ঢাকা, বৃহস্পতিবার 1 August 2019, ১৭ শ্রাবণ ১৪২৬, ২৮ জিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

টাকার পরিমাণে রেকর্ড হলেও প্রবৃদ্ধি হার বিগত ১১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম

স্টাফ রিপোর্টার : সদ্য সমাপ্ত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ২ লাখ ২৩ হাজার ৮৯২ কোটি ৪২ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। রাজস্ব আদায়ের পরিমাণে অতিতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। এ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধির হার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা গত ১১ অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিভিন্ন সেক্টরের ভ্যাট অব্যাহতি, বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে শুল্ক ও আয়কর অব্যাহতি দেয়া ও বড় বড় প্রকল্প চালু করায় গতবছর রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি কমেছে বলে জানান এনবিআর চেয়ারম্যান।
গতকাল বুধবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভবনের সম্মেলন কক্ষে এনবিআরের চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া এসব তথ্য তুলে ধরেন। এ সময় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, পাঁচ বছর আগে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১২ দশমিক ৩ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরে (২০১৩-১৪) প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। শুধু তাই নয়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধির হার যেখানে ছিল ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ, সেখানে পরের এই ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের রাজস্ব আহরণ নিয়ে বিভিন্ন জন বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা বলে থাকেন। কেউ কেউ বিষয়টির ভিন্নতর ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। কোনোভাবেই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না বলে মনে করেন। তবে আমরা মনে করি, অত্যন্ত সুকৌশলে ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা মাফিক এগোচ্ছি।
রাজস্ব আদায় প্রবৃদ্ধির হার কম হওয়ার বিষয়ে মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, উন্নত দেশে রূপান্তরিত হতে সরকার বেশ কিছু বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা রাখতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব অব্যাহতি দিতে হচ্ছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া গত অর্থবছরের ভ্যাটের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু খাতে যেমন গ্যাস, ইন্টারনেট, রফতানিমুখি গার্মেন্টস শিল্প, সোলার মডিউল, ট্রাভেল এজেন্ট, বেবী লোশন, হাওয়াই চপ্পল ও কম্পিউটার যন্ত্রাংশে প্রায় ১৫ হাজার ১৯২ কোটি ৬ লাখ টাকার ভ্যাট অব্যাহতি  দেওয়া হয়েছে। কাস্টমসের ক্ষেত্রে মূলধনী যন্ত্রপাতি, ব্যাগেজ রুলস, মোবাইল ম্যানুফ্যাকচারিং, পোল্ট্রি রিলিফ গুডস, শিপ, বেজা ও কূটনৈতিক মিশনে প্রায় ১ হাজার ৫০২ কোটি টাকার আমদানি শুল্ক অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
কোন খাত থেকে কত অর্থ আদায় করা হয়েছে তার ব্যাখ্যা দিয়ে মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া জানান, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আয়করে ৭২ হাজার ৮৯৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা মোট রাজস্বের ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ। ভ্যাট থেকে ৮৭ হাজার ৬১০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা মোট রাজস্বের ৩৯ দশমিক ১ শতাংশ।
কাস্টমস থেকে ৬৩ হাজার ৩৮২ কোটি ১৬ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে এনবিআর, যা মোট রাজস্বের ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ মোট ২ লাখ ২৩ হাজার ৮৯২ কোটি ৮২ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করা হয়েছে। টাকার পরিমাণে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেলেও প্রবৃদ্ধির হারে তা গত ১১ বছরের মধ্যে কম।
এনবিআরের তথ্য মতে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ, ২০১০-১১ অর্থবছরে ২৮ শতাংশ, ২০১১-১২ অর্থবছরে ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১২ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৩ দশমিক ২ শতাংশ, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।
উল্লেখ্য, বিদায়ী অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ২ লাখ ৮০ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। আর এনবিআর এই সময়ে রাজস্ব আহরণ করেছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সংশোধিত রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫৬ হাজার ১৮১ কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে। 
মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, দেশের চার কোটি লোকের কর দেওয়ার সামর্থ্য আছে। তাঁদের বেশির ভাগই স্বতঃপ্রণোদিতভাবে কর দেন না। আমরা তাঁদের কর জালে আনার উদ্যোগ নিয়েছি। বর্তমানে সারা দেশে ৪০ লাখ কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) বা নিবন্ধিত করদাতা আছেন। এর মধ্যে ২২ লাখ টিআইএনধারী গত বছর বার্ষিক আয়কর বিবরণী জমা দিয়েছেন।
এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, নতুন করদাতা খুঁজে বের করতে এনবিআরের ২১৩টি দল কাজ করছে। এসব দলে কর কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা আছেন। গত অর্থবছরে ৩ লাখ ৩১ হাজার ২৭২ জন নতুন করদাতা পাওয়া গেছে। তাঁদের কাছ থেকে ২৮ কোটি টাকা কর পাওয়া গেছে। চলতি অর্থবছরে ৬ লাখ ৭২ হাজার নতুন করদাতা পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, চলতি বছরে আরও চার-পাঁচ লাখ নতুন করদাতা বার্ষিক রিটার্ন জমা দেবেন। যাঁরা টিআইএন নিয়েছেন এবং করযোগ্য আয় আছে, কিন্তু রিটার্ন জমা দেবেন না, তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে এনবিআর।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ