ঢাকা, রোববার 11 August 2019, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৬, ৯ জিলহজ্ব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সরকারের নীতি সহায়তা না থাকায় ডুবতে বসেছে চামড়া শিল্প

* গত সাত বছরে গরুর চামড়ার দাম অর্ধেকে নেমেছে
* ছাগলের চামড়ার দাম তিন ভাগের দুই ভাগই নেই
* এবারও চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার শঙ্কা
মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান: বাংলাদেশের সবকিছুতে ঊর্ধ্বমুখিতা বিরাজ করছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে পোশাক, আসবাবপত্র, বাসাভাড়া, পরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি এমনকি নিত্যদ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে অতিষ্ট জনজীবন। সবকিছুই মধ্যবিত্তের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। যে চামড়া দিয়ে তৈরি হয় জুতা-সেন্ডেল তার দামও আকাশচুম্বি। কিন্তু যে পণ্য বিক্রির অর্থদিয়ে গরীব-অসহায় ও কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হয় তার দাম নিচে নামতে নামতে তলানিতে ঠেকেছে। প্রতিবছর কমছে পশুর চামড়ার দাম। গত বছরের দাম এ বছরেও বহাল থাকলেও এই দাম সাত বছর আগের দামের তুলনায় খুবই কম। হিসাব বলছে, গত সাত বছরে গরুর চামড়ার দাম কমে হয়েছে অর্ধেক, আর খাসির চামড়ার দাম কমে এক-তৃতীয়াংশেরও নিচে নেমে এসেছে। আবার গত বছরের তুলনায় অন্তত ২৫ লাখ পিস চামড়া কম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা। যদিও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবছর কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা গত বছরের চেয়ে বেশি। গত বছরের চেয়ে বেশি কোরবানি হবে বলেও ধারণা করছে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর। কোরবানির পশুর সংখ্যা বাড়লেও কেন চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়েছে, সে সম্পর্কে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি সংগঠনের নেতারা। তবে অনেকে অর্থের অভাবের কথা জানিয়েছেন। সবমিলে সরকারের নীতি সহায়তা না থাকায় ডুবতে বসেছে চামড়া শিল্প।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী অর্থের অভাবে তারা চামড়া কেনার লক্ষ্যমাত্রা কমিয়েছে। এটা চামড়া শিল্পের জন্য শুভ লক্ষ্যণ নয়। এ শিল্পের সুদিন ফেরাতে সরকারের উচিত ছিল ব্যবসায়ীদের নীতি-সহায়তা দেওয়া। এমনিতেই ট্যানারি হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরিত হওয়ায় ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে ব্যবসায়ীদের। চামড়া শিল্পের আন্তর্জাতিকবাজার হারিয়েছে ব্যবসায়ীরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টানা ক্ষমতায় থেকেও আওয়ামীলীগ সরকার চামড়া শিল্পের সুদিন ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছে। সরকারের উদাসিনতা ও নীতি সহায়তা না থাকায় ডুবতে বসেছে চামড়া শিল্প।
প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এ বছর কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ১ কোটি ১৮ লাখ। এর মধ্যে অন্তত ১ কোটি ১০ লাখ পশু কোরবানি হতে পারে বলে ধারণা করছে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর। অন্যদিকে, গত বছর ঈদে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৫ লাখ। এর মধ্যে ১ কোটি ৫ লাখের মতো পশু কোরবানি হয়েছিল।
এ বছর কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা বাড়লেও কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা এক কোটি পিস পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছেন। গত বছর এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল সোয়া এক কোটি পিস। অর্থাৎ, আগের বছরের তুলনায় অন্তত ২৫ লাখ পিস চামড়া কম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছেন তারা।
হিসাব বলছে, গত সাত বছরে গরুর চামড়ার দাম কমে হয়েছে অর্ধেক, আর খাসির চামড়ার দাম কমে এক-তৃতীয়াংশেরও নিচে নেমে এসেছে। ২০১৩ সালে যেখানে গরুর চামড়ার দাম ছিল প্রতি বর্গফুট ৮৫ থেকে ৯০ টাকা, সেখানে এ বছর এই চামড়ার দাম ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় নেমে এসেছে। অন্যদিকে, ২০১৩ সালে সারাদেশে খাসির চামড়ার দাম ছিল প্রতি বর্গফুট ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। এ বছরে এর দাম ঢাকার মধ্যেই নেমে এসেছে ১৮ থেকে ২০ টাকায়। কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের এমন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ফলে চামড়ার দাম নিয়ে এখনই শঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদিও বরাবরের মতোই সরকার এ বছরও কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর সারাদেশে যে পরিমাণ পশুর চামড়া পাওয়া যায়, তার অর্ধেকেরও বেশি আসে কেবল ঈদুল আজহার সময়। এ বছরও এক কোটির বেশি পশু কোরবানি হতে পারে বলে জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। এই বিপুল পরিমাণ পশুর চামড়া যেন দেশ থেকে পাচার হয়ে না যায় এবং চামড়া সংগ্রহকারীরাও যেন প্রকৃত মূল্য পায়, সেটি নিশ্চিত করতেই সরকার প্রতিবছর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি মাসের ৬ তারিখে এক বৈঠকে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বৈঠকে জানানো হয়, এবারের ঈদুল আজহায় কোরবানি হওয়া গরুর চামড়ার দাম রাজধানীতে প্রতি বর্গফুট ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। ঢাকার বাইরে এর দাম ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। এছাড়া, খাসির কাঁচা চামড়ার দাম সারাদেশে প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা ও বকরির চামড়ার দাম ১৩ থেকে ১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর আগের কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৩ সাল থেকেই কমছে চামড়ার দাম। ওই বছর ঢাকার ভেতরে গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ৮৫ থেকে ৯০ টাকা, ঢাকার বাইরে ৭৫ থেকে ৮০ টাকা। পরের বছর ২০১৪ সালে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা ছিল ঢাকার ভেতরে ৭০ থেকে ৭৫ টাকা, ঢাকার বাইরে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। ২০১৫ সালে আরও কমে এই দাম। ওই বছর প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ঢাকার ভেতরে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, ঢাকার বাইরে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। এর পরের বছর ২০১৬ সালে অবশ্য ব্যবসায়ীরা চামড়ার দাম নির্ধারণ করেন। ওই বছর গরুর চামড়ার দাম নির্ধারিত হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ঢাকার ভেতরে ৫০ ঢাকা, ঢাকার বাইরে ৪০ টাকা। এক বছর বিরতি দিয়ে ফের চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয় সরকার। ২০১৭ সালে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ঢাকার ভেতরে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, ঢাকার বাইরে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। এখন এই দাম ঢাকার ভেতরে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়।
খাসি ও বকরির চামড়ার দামের অবস্থা আরও বেহাল। ২০১৩ সালে সারাদেশে খাসি ও বকরির চামড়ার দাম ছিল প্রতি বর্গফুট ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। পরের বছর তা একধাপে নেমে যায় ৩০ থেকে ৩৫ টাকায়। ২০১৫ সালে এসে এর দাম নির্ধারণ করা হয় আরও ১৫ টাকা কমিয়ে। ওই বছর খাসির চামড়ার দাম ছিল প্রতি বর্গফুট ২০ থেকে ২২ টাকা। ২০১৬ সালে ব্যবসায়ীরা দাম নির্ধারণ করার সময় সারাদেশে প্রতি বর্গফুট খাসির চামড়ার দাম রাখেন ২০ টাকা। পরের বছর সরকার ঢাকার মধ্যে খাসির চামড়ার দাম খানিকটা বাড়ালেও কমিয়ে দেয় ঢাকার বাইরের দাম। ঢাকার ভেতরে দাম ছিল ২০ ২২ টাকা, ঢাকার বাইরে ১৫ থেকে ১৭ টাকা। এখন তা এসে ঠেকেছে ঢাকার ভেতরে ১৮ থেকে ২০ টাকায়, ঢাকার বাইরে ১৩ থেকে ১৫ টাকায়।
চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম পড়ে যাওয়ার কারণেই দেশেও কমছে চামড়ার দাম। এছাড়া, ট্যানারি শিল্প সাভারে স্থানান্তরের সময় তারা ক্রেতা হারিয়েছিলেন। সেই জের এখনো টানতে হচ্ছে দেশীয় চামড়া ব্যবসায়ীদের।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) কোষাধ্যক্ষ মো. মিজানুর রহমান বলেন, হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরের সময় আমাদের সব চামড়া কোম্পানির কাজ টানা চার মাস বন্ধ ছিল। ওই সময় আমরা আন্তর্জাতিক বাজারের ক্রেতা হারিয়েছি। ক্রেতারা সব অন্য দেশের পণ্য উৎপাদনকারীদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। সেসব ক্রেতাকে আমরা এখনো ফিরে পাইনি। ফলে আমাদের যে পরিমাণ পণ্যের অর্ডার আসত, তা অনেক কমে গেছে। সেই ধাক্কাই আমরা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। ফলে চামড়া শিল্পের আগের ভালো অবস্থায় আমরা এখনো ফিরে যেতে পারিনি।
কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. হাজী দেলোয়ার হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, এ বছর আমরা এক কোটি পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছি। গত বছরের চেয়ে এবার আমাদের লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা কম।   
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মফিজুল ইসলাম বলেন, আমরা চামড়া ব্যবসায়ীদের বলেছি, এই টাকাটা যেহেতু গরীবের কাছে যায়, তারা যেন ন্যায্যমূল্য দেয়। আর এই টাকার পুরাটাই তো উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহৃত হয়। কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য যাই হোক, বাজারে কোনো অবিক্রিত চামড়া থাকবে না।
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনে তথ্য অনুযায়ী, দেশে সারাবছর ৬০ থেকে ৭০ লাখ গরু জবাই হয়। ছাগল ও ভেড়া জবাই হয় ৮০ লাখ থেকে ২ কোটি। অন্যদিকে, ঈদুল আজহায় গরু-মহিষ জবাই হয় প্রায় ৩০ লাখ, ছাগল ও ভেড়া ৭০ থেকে ৮০ লাখ। কোনো না কোনো প্রক্রিয়ায় এসব পশুর সবগুলোর চামড়াই তারা সংগ্রহ করে থাকেন। এ বছর কেন লক্ষ্যমাত্রা কম ধরা হয়েছে, তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি কোনো সংগঠনের নেতারা। ট্যানারি মালিকেরা বলছেন, তারা গত বছর ৯৫ লাখ পিস চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন। এ বছর বন্যার কারণে এই সংখ্যা পাঁচ থেকে সাত লাখ কম হতে পারে।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, মূলত বন্যার কারণেই চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা কম ধরা হয়েছে। আমরা মনে করছি, এবার কোরবানি কম হবে। এছাড়া আমাদের হাতে তেমন টাকা নেই। আন্তর্জাতিক বাজারেও চামড়ার দাম কমেছে। আমরা চামড়ার দাম কমাতে বলেছিলাম। গত বছরের মতো দাম অপরিবর্তিত রাখার প্রভাব বাজারে পড়বেই। উল্লেখ্য, গেল কোরবানি ঈদে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে হতাশা প্রকাশ করেছিলেন সব পক্ষ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ