ঢাকা, রোববার 11 August 2019, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৬, ৯ জিলহজ্ব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

পশুর ভরা হাটেও দাম চড়া

এইচ এম আকতার : রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে গরু, ছাগল আসা শুরু হয়েছে এক সপ্তাহ ধরে। হাটে পর্যাপ্ত পশু থাকলেও ক্রেতার সংখ্যা একবারেই হাতেগোনা। বিক্রেতারা বলছেন, দুদিন পর ঈদ এখনও অপেক্ষা। সে তুলনায় হাটে ক্রেতা কম। গরুর দাম যাচাই বাছাই চলছে। আর ক্রেতারা বলছেন, হাটে গরুর দাম অনেক বেশি। পশুর ভরা হাটেও দাম চড়া। ক্রেতা কম দেখে দুশ্চিন্তায় গরুর ব্যবসায়ীরা। তবে ভালো কিছুর অপেক্ষায় এখনও ক্রেতা-বিক্রেতা।
 মেহেরপুরের বামুনদিয়া থেকে ২০ গরু নিয়ে গাবতলী পশুরু হাটে এসেছেন হাফিজুর রহমান। গত ৬ আগস্ট হাটে তুললেও তিন দিনে একটি গরুও বিক্রি হয়নি তার। তাদের কাছে দুটি বড় গরু রয়েছে। যেগুলোর দাম চাওয়া হচ্ছে ছয় লাখ থেকে সাড়ে ছয় লাখ। তবে ক্রেতারা বলছেন, আড়াই থেকে তিন লাখ। যে কারণে বিক্রি করা যাচ্ছে না। আর ছোট ও মাঝারি গরুগুলোর দাম কম বললেও কিনছেন না কেউ। বিক্রেতাদের চাওয়া দামের তুলনায় ক্রেতারা বলছেন অর্ধেক।
হাফিজুর রহমান বলেন, সাধারণত গরু যে দামে বিক্রি হচ্ছিল, হাটেও একই দাম চাওয়া হচ্ছে। ২২-২৩ হাজার টাকা মন ধরে দাম চাচ্ছি আমরা। কিন্তু হাটে তো ক্রেতাই কম। আমার ২০টি গরুর মধ্যে একটিও বিক্রি করতে পারিনি।
গাবতলী, বছিলা, উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টর, আশিয়ান সিটি, আফতাব নগর পশুর হাটে ৯ আগস্ট বিকেল ৪টা পর্যন্ত ক্রেতাদের কোনও ভিড় দেখা যায়নি। মাঝে মাঝে কয়েকজন ক্রেতাকে পশুর দাম জিজ্ঞেস করতে দেখা গেছে। কিন্তু কেনার জন্য দামাদামি খুব একটা দেখা যায়নি। ক্রেতাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরও ঈদের আগে গরুর দাম বেশি ছিল। পরবর্তী সময়ে ঈদের আগেরদিন রাতে সেসব গরু অনেক কম দামে বিক্রি হয়েছে। এবারও দাম কমার আশায় শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চান তারা।
দনিয়া শনিরআখড়া হাটে জামালপুর থেকে গরু নিয়ে এসেছেন, আলিমুল্লাহ। তিনি ২২টি গরু নিয়ে হাটে আছে গত পাঁচ দিন ধরে। গতকাল ৫টি গরু বিক্রি করেছে। এতে করে ঢাকায় থাকার খরচ হয়ে যাবে। তিনি দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, মামা গত পাঁচ দিন ধরে ৬ জন লোক ঢাকায় রাস্তায় আছি। গরু এবং আমাদের খাওয়ার খচরও কম না। ঢাকায় তেমন কোন টাকা নিয়ে আসিনি। তাই বাধ্য হয়ে ৫টি গরু বিক্রি করেছি। এখন আর চিন্তা নেই ঈদেও জামাত পর্যন্ত অপেক্ষা করলেও কোন সমস্যা নেই। তাছাড়া আমি গরু পালনে কোন মেডিসিন ব্যবহার করিনি। তাই গরু বিক্রি না হলেও কোন ক্ষতি নেই।
একই জেলা থেকে ৮টি গরু নিয়ে উত্তরার পশুর হাটে এসেছেন বেপারি মনতাজ। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে আমরা হাটে এসেছি। এখনও কোনো গরু বিক্রি করতে পারিনি। বাজার এখনও জমেনি। আসছি, মনে হচ্ছে গত বছরের তুলনায় এবার বাজার ভালো যাবে। তিনি জানান, গত বছর আমার ৫০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। এ বছর বাজার দেখছি, আজ (শুক্রবার) রাতে বাজারের পরিস্থিতি বোঝা যাবে। এখনও কিছু বলতে পারছি না।
পাবনা থেকে ৫টি গরু নিয়ে এসেছেন বেপারি মো. বাবুল আক্তার। তিনি বলেন, আমার পালা গরু। আদর করে পেলেছি। এখন ভালো দাম পেলে ছেড়ে দেবো।
ধানমন্ডি থেকে মোহাম্মদপুরের বছিলা হাটে কোরবানির পশু কিনতে এসেছেন মধ্যবয়সী আসিফুর রহমান। তিনি বলেন, আজকে এসেছি, পছন্দ হলে কিনবো। তবে দাম অনেক বেশি। শেষদিকে হয়তো কমতে পারে। সেজন্য অপেক্ষা করব। প্রয়োজনে পরে কিনব।
উত্তরা-১২ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা মোহসিন আলী বলেন, আজ থেকে কোরবানির পশুর বাজার জমে উঠবে। এই বাজার ঘুরে দেখেছি, পর্যাপ্ত গরু আছে। তবে, বিক্রেতারা দাম ছাড়ছে না। হয়তো বেপারিরা চাঁদ রাত পর্যন্ত দেখবে। দেখি যদি দামে মিলে যায় তবে কিনবো নয়তো আরও দুই দিন সময় আছে। অন্যান্য হাটের খোঁজ খবরও নিচ্ছি। যেখানে কমে পাওয়া যায়, সেখানেই কোরবানির পশু কিনতে যাবো।
শুধু দাম নয়, আগে গরু কিনলে সেটা লালন-পালন করা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। এ কারণেও অনেক ক্রেতা শেষ দিকে কোরবানির পশু কিনতে চান। মিরপুর থেকে আসা একজন ক্রেতা নাসিরুল হক। তিনি বলেন, গরুর দাম বেশি সেটা যেমন সত্য তার ওপর কেনার পর রাখার জায়গার অভাব। সবমিলিয়ে লাভ-লোকসান যাই হোক, শেষ দিকে কিনতে চাই। আজকে এসেছি, বাজার যাচাই করতে।
কুষ্টিয়া থেকে গাবতলী হাটে গরু নিয়ে আসা বেপারি লিয়াকত আলী শেখ বলেন, গতবার আমাদের লস হয়েছে। এবার আর লস করবো না। লাভ হলে ৫ হাজার টাকা লাভ হয়। আর লস হলে সেটা ৫০ হাজারে গিয়ে ঠেকে।
সিরাজগঞ্জ থেকে ২৪টি গরু নিয়ে এসেছেন কোরবান বেপারি। তিনি বলেন, আমরা আরিচা ঘাট পর্যন্ত ট্রলারে এসেছি। গরু প্রতি খরচ হয়েছে ৩০০ টাকা। এরপর আরিচা থেকে ট্রাক ভাড়া করে এসেছি হাটে। ট্রাক ভাড়া নিয়েছে ১৫ হাজার। ৭ আগস্ট সকাল থেকে আমরা ৫-৬ জন লোক রয়েছি। তাদের খবচ আছে। সবমিলিয়ে গরু প্রতি খরচ অনেক হয়। লস দিয়ে বিক্রির সুযোগ নেই। প্রয়োজনে বাকি থাকা গরু ফেরত নিয়ে যাবো।
তবে শেষদিন পর্যন্ত ক্রেতার অপেক্ষায় থাকবেন বলে জানিয়েছেন মেঘডোনিং অ্যাগ্রো ফার্মের ম্যানেজার সাজ্জাদ আলম ফাহিম। তিনি বলেন, আমাদের ১৩০ টি গরু হাটে আনা হয়েছে। তার মধ্যে বিক্রি হয়েছে পাঁচটি। শেষ দিন পর্যন্ত আমরা ক্রেতাদের জন্য অপেক্ষা করব।
ঝিনাইদহ থেকে একটি ছাগল নিয়ে এসেছেন রফিক মুন্সী।  এটির দাম চান আড়াই লাখ টাকা। ছাগলটির বয়স তিন বছরের বেশি। কোনও খামারে নয় নিজের বাড়িতেই লালন পালন করেছেন বলে জানান রফিক। তার ভাষ্য, ছাগলটি আমাদের বাড়িতেই বড় হয়েছে। আমরা যতœ করে বড় করেছি এ ছাগলকে। এবার বিক্রি করবো বলে ঢাকায় নিয়ে আসছি।
গাবতলী হাটে এই ছাগলটির দাম সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা দাম উঠেছে বলে জানিয়েছেন মালিক। তার প্রত্যাশা, সর্বোচ্চ দামেই ছাগলটি বিক্রি হবে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বড় ছাগলের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি আকারের ছাগলের দামও ঊর্ধ্বমুখী। পাবনা থেকে ২০০ ছাগল নিয়ে গাবতলী হাটে এসেছেন আজিজ বেপারি। তিনি বলেন, বাজারে ছাগল আছে প্রচুর কিন্তু কিনতে আসা লোকের সংখ্যা কম। গত তিন দিনে আমার ২০০ ছাগলের মধ্যে বিক্রি হয়েছে মাত্র ১২টি।
রাজধানীর গাবতলীর পশুর হাটে প্রতিবারের মতো এবার উঠেছে উট-দুম্বা। চারটি উটের মধ্যে বিক্রি হয়েছে একটি। বাকি তিনটি উটের দাম যথাক্রমে ১৪, ১৬ ও ১৮ লাখ টাকা।  ক্রেতারা ১০-১২ লাখ টাকা পর্যন্ত দাম বলছেন বলে জানিয়েছেন বিক্রেতা আমজাদ হোসেন। 
হাট থেকে গরু কেনার পর তা নির্ধারিত স্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য হাটেই পাওয়া যায় রাখাল। যারা হাট থেকে বাসা পর্যন্ত কোরবানির পশুটি পৌঁছে দেয়। আর এ জন্য ক্রেতাকে গুনতে হয় এক থেকে দেড় হাজার টাকা। তবে এসব রাখালের অধিকাংশই ঈদ ছাড়া অন্য সময়ে ভিন্ন কাজ করেন। 
 মৌসুমি রাখালরা জানান, হাট থেকে গন্তব্যের দূরত্ব অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয় তাকে কত টাকা দিতে হবে। তবে এর মাত্রা এক থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে। আর বেশি দূরে হলে রাখাল ছাড়াই পিকআপ ভ্যানে করে ক্রেতারা কোরবানির পশু নিয়ে যান।
রাজধানীতে কোরবানির পশুর স্থায়ী ও অস্থায়ী হাটগুলোতেই মিলছে গরু-ছাগলের খাবার বিক্রির দোকান। সেখানে গম, ভুট্টা, চিড়া, ভুষি, খড় ও ঘাস বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। এর সঙ্গে মোটা লবণও বিক্রি হচ্ছে। দোকানিরা বলছেন, এসব ভুষির মধ্যে গমের ভুষি বেশি বিক্রি হচ্ছে।
বেপারিরা বলছেন, গরু গমের ভুষিই বেশি খাচ্ছে। কিছুটা লবণ আর ভুষি দিয়ে মেখে দিতে হচ্ছে। আর যেগুলো খাচ্ছে না, সেগুলোকে জোর করে খাওয়াতে হচ্ছে। নয়তো পশুর স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যাবে বলেও তারা আশঙ্কা করেন।
আশির উপরে উঠলেই গরু ভালো পাওয়া যাবে'- এভাবেই বলছিলেন ব্যবসায়ী সাদিক তার বন্ধুকে। গতকাল শনিবার সকাল থেকে রাজধানীর রামপুরা আফতাবনগর গরুর হাটে ঘুরছিলেন পছন্দের গরু কেনার জন্য। বেলা গড়িয়ে গেলেও তখন ভাগ্য মেলাতে পারেননি বলে জানান তিনি।
রামপুরা এলাকায় ফার্মেসি ব্যবসা করেন তিনি। এবারের কোরবানির জন্য ৬০ হাজার টাকা বাজেট করেছিলেন। তবে পছন্দের গরু কিনতে আশি হাজার টাকার ওপরে গুনতে হবে বলেন বন্ধুকে।
বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করা ফাহাদ বলছিলেন একই ধরনের কথা। বড় ভাইয়ের সঙ্গে গরু কিনতে এসেছেন হাটে। তিনি বলেন, আপনি যদি লাখ টাকার ওপরে গরু কিনেন তাহলে ভালো পাবেন। আর লাখ টাকার নিচে হলে দাম আগুনের মতো।
কথা হয় কুষ্টিয়ার ব্যবসায়ী আলীর সঙ্গে। তার সঙ্গেই গরুর দামদর করছিলেন ফাহাদরা। ওই গরু বিক্রেতা বলেন, মামা আমরা তো ২১ হাজার থেকে ২৩ হাজার টাকা মণ হিসেব করে এই গরু কিনে এনেছি। গরুটায় পৌনে তিন মণ গোশত হবে। আপনি সেই হিসেবে দাম বলেন।
ফাহাদ ওই গরুর দাম ৪৫ হাজার টাকা বলেছেন। তাতে কিছুটা বিরক্ত হয়ে বিক্রেতা বলেন, ও সব দামে হবে না মামা। আপনি যদি নেন তাহলে একদাম ৫৭ হাজার টাকা পড়বে।
গরুর হাটটি ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই প্রচুর ক্রেতার আগমন ঘটেছে। সেই সঙ্গে বিক্রিও হচ্ছে। তবে অনেকেই ঘুরে ঘুরে পছন্দের গরু কিনতে পারছেন না বলে অভিযোগ করছেন। বিক্রেতাদেরও অভিযোগ, ক্রেতারা বিবেচনা করে দাম বলছেন না!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ