ঢাকা, সোমবার 5 August 2019, ২১ শ্রাবণ ১৪২৬, ৩ জিলহজ্ব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ধর্মপ্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য থামিয়ে দিলেন প্রতারিত হজ্বযাত্রীরা

স্টাফ রিপোর্টার: ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো: আব্দুল্লাহ মঞ্চে বসে যখন এ বছরের হজ্বযাত্রার সফলতার নানাদিক তুলে ধরছেন, ঠিক তখনি সামনের দর্শক সারি থেকে উঠে এসে তার বক্তব্য থামিয়ে দিলেন প্রতারণার শিকার ৪ হজ্বযাত্রী। গতকাল রোববার সকালে আশকোনার ঢাকা হজ্ব অফিসে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী। অনুষ্ঠানের প্রায় শেষ দিকে মন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, এ বছর হজ্ব ব্যবস্থাপনায় কোনো অনিয়ম হয়নি। কোনো হজ্বযাত্রী প্রতারিতও হয়নি। হজ্ব অফিসের তিন তলার হল রুমে সাংবাদিক ছাড়াও সেখানে হজ্বযাত্রী, কর্মকর্তা ও ওলামা-মাশায়েখদের অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রী সবার উদ্দেশে জানতে চান, প্রতারিত হয়ে হজ্বে¡ যেতে পারছেন না, এমন কেউ কি আছেন?
এ সময় হল রুমের দক্ষিণ-পূর্ব কর্ণার থেকে বয়োবৃদ্ধ চারজন হজ্বযাত্রী এগিয়ে এসে মন্ত্রীর সামনে একেবারে মঞ্চের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে তাদের আইডি কার্ড ও ভিসার কপি দেখিয়ে বলেন, আমরা এজেন্সি দ্বারা প্রতারিত হয়েছি। আমরা প্রত্যেকেই সাড়ে তিন লাখ টাকা করে এজেন্সিকে দিয়েছি। আমাদের ভিসাও হয়েছে। এখন বিমান টিকিট আমাদের দেয়া হচ্ছে না। এসময় মন্ত্রী বলেন, ঠিক আছে, আমি যেহেতু আজ (রোববার) দুপুরের পরেই হজ্বে চলে যাচ্ছি তাই হজ্ব অফিসারকে বলে যাচ্ছি তিনি বিষয়টি দেখবেন। আপনাদের কাগজপত্র সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আপনারা অবশ্যই হজ্বে যেতে পারবেন। এর আগে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আব্দুল্লাহ বলেছেন, হজ্বযাত্রীদের সাথে প্রতারণা করলে কেউই ছাড় পাবেন না।
তিনি বলেন, প্রতি বছরই হজ্বযাত্রীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এতেই প্রমাণ হয় বাংলাদেশের মানুষের আর্থিক সক্ষমতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। হজ্বযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সরকার সম্ভব সব ধরনের চেষ্টা করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এদিকে পঞ্চগড়ে ৩৭জন হজ্বযাত্রী প্রতারণার শিকার হয়ে রাস্তায় বসে কাঁদছেন।
প্রতারিত ওই চার হজ্বযাত্রী জানান, তারা প্রত্যেকেই পদ্মা ট্রাভেলস নামের (লাইসেন্স নং ১২৬৬) একটি এজেন্সিকে সব টাকা পরিশোধ করেছেন। ভিসাও তারা হাতে পেয়েছেন। একদিন আগে পর্যন্ত তাদের বিমান টিকিটও ওকে ছিল। কিন্তু আজ অনলাইনে তাদের বিমান টিকিট ব্লক দেখানো হচ্ছে। আর এজেন্সির লোকজনও তাদের কাছে আরো অতিরিক্ত টাকা দাবি করছেন। অন্যথায় তাদের হজ্বে নেয়া হবে না বলেও হুমকি দিচ্ছেন আবু হাসান নামের ঐ এজেন্সিরই একজন গ্রু লিডার।
প্রতারিক এই চার হজ্বযাত্রীর নাম ইদ্রিস আলী, নুরুল ইসলাম, জাহানারা বেগম ও আবদুস সবুর খান। তাদের প্রত্যেকেরই বাড়ি সাতক্ষীরা জেলার পাটকেলঘাটা থানায়। আবদুস সবুর খান জানান, তিনি হজ্বের জন্য মোট তিন লাখ ৬০ টাকা দিয়েছেন। আর ইদ্রিস আলী দিয়েছেন তিন লাখ ৫৫ হাজার টাকা। নুরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী জাহানারা বেগম দিয়েছেন দু'জনে প্রায় ৬ লাখ টাকা। ফসলী জমির ২১ কাঠা বিক্রি করে সস্ত্রীক হজ্ব করার জন্য টাকা জমা দিয়েছেন বলে জানান এই হজ্বযাত্রী।
এদিকে প্রতারিত এই হজ্বযাত্রীদের বিষয়ে ঢাকা হজ্ব অফিসের পরিজচালক মো: সাইফুল ইসলাম জানান, কোনো হজ্বযাত্রীই হজ্বে যাওয়ার বাদ পড়বে না। আমরা তাদের কাগজপত্রগুলো দেখবো। সব ঠিক থাকলে অবশ্যই তারা হজ্বে যেতে পারবেন। আমরা এজেন্সি মালিককে ডেকে অবশ্যই এর কৈফিয়ত চাইব। প্রয়োজনে আমরা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতেও দ্বিধাবোধ করবো না।
পঞ্চগড় সংবাদদাতা: সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেও দালালের খপ্পরে পড়ে হজ্বে যাওয়া হলো না ৩৭ মুসল্লির। হজ্বে পাঠানোর কথা বলে কথিত মোয়াল্লেমসহ একটি চক্র কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে উধাও। এ অবস্থায় কাঁদছেন ৩৭ মুসল্লি।
দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে হজ্বে যেতে না পারায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা। টাকা উদ্ধারসহ প্রতারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গতকাল রোববার প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। প্রতারণার শিকার মুসল্লিরা জানান, মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় আয়োজন পবিত্র হজ্বের শেষ সময়ের প্রস্তুতি চলছে। হজ্বের উদ্দেশ্যে হাজিরা এখন মক্কায় অবস্থান করছেন। এ অবস্থায় হজ্বের প্রস্তুতি নিয়ে স্থানীয় মোয়াল্লেমের মাধ্যমে হজ্ব এজেন্সির নির্ধারিত টাকা পরিশোধ করেও হজ্বে যেতে পারেননি পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকার ৩৭ জন হজ্বযাত্রী। এদের কেউ জমি বিক্রি করে কেউ গরু বিক্রি করে হজ্বের জন্য টাকা জমা দিয়েছেন। কিন্তু কথিত মোয়াল্লেম ওয়াছেদ আলীসহ প্রতারক চক্র এসব হজ্বযাত্রীর কোটি টাকা নিয়ে উধাও। তাই প্রাক-নিবন্ধন করলেও আর হজ্বে যাওয়া হলো না তাদের। অনেকে মিলাদ-মাহফিল, দোয়ার অনুষ্ঠান করে হজ্বে যাওয়ার জন্য স্বজনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছেন। এখন সমাজে তাদের মুখ দেখানো কঠিন হয়ে পড়েছে। হজ্বে যেতে না পারায় এখন তারা কাঁদছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পঞ্চগড় সদর উপজেলার টুনিরহাট ফকিরপাড়া এলাকার মোয়াল্লেম ওয়াছেদ আলী ও কুমিল্লার লাকসাম এলাকার আব্দুল জলিল এটিএম ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস লিমিটেড ও সানফ্লাওয়ার এয়ার লিংকার্সসহ বিভিন্ন হজ্ব এজেন্সির নামে দুই লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা গ্রহণ করেছেন। তাদের হজ্বে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলা হয়। সেই মতো হজ্বে যাওয়ার জন্য প্রাক-নিবন্ধনও করেন তারা। কথা ছিল শেষ দিকে তাদের হজ্বে পাঠানো হবে। মোয়াল্লেম ওয়াছেদের কথা মতো তারা হজ্বের যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন। কিন্তু শেষ দিকে এসে টালবাহানা করেন ওয়াছেদ। একপর্যায়ে ঘা ঢাকা দেয় ওয়াছেদসহ প্রতারক চক্রের সবাই। এতে হজ্বের আগ মুহূর্তে দিশেহারা হয়ে পড়েন ৩৭ জন মুসল্লি। চাহিদামতো টাকা দিয়েও হজ্বে যেতে না পারায় কষ্টের সীমা নেই তাদের। দিশেহারা হয়ে বিভিন্ন দপ্তরের সহযোগিতার জন্য ঘুরছেন তারা। ভুক্তভোগীরা তাদের টাকা উদ্ধারসহ প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন তারা।
 তেঁতুলিয়া উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা বশির আলম বলেন, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা থেকে জমিয়ে হজ্বে যাওয়ার জন্য টাকা জমা দিয়েছিলাম। মোয়াল্লেমসহ প্রতারক চক্রের কবলে পড়ে হজ্বে যাওয়া হলো না। আমাদের টাকা উদ্ধারসহ পরবর্তী বছরে যেন আমরা হজ্বে যেতে পারি সে ব্যবস্থা করার জন্য প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানাই।
লিয়াকত আলী নামে আরেক ভুক্তভোগী বলেন, আমরা ওয়াছেদের কথামতো হজ্বে যাওয়ার সব প্রস্তুতি নিয়েছি। বাড়ির সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়েছি। মিলাদ মাহফিল করেছি। হজ্বের কাপড় কিনেছি। এ অবস্থায় আমরা আর যেতে পারলাম না। আমরা এই প্রতারকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। আর কোনো হজ্বযাত্রীর সঙ্গে যেন এমনটা করতে না পারে তারা। পঞ্চগড় জেলা শহরের মিলগেট এলাকার ক্বারী কছিম উদ্দিন বলেন, শেষ মুহূর্তে এসে আমরা জানতে পারি প্রতারকের খপ্পরে পড়েছি। তারা গা ঢাকা দেয়। আমাদের ভুয়া মেডিকেল করিয়েছে তারা। আমাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে জমা দেয়নি। এমনকি আমাদের পাসপোর্টগুলোও তাদের হাতে আছে। আমরা আমাদের টাকা ও পাসপোর্ট উদ্ধারসহ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাই। পঞ্চগড় হাড়িভাসা এলাকার ইসমাইল হোসেন বলেন, ওয়াছেদ আমাদের চ্যালেঞ্জ করেছে না নিয়ে যেতে পারলে ডাবল টাকা ফেরত দেবে। বিশ্বাস করে তার হাতে টাকা দিয়েছি। তাকে নিয়েই হজ্বের উপকরণ কিনেছি। শেষ মুহূর্তে এসে জানতে পারি তারা আমাদের নামে কোনো টাকা জমা করেনি। আল্লাহর ঘর জিয়ারত করার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু যেতে পারলাম না। এদিকে মোয়াল্লেম ওয়াছেদ আলী ও আব্দুল জলিলের মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তাদের নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি আমি। তারা আমাকে জানিয়েছেন, প্রাক-নিবন্ধন হলেও মূল নিবন্ধন না হওয়ায় তাদের এবার হজ্বে যাওয়ার সুযোগ নেই। ভুক্তভোগীদের আইনের আশ্রয় নেয়ার পরামর্শ দিয়েছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ