ঢাকা, বৃহস্পতিবার 15 August 2019, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৩ জিলহজ্ব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ঢাকার বাইরে ব্যাপকহারে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী

# একদিনে ঢাকাসহ তিন জেলায় মারা গেছে ৭ জন # সারাদেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৪৬ হাজারের বেশি
# ২৪ ঘণ্টায় বেড়েছে ১ হাজার ৮৮০ জন
ইবরাহীম খলিল : ঈদের দিন কমলেও তার পর দিন  হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়া নতুন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আবার বেড়েছে। ঈদের দিনের তুলনায় এই সংখ্যাটি দেড় গুণ হয়েছে পর দিন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশন সেণ্টার ও কণ্ট্রোল রুমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশের হাসপাতালগুলোতে এক হাজার ৮৮০ জন রোগী ভর্তি হন। আগের ২৪ ঘণ্টায় এই সংখ্যাটি ছিল এক হাজার ২০০ জন।
এদিকে প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা, বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও। গতকাল বুধবার ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগের দিন মঙ্গলবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মঙ্গলবার ৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এরমধ্যে চারজনই শিশু। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দিনে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা শতাধিক হলেও সরকারে পক্ষ থেকে তা স্বীকার করা হচ্ছে না। 
এদিকে ঈদের পর দিন ঢাকায় কুর্মিটোলা হাসপাতালে রোগী পরিদর্শন করতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন রোগীর সংখ্যা কমে আসছে জানিয়ে বলেছিলেন, সাধারণ মানুষ ডেঙ্গু নিয়ে  ‘সচেতন হয়ে ওঠায়’ নতুন রোগীর সংখ্যা কমছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য উল্টো কথাই বলছে।
সরকারি তথ্য এও বলছে, ঈদের ছুটিতে মানুষ ঢাকা ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর সংখ্যাও রাজধানীতে সারাদেশের তুলনায় কমেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যেসব রোগী ভর্তি হয়েছে, তাদের মধ্যে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে আছে ৭৫৫ জন। আর ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলার হাসপাতালে এই সংখ্যা এক হাজার ১২৫ জন। সব মিলিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৬ হাজার ৩৫১ জন। এই সংখ্যাটি প্রতিদিনই রেকর্ড হচ্ছে। আর রোগীদের মধ্যে সিংহভাগই চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছেন। বর্তমানে সাত হাজার ৮৬৯ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা ৪০ জন বলে জানানো হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে। যদিও বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য বলছে, ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা এরই মধ্যে একশ’ ছাড়িয়েছে।
ঈদের দিনেও ২ হাজারের বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত 
ঈদের দিনে সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ২০৯৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন। আর চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪৩ হাজারের বেশি রোগী। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরে গেছেন ৩৩ হাজার ২২৫ জন। বর্তমানে সারাদেশে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৮ হাজার ৬ জন রোগী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেণ্টার ও কণ্ট্রোল রুম থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ৮৪২ জন এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ২৫১ জন ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৩৫, মিটফোর্ড হাসপাতালে ৭০, ঢাকা শিশু হাসপাতালে ৩০, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৬২, বিএসএমএমইউতে ২৮, পুলিশ হাসপাতাল রাজারবাগে ২৯, মুগদা হাসপাতালে ১১৯, বিজিবি হাসপাতাল পিলখানায় ৪, সম্মলিত সামরিক হাসপাতালে ১৭ এবং কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৩৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। 
গ্রামেও বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী 
এদিকে রাজধানীর বাইরে নতুন করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে অনেকেই। পাবনা ও মাদারীপুরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে মাহফুজুর রহমান নামের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। স্বজনরা জানান, ঢাকা থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মাহফুজ ঈদ করতে গ্রামে যান। অবস্থার অবনতি হলে তাকে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতে মারা যায়।
সাতক্ষীরায় বিভিন্ন হাসপাতালে এখনও পর্যন্ত ভর্তি রয়েছে ৩৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী। সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিনই ভর্তি হচ্ছেন ডেঙ্গুতে আক্রান্তরা। সিলেটের সিভিল সার্জন হিমাংশু লাল বিশ্বাস জানিয়েছেন, বর্তমানে সিলেটের সরকারি, বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ৬৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। বরিশাল শের- ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসাধীন ৩৩০ জন রোগী।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসেব অনুযায়ী ঢাকা শহরের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ৪ ১৪৩ জন রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন। ঢাকার বাইরে ৩ হাজার ৭২৬ রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) ১৪৭ জন, মিটফোর্ড হাসপাতালে ৮৩ জন, ঢাকা শিশু হাসপাতালে ২০ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৭৩ জন ভর্তি হয়েছেন।
এছাড়াও বিএসএমএমইউতে ৩১ জন, রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ১৫ জন, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪৭ জন, পিলখানা বিজিবি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩ জন, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ১১ জন, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৫২ জন রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন।
এছাড়াও ঢাকা শহরের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে নতুনভাবে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ২৭৩ জন রোগী। এদের মধ্যে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেণ্ট হাসপাতালে ২০ জন, বারডেম হাসপাতালে ৯ জন, বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১১ জন, ধানমন্ডি ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬ জন, স্কয়ার হাসপাতালে ১০ জন, ধানমন্ডি কমফোর্ট নার্সিংয়ে ৩ জন, শমরিতা হাসপাতালে ৮ জন, মিরপুর ডেল্টা মেডিকেল কলেজে ৪ জন, ল্যাব এইড হাসপাতালে ৫ জন, সেণ্ট্রাল হাসপাতালে ১৮ জন, হাই কেয়ার হাসপাতালে ২ জন, হেলথ এন্ড হোপ হাসপাতালে ১ জন, গ্রীন লাইফ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৫ জন, কাকরাইল ইসলামী ব্যাংক সেণ্ট্রাল হাসপাতালে ২৫ জন রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন।
এছাড়াও খিদমা জেনারেল হাসপাতালে ৯ জন, ইউনাইটেড হাসপাতালে ৫ জন, অ্যাপোলো হাসপাতালে ১৪ জন, আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৪ জন, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০ জন, বিআরবি হসপিটালস লিমিটেডে ২ জন, আজগর আলী হাসপাতালে ১২ জন, উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৭ জন, বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে ৫ জন, সালাউদ্দিন হাসপাতালে ৯ জন, পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৩ জন, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০ জন ও কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে ৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
পাবনায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মাহফুজের মৃত্যু : পাবনায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মাহফুজের মৃত্যু হয়েছে। পাবনা জেলা স্কুল থেকে ২০১৭ সালে গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ পেয়ে এসএসসি পাশের পর চলতি বছর সরকারী শহীদ বুলবুল কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে পাস করে এইচএসসি। গত রোজার ঈদের পর প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকার ফার্মগেটের একটি কোচিং সেণ্টারে ভর্তি হয়ে সেখানেই একটি ছাত্রাবাসে ওঠে সে। গতকাল বুধবার ভোররাতে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মাহফুজ মারা যাওয়ায় ভেঙে গেলো মা-ছেলের স্বপ্নযাত্রা। থেমে গেল জীবন সংগ্রামের এক সম্ভাবনার গল্প। তার বাড়ি পাবনা জেলার সদর উপজেলার বালিয়াহালট চক রামানন্দপুর গ্রামে।  মাহফুজের মামা নাহিদ হোসেন জানান, মাহফুজের পুরো নাম মোসাব্বির হোসেন মাহফুজ (১৮)। জন্মের আগেই মাহফুজের বাবা গোলাম মোস্তফার মারা গেলে বোন ও ভাগ্নেকে তাদের বাড়িতে নিয়ে আসেন। তারপর থেকে তাদের বাড়িতেই বড় হয় সে। গত ৮ আগস্ট ঈদের ছুটিতে বাড়ি আসার পর অসুস্থ হয়ে পড়ে মাহফুজ। অবস্থার অবনতি হলে তাকে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পাবনা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ রঞ্জন কুমার বলেন, “আমাদের হাসপাতালে বর্তমানে ৪৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৭ জনকে ভর্তি করা হয়েছে।” পাবনায় গতকাল পর্যন্ত ২৪৫ জন ডেঙ্গুরোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
হাসপাতালে কেমন ছিলেন ডেঙ্গু আক্রান্তরা : ঈদের দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার বারান্দায় একটি বেডে শুয়ে ছিলেন জীর্ণশীর্ণ দেহের এক ছোট্ট শিশু। শিয়রে বসে তার মা শিশুটির মুখে বেদানার দানা তুলে দিচ্ছিলেন। শিশুটির কী হয়েছে জিজ্ঞাসা করতেই বিষন্ন অভিব্যক্তি প্রকাশ করে ওই নারী জানালেন, তারা মা-মেয়ে দু’জনেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। বর্তমানে তিনি কিছুটা সুস্থ হলেও মেয়ের শরীর ভালো না। রাজধানীর হাজারীবাগের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হারুনুর রশীদের স্ত্রী নুসরাত জাহান মীম এবং সাড়ে ৫ বছরের শিশু কন্যা মারিয়াম আক্তার সোনিয়া ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। ঈদের দিন সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে মীম জানান, ১২ দিন আগে তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। পাঁচদিন পর মেয়ে সোনিয়ার ডেঙ্গু ধরা পড়ে।
মীম জানান, ছেলে-মেয়েকে নিয়ে এবারের ঈদ গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে করার পরিকল্পনা করেন তারা স্বামী-স্ত্রী। কিন্তু ডেঙ্গুতে সব ভেস্তে গেল। তিনি আরও জানালেন, ঈদ হাসপাতালে করায় মেয়ের মন খুব খারাপ। ছেলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারে এ আশঙ্কায় চাচার সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ঈদ হাসপাতালে করায় দুঃখ নেই মীমের। তার প্রচণ্ড জ্বর হওয়ায় ভেবেছিলেন বাঁচবেন না। তিনি সুস্থ হয়েছেন। এখন মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারলেই খুশি মীম।
 ভোলার বাসিন্দা এক বৃদ্ধ জানান, তার ছোট ছেলে ছয়দিন ধরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। প্রতিবছর গ্রামে ঈদ করলেও এবার ডেঙ্গুর কারণে যেতে পারেননি। নিরূপায় হয়ে হাসপাতালেই ঈদ করতে হচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ