ঢাকা,বুধবার 31 July 2019, ১৬ শ্রাবণ ১৪২৬, ২৭ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

গোলাপ সংবাদ

আখতার হামিদ খান : গোলাপ নিয়ে উপকথার শেষ নেই। প্রেমিকা ভিনাস তাঁর প্রেমাম্পদ অ্যাডোনিসের সঙ্গে মিলিত হবার কামনায় অধীরপদে অভিসারে যাচ্ছিলেন। ঝোপের কাঁটার ঘায়ে তাঁর পা থেকে রক্ত ঝরে। সে রক্তই হয়ে ওঠে লাল গোলাপ। আরেক গল্প বলে: সিবিল ভিনাসের সৌন্দর্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিরূপে সৃষ্টি করেন গোলাপকে। কেউ বলেন প্রেমের দেবতা। মিউপিডের হাসির মূর্তরূপেই হল গোলাপ। আবার কেউ বলেন, ঊষাদেবী আরোরার কেশবিন্যাসের সময় ঝরে পড়ে গোলাপ। আরেক গল্পমতে গোলাপের আবির্ভাব হয় এক কুমারীর প্রার্থনায়। বেথেলহেমে তাঁকে অন্যায়ভাবে জীবন্ত দাহ করতে গেলে তিনি বিধাতার কাছে প্রার্থনায় রত হন। প্রার্থনা গৃহীত হলে বিধাতা লেলিহান কাষ্ঠ খ-গুলোকে লাল গোলাপ এবং অপ্রজ্জ্বলিতগুলোকে সাদা গোলাপে পরিণত করেন। আরেক গল্প আছে গোলাপ স্বর্গেই ফুটেছিল, তবে সাদা গোলাপ। আকৃষ্ট হয়ে ইভ তাকে চুম্বন করতে গেলে সাদা গোলাপটি লজ্জায় লাল গোলাপ হয়ে যায়। আরব্য উপাখ্যানে আছে: পদ্মফুল রাতে ঘুমায় বলেই বিধাতা দিবানিশি ফুটে-থাকা গোলাপ ফুল সৃষ্টি করেন। গানের পাখি বুলবুল ভালোবেসে সাদা গোলাপটিকে আলিঙ্গন করতে গেলে সেটি লাল গোলাপ হয়ে যায়। হিন্দু পুরাণে আছে: বিষ্ণু মর্ত্যে এসে সরোবরে যেখানে স্নান করছিলেন সেখানে একটি পদ্মফুল ফোটে। ফুলটি থেকে ব্রহ্মা বেরিয়ে এসে বিষ্ণুকে বলেন-ফুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম এটিই। বিষ্ণু ব্রহ্মাকে আমন্ত্রণ করে বৈকুণ্ঠে এনে গোলাপ দেখালে ব্রহ্মা স্বীকার করেন যে গোলাপই সৃষ্টির সেরা ফুল। আর একটা রূপকথা বলে শেষ করি। করিস্থের রূপসী রাণী রোদান্তে এক দঙ্গল প্রেমিকের এককালীন উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে ডায়ানদেবীর মন্দিরে আশ্রয় নিলে তাঁর পূজারীর দল রূপে মুগ্ধ হয়ে দেবীর বদলে রাণীর পূজা শুরু হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ডায়ানার ভাই অ্যাপোলো রূপসী রোদান্তেকে গোলাপ আর তাঁর প্রেমিকদের পোকামাকড়ে পরিণত করেন (আমি বলি এ কেমন বিচার-প্রেমাস্পদকাকে গোলাপ আর প্রেমিকদের পোকামাকড়? অবশ্য প্রেমিক তো পরোয়ানা। রূপের দীপে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহুতি দেয়াই তো তার নিয়তি)।
ইতিকথা ছেড়ে এবার ইতিহাসে যাই। বলা হয় মানুষের আবির্ভাব দশ লক্ষ বছর আগে। আর গোলাপের সূচনা ধরা হয় তিনশত থেকে ছয়শত লক্ষ বৎসর পূর্বে। সময়সীমার এই বিশাল হেরফেরটা ঘটে নিত্যনব আবিষ্কৃত ফসিল কিংবা জীবাশ্মের আধুনিক থেকে আধুনিকতর প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ মারফত প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে। প্রাকৃতিক গোলাপ জন্মে পশ্চিম এশিয়ার ফ্রিজিয়ায়- যার ভোগোলিক অবস্থান বর্তমান ইরাক-তুরস্কের সীমান্তের দুইপাশ জুড়ে। আর আধুনিক গোলাপের জন্ম ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলে। ফলে গোলাপের ইতিহাসও আরেকবার প্রমাণ করে: এশিয়া শিল্পী, ইউরোপ কারিগর। এশিয়া গোলাপ পেয়েছে প্রকৃতির কাছ থেকে। জহুরী জহর চিনেছে, স্থান দিয়েছে মুদ্রার পিঠে পতাকার গায়ে, কদর করেছ এমনি আরো নানান উপায়ে তবে ওই পর্যন্তই। প্রতিপক্ষের ইউরোপ এশিয়ার কাছ থেকে গোলাপটি পেয়ে নিজের প্রকৃতিযোগে তাকে পরিণত করেছে অনিন্দ্যসুন্দর আধুনিক গোলাপে।
গোলাপ প্রথমে যায় ইউরোপ ভূখণ্ডের গ্রিসে এবং স্থান পায় গ্রীকদের হৃদয়ে ও মস্তিষ্কে। সেখানে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের কবি সাফোর কবিতায় পুষ্পরাণীর অভিধা পায় গোলাপ। গ্রিক নিসর্গবিদ থিওফ্রেস্টাস (খ্রি. পূ. ৩৭২-২৮৭) গোলাপের বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন ইতিহাসে প্রথম এবং এর সম্প্রসারণ বিষয়েও অনেক অভ্রান্ত কথা বলেন সময়ের বহু পূর্বে- যেমন বীজের চেয়ে কাটিঙের প্রক্রিয়াই শ্রেয়। প্রাচীন হেলাসের সর্বত্রই গোলাপের প্রচলন ছিল। ঔপনিবেশিক গ্রীকগণই পুষ্পটিকে সিসিলিতে এবং সেখান থেকে আফ্রিকার প্রবর্তন করেন।
এরপর গোলাপ যায় রোমে এবং স্থান পায় তাদের বাগানে, দৈনন্দিনের জীবনে। কোনো কিছুকেই মনেপ্রাণে ভালোবাসতে রোমকগণ অভ্যস্ত নন। তাঁরা ভালোবাসেন দেহে মনে। গোলাপের প্রতি তাঁদের আসক্তির শারীরিক দিকটি ছিল ইতিহাসে নজিরহীন। বিত্তবান নাগরিকগণ গোলাপের ওপর হাঁটতেন, বসতেন, শুতেন, সঙ্গম করতেন এবং ঘুমাতেন। এমনকি গোলাপ তাঁরা খেতেনও-গোলাপের মধু, গোলাপের পুডিং। পান করতেন গোলাপের সুরা, ¯œান করতেন গোলাপের জলে। গোলাপের পাপড়ি দিয়ে তাদের বালিশের খোল পর্যন্ত পূর্ব হত। ভোজোৎসবের হলঘরে মেঝেতে থাকত গোলাপ পাপড়ির এক ইঞ্চি পুরু স্তর।
এই ফুলেল মেঝের পরতের পুরুত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিল পদমর্যাদার প্রতীক। এস ব্যাপারে যথারীতি সবার ওপর টেক্কা দিয়েছেন ম্রাট নিরো, মতান্তরে, হেলিওগাবালুস। এক রাজকীয় ভোজোৎসবে অতিথিশালার চাল থেকে নেমে আসা গোলাপের পাপড়িপ্রপাতে অনেক অতিথি ‘গোলাপসমাধি’ বরণ করেন। সম্ভবত করুণ দৃশ্যটি রচনায় সহযোগিতা করেছিলেন তাদের বেসামাল মাত্রার গোলাপাসব পান। গোলাপপাপড়ি সুযোগ্য রোমকদের গলার হার হত, রোগে ওষুধের কাজ করতে এবং ভাসত তাদের সুরার পাত্রে। গোলপভস্ম ব্যবহৃত হতস ম্যাসকারা হিসাবে। তাজা গোলাপের ব্যবহার ছিল কামোদ্দীপকরূপে। রোমক ভদ্রলোক গোপালজলে স্নান করে, গোলাপাসব পান করে, গোলাপঘটিত পিঠেপুলি- হালুয়ারুটি খেতেও ভালোবাসতেন। একটি রোমান রন্ধন ব্যবস্থাপত্র ছিল এরকম: এক পাউন্ড গোলাপ পাপড়ি চালনি দিয়ে চেলে হামাদনদিস্তার হামানে নিন, চার কাপ মগজ, আটটি ডিম, দেড় গ্লাস উত্তম দ্রাক্ষাসব, কয়েক চামচ তেল যোগ করুন, নিয়মমত মরিচ-লবণ দিয়ে আভেনে সেঁকে নিন এবং মজা চাখুন। এই গোলাপ ভজনায় বীরপুঙ্গব রোমানদের কোনো মেয়েলিপনা ছিল না। গোলাপমালা গলায় পরে সৈন্যগণ যুদ্ধে যেতেন, রোমে ফেরার সময় যুদ্ধবিজয়ী রথ থাকত গোলাপসজ্জিত। স্পষ্টতই, এত সব বিপরীতধর্মী চাহিদা মেটাতে রোমের গোলাপবাগানগুলো কুলিয়ে উঠত না। ফলে চাষীসাধারণ অধিকতর লাভজনক গোলাপ চাষে এতো বেশি ঝুঁকে পড়লেন যে, উপেক্ষিত হল কুঞ্জবন ঋার ফলবাগান। সঙ্কুচিত হল শস্যভূমি। শীতে গোলাপগুলি ন্যাড়া হয়ে গেলে সকলেরই গোলাাপ্রীতি থিতিয়ে আসে। ব্যতিক্রম শুধু রোমকগণ। তারা বাষ্পীয় তাপের গ্রীনহাউসে গোলাপ চাষ অব্যাহত রাখতেন। এই অভিনব ধারণা একেবারে অধুনা ছাড়া ইতিহাসে আর দেখা যায় না। তবুও গোলাপবিলাসী রোমানদের চাহিদামতো গোলাপের জোগান পাওয়া সম্ভব হত না।
গোলাপ পাপড়ি নৌকায় আমদানি করা হত ঈজিপ্ট থেকে। স্বভাবতই আমদানিটি ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কতিথ আছে যে বিলাস পণ্যটির একটি চালানোর জন্যে সেকালে সম্রাট নিরো মূল্য বাবদ ব্যয় করেছিলেন এক টন স্বর্ণ-একালে যার দাম হবে প্রায় দেড় লক্ষ মার্কিন ডলার। অবক্ষয়ের যুগে রোমীয় জীবনে গোলাপ লাম্পট্যের প্রতীকও হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অনেক অপকর্মের জন্য প্রয়োজনীয় গোপন বিনিময় সম্পন্ন হতো ‘সাব রোজা’, মানে গোলাপতলে-অর্থাৎ গৃহের একান্তে যেখানটায় শিরোপে ঝোলানো থাকত এক গুচ্ছ গোলাপ, ঝাড় লণ্ঠনের মতো। বিশেষ গোপনীয়তার সেই রোমীর অভিব্যক্ত ‘লঠ রম্রট’ সবিশেষ গোপনীয়তার অর্থে আজো প্রচলিত।
রোমের পতনের সঙ্গেই খতম হয়ে গেল এইসব আদিখ্যেতা, এমনকি সামগ্রিক গোলাপপ্রীতিও। আয়েশী ধনিকশ্রেণীর বিলুপ্তির সঙ্গে গোলাপ বাগানেও সুপ্তি নামে। ফের বন্যই হয়ে যায় বনের গোলাপ। খ্রিস্টসভ্যতার ওই অরুণ প্রভাতে পুষ্পরাণীর শুধু লালয়িতার আকালই নয়, গ্রহীতার সঙ্কটও দেখা দিয়েছিল। কারণ, প্রতিষ্ঠার সেই নাজুক পর্বে খ্রিস্টান গির্জা অখ্রিস্টান রোমানদের যাবতীয় পাপের একক প্রতীক জ্ঞান করে সুন্দরের দ্যোতক গোলাপকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিল। অত:পর খ্রিস্টসভ্যতা জয় করতে গোলাপের সময় লেগে যায় প্রায় চার শত বৎসর। তার পরে অবশ্যৗ লাল গোলাপ সম্মানিত হয় যীশুর শোণিতের প্রতীকরূপে, আর সাদা গোলাপ মেরীর কুমারীত্বের। এমনকি খ্রিস্টান চার্চের আশ্রয়েই মধ্যযুগের দুর্দিন কাটিয়ে গোলাপ তার আধুনিক লালয়িতাদের সাক্ষাৎ পায় এবং তাদের সাধনায় নবজন্মও লাভ করে।
ইংরেজ-ফরাসীর গোলাপ প্রীতির বৈশিষ্ট্য রোমানদের বিপরীত। সে এক গভীর ভালোবাসা, অপার শ্রদ্ধামিশ্রিত। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়: সম্রাট নাপোরিয়র (১৭৬৯-০১৮২১) আমলে ইঙ্গ-ফরাসী যুদ্ধেরকালে অধিকৃত ফরাসী নৌবহরে প্রাপ্ত গোলাপচারাগুলোকে বৃটিশ বাহিনী বিশ্বস্ততার সঙ্গে পাঠিয়ে দিত তাদের যথাঠিকানায়-মানে শত্রুসেনাপতির পত্নী সম্রাজ্ঞী জোসেফিনের মালমেজোঁ প্রাসাদের গোলাপবাগানে। ঘনঘোর যুদ্ধ যখন তুঙ্গে, তখনও ফরাসী সম্রাজ্ঞী তাঁর বিশেষ গোলাপের বিশেষ চার টি বিশেষ ছাড়পত্রের ছত্রছায়ায় পেয়ে যেতেন ইংল্যান্ডের বিশেষ নার্সারি কিংবা বিশেষ সংগ্রাহকের কাছ থেকে। তাঁরই উদ্যোগ ও প্রেরণার ফলে উনবিংশ শতকের প্যান্স বিশ্বের গোলাপরাজধানীর খ্যাতি লাভ করে এবং সে সূত্রেই আধুনিক গোলাপের জন্মও হয় সেখানেই, ফুলটির নামও রাখা হয় ‘লা ফ্রঁস’। গোলাপের ইতিহাসে ব্যক্তিবিশেষের অবদানের বিচারে গোলাপের এই নিষ্ঠাবতী প্রেমিকা এককথায় তুলনাহীন। গোলাপ যদি ফুলের রাণী হয়, জোসেফিন তবে গোলাপের রাণী।
আপাতত এশিয়ায় ফেরা যাক। ভারতবর্ষে গোলাপ আনেন প্রথম মোগলসম্রাট জহিরুদ্দীন মোহাম্মদ বাবর (১৪৮৩-১৫৩০) ইরাকের বসরা থেকেই। ভারতবর্ষীয়দের উদ্যানরচনাও শেখান এই শিল্পীসম্রাট। এমনকি গোলাপের জন্য আলাদা বাগান করার ধারণাও তাঁরই প্রবর্তনা। তবে ধারণাটি ব্যাপকভাবে বাস্তবায়িত হয় চতুর্থ মোগলসম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে (১৬০৫-২৭), গোলাপপ্রেমী সম্রাজ্ঞী মেহেরুন্নিসা নুরজাহানের উৎসাহে। তাঁর উদ্যোগে ও প্রেরণায় গোলাপচর্চা ছড়িয়ে পড়ে আমীর ওমরাহ এবং অন্যান্য রাজন্যবর্গের মধ্যে, স্থাপিত হয় শালিমার নিশাতবাগ প্রভৃতি গোলাপোদ্যান-দিল্লী, আগ্রা, লাহোর, কাশ্মীরসহ বিভিন্ন গোলাপনুকূল অঞ্চল্ েতবে গোলাপী আতর ইৎপাদনের নতুন প্রক্রিয়া উদ্বাভাবনের কৃতিত্বটি সম্রাট জাহাঙ্গীর (১৫৬৯-১৬২৭) তাঁর আত্মজীবনী ‘তুজুকে জাহাঙ্গীরী’তে স্ত্রী নুরজাহানের বদলে শাশুড়ী সালিমা বেগমকেই দেন।
বঙ্গদেশে গোলাপ আসে ব্রিটিশ যুগে উপনিবেশনের সূত্রে। উপনিবেশক জাতিটি ছিল  গোলাপপ্রেমীর অধিক, গোলাপপাগলই। কোটের বোতামঘরে বাটনহোলস্বরূপ গোলাপ পরতেন প-িত নেহরুও সর্বদাই। কিন্তু ব্রিটিশবাবুরা পিন মেরে ল্যাপেলের পেছনে লুকিয়ে ‘বাটনহোল-জলধার’ও পরিধান করতেন। আড়ালে থেকে জলভরা নলটি গোলাপের বৃন্তটি জলে ডুবিয়ে রেখে ফুলটির সজীবতার আয়ু বাড়াত বলে। উদ্যাপিত পুষ্প-লেখক ডক্টর হেসায়ন তাঁর ‘দ্য আর্মচেয়ার বুক অফ দ্য গার্ডেন’- নামক বিখ্যাত পুস্তকে জানাচ্ছেন যে যুক্তরাজ্যের বিশ মিলিয়ন পরিবারের মধ্যে সতেরো মিলিয়ন পরিবারেরই একটি বাগান আছে। তার মধ্যে শতকরা পঁচাশি ভাগ বাগানেই এগোরোটি গোলাপগুল্ম আছে গড়ে। শতকরা ষাট জন ব্রিটিশ নারীপুরুষই স্বহস্তে উদ্যানচর্যা করেন। তাদের শহরগুলোতে নাগরিকদের জন্য বরাদ্দকৃত সবজি চাষের প্লটের কিনারে এক মিটার চওড়া কেয়ারিতে গোলাপ ফোটানো বাধ্যতামূলক। এদেশের সূর্যকরোজ্জ্বল প্রকৃতির বুকে ইংরেজদের গোলাপচর্চার আগ্রহ আরেক ধাপ বেড়ে যায়, বিশেষত শৈলশহরগুলোতে। রাজধানী কলকাতা হয়ে যায় উপনিবেশকদের পুষ্পচর্চার কেন্দ্র। সেখানে গড়ে ওঠে এগ্রি-হর্টিকালচারাল সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া। পার্শ্ববর্তী হাওড়াতে বোটানিক্যাল গার্ডেন স্থাপিত হয় ১৮২০ সালে। অবশ্য শিবপুরের এই বাগানটি অষ্টাদশ শতাব্দীতেই শুরু হয়েছিল অন্য নামে। এইসব তৎপরতার ফলে বাংলা-বিহারের সীমান্ত এলাকা জুড়ে ব্যাপকভাবেই গোলাপের চাষ হতে থাকে এবং বিদেশীদের মধ্যে কাটা-ফুলের ব্যাপক চাহিদার কারণে সেখানে উপরোপ থেকে আধুনিক গোলাপের নতুন ভ্যারাইটিগুলোও আসতে থাকে সমানে।
বাণিজ্যতন্ত্রী জাতীটির বাণিজ্য জাহাজের নাবিকেরা দূরপ্রাচ্যের সাংহা ই-ক্যান্টন বন্দরনগরীগুলোর বাগানে নতুন গোলাপ দেখামাত্র দেশে পাঠানোর জন্য চারা সংগ্রহ করতো। একটানা সুদীর্ঘ সমুদ্র সফরে মরে যাবে বলে যাত্রাবিরতি ঘটিয়ে চারাগুলোকে শিবপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনে কিছুকাল লালনপালন করা হতো। সেই সুবাদেই কিছু কিছু গোলাপ গাছ এখানে থেকে যেত এবং আশেপাশে ছড়িয়েও পড়তো। কারণ কলকাতা ও তার আশেপাশে তখন গিজগিজ করত ইউরোপীয় পুষ্পপ্রেমী সম্প্রদায়। তাদের বাগানে কাজ করত দেশী মালী। তাদের মাধ্যমে বাঙালি অভিজাত মহলে তথা সমতল বাংলায় পৌঁছে যায় গোলাপ এবং দেশী-বিদেশী গোলাপের বিচিত্র সমাহারে এ ব্যাপারে বঙ্গদেশ ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চল থেকে সমৃদ্ধতরও হয়ে ওঠে। ফলে বাংলাতেই লেখা হল গোলাপচর্চার প্রথম ভারতীয় বই (প্রবোধচন্দ্র দে প্রণীত ও ১৯০৮ সালে প্রকাশিত ‘গোলাপ’ বাড়ী), প্রথম তিনজন ভারতীয় গোলাপ-সংকরকও ছিলেন বাঙালি (বোধিসত্ত্ব ভট্টাবার্য, বিজয় রায় চৌধুরী, শিবপ্রসাদ বন্দ্যেপাধ্যায়)। প্রসঙ্গত উল্লেখ যে এদেশ হয়ে চাইনীজ স্পিশিসগুলো ইউরোপে পৌছে সেখানকার স্পিশিসগুলোর সঙ্গে মিলিত হয়েই জন্ম দেয় আধুনিক গোলাপের। নবজাত প্রথম আধুনিক গোলাপ ‘লা ফ্রঁস’ ও অনতিবিলম্বেই বঙ্গে চলে আসা ব্রিটিশদের মাধ্যমে এবং বেশ জনপ্রিয়তাও লাভ করে এদেশে। এদিক থেকে দেখলে মনে হবে আজকের চোখ ধাঁধাানো আধুনিক গোলাপের সৃষ্টিকর্মে বঙ্গদেশও একটা ঐতিহাসিক অবদান রেখেছিল।
আধুনিক গোলাপ বাংলাদেশে আসে স্বাধীনতার পরপরই। দ্রুততম গতিতে গোলাপের উন্নততম মানের বংশবৃদ্ধির চাবিকাঠিই হল বাডিং কিংবা চোখকলম পদ্ধতি। এখানে প্রক্রিয়াটি ১৯৭২ সালেই আয়ত্ত করেন বিশিষ্ট হর্টিকারচারিস্ট এ এস. এম. কামালউদ্দীন। কিন্তু বিদ্যাটি তিনি বিতরণ করেননি। ১৯৭৩ সালে বোটানিক্যাল গার্ডেনে কর্মরত তকদানীন্তর ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসার গোলাম সাত্তর চৌধুরী বাডিং-বিষয়টি সার্বিকভাবে শিখে নিয়ে বিপুল উৎসাহে শেখাতে থাকেন পেশাদার মালাকর এবং অ্যামেচার রোজারিয়ানদের। এই গোলাপপ্রেমী ফরেস্টারের হাতেই সত্তর দশকের প্রথমভাগে গড়ে ওঠে বোটানিক্যাল গার্ডেনের গোলাপ বাগানটি। তাঁরই পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানে একই দশকের শেষভাগে বাংলাদেশ রাইফেলসের গোলাপ বাগানটিও যাত্রা শুরু করে। তিনি বাংলাদেশে নতুন গোলাপের প্রথম সংকরায়কও। ১৯৭৫ সালে প্রাপ্ত গোলাপটিকে তিনি প্রেরণাদাত্রী স্ত্রীর সম্মানে ‘ফাতেমা সাত্তার’- নামে জনসমক্ষে আনেন। এতসব অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে বাংলাদেশ জাতীয় গোলাপ সমিতি ১৯৮৯ সালের গোলাপ প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনী উপলক্ষে ‘গোলাপপিতা’ সম বলে একটি মানপত্র দান করে। বাংলাদেশ রাইফেলস্ এর গোলাপ বাগানটি চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠা লাভ করে আশির দশকের প্রথমভাগে, বাগানের নির্বাহী দায়িত্ব পালনকারী তদানীন্তন নায়েক-সুবেদার গোলাপপ্রেমী মীর হামিদুর রহমানের হাতে। তিনিও একটি গোলাপ প্রজনন করে ইনট্রোডিউস করেন, মানে জনসমক্ষে আনেন, স্ত্রীর নামে ‘রাহেলা হামিদ।’ গোলপভক্ত এই সৈনিকও তাঁর লব্ধ গোলাপ লালনবিদ্যা দেশময় ছড়িয়ে দেন দু’টি জাতীয় ওয়ার্কশপের মাধ্যমে।
তবে গোলাপচর্চা এদেশে আন্দোলনের রূপ নেয় যে দু’জন গোলাপ বিশেষজ্ঞদের উদ্যোগে ও শ্রমে তাঁরা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ডক্টর মাহবুবুর রহমান খান এবং তাঁর পত্নী বদরুন্নেসা সরকারী কলেজের বোটানির তদানীস্তন বিভাগীয় প্রধান মুফতি নুরুন্নেছা খাতুন। তাদের আন্তরিক চেষ্টায় ও নিরবচ্ছিন্ন নিষ্ঠায় ‘বাংলাদেশ জাতীয় গোলাপ সমিতি’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮২ সালে এবং ১৯৮৩ সাল থেকেই প্রবর্তিত হয় গোলাপ প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীর সাড়ম্বর বাৎসরিক অনুষ্ঠান। রূপরসগন্ধবর্ণমন্ডিত সেই অনুষ্ঠানটি ব্যাপক মিডিয়া কাভারেজ এদেশের গোলাপচর্চাকে এক অভূতপূর্ব গতি দান করে এবং তুঙ্গে তুলে রাখে প্রায় দেশ দশক ধরে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে গোলাপপ্রেমী এই দম্পতিও সংকরায়ণের মাধ্যমে একটি উল্লেখযোগ্য গোলাপ সৃষ্টি করেন। তাদের অকালপ্রয়াত পুত্র ‘শিবলি’র নামে অভিহিত সেই গোলাপটি ‘ইট্রোডিউস্ড’ না হলেও তার শত পাপড়ির ম্যাজেন্টা রঙটি আমার স্মৃতিতে রয়েছে আজো। গোলাপচর্চার সেই স্বর্ণযুগেই ‘মওলানা ভাসানী’- নামী বসরাই গোলাপের স্মৃতিজাগানিয়া অতীত সুগন্ধী একটি আধুনিক গোলাপ উপহার দেয় বোটানিক্যাল গার্ডেন। আধুনিক গোলাপে সুগন্ধ থাকে না কথাটা উনিশ শত ষাটের দশকের পরে আর চলে না। যদিও তার আগেও ‘ক্রিমসন গ্লোরি’ ‘মিরান্ডি’ ‘এনা হার্কনেস’ প্রমুখের মতো সুগন্ধী গোলাপ ছিল, তবে সংখ্যায় কম। বিলম্বে হলেও, সুরভির প্রতি গবেষকদের দৃষ্টি অবশেষে বিশেষভাবে আকৃষ্ট হবার ফলে ষাটের দশকের শুরু থেকেই প্রচুর সুগন্ধ গোলাপের বিশিষ্ট সুগন্ধটি রাসায়নিক সারজনিত আধুনিক বহুরূপী গোলাপের বিচিত্র সুগন্ধে সভ্য নাও হতে পারে। বোটানিক্যাল গার্ডেন ‘বঙ্গবন্ধু’ ‘সিটি অফ ঢাকা’ নামেও গোলাপ বের করেছিল। তবে সস্করায়ণে বিশেষ সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছিলেন তরুণ রোজারিয়ান মির্জা শোয়েব।
তাঁর সৃষ্ট ‘বায়ান্ন’ ‘একুশে’ ‘সূর্যোদয়’ ‘হেমন্ত’ ‘আনন্দ’ প্রভৃতি আধুনিক গোলাপ উল্লেখের দাবি রাখে। তবে গোলাপ নিয়ে আনন্দ আমাদের ব্যাহত হতে থাকে নব্বইয়ের দশক থেকেই। গোলাপচর্চার অভিযান প্রায় থেমেই যায় দশকটির মাঝামাঝি নাগাদ। কারণ একাধিক। এখানে আমি কেবল একটি বলেই শেষ করব। আমার মনে শহরে নগরে গোলাপের দ্রুতপদে পিছু হটার বড় কারণ হল বহুতল ভবনের লাগাম দিয়ে ছুটে চলা। মাটি হারিয়ে গোলাপ আশ্রয় নেয় দ্বিতল দালানের ছাদে অথবা ত্রিতল প্রাসাদের চাতালে। সেগুলিও গুঁড়িয়ে মাড়িয়ে দেশের অর্থনীতি বিধ্বংসী নভোগামী ইমারতের অনিয়ন্ত্রিত বংশবিস্তার ঘাতক ক্যানাসারের রূপ নিলে- রোদপিয়াসী গোলাপ পালিয়ে বাঁচতে চায় এক চিলতে বারান্দায়। সেখানেও যদি অভাগিণীর কপালে, কর্কটক্রান্তীয় রোদের বদলে, দক্ষিণের রৌদ্রটুকু মেলে-তবেই কেবল নগরীর শেষ গোলাপটি রক্ষা পেতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ