ঢাকা,বুধবার 31 July 2019, ১৬ শ্রাবণ ১৪২৬, ২৭ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ব্যক্তিগত তথ্য চলে যাচ্ছে অন্যের হাতে

জাফর ইকবাল : সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি বিষয় বেশ ভাইরাল হচ্ছে। সেটি হলো, নিজেকে ভবিষ্যতে কেমন লাগবে বা বুড়ো হলে চেহারার কি রকম পরিবর্তন হতে পারে, একইসাথে আপনার সাথে কার মিল রয়েছে এমন একটি অ্যাপের ব্যবহার। অনেকেই খুব স্বাচ্ছন্দ্যে সেটি শেয়ার বা ব্যবহার করছেন। কিন্তু অনেকেই জানেন, এর মাধ্যমে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। জানা গেছে, এরই মধ্যে মানুষজনকে বুড়ো আর তরুণ হলে দেখতে কেমন লাগবে সেই লোভ দেখিয়ে বিশ্বের ১৫ কোটি মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিয়েছে ‘ফেইস অ্যাপ’। এসবের উদ্দেশ্যই থাকে ব্যবহারকারীকে নানা রকম প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়া। এই ধরনের অ্যাপ থেকে কিভাবে নিজেকে রক্ষা করাই হচ্ছে এখন প্রধান কাজ। নিরাপদে থাকতে হলে এই অ্যাপগুলো সর্ম্পকে হতে হবে সচেতন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যাপ ‘ফেইসঅ্যাপ’-এর সাহায্যে তরুণ হয়ে যাচ্ছেন বৃদ্ধ, আর বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছেন তরুণ। সেই ছবি আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করে মজাও পাচ্ছেন অনেকে। কিন্তু সেই আনন্দের মধ্যে ক্রমেই দানা বাঁধছে আশঙ্কা। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এই অ্যাপের মাধ্যমে ফোনের সব ছবি চুরি বা ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে না তো? তবে শুধু ফেইসঅ্যাপ নয়, আরো নানানভাবে অনলাইনে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে অনেক অ্যাপ। ফেইসঅ্যাপ ব্যবহারের সময় ব্যবহারকারীদের কিছু ‘টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন’ দেওয়া হয়। তাতে উল্লেখ থাকে, আপনার ছবি ও নাম ফেইসঅ্যাপ কৃর্তপক্ষ চাইলে তাদের নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবেন। এ ছাড়া অ্যাপটি ব্যবহার করে ছবি সম্পাদনা করার আগে সেটিকে ফোনের স্টোরেজ পারমিশন দিতে হয়। এর ফলে অ্যাপটি চাইলেই ছবিসহ ফোনের স্টোরেজে থাকা যেকোনো ফাইল পড়ে ফেলতে পারে, এমনকি তা গোপনে নিজেদের সার্ভারে জমাও করতে পারে। প্রতিটি ছবি সম্পাদনার সময় ফেইসঅ্যাপ তা নিজেদের ক্লাউড সার্ভারে আপলোড করে। তবে এই বিষয়টি সম্পর্কে ফেইসঅ্যাপের মালিকানা প্রতিষ্ঠান ওয়্যারলেস ল্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা শুধু সম্পাদনার জন্য নির্বাচন করা ছবিটিই সার্ভারে আপলোড করে থাকেন এবং ৪৮ ঘণ্টা পর তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধ্বংস বা ডিলিট করে দেওয়া হয়। কিন্তু তাদের এ ধরনের বক্তব্যে অনাস্থা এনেছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। এ ছাড়া ফেইসঅ্যাপের অনেক ভুয়া সংস্করণও রয়েছে প্লেস্টোরে। এই ক্লোন বা নকল অ্যাপগুলো ব্যবহারকারীকে বোকা বানিয়ে ব্যবহারকারীর ডিভাইসে ক্ষতিকর অ্যাডওয়্যার ‘মোবিড্যাশ’ ইনস্টল করে। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক বেশি ডিভাইসে আক্রমণ চালানো যায়। চুরি করতে পারে ব্যবহারকারীর তথ্য।
বিয়ের পর আপনার ভবিষ্যৎ কেমন হবে? কিংবা আপনার ফেইসবুক প্রোফাইল কে বা কারা লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেন? চীনা হলে আপনাকে দেখতে কেমন লাগত? নাম বা কী হতো? এমন হাজারো প্রশ্নের উত্তর আমরা কমবেশি সবাই জানতে আগ্রহী। এমন ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে হস্তরেখাবিশারদ কিংবা জ্যোতিষীর কাছে না গেলেও চলবে। ফেইসবুকের হোম পেইজে এমন অনেক অ্যাপ রয়েছে। ফেইসবুকের এমন অ্যাপ আপনার অনেক বন্ধুই ব্যবহার করছেন। ফেইসবুকের নিউজ ফিডে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তথ্যের যেসব লিংক বন্ধুরা শেয়ার করেন, তা এই অ্যাপ ব্যবহার করেই। আপনি যখন ‘বিয়ের পর ভবিষ্যৎ কেমন হবে’ জানতে আগ্রহী হয়ে অ্যাপটিতে ঢুঁ মারবেন, তখন ওয়েবসাইটটিতে প্রথমে লেখা থাকবে ‘খেলাটি খেলতে এখানে ক্লিক করুন।’ তারপর তাতে ক্লিক করলে ফেইসবুকে লগইন করতে বলা হবে। এরপর ফেইসবুক থেকে কিছু তথ্য দেখার অনুমতি চাওয়া হবে। আপনি ভবিষ্যৎ জানার অতি আগ্রহে কোনো কিছু না ভেবেই অনুমতি দিয়ে দেন। ঠিক তখনই আপনার প্রোফাইলের তথ্যগুলো সংগ্রহ করে রাখে ফেইসবুক। এখানে শেষ নয়। কিছু সময় পর ফলাফলও দেখায় তারা। ফলাফলটি বন্ধুদের সঙ্গে ফেইসবুকে শেয়ার করতেও প্রলুব্ধ করা হবে। যাতে আপনার দেখাদেখি অন্যরাও আগ্রহী হয় এই ফাঁদে পা দিতে।
অ্যাপস্টোরে প্রতি মুহূর্তে বিভিন্ন ভুয়া, ম্যালওয়ার যুক্ত অ্যাপ উন্মোচন করে ডেভেলপাররা। ব্যবহারকারীরা অ্যাপগুলো ইনস্টল করলে নজরদারি চালানো হয় ব্যবহারকারীর ফোনের ব্যবহারের ওপর। ফোন দিয়ে কী খোঁজা হচ্ছে, কী কেনা হচ্ছে, প্রতিটি বিষয়ে নজর রাখে এই ম্যালওয়্যার। সেই ভিত্তিতে বারবার সেই সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন আসে ব্যবহারকারীর ফোনে। এমনকি মোবাইল ব্যবহার করার মধ্যেও ভেসে ওঠে বিরক্তিকর সব পপআপ। এভাবে চুরি হতে থাকে ব্যক্তিগত নানা তথ্য। সম্প্রতি প্লেস্টোরে তেমনি কিছু ক্ষতিকর অ্যাপ মুছে ফেলা হয়েছে। অ্যাপগুলো হচ্ছে- লুডো মাস্টার : নিউ লুডো গেম ২০১৯. ফল ফ্রি, স্কাই ওয়ারিয়র্স : জেনারেল অ্যাটাক, কালারফুল ফ্ল্যাশকল: স্ক্রিন থিম, বায়ো ব্লাস্ট ইনফিনিটি ব্যাটল শুট ভাইরাস, শুটিং জেট, ফটো প্রজেক্টর, গান হিরো : গানম্যান গেম ফর ফ্রি, কুকিং উইচ, ব্লকম্যান গো ফ্রি, রিলম অ্যান্ড মিনি গেমস, ক্রেজি জুসার হট নাইফ হিট গেম অ্যান্ড জুস ব্ল্যাস্ট, ক্লাস অব ভাইরাস, অ্যাংরি ভাইরাস, র‌্যাবিট টেম্পল, স্টার রেঞ্জ, কিস গেম: টাচ হার হার্ট, গার্ল ক্লথ, এক্সুরে স্ক্যান সিমুলেটর প্রভৃতি। এই অ্যাপগুলো আপনার ফোনে ইনস্টল থাকলে দ্রুত মুছে ফেলাই উত্তম।
এ ধরনের অ্যাপগুলো তৈরি করার পেছনে বিশাল এক বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য আছে। অ্যাপ্লিকেশনগুলো কেউ ব্যবহার করলে ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে কিছু তথ্য নেয়ার অনুমতি চাওয়া হয়। এর মধ্যে থাকে ফোনের লোকেশনের তথ্য, মিডিয়া এক্সেস, ফোন তথ্য ইত্যাদি। ফেইসবুকভিত্তিক অ্যাপগুলো ফেইসবুক ব্যবহারকারীর নাম, মেইল আইডি, মোবাইল নম্বর, ছবি, লাইক শেয়ার, ফেইসবুক বন্ধু তালিকা, মেসেজ দেখার অনুমতি ইত্যাদি পেয়ে থাকে। কিছু অ্যাপ ফেইসবুকে আপলোড করা ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহারেরও অনুমতি নেয়। সংগৃহীত বা চুরি করা তথ্যগুলো নানা কাজে ব্যবহার করা হয়। বিক্রি করে দেওয়া হয় ফোন নম্বর ও ই-মেইল ঠিকানাগুলো। অনলাইন বিজ্ঞাপনের মারফত পণ্যের প্রচারণায় ব্যবহার করা হয়।
ব্লুস্কিম সফটওয়্যার লিমিটেডের সিনিয়র ডেভেলপার শেখ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তথ্য বিক্রির পাশাপাশি অ্যাপগুলো ব্যবহারকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে হ্যাকিংয়ের অ্যালগরিদমে ব্যবহার করে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) শক্তিশালী করতে অসংখ্য ছবি প্রয়োজন হয়। এ অ্যাপগুলো থেকে পাওয়া ছবি দিয়ে এ কাজে ব্যবহার করা হয়। অনেকে পর্নোসাইটে বিকৃতভাবে ব্যবহারের মতো বিভিন্ন অনৈতিক উদ্দেশ্যেও ছবিগুলো ব্যবহার করে থাকে।
সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজিস্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ আলভিন রদ্রিগেজ বলেন, বর্তমানে ফেইস আনলক প্রযুক্তি মোবাইল বা কম্পিউটারে ব্যবহার করা হয়। চেহারা এমন পাসওয়ার্ড, যা পরিবর্তন করা যায় না। ব্যক্তিগত ও স্থায়ী এ পাসওয়ার্ডকে ক্লাউডে আপলোড করে হ্যাকারদের হাতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র তুলে দিচ্ছেন আপনি।
বেসিসের সাবেক সভাপতি ও বিডি জবসের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব সচেতন। ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে ফেইসবুক ও গুগলের বিরুদ্ধে মামলা চলছে অনেক দেশে। আমাদের এখানে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ফেইসবুকে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে খুব কম ব্যবহারকারীই সচেতন। এই সুযোগে ফেইসবুকের পাশাপাশি থার্ড পার্টি অ্যাপগুলো তথ্য হাতিয়ে নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করছে। তথ্যের সুরক্ষায় ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয়ভাবে সচেতন হওয়ার প্রয়োজন।
যেভাবে নিরাপদ থাকবেন : স্মার্টফোনের কারণে অ্যাপনির্ভর অনেক সেবা তৈরি হচ্ছে। এসবকে কাজে লাগিয়ে অ্যাপকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে সাইবার সস্ত্রাসীরা। অ্যাপে ডাউনলোডের সময় যে বিষয়গুলো মাথায় রাখা উচিত।
অফিশিয়াল অ্যাপ স্টোর থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করুন: সব সময়ই অফিশিয়াল অ্যাপ স্টোর থেকেই অ্যাপগুলো ডাউনলোড করুন। যদিও অফিশিয়াল অ্যাপ স্টোরগুলোতেও অনেক সময় ক্ষতিকারক অ্যাপ খুঁজে পাওয়া যায়। তবে অফিশিয়াল অ্যাপ স্টোর কর্তৃপক্ষ সেগুলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সরিয়ে ফেলতে সচেষ্ট থাকেন। তাই সর্বদা অফিশিয়াল অ্যাপ স্টোরগুলোর ওপরই ভরসা রাখুন। এতে ভুয়া অ্যাপ ডাউনলোডের সম্ভাবনা অনেক কমে যাবে।
অ্যাপের বিবরণ পড়ুন : যদি কোনো অ্যাপে প্রচুর বানান বা ব্যাকরণগত ভুল খুঁজে পান, এ ক্ষেত্রে এটিকে ভুয়া অ্যাপের সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবেই ধরে নিতে পারেন। কেননা সন্দেহ নেই যে কোনো বিশ্বস্ত ডেভেলপার এ ধরনের ভুল করবেন না। তাই কোনো একটি অ্যাপের মৌলিক বিবরণে এ ধরনের ভুল থাকা মানেই হলো সেই অ্যাপটি ভুয়া হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
ডাউনলোডের সংখ্যা : অ্যাপটি আসলে ভুয়া নয় তা যাচাই করার এটি খুবই ভালো একটি সূচক হলো ডাউনলোড সংখ্যা। সংখ্যা বেশি হলে ধরে নিতে হবে অ্যাপটি ঠিক আছে। অন্যথায় কোন সমস্যা আছে সেটি ধরেই নিতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ