ঢাকা, বৃহস্পতিবার 15 August 2019, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৩ জিলহজ্ব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দুই মেয়েরের সাফল্য দাবি

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : কোরবানির ঈদের দিন রাজধানীতে যে পশুবর্জ্য জমেছিল, তার সবই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করেছেন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র। তাদের এই দাবি যথার্থ বলে মনে করেন? এমন একটি প্রশ্ন নিয়ে পাঠকের সামনে হাজির হয়েছিল বাংলাদেশের একটি নিউজ অনলাইন পোর্টাল-যারা ওই জগতের পথিকৃত। ওই পোর্টালটিতে যাদের চোখ পড়েছে, কিংবা যারা খবর দেখেছেন পড়েছেন তাদের মধ্যে জরীপে অংশগ্রহনকারী ছিলেন ২৯৭ জন। তারা যে ভোট প্রদান করেছেন তাতে ওই প্রশ্নের উত্তরে (হ্যাঁ-) ৪৭% ভোটার মনে করেছেন দুই মেয়রের দাবী সঠিক। আর (না-) ৫৩% ভোট মনে করেছেন দাবী সঠিক নয়।
অপরদিকে, ঈদের পরদিন দুই মেয়র পৃথকভাবে সংবাদ সম্মেলন করে দাবী করেছেন ২৪ ঘন্টার মধ্যেই স্ব স্ব এলাকার পশুর বর্জ্য অপসারন করেছেন। তারা এ জন্য সফলতার বর্ননাও দিয়েছেন।
মাঠপর্যায়ে কর্মী সংখ্যা বাড়ানো ও তাদের ওপর নজরদারি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণে সফল হয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। সংস্থা দুটির মেয়ররা বলছেন, বিগত বছরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাগুলো কথা মাথায় রেখে এবার নতুন আঙ্গিকে পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনায় ছিল- মাঠকর্মীদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ এবং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মাধ্যমে কর্মীদের কার্যক্রম নিশ্চিত করা। আলাপকালে তারা বিষয়টি জানান।
ডিএসসিসির মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘আমরা যখন দেখলাম পরিচ্ছন্নতাকর্মীর যেমন সংকট রয়েছে, তেমনি প্রয়োজন সঠিক মনিটরিং। তাই এ বছর মাঠ পর্যায়ে যেমন কর্মীর সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে, তেমনি কঠোর করা হয়েছে মনিটরিং ব্যবস্থাপনা। এতে চ্যালেঞ্জিং হলেও নির্ধারিত সময়ের কয়েক ঘণ্টা আগেই কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণ সম্ভব হয়েছে।’‘আমি নিজেও ঈদের দিন বিকেল থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত লাইভ মনিটরিংগুলো পর্যবেক্ষণ করেছি। এর ফলে পর্যাপ্ত কর্মী এবং সঠিক মনিটরিং ও কলিং সিস্টেমে নাগরিকদের মতামতের ভিত্তিতে আমরা সেবা নিশ্চিত করতে পেরেছি। হটলাইনে প্রচুর সাড়া পেয়েছি। এতে যেসব স্থানে আমাদের কর্মীরা যেতে পারেনি সেসব স্থানেও ঠিকানা জেনে কর্মী পাঠাতে পেরেছি। এ কারণে নির্ধারিত সময়ে শতভাগ বর্জ্য অপসারণ করেছি’- বলেন মেয়র।
একই কথা বললেন ডিএনসিসির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমরা এবার বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম। যে কারণে সকল কর্মকর্তার ছুটি বাতিল করে প্রায় ৯ হাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং করেছি। সেই সঙ্গে আমি নিজেও মধ্য রাত পর্যন্ত অফিসে থেকে সকলে একই পরিবারের মতো কাজ করেছি। আমরা সার্বক্ষণিক ওয়াকিটকির মাধ্যমে কর্মীদের খোঁজ-খবর নিয়েছি।’
কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবছর সংস্থাটিতে নিজস্ব ২ হাজার ৪০০ জন নিজস্ব পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ মোট ৯ হাজার ৫০০ জন কর্মী বর্জ্য অপসারণে কাজ করেছেন। এবার প্রায় আড়াই লাখ পশু কোরবানি হয়েছে ওই এলাকায়। তাই ঈদের প্রথম দিন ১৩ হাজার ২৩৪ টন বর্জ্য অপসারণ করেছে সংস্থাটি। এ কাজে খোলা ট্রাক, কন্টেইনার বক্স, কন্টেইনার ক্যারিয়ার, ডাম্পার ট্রাক, কম্পেক্টর, পে-লোডার, পানির গাড়িসহ ৪৩৮টি যানবাহন ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
ডিএসসিসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সংস্থাটিতে এ বছর নিজস্ব ৫ হাজার ২৪১ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ মোট ৯ হাজার ৪৯৩ জন কর্মী কাজ করেছেন বর্জ্য অপসারণে। ওই এলাকায় এবছর প্রায় সাড়ে তিন লাখ কোরবানির পশু জবাই হয়েছে। এসব পশুর ১৬ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য সংস্থাটির মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে অপসারণ করা হয়েছে। এ কাজে খোলা ট্রাক, কন্টেইনার বক্স, কন্টেইনার ক্যারিয়ার, ডাম্পার ট্রাক, কম্পেক্টর, পে-লোডার, পানির গাড়ি ও টায়ার ডোজারসহ ৩৮২টি যানবাহন ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
ডিএসসিসির ফেইসবুক লাইভ মনিটরিং টিমের প্রধান ও সংস্থার আইসিটি প্রধান ও সিস্টেম এনালিস্ট আবু তৈয়ব রোকন বলেন, ‘আগে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ঠিকমত কাজ করছেন কি না তা মনিটরিং করা কঠিন ছিল। এ কারণে কেউ কেউ ফাঁকিবাজি করার সুযোগ পেতো। কিন্তু এবার ফেইসবুক লাইভের কারণে সে সুযোগ ছিল না। কাজে সবার পূর্ণ মনোযোগ ছিল বলেই আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বর্জ্য অপসারণ করতে পেরেছি।’
ঈদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাজধানীর কোরবানি পশুর বর্জ্য অপসারণের ঘোষণা দিয়েছিল দুই সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি)। সে অনুযায়ী প্রথম দিনের বর্জ্য শতভাগ অপসারণের দাবিও করেছে সংস্থাটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার (১৩ আগস্ট) দুপুর তিনটা পর্যন্ত দুই সিটি করপোরেশন তাদের ল্যান্ডফিলে ৩০ হাজার ২৯৮ মেট্রিক টন বর্জ্য অপসারণ করেছে। এরমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ ১৭ হাজার ৬৪ ও উত্তর ১৩ হাজার ২৩৪ মেট্রিক টন বর্জ্য অপসারণ করেছে।
ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ সূত্র জানায়, তাদের ধারণা ছিল, অন্যান্য বছরের মতো এ বছরও ১৫-২০ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য হতে পারে। কিন্তু, ঈদের দিন সেই ধারণা বদলে গেছে। বিকাল পর্যন্ত প্রায় ১৭ হাজার ৬৪ মেট্রিক টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। এটি ২১ হাজার মেট্রিক টনে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। ৭৫টি ওয়ার্ড বিশিষ্ট এই সংস্থাটিতে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ কোরবানি দিয়েছে। পাশাপাশি পশু বেচাবিক্রির জন্য ১৭টি হাট ইজারা দেয়া হয়েছে।
সূত্র আরও জানিয়েছে, কোরবানির বর্জ্য সংগ্রহ করে মাতুয়াইল নেওয়ার জন্য খোলা ট্রাক, কন্টেইনার বক্স, কন্টেইনার ক্যারিয়ার, ডাম্পার ট্রাক, কম্পেক্টর, পে-লোডার, পানির গাড়ি ও টায়ার ডোজারসহ ৩৮২টি যান-যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। এর বাইরে ঈদের আগের রাতে কোরবানির পশুর হাট পরিষ্কারের জন্য ৩৪টি ট্রাক ও ঈদের দিন বর্জ্য পরিষ্কারের জন্য ১১৭টি খোলা ট্রাক নিয়োজিত রয়েছে। পাশাপাশি ৯ হাজার ৪৯৩ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী মাঠে ছিল।
জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আ হ ম আব্দুল্লাহ হারুন বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা ১৭ হাজার ৬৪ মেট্রিক টন বর্জ্য মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে ডাম্পিং করেছি। বিকালে বৃষ্টি হওয়ায় হাটের বর্জ্য অপসারণে কিছু সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বর্জ্যরে পরিমাণ আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
অপরদিকে উত্তর সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, এ বছর তারা ১০ থেকে ১৫ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপাদন হবে এমন লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে নিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছে। কিন্তু, মঙ্গলবার দুপুর তিনটা পর্যন্ত তারা ১৩ হাজার ২৩৪ মেট্রিক টন বর্জ্য অপসারণ করেছে। এ কাজে তাদের নিজস্ব ২ হাজার ৪০০ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ১ হাজার ৪৩৫ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাজ করেছে। এছাড়া আরও ১ হাজার ১০০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং বাসা-বাড়ি থেকে ভ্যান সার্ভিসের মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহ করার জন্য প্রায় ৪ হাজার ৫০০ জন শ্রমিক কোরবানির বর্জ্য অপসারণে নিয়োজিত ছিল। ৫৪টি ওয়ার্ড বিশিষ্ট এ সংস্থাটিতে একটি স্থায়ী পশুর হাটসহ এ বছর ১০টি হাট বসেছে। আর আড়াই লাখের বেশি মানুষ কোরবানি দিয়েছেন।
ঈদের দিন হতে কোরবানির পশুর বর্জ্য নিরবচ্ছিন্নভাবে অপসারণের জন্য ডাম্প ট্রাক ও খোলা ট্রাক ১৬৯টি, ভারী যান-যন্ত্রপাতি ২৮টি, পানির গাড়ি ১১টি, বেসরকারি ৮২টি এবং ভাড়ায় ১৪৮টি পিকআপভ্যানসহ মোট ৪৩৮টি গাড়ি নিয়োজিত রয়েছে।
মঙ্গলবার বিকালে উত্তর সিটির নগর ভবনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের ওয়েব্রিজের তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত দুই হাজার ৪৪৯টি ট্রিপে ১৩ হাজার ২৩৪ টন বর্জ্য ল্যান্ডফিলে পরিবহন করা হয়েছে। স্বল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য অপসারণ, বর্জ্য ব্যবস্থায়ন এবং সড়ক পরিচ্ছন্ন করার কাজে ৪৩৮টি বিভিন্ন ধরনের যান-যন্ত্রপাতি নিয়োজিত ছিল।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ