ঢাকা, রোববার 11 August 2019, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৬, ৯ জিলহজ্ব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

এবার ঈদে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে থাকবে হাজার হাজার মানুষ

ইবরাহীম খলিল : রাত পোহালেই কুরবানির ঈদ। ইতিমধ্যে কয়েক হাজার ডেঙ্গুরোগী ভর্তি আছেন রাজধানীসহ দেশের হাসপাতালগুলোতে। এছাড়া প্রতিদিন এই রোগে আক্রান্ত হয়ে দুই সহস্রাধিক মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। ফলে এবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে থাকতে হবে হাজার হাজার মানুষকে। আর হাসপাতালের বাইরে বাসায় কিংবা গ্রামের বাড়িতে ভুগতে হবে আরও বেশি। গতকাল শনিবার পর্যন্ত কয়েকটি এলাকায় খবর নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালগুলোতে ভর্তি কম দেখানো হলেও আসলে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কমছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন অনেক মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি হতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এছাড়া অনেক মানুষ এখন আর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রথমেই হাসপাতালে যাচ্ছে না। বাসাতেই চিকিৎসা নিচ্ছেন।
গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর মুগদাপাড়া এলাকার মধ্য মসজিদের মুয়াজ্জিন মফিজ উদ্দিন নিজের শরীরে ডেঙ্গুর উপস্থিতি টের পান। তিনি স্থানীয় ডাক্তার সাজ্জাদ হোসেনের শরণাপন্ন হন। চিকিৎকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তের প্লাটিলেট পরীক্ষা করেন। পরীক্ষার পর দেখা যায় তার রক্তের প্লাটিলেট এক লাখের নিচে নেমে গেছে। সেই থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহার করছেন। জানা গেছে হাসপাতালে এমনিতেই রোগীর সংখ্যা বেশি। তাই ভোগান্তির কথা চিন্তা করে বাসায় থেকেই চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে যদি অবস্থার অবনতি হয় তাহলে পরবর্তীতে হাসপাতালে ভর্তির চিন্তা করবেন।
রাজধানীর মানিকনগর, মান্ডা, সবুজবাগ এবং বাসাবো এলাকায় এমন কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে ডেঙ্গু ধরা পড়লেই তারা এখন আর হাসপাতালে যাচ্ছেন না। এছাড়া বেশি সিরিয়াস না হলে হাসপাতালেও ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না। আর হাসপাতালে যারা ভর্তি হন তাদের অবস্থার একটু উন্নতি হলেই ছুটি দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
রাজধানীসহ সারাদেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আবার বেড়েছে। গত তিনদিন ৭, ৮ ও ৯ আগস্ট যথাক্রমে ২৪২৮, ২৩২৬ ও ২০০২ জন আক্রান্তের সংখ্যা থাকলেও গত ২৪ ঘণ্টায় শনিবার আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ২১৭৬ জনে দাঁড়িয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ১০৬৫ জন ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ১১১১ জন ভর্তি হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুম সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ১ জানুয়ারি থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশের হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির সংখ্যা ৩৮ হাজার ৮৪৪ জন। আক্রান্তদের মধ্যে মারা গেছে ২৯ জন। হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন ২৯ হাজার ৩৯৫ জন। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৯ হাজার ৪২০ জন।
রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি ৪০টি হাসপাতালে পরিসংখ্যান অনুসারে, গত ৭ আগস্ট ভর্তিকৃত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২৭৫। ৮ আগস্ট তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৫৯ জন ও ৯ আগস্ট তা আরও কমে ৯৪৭ জনে দাঁড়ায়। তবে গতকাল শনিবার আবার তা বেড়ে ১০৬৫ জনে দাঁড়িয়েছে।
একই সময়ে ঢাকার বাইরে ৭ আগস্ট রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ১৫৩ জন। ৮ আগস্ট রোগীর সংখ্যা ১৪ জন কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৬৭ জনে। ৯ আগস্ট রোগীর সংখ্যা আরও কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৫ জনে এবং আজ শনিবার (১০ আগস্ট) তা বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ১১১ জনে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৫৩ জন, মিটফোর্ডে ৬৩ জন, ঢাকা শিশু হাসপাতালে ২৪ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৭৮ জন, বিএসএমএমইউতে ৩০ জন, পুলিশ হাসপাতাল রাজারবাগে ১৪ জন, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১১৩ জন, বিজিবি হাসপাতাল পিলখানা ঢাকায় ২ জন, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ৩৪ জন এবং কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৭২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।
বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা শহর ছাড়া ঢাকা বিভাগে ২৭৭ জন, চট্টগ্রামে ২২৬ জন, খুলনায় ১২৬ জন, রংপুরে ৭১ জন, রাজশাহী ১১৪ জন, বরিশালে ১৭৮ জন, সিলেটে ৩২ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ৮৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।
এছাড়া চলতি মাসের ১০ দিনেই ২০ হাজার ৩৮৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। জুলাই মাসে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হন ১৬ হাজার ২৫৩ জন। এদিকে রাজধানীসহ সারাদেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ২ হাজার ১৭৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তার আগের এই সংখ্যা ছিল দিন ২ হাজার ২ জন। রাজধানী ঢাকাতেই এক হাজার ৬৫ জন রোগী এবং ঢাকার বাইরে এক হাজার ১১১ জন ভর্তি হয়েছেন বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে।
গত ২৪ ঘণ্টার হিসাবে ঘণ্টায় ভর্তি হচ্ছেন ৯০ জনের উপরে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে এ তথ্য জানা গেছে। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৮ হাজার ৮৪৪ জন।
বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা আরও কয়েকগুণ বেশি বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। মৃতের সংখ্যা এ পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২৯ জন বললেও বেসরকারি হিসাবে শতাধিক। প্রতিদিনই আক্রান্তের সঙ্গে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। জুন মাসে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছিলেন এক  হাজার ৮৮৪ জন। মে মাসে ১৯৩ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২৯ হাজার ৩৯৫ জন। বর্তমানে ভর্তি আছেন ৯ হাজার ৪২০ জন।
মুগদা হাসপাতাল : গতকাল দুপুর ২টা পর্যন্ত মুগদা ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিল ৫৫৩ জন। এর মধ্যে মেডিসিন ওয়ার্ডে ৪২৭ জন, শিশু ওয়ার্ডে ১০০ জন, কেবিনে ২৪ জন, সার্জারি ইউনিটে ২ জন। গ্র্যান্ড টোটাল ১,৭১৫ জন। দুই দিন আগে সর্বমোট ডেঙ্গু রোগী ছিল ১৪৯৯ জন। অর্থাৎ গত দুই দিনে মুগদা ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে ২১৬ জন। সঙ্গত কারণেই চিকিৎসক, নার্স, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, কর্মচারীরা বলছেন- দিন যত যাচ্ছে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা ততই বাড়ছে। সেইসঙ্গে বাড়ছে ডেঙ্গু আতঙ্ক। রোগীর আত্মীয় স্বজনরা তো বটেই, ডেঙ্গু নিয়ে কাজ করা প্রতিটা মানুষ রয়েছেন শঙ্কার মধ্যে। কবে নাগাদ এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে, তা কেউ জানে না।
সাধারণত, ঈদ, পূজা, বড়দিনের মত প্রধান প্রধান ধর্মীয় উৎসবে হাসপাতালগুলোতে রোগীর ভিড় থাকে কম। বেশিরভাগ চিকিৎসক-নার্স, কর্মচারী-কর্মকর্তা থাকেন ছুটিতে। বিশেষ করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তরা আগে-ভাগেই চলে যান ঢাকা অথবা দেশের বাইরে। ঈদ উদযাপন করেন পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে। কিন্তু এবারের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ডেঙ্গু এবং বন্যার কারণে সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারীদের ঈদের ছুটি বাতিল। বিশেষ করে স্বাস্থ্য বিভাগের কেউ ছুটি পাবেন না। সরকারের এ নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে বাধ্য সরকারি প্রত্যেক কর্মচারী।
‘ডেঙ্গু পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে কি-না শনিবার এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. খায়রুল আলম বলেন, গত দুই দিনে নতুন ভর্তি হয়েছে ২১৬ জন। এটাকে তো আর উন্নতি বলা যায় না।’
গত দেড় মাস ধরে ডেঙ্গু রোগীর সেবা দিতে দিতে মুগদা হাসপাতালের বেশ কয়েকজন চিকিৎসক ও নার্স অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে ২৭ জন নার্স ও ৭ চিকিৎসক ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। শুক্রবার নতুন করে আরেকজন নার্সও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।
গতকাল মেডিসিন ওয়ার্ডে ৫০০ রোগীকে সেবা দিচ্ছেন মাত্র ১১ জন নার্স। ৪২৭ জন ডেঙ্গু রোগী ও ৭৩ জন সাধারণ রোগীর সেবা দিতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠেছে নার্সদের। সাপ্তাহিক ও ঈদের ছুটিÍ সবকিছু ভুলে গিয়ে টানা ডিউটি করছেন তারা।
 মেডিসিন ওয়ার্ডের নার্সিং ইনচার্য রাহেলা বেগম বলেন, ‘আমাদের কোনো ঈদ উৎসব নেই। কাঁধের ওপর আছে কেবল দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালন করছি। বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমাদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।’ এদিকে শনিবার (১০ আগস্ট) পর্যন্ত মুগদা হাসপাতালে মোট ১,৭১৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে বাসায় ফিরেছেন ১ হাজার ১৪৯ জন, মারা গেছে ১৩ জন।
কোন এলাকায় মশা বেশি : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে বছরে তিনবার মশা জরিপ করে। এ বছর প্রথম মার্চ মাসে তারা ১০০টি এলাকায় জরিপ করেছিল। এরপর জুলাইয়ের ১৭ থেকে ২৭ পর্যন্ত আবার জরিপ করে। তাতে দেখা গেছে, উত্তর সিটি করপোরেশনে সবচেয়ে বেশি মশা ১৮ নম্বর ওয়ার্ড (বারিধারা, কালাচাঁদপুর, নর্দ্দা, শাহজাদপুর) ও ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে (বনানী, গুলশান, কড়াইল, মহাখালী)। ১ (উত্তরা), ২১ (বাড্ডা), ২৩ (খিলগাও, পূর্ব হাজীপাড়া, মালিবাগ, মালিবাগ চৌধুরীপাড়া) ও ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে (লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর) বেশি মশা পাওয়া যায়।
অন্যদিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫ (মুগদা, রাজারবাগ, কদমতলা বাসাবো), ১২ (মালিবাগ, গুলবাগ, শান্তিবাগ), ২০ (সেগুনবাগিচা, তোপখানা রোড, ফুলবাড়িয়া, বুয়েট এলাকা), ৩৯ (মানিকনগর, কাজিরবাগ, হাটখোলা রোড, আরকে মিশন রোড), ৪০ (দয়াগঞ্জ, নারিন্দা), ৪৫ (শশীভূষণ চ্যাটার্জি লেন, রজনী চৌধুরী লেন) ও ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডে (মিল ব্যারাক, অক্ষয় দাস লেন) মশা বেশি পাওয়া গিয়েছিল।
আইইডিসিআরের একজন পরিচালক বলেন, সম্প্রতি রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা ঢাকার মশা জরিপ করেছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মশা বেশি এমন এলাকার রোগীও হাসপাতালে বেশি।’ তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রোগী ও মশার তথ্য কাজে লাগানোর সুযোগ আছে।
ওই জরিপে দেখা গিয়েছিল, ২২.৯০ শতাংশ মশার জন্মস্থল পরিত্যক্ত টায়ার। জরিপে আরও ৯টি উৎসের কথা বলা হয়। এর মধ্যে আছে পানি আছে, এমন ভবনের এমন মেঝে, প্লাস্টিকের ড্রাম, পানির ট্যাংক, প্লাস্টিকের বালতি, মাটির পাত্র, ফুলের টব বা ট্রে, রঙের পাত্র, টিন বা ধাতব পাত্র, প্লাস্টিকের মগ বা বদনা।
সম্প্রতি স্কাউট পরিচালিত এক জরিপে বলা হয়েছে রাজধানীর ৫৬ ভাগ বাড়িতেই ডেঙ্গুর বাহক এডিশ মশার লার্ভা রয়েছে। বাংলাদেশ স্কাউটের সদস্যরা গত ১ জুলাই থেকে শনিবার পর্যন্ত এক লাখ ১০ হাজার ৭৬৫টি ভবন পরিদর্শন করে। এর মধ্যে ৬২ হাজার ২৩৭ টি বাড়িতেই এডিশ মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এছাড়া সিটি করপোরেশন নিজেরা ২৫ হাজার ৯৯৭টি বাড়ি পরিদর্শন করে ৮২৩টি বাড়িতে মশার লার্ভা পেয়েছে । এসব লার্ভা ধ্বংস এবং নির্মাণাধীন ৯৫ বাড়ি মালিককে জরিমানা করা হয়েছে।
কারা বেশি আক্রান্ত 
হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৭ হাজার ৭৭০ জন রোগীর বয়স বিশ্লেষণ করে আইইডিসিআর বলছে, ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সীরা ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্তদের ৫২ শতাংশ এই বয়সী। আবার ৮ হাজার ৪৮৮ জনের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, আক্রান্তদের ৬৫ শতাংশ পুরুষ ও ৩৫ শতাংশ নারী।
আইইডিসিআর শুধু রোগতত্ত্ব নিয়ে কাজই করে না। তারা স্বাস্থ্য পরীক্ষাও করে। এ বছর ৪৯৯ জন ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য আইইডিসিআরের পরীক্ষাগারে এসেছে। এদের মধ্যে ১৫৫ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। শনাক্ত ব্যক্তিদের ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী।
আইইডিসিআর দেখেছে, পরীক্ষা করতে এসে ডেঙ্গু রোগীরা ১৫টি শারীরিক অসুবিধার কথা বলে। এর মধ্যে আছে জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, অসুস্থতা বোধ, বমিভাব, গিরায় ব্যথা, মারাত্মক দুর্বলতা, কাশি, পেটব্যথা।
এ ব্যাপারে ভাইরোলজিস্ট ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, পুরুষের ও যুব জনগোষ্ঠীর ঘরে ও কর্মস্থলে, স্কুলে এডিস মশার কামড় খাওয়ার ঝুঁকি বেশি। তবে সরকারের হিসাবে ও প্রথম আলোর নিজস্ব অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডেঙ্গুতে নারীদের মৃত্যু বেশি হচ্ছে। এ ব্যাপারে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, এর পেছনে সামাজিক কারণ রয়েছে। নারী অসুস্থ হলে পুরুষের চেয়ে গুরুত্ব কম পায়। নারীকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও তা অনেক বিলম্বে হয়।
বরিশাল : বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগে চিকিৎসাধীন এক শিশু মারা গেছে। তার নাম রুশা (১০), বাড়ি ঝালকাঠির রাজাপুরে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বরিশালে এ নিয়ে পাঁচ জনের মৃত্যু হলো। এদের মধ্যে চার জন শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং একজন গৌরনদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন বলেন, ঢাকা থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয় রুশা। গত শুক্রবার রাতে শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শনিবার (১০ আগস্ট) সকালে সে মারা যায়।
ডা. বাকির হোসেন আরও জানান, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শনিবার পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি আছে ৩৪০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি হয়েছে ৯৮ জন ডেঙ্গু রোগী। গত ১৬ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে ৭০২ জন ভর্তি হয়। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে ৩৪০ জন।
কুমিল্লা : গত ২৪ ঘণ্টায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ৪৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া জেলার বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে বর্তমানে ১১৯ জন চিকিৎসাধীন। জেলা সিভিল সার্জন ডা. মুজিবুর রহমান এ তথ্য জানান। সিভিল সার্জন জানান, এ পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ৪৭৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এখন চিকিৎসাধীন ১১৯ জন। চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছেন ৩৪৯ জন। তিনি আরো জানান, চিকিৎসাধীন রোগীর মধ্যে কেউ আশংকাজনক নয় এবং এ পর্যন্ত ডেঙ্গুজ্বরে কুমিল্লায় কেউ মারা যায়নি।
সিরাজগঞ্জ : সিরাজগঞ্জে বেড়েই চলেছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। প্রতি দিন প্রায় ২৫ জন ডেঙ্গু রোগী সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন হাসপাতালে আসছে। তাদের মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৮৪ জন। এ নিয়ে গত ১৮ দিনে জেলায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়ালো ২৫০ জনে। সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মির্জা মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, জেলায় এ পর্যন্ত ২৫০ জন মানুষ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার থেকে  শনিবার পর্যন্ত) ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১২ জন, এনায়েতপুর খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬জন, সিরাজগঞ্জ শহরের নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬ জন। মোট চিকিৎসাধীন ৮৪ জন। বাকিরা চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।
সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন জাহিদুল ইসলাম জানান, প্রতিদিনই নতুন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। ডেঙ্গু সচেতনতায় সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে প্রচারপত্র বিতরণ ও ব্যানার টানানো হচ্ছে। পাশাপাশি চলছে প্রচার, মিছিল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।
ঠাকুরগাঁও : ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এ হাসপাতালে এ পর্যন্ত মোট ৬৬ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে পুরুষ ৫৪ জন, মহিলা ও শিশু মিলে ১২ জন। এদের মধ্যে এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে মোট ২৯ জন রোগী। পুরুষ ওয়ার্ডে ২০ জন ও মহিলা ওয়ার্ডে ৯ জন রোগী এবং ঠাকুরগাঁওয়ের এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তিনজন। মৃতদের মধ্যে শুক্রবার রাতে রাণীশংকৈল উপজেলার অনুকুল রায়ের মেয়ে অপি রাণী রায় (১৬) নামে এক কলেজ ছাত্রী ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতাল থেকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যায় । এর আগে জেলার রাণীশংকৈল উপজেলার ভকরগাঁও গ্রামের রবিউল ইসলাম রুবেল নামে এক মাদ্রাসা ছাত্রের মৃতু হয়েছে।
অন্যদিকে, ঠাকুরগাঁওয়ের ফিরোজ কবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ডেঙ্গুতে রোগে আক্রান্ত হয়ে শুক্রবার (২৬ জুলাই) রাত ১০টার দিকে ঢাকা স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। মৃত তিনজনের মধ্যে শুধু একজন রোগী ঠাকুরগাঁওয়ে থেকে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বাকি আরও দুইজন রোগী ঠাকুরগাঁওয়ের বাইরে থেকে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।
টাঙ্গাইল : টাঙ্গাইল ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ৩৪ বেডের অত্যাধুনিক ডেঙ্গু ওয়ার্ড উদ্ধোধন করেছেন টাঙ্গাইল-৫ আসনের এমপি ছানোয়ার হোসেন। শনিবার দুপুরে তিনি চিকিৎসার বিষয়ে চিকিৎসক ও রোগীদের সাথেও আলাপ করেন। আসন্ন ঈদের ছুটিতে যাতে চিকিৎসার কোনো কমতি না হয় সে বিষয়ে চিকিৎসকদের নিদের্শনা দেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ