথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রও একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির সাথে ন্যায়ানুগ আচরণ করেনি। অবশ্য তার এমন অভিযোগে কোন অভিনবত্ব নেই বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের ব্যর্থতা ও গণমানুষের অধিকার হরণের অভিযোগ খুবই পুরানো। কিন্তু সাবেক প্রধান বিচারপতির এই উপলব্ধি খুবই বিলম্বিত। একেবারে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পরই তার এমন উপলব্ধি।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও সাবেক প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে যে গুরতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তা কোন ভাবেই উপেক্ষার করার মত নয়। বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত সকল নির্বাচন ও অভিযুক্ত সাবেক প্রধান বিচারপতি প্রদত্ত রায়ের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সঙ্গত সুযোগই সৃষ্টি হয়েছে। অবস্থাদৃষ্ট্রে মনে হচ্ছে অবক্ষয় ও অশুচীর ঢেউটা আছড়ে পড়েছে আমাদের সমাজ-রাষ্ট্রের সর্বত্রই। বাদ যাচ্ছে না রাষ্ট্রের অঙ্গ ও উপঅঙ্গগুলোও। সঙ্গত কারণেই রাষ্ট্র ও সরকার নৈতিকতা এবং সততার মানদন্ডে কার্য সম্পাদন করতে পারছেনা বা করছে না। অশুচী যে কখনো শুদ্ধাচারি হতে পারে এসবই তার যথোপযুক্ত প্রমাণ।
রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ-নির্বাহী তথা শাসন বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ। নির্বাহী বিভাগের মূল কাজ আইন অনুযায়ী শাসনকাজ পরিচালনা করা। আইন বিভাগের কর্তব্য নতুন আইন প্রণয়ন ও পুরনো আইন সংশোধন। আর আইনের যথাযথ প্রয়োগ করে সুবিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিচার বিভাগের। সাধারণভাবে রাষ্ট্র প্রধান ও সরকারপ্রধানকে কেন্দ্র করে যে বিভাগ গড়ে ওঠে তাকেই এক কথায় নির্বাহী বিভাগ বলা হয়। নির্বাহী বিভাগের মধ্যমণি হচ্ছে ব্যুরোক্রেসি বা আমলাতন্ত্র। রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গ স্বতন্ত্র সত্তা হলেও সেগুলো একে অন্যের পরিপূরক।
অধ্যাপক গার্নারের মতে, নির্বাহী বিভাগ তথা শাসন বিভাগের কার্যাবলীকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়। (এক) অভ্যন্তরীণ শান্তি ও শৃঙ্খলা বিষয়ক (Administrative), (দুই) পররাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও  বৈদেশিক সম্পর্ক (Diplomatic), (তিন) সামরিক ব্যবস্থা (Military), (চার) বিচার বিষয়ক ক্ষমতা (Judicial) ও (পাঁচ) আইন বিষয়ক ক্ষমতা (Lagislative)।
নির্বাহী বিভাগকে সফল ও সার্থক করে তুলতে হলে উপরোক্ত সব উপবিভাগের একটি কার্যকর সেতুবন্ধন জরুরি। কিন্তু আমাদের দেশে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই রাষ্ট্রের কোন অঙ্গই যথাযথাভাবে কার্য সম্পাদন করতে পারছে না বরং এই অঙ্গগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত হচ্ছেন তারাও রাষ্ট্র, জনগণ, আইন-সংবিধান ও বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে দায়িত্ব পালন করছেন না। রাষ্ট্রের অঙ্গগুলো অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথভাবে কার্যসম্পাদক করতে পারছে না। ফলে ব্যহত হচ্ছে সুশাসন। কার্যকারিতা হারাচ্ছে আইন ও সংবিধান। বিঘ্নিত হচ্ছে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ।
একথা মনে রাখেত হবে যে, অবক্ষয়হীন ও মূল্যবোধভিত্তিক রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার গঠন করতে হলে সবার আগে রাষ্ট্রের অঙ্গগুলোতে অস্বচ্ছতা ও অবক্ষয় রোধ করতে হবে। কারণ, রাষ্ট্রের সাথে অন্যান্য ইউনিটগুলোর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। একই সাথে এই অঙ্গগুলো পরিচালনার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত থাকেন তাদেরকেও রাষ্ট্রীয় সংবিধান, প্রচলিত আইন, জনগণ ও বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। নিজেকে কদর্য ও অশুচীর নিগঢ়ে আবদ্ধ রেখে অন্যদের শ্বেত-শুভ্র করার কর্মযজ্ঞ কখনোই সফল ও সার্থক হয়নি আর হবেও না। কারণ, নাপাকি দিয়ে কখনোই নাপাকি দুর করা যায় না।
‘আপনি আচরি ধর্ম পরকে শেখাও’ এই আপ্তবাক্যটি আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে। কিন্তু কথাটার প্রতিফলন প্রায় ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কোন ক্ষেত্রের এর পুরোপুরি প্রতিফলন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রের কোন অঙ্গই যথাযথভাবে কার্য সম্পাদন করতে পারছেনা বা করতে দেয়া হচ্ছে না। অথচ রাষ্ট্রকে সফল ও সার্থক করে তোলার জন্য রাষ্ট্রের সকল অঙ্গ ও উপঅঙ্গের সম্মিলিত প্রয়াস জরুরি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়।
শাসন বিভাগের অন্যতম স্তম্ভ হচ্ছে আমলাতন্ত্র বা ব্যুরোক্রেসি। সংবিধানে আমলাদেরকে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু একশ্রেণির দলবাজ আমলার কারণে প্রজাতন্ত্র যে তাদের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তা খুবই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। বিগত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে গয়েবী মামলা ও গ্রেফতার অভিযানকে আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দায়িত্ব বলে দাবি করা হলেও নির্বাচনে ভোট চুরি রোধে প্রশাসনের ভূমিকা রীতিমতো প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এমন গর্হিত ও রাষ্ট্রবিরোধী কাজকে প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার অভিযোগও জোরালো ভিত্তি পেয়েছে এবং সম্প্রতি এর অবগুন্ঠনও উম্মোচিত হয়েছে। যা সরকারি কর্মচারী বিধিমালা ও সংবিধানের মারাত্মক লঙ্ঘন বলেই বিবেচিত। সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদে সরকারি কর্মচারীদের কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘Every person in the service of the republic has a duty to strive at all time to serve the people.’ অর্থাৎ ‘সব সময় জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য’। কিন্তু আমাদের দেশের সিভিল প্রশাসন কি সেই সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ? উত্তরটা তো নেতিবাচকই হওয়ার কথা !
দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আমলাদের অপেশাদারী ও দলবাজ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা সম্পর্কে রাষ্ট্র বিজ্ঞানী অগ (Ogg) বলেন, (‘The body of the civil servants is an expert, professional, non-political, permanent and subordinate staff.’) অর্থাৎ ‘রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারা হবে সুদক্ষ, পেশাদারী, অধীনস্থ কর্মকর্তা যারা স্থায়ীভাবে চাকরি করেন এবং রাজনীতির সাথে যাদের কোনো সংশ্রব নেই’।
আমাদের দেশে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব ও ব্যর্থতার অভিযোগ নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। সম্প্রতি এই বিষয়ে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছে ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন’। এই নাগরিক সংগঠন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গুরতর অনিয়ম ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার(সিইসি)সহ সংশ্লিষ্টদের দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপ্রিম  জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের দাবি জানিয়েছে। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে শুধু ভোটে সীমাহীন অনিয়মই নয় বরং নির্বাচন কমিশনও ফলাফল জালিয়াতি করেছে বলে সুজন অভিযোগ করেছে।
দাবি করা হয়েছে, ঢাকা-১০ আসনে তাৎক্ষণিক ফল ঘোষণায় ৬৯.৯২ শতাংশ ভোট পড়েছে জানানো হলেও কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলে তা বেড়ে ৭৩.০৯ শতাংশ, ঢাকা-১১ আসনে ৬০.৪৬ শতাংশে ৬২.৬৫ শতাংশ, চট্টগ্রাম-৮ আসনে ৭৪.৪৪ শতাংশের বিপরীতে ৭৬.৭২ শতাংশ এবং গোপালগঞ্জ-৩ আসনে ৯৩.২৪ শতাংশের পরিবর্তে ৯৪.৩৩ শতাংশে উন্নীত হয় বলে সুজনের দাবি করেছে। দুই ফলের অনিয়ম তুলে ধরে বলা হয়, চট্টগ্রাম-১০ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থীর বেসরকারি ফলাফলে প্রাপ্ত ভোট ‘শূন্য’ দেখানো হলেও কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলে দেখানো হয়েছে যে ওই প্রার্থী ২৪৩টি ভোট পেয়েছেন। ব্যালট পেপার ও ইভিএমে ভোট প্রদানের মধ্যে ভোটের পার্থক্য ২৯.৩৮ শতাংশ উল্লেখ করে জানানো হয়, এবার নির্বাচনে ৩০০ আসনে মধ্যে ছয়টি আসনে সম্পূর্ণ ইভিএমের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ করা হয়। ৩০০ আসনে গড় ভোট পড়েছে ৮০.২০ শতাংশ। এর মধ্যে ব্যালট পেপারে ভোট হওয়া ২৯৪টি আসনের গড় ভোট ৮০.৮০ শতাংশ হলেও ইভিএমে গড় ভোট পড়েছে ৫১.৪২ শতাংশ। যে ২১৩টি ভোট কেন্দ্রে ১০০ শতাংশ ভোট পড়েছে, তা বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে দাবি করা হয়েছে। ৭৫টি নির্বাচনী এলাকার ৫৮৭টি ভোট কেন্দ্রে প্রদত্ত সকল ভোট নৌকা প্রতীকে পড়েছে। যা সুস্থ্য বিবেকসম্পন্ন কোন মানুষের কাছেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
উল্লেখিত তথ্যগুলো সুজনের নিজস্ব কোন তথ্য-উপাত্ত নয় বা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষেও এসব তথ্য দেয়া হয়নি বরং এসব নির্বাচন কমিশন প্রদত্ত তথ্য। বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা যখন বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক রিপোর্ট করে, টিআইবি থেকে শুরু করে অন্যান্য সংগঠন, তখন সরকার বা ইসির পক্ষে বলা হয় যে, তাদের তথ্যের উৎস সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের দেয়া তথ্য দিয়ে সুজন যে বোমা ফাটিয়েছে তা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান খোদ নির্বাচন কমিশনকেই রীতিমত আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
এসব অভিযোগ শুধু নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে এমন নয় বরং জনগণের জানমালের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধেও নির্বাচনে পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণের গুরতর অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে নানাবিধ অপরাধ ও পেশাগত অসদাচারণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অথচ এই বাহিনীর দায়িত্ব হলো আইন প্রয়োগের মাধ্যমে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা। খোদ পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, পুলিশের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ঘুষ নেওয়া, নানাভাবে হয়রানি, বিয়ের পর স্ত্রীকে ভরণ-পোষণ না দেওয়া ও যৌতুকের জন্য নির্যাতন, মামলা দায়েরের পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়া, জমি-জমা সংক্রান্ত এবং পুলিশ সদস্যের হুমকির মুখে জীবনের নিরাপত্তা চাওয়ার অভিযোগ আসছে। এগুলোর মধ্যে ঘুষ ও হয়রানির পর ভরণপোষণ না দেওয়ার জন্য পুলিশ স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রীর অভিযোগই বেশি। মাদক ব্যবসা, বিক্রি ও সেবনের অভিযোগ আছে। গত ৩১ জানুয়ারি পুলিশ সদর দফতর থেকে সারাদেশের পুলিশের জন্য ১০টি নির্দেশনা দেওয়া হয়। যারা মাদক বিক্রেতাদের কাছ থেকে অবৈধ সুযোগ-সুবিধা নেন,তাদের চিহ্নিত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও প্রয়োজনে ফৌজদারি মামলার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তার সাথে এবার নতুন অভিযোগ যুক্ত হয়েছে নির্বাচনী ক্ষমতাসীনদের পক্ষে প্রভাব খাটানো।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে অশুচী ও অশুদ্ধতা এখন আমাদের সমাজ-রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। প্রজাতন্ত্রের অধিনস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এখন নিজেদেরকে স্বাধীন ও সার্বভৌম মনে করতে শুরু করেছে। আর প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা এখন প্রভূর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। একথা মনে রাখা দরকার যে, রাজতন্ত্রের কর্মচারী ও প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী এক নয়। রাজতন্ত্রের কর্মচারীরা রাজার বেতনভুক্ত এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা নাগরিকদের বেতনভুক্ত কর্মচারী। তাই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারিদের জনগণের আবেগ-অনুভূতি ও প্রজাতন্ত্রের স্বার্থকেই অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতা এখন প্রান্তিক পর্যায়ে নেমে এসেছে। ঔপনিবেশিক শাসকরা স্বাধীনতাকামীদের যেভাবে নিপীড়ন-নির্যাতন করেছে, পাক হানাদার বাহিনী মুক্তিকামী বাংলাদেশিদের যেভাবে বর্বরতা চালিয়েছে, স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রাচারও গণমানুষের অধিকার হরণ এবং সে কাজকে আরও অধিকতর নির্বিঘœ করতে জনগণের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও গায়েবী মামলা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অভিযোগপত্র এবং নানাভাবে হয়রানী করা হচ্ছে। আর দাবি করা হচ্ছে তারা নিজেরাই শুদ্ধাচারি। একথা মনে রাখতে হবে যে, অশুচী কখনো শুদ্ধাচারি নয় বরং শুদ্ধাচারি হতে গেলে আগে নিজেকেই সবার আগে শুদ্ধ করতে হবে। তাই দেশে সুশাসন ও জনগণের অধিকার নিশ্চিতের জন্য কোন ক্ষেত্রেই বিচ্যুতি নয় বরং শুদ্ধতার পরীক্ষায় রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে উত্তীর্ণ হতে হবে। অন্যথায় দেশকে গণমুখী ও কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত করা কোন ভাবেই সম্ভব হবে না এবং আমাদের ভাগ্যবিড়ম্বনারও পরিসমাপ্তি ঘটবে না। স্বাধীনতার স্বপ্নও আমাদের কাছে অধরাই থেকে যাবে। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ