ঢাকা, রোববার 11 August 2019, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৬, ৯ জিলহজ্ব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ধরপাকড় উপক্ষো করে কাশ্মীরে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে

সংগ্রাম ডেস্ক : আগামী ৩১ অক্টোবর কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল হিসেবে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে। এদিকে কাশ্মীরে ব্যাপক ধরপাকড় উপেক্ষা করেই ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে কাশ্মীর ভাঙ্গার বিরুদ্ধে। বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাস গুলী ছোঁড়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর। বিক্ষুব্ধ কাশ্মীরীদের বিরুদ্ধে নির্বিচারে নিরাপত্তা বাহিনীর। গ্রেফতার করেছে ৫ শতাধিক কাশ্মীরীকে। এনটিভি, পার্সটুডে, এক্সপ্রেস ট্রিবিউন, হাফিংটন পোস্ট।
কাশ্মীর দ্বিখন্ডিত হচ্ছে অক্টোবরে
সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের জন্মবার্ষিকীতে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য ভেঙ্গে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ নামে আলাদা দুইটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হতে যাচ্ছে।
আগামী ৩১ অক্টোবর ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা বল্লভভাই প্যাটেলের ১৪৪তম জন্মবার্ষিকী। ওই দিনই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে ।
গত সোমবার ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপতির আদেশে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ রদ করার কথা জানিয়েছিলেন।
ভারতীয় সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদের বলেই জম্মু ও কাশ্মীর এতদিন বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা পেয়ে আসছিল।
৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করার পাশাপাশি ওইদিন অমিত শাহ ‘জম্মু ও কাশ্মীর সংরক্ষণ বিল’ নামে নুতন একটি প্রস্তাব পার্লামেন্টে তোলেন।
বিরোধী দলগুলার ঘোর আপত্তির পরও গত সপ্তাহে ভারতের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে ওই বিল পাস হয়।
লোকসভায় বিলটি পাস হওয়ার পর তা উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় পাঠানো হয়। সেখানেও বিলটি পাস হলে অনুমোদনের জন্য তা রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়।
এনডিটিভি জানায়, শনিবার ভারতের রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দ ওই বিলে অনুমোদন দেন।
কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হওয়ার পর আপাতত দুই জায়গায় দুজন লেফটেন্যান্ট গভর্নর কেন্দ্র সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রশাসনিক কর্মকা- পরিচালনা করবেন। জম্মু ও কাশ্মীরে আইনসভা থাকবে, তবে লাদাখে তা থাকবে না।
যদিও জম্মু ও কাশ্মীর খুব বেশিদিন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল থাকবে না বলে কাশ্মীরবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।  তিনি শিগগিরই সেখানে বিধানসভার নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মোদী বলেন, “জম্মু-কাশ্মীরের জনগণই তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে। সেখানে আগের মত মুখ্যমন্ত্রীও থাকবে। ওই অঞ্চলে একবার শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে এলেই জম্মু-কাশ্মীর আবারো পুরোদস্তুর রাজ্য হয়ে যাবে।”
কাশ্মীরীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে পাকিস্তানে ভারত বিরোধী বিক্ষোভ
ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরের অধিবাসীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে আজও (শুক্রবার) বিক্ষোভ করেছে পাকিস্তানিরা। রাজধানী ইসলামাবাদসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে জুমার নামাজের পর বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়।
তারা কাশ্মীরের জনগণের বিরুদ্ধে ভারত সরকারের নানা সীমাবদ্ধতা ও দমন-পীড়ন বন্ধের দাবি জানায়। এ সময় বিক্ষোভকারীদের হাতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান লেখা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড শোভা পাচ্ছিল।
পাকিস্তানি বিক্ষোভকারীরা কাশ্মীরীদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে গোটা বিশ্বের মানুষের প্রতি আহ্বান জানান। তারা সাংবাদিকদের বলেছেন, ভারত সরকার গোটা কাশ্মীরকে কারাগারে পরিণত করেছে। তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সোচ্চার না হলে ভারতীয় সেনাবাহিনী সেখানে নির্মম গণহত্যা চালাবে বলে তাদের আশঙ্কা।
গত সোমবার ভারত সরকার জম্মু কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে সেখানে অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে রেখেছে।
ট্রেনের পর এবার দিল্লি-লাহোর বাস পরিষেবাও বন্ধ করলো পাকিস্তান
কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা তুলে নেয়ার পর ভারতের সঙ্গে একের পর এক সম্পর্ক চ্ছিন্ন করে যাচ্ছে পাকিস্তান। সমঝোতা ও থর এক্সপ্রেস বন্ধ ঘোষণার পর এবার দুদেশের মধ্যে চলাচলকারী বাস পরিষেবাও বন্ধ করে দিলো পাকিস্তান।
দেশটির যোগাযোগ ও ডাক বিভাগের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী মুরাদ শহিদ টুইট করে জানান, ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিটির নির্দেশ অনুযায়ী বাস পরিষেবা বন্ধ করা হলো।
গেলো বৃহস্পতিবার সমঝোতা এক্সপ্রেস বন্ধ করার কথা ঘোষণা করে পাকিস্তান। তারপর শুক্রবার বন্ধ করে দেয়া হয় দুদেশের মধ্যে চলাচলকারী থর এক্সপ্রেস। এবার বন্ধ করা হলো ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একমাত্র বাস পরিষেবাটিও।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সদা-ই-সরহদ নামের বাস পরিষেবা শুরু হয় ১৯৯৯ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী নিজে প্রথম বাসে চড়ে লাহোরের বৈঠকে যোগ দিতে যান। ওয়াঘায় তাকে স্বাগত জানান তৎকালীন পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। ২০০১-এ সংসদ হামলার পরে এই বাস পরিষেবা বন্ধ হয়ে গেলেও ২০০৩ সাল থেকে ফের শুরু হয়।
কাশ্মীর থেকে বিশ্বের নজর ঘোরাতে ‘যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি’ তৈরি করতে পারে ভারত, বললেন ইমরান খান
কাশ্মীর থেকে বিশ্বের নজর ঘোরাতে ভারত ‘যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি’ তৈরি করতে পারে বলে অভিযোগ করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান।-আনন্দবাজার
ইমরান খানের দাবি, পুলওয়ামার পরেও এমন অবস্থা তৈরি হয়েছিল। এই দাবি উড়িয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার বলেন, ‘আতঙ্ক সৃষ্টি করছেন ওঁরাই। আন্তর্জাতিক মহল কোনও যুদ্ধ-পরিস্থিতি দেখছে না। এ-সবই হল ছলচাতুরী করে নজর ঘোরানোর চেষ্টা।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেওয়াতেই ভারত তড়িঘড়ি কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নিয়েছে বলে মনে করছেন ইমরান। গত কাল তিনি বলেন, ভারত এমন পরিস্থিতি (ফল্স ফ্ল্যাগ অপারেশন) তৈরি করতে পারে, যাতে অন্য পক্ষের উপরে দায় পড়ে।
ইমরান খান আরো বলেন, ‘এমন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে। এ ভাবেই দেখেছি যুদ্ধ বাধতে। আমরা সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চেয়েছি। কিন্তু ওরা (ভারত) ভোটে পুলওয়ামার ফায়দা নিতে চাইল। এখন চেষ্টা চালাচ্ছে আমাদের এফএটিএফ-এর কালো তালিকায় তোলার।’
রবীশ কুমার এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘নতুন বাস্তবকে প্রত্যক্ষ করে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধ করুক পাকিস্তান।’
কাশ্মীর থেকে বিশ্বের নজর সরাতে ভারত ‘যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি’ তৈরি করতে পারে বলে অভিযোগ ইমরান খানের। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দাবি, পুলওয়ামার পরেও এমন অবস্থা তৈরি হয়েছিল।
তবে এই দাবি উড়িয়ে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার বলেন, ‘‘আতঙ্ক সৃষ্টি করছেন ওরাই। আন্তর্জাতিক মহল কোন যুদ্ধ-পরিস্থিতি দেখছে না। এসবই হল ছলচাতুরী করে নজর ঘোরানোর চেষ্টা।’’
ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেওয়াতেই ভারত তড়িঘড়ি কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নিয়েছে বলে মনে করছেন ইমরান। তিনি বলেন, ভারত এমন পরিস্থিতি (ফল্স ফ্ল্যাগ অপারেশন) তৈরি করতে পারে, যাতে অন্য পক্ষের উপরে দায় পড়ে।
ইমরানের কথায়, ‘‘এমন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে। আমরা সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চেয়েছি। কিন্তু ওরা (ভারত) ভোটে পুলওয়ামার ফায়দা নিতে চাইল। এখন চেষ্টা চালাচ্ছে আমাদের এফএটিএফ-এর কালো তালিকায় তোলার।’’
রবীশ কুমারের প্রতিক্রিয়া, ‘‘নতুন বাস্তবতাকে প্রত্যক্ষ করে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধ করুক পাকিস্তান।’’
ধরপাকড় সত্ত্বেও কাশ্মীরে বিক্ষোভ, কাঁদানে গ্যাস, গুলী
ধরপাকড় সত্ত্বেও ভারত সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে। শুক্রবার কারফিউ কিছুটা শিথিল করার পর কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে নেমে পড়েন প্রধান শহর শ্রীনগরে। এ সময় তাদের ওপর ভারতীয় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও গুলী নিক্ষেপ করেছে। পাঁচদিন আগে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করার পর শুক্রবার জুমার নামাজের পরে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে অনলাইন।
জম্মু ও কাশ্মীরকে নিজেদের কব্জায় নিতে ভারত গত সপ্তাহে সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে। এই ধারার অধীনে কাশ্মীর স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছিল। কিন্তু সেখানকার আঞ্চলিক নেতারা এর তীব্র বিরোধীতা করেছেন।
গত প্রায় ৩০ বছর ধরে সেখানে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামীরা। এ লড়াইয়ে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫০ হাজার মানুষ। পুলিশ বলছে, শুক্রবার শ্রীনগরের শূরা এলাকায় বিপুল সংখ্যক মানুষ সমবেত হয়। আইওয়া ব্রিজ এলাকায় পুলিশ তাদের পিছু ধাওয়া করে। সেখান থেকে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, তাদের ওপর কাঁদানে গ্যাস ও গুলি ছুড়তে দেখা যায় পুলিশকে। তখন অনেক নারী ও শিশু পানিতে ঝাঁপ দেয়। শ্রীনগরের শেরে কাশ্মীর ইন্সটিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসে এসব কথা বলেছেন ওই প্রত্যক্ষদর্শী। এই মেডিকেলে গুলীবিদ্ধ অনেককে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, পুলিশ আমাদের ওপর দু’দিক থেকে আক্রমণ করেছে। পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, দুটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে ১২ জনকে। তাদের গায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, শুরা এলাকায় বিক্ষোভে সমবেত হয়েছিলেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। এ যাবতকালের মধ্যে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ।
বিক্ষুব্ধ কাশ্মীরে ছররা গুলীর তাণ্ডব, গ্রেফতার ৫ শতাধিক
কাশ্মীরের জনগণ ৩৭০ ধারা বাতিলের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে; মোদি সরকারের পক্ষ থেকে এমন দাবি করা হলেও সেখানকার বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। কারফিউ জারি রেখে সংবাদমাধ্যম ও ইন্টারনেটসহ মানুষের চলাচলের ওপর পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং বিপুল সংখ্যক অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন সত্ত্বেও বিক্ষিপ্তভাবে বিক্ষোভের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কাশ্মীরবাসী। এদিকে শ্রীনগরের মহারাজা হরি সিং হাসপাতাল (এসএমএসএইচ) পরিদর্শনের ভিত্তিতে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে ধারণা করা যাচ্ছে, আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভের আশঙ্কা দেখলেই বেসামরিক জনসাধারণের ওপর ছররা গুলি ছুড়ছে। বিক্ষোভ দমনের অংশ হিসেবে এ পর্যন্ত ৫শ’রও বেশি রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীকে গ্রেফতার করেছে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী।
টেলিফোন ও ইন্টারনেটের উপর নিয়ন্ত্রণসহ কাশ্মীরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় সেখানকার পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র উপস্থাপন করাটা কঠিন হয়ে পড়েছে সংবাদকর্মীদের জন্য। ৮ আগস্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, এরপরও অঞ্চলটিতে বিক্ষিপ্তভাবে বিক্ষোভ হচ্ছে। শ্রী মহারাজা হরি সিং হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে ছররা গুলীবিদ্ধ আট ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মার্কিন সংবাদমাধ্যম হাফিংটন পোস্টের প্রতিবেদক। এদের মধ্যে সাতজন পুরুষ ও একজন নারী রয়েছেন।
হাসপাতালের রোগীরা জানিয়েছেন, তারা শ্রীনগরের নৌহাট্টা এলাকায় বিক্ষোভ হতে দেখেছেন। তাদের দাবি, সেখানে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের উপর ছররা গুলি ছুড়েছে। ওই হাসপাতালের এক চিকিৎসক হাফিংটন পোস্টকে জানান, গত তিন দিনে প্রায় ৪০ জন ছররা গুলিবিদ্ধ মানুষকে চিকিৎসা দিয়েছেন তারা।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শ্রীনগরের এলাহি বাগ এলাকার বাসা থেকে বের হয়ে পার্শ্ববর্তী খেলার মাঠের দিকে যাচ্ছিলো আসরার খান নামে একাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। তবে খেলার মাঠে না গিয়ে শেষ পর্যন্ত তার গন্তব্য হয়েছে হাসপাতাল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভারতীয় আধা সামরিক বাহিনীর সেনারা কিশোর আসরারকে লক্ষ্য করে টিয়ার গ্যাস শেল ছুড়েছিলো। তার শরীরে ছররা গুলিরও আঘাত লেগেছে।
রক্তাক্ত অবস্থায় মোটরসাইকেলে করে আসরারকে নিয়ে যাওয়া হয় শেরে কাশ্মীর ইন্সটিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্স (এসকেআইএমএস) হাসপাতালে। সিটি স্ক্যানে দেখা যায়, তার মাথায় অভ্যন্তরীণ রক্তপাত হচ্ছে। রাতভর চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচার চালান। তার শারীরিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। চিকিৎসককে উদ্ধৃত করে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, প্রাণে বেঁচে গেলেও ওই কিশোর তার দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারাতে পারে।
শুক্রবার  কড়াকড়ি কিছুটা শিথিল করা হলেও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি ও ওমর আবদুল্লাহসহ ৫ শতাধিক নেতাকর্মী এখনও সরকারি হেফাজতেই রয়েছেন। যে কোনও ধরনের প্রতিবাদ বা সমাবেশ এড়ানোর চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় সরকার। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম কাশ্মীর মিডিয়া সার্ভিসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অল পার্টিজ হুরিয়াত কনফারেন্স-এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আলি গিলানি এবং হুরিয়াত ফোরামের চেয়ারম্যান মিরওয়াইজ উমর ফারুকসহ সংগঠনের প্রায় সব নেতাকে গৃহবন্দি কিংবা জেলে আটক রাখা হয়েছে। কাশ্মীরের আনাচে কানাচে ভারতীয় সেনাদের প্রবল উপস্থিতি রয়েছে। শ্রীনগর শহরকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে ভারতীয় সেনারা। জম্মু, কাঠুয়া, সাম্বা, পুঞ্চ, দোদা, কিশটোয়ার, উদামপুর ও অন্যান্য এলাকায়ও একই পরিস্থিতি চলছে। এমন অবস্থায় যেন ধূ ধূ মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে কাশ্মীর উপত্যকা।
চীন ও ভারতের মধ্যকার বিরোধপূর্ণ এলাকা লাদাখের তিনটি এলাকায়ও বড় জমায়েত নিষিদ্ধ করেছে দিল্লি। বৃহস্পতিবার ভোর পাঁচটা থেকে কার্গিল, দ্রাস ও সানকু এলাকায় এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হচ্ছে। এসব এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছে সরকার। প্রশাসন জানিয়েছে, কোনও জায়গায় চার জন বা তার বেশি সংখ্যক মানুষের জমায়েত হলেই শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
অন্য এলাকা থেকে কাশ্মীরে গমনকারী রাজনীতিবিদদেরও বাধা দেওয়া হচ্ছে। শুক্রবার ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা সীতারাম ইয়েচুরি ও তার দলীয় সহনেতা ডি রাজাকে শ্রীনগর বিমানবন্দরে আটকে দেওয়ার পর প্রতিবাদ জানিয়ে টুইট করেছে সিপিআই (এম)। সংবাদসংস্থা পিটিআইকে ইয়েচুরি ফোনে বলেন, ‘ওরা আমাদের একটি আইনি নির্দেশ দেখিয়েছিল, সেখানে বলা হয়েছে ওরা আমাদের শ্রীনগরে প্রবেশের অনুমতি দেবে না। এতে বলা হয় নিরাপত্তাজনিত কারণেই শহরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। আমরা এখনও তাদের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দুজনই জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্যপালকে অনুরোধ করেছিলাম যাতে আমাদের সফরে কোনও বাধা দেওয়া না হয়। তারপরেও আমাদের আটক করা হয়েছে। আমি আমার অসুস্থ সহকর্মী এবং অন্য সহকর্মীরা যারা ওখানে রয়েছেন তাদের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলাম।’
এর আগে বৃহস্পতিবার (৮ আগস্ট) কংগ্রেস আইনপ্রণেতা গুলাম নবী আজাদকেও শ্রীনগর বিমানবন্দর থেকেই  ফেরত পাঠানো হয়। রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা আজাদ কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে দেখা করতে শ্রীনগরে গিয়েছিলেন।
বুকারজয়ী ভারতীয় লেখক ও মানবাধিকারকর্মী অরুন্ধতী রায় কাশ্মীরকে দেখেন ‘একটি পরমাণু যুদ্ধক্ষেত্র এবং পৃথিবীর সবচেয়ে সামরিকীকরণকৃত এলাকা’ হিসেবে। সেই ২০১৩ সালে ‘আফজাল গুরুর ফাঁসি ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য কলঙ্ক’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি বলেছিলেন,‘এখানে [কাশ্মীরে] রয়েছে ভারতের পাঁচ লাখ সৈনিক। প্রতি চারজন বেসামরিক নাগরিকের বিপরীতে একজন সৈন্য! আবু গারিবের আদলে এখানকার আর্মি ক্যাম্প ও টর্চার কেন্দ্রগুলোই কাশ্মীরিদের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের বার্তাবাহক।’ ২০১৩ সালের পর আরও ৫ বছর পেরিয়ে গেছে। কাশ্মীর সংকটের সমাধানে সেখানে সেনা-সংখ্যা আরও বাড়ানো হয়েছে। দমনপীড়নের পথেই হেঁটেছে ভারতীয় বাহিনী। এর সবশেষ সংযোজন হিসেবে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নিয়ে তাকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রূপান্তর করেছে মোদি সরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ