ঢাকা, রোববার 18 August 2019, ৩ ভাদ্র ১৪২৬, ১৬ জিলহজ্ব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ঐতিহ্যের সৌখিন রাজ্য দোয়েল চত্বর

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোর অন্যতম হচ্ছে দোয়েল চত্বর। হস্তশিল্প আমাদের দেশের শিল্প সাংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। হস্তশিল্প বা হাতের তৈরি জিনিসপত্র আমাদের ঐতিহ্যকে ধারন করে। কালের বিবর্তনে এ সমস্ত পণ্য দ্রব্যের ব্যবহার ও ক্রেতা কমলেও আমাদের দেশ থেকে হস্তশিল্প এখনো হারিয়ে যায়নি। তারই প্রমাণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বর সংলগ্ন গড়ে উঠা হস্তশিল্পের মার্কেট। প্রিয় মানুষকে উপহার দেয়া কিংবা নিজের ড্রয়িং-লিভিং রুম সাজানো-উদ্দেশ্য আপনার যাই হোক না কেনো সাধ্যের মাঝে সবকিছুর সমাধান পাবেন এই জায়গায়।
দোয়েল চত্বরের অবস্থান : দোয়েল চত্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ভিতরে কার্জন হলের সামনে অবস্থিত। বাংলাদেশের জাতীয় পাখি দোয়েলের একটি স্মারক ভাস্কর্য। এর স্থপতি হলেন আজিজুল জলিল পাশা। এটি বাংলাদেশের জাতীয় বৈশিষ্ট্যের ধারক ও বাহক যা দেশের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে। শাহবাগে অবস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে দোয়েল চত্বর। টিএসসি থেকে দোয়েল চত্বরের দিকে এলে হাতের ডানদিকে পড়ে বিজ্ঞান লাইব্রেরী, সোজা চলে গেলে হাতের বাম পাশে পড়ে ঐতিহাসিক কার্জন হল ও শহীদুল্লাহ হল, বাম দিকে গেলে হাতের ডান পাশে পড়ে কার্জন হল ও বাম পাশে পড়ে শিশু একাডেমী। দোয়েল চত্ত্বর হলো হাইকোর্ট মাজারের সন্নিকটে।
শৌখিনতার রাজ্য দোয়েল চত্বর: প্রায় ৩০ বছর ধরে ঐতিহ্যকে লালন করছে দোয়েল চত্বরের দোকানগুলো। বছরের প্রায় প্রতিদিন এ মার্কেটের দোকান গুলোতে ক্রেতাদের আনাগোনা থাকলেও পহেলা বৈশাখ, বিয়ে ইত্যাদি নানা রকমের আচার অনুষ্ঠানে এ মার্কেটে ক্রেতাদের ধুম পড়ে। লোক ও কারুশিল্পীরা দোয়েল চত্বর এলাকায় প্রায় ৪০টি মৃৎশিল্পের দোকানসহ মোট ৫০টি বাঁশ, বেত ও কাঠের হস্তশিল্পের দোকানে নানা বাহারি পণ্যের পসরা নিয়ে বসে। এখানে পাওয়া যায়, মাটির তৈরি বিভিন্ন তৈজসপত্র, ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের হাঁড়ি-পাতিল, কলস, সরা, ফুলদানি, বাহারি খেলনা, মাটির সানকি, কাপ-পিরিচ, জগ, থালা, বাটি, পোড়ামাটির ভাস্কর্য, মাটির তৈরি ফলমূল, অলঙ্কার, বৈশাখী চুড়ি, বেত ও কাঠের শোপিস, পাটের শিকা, পুতুল, হ্যান্ডপার্স, সাইডব্যাগ, হোগলা পাতা ও নারিকেলের খোসার তৈরি নানা ধরনের শোপিস। এছাড়াও নকশী করা তালপাতার পাখা, বাঁশের বাঁশি, কুলো, ডালা, পাখি, নৌকা, একতারা, ডুগডুগি, ঢোল, মাথার মাথাল, সাপের বীণ, পুঁতির মালা, কুঁড়েঘর ও গ্রাম্য চিত্রকর্মসহ হাজারও বাংলাদেশি ঐতিহ্যবাহী পণ্য রয়েছে।
শো-পিস মার্কেট: বাঁশ, কাঠ, পাট ও মাটির তৈরি আসবাবপত্র ও শো-পিস ঘরের শুধু শোভাবর্ধনই করে না এর জন্য রয়েছে আমাদের মনের টান। তাই এখন অনেক উচ্চমধ্যবিত্ত ও বিত্তশালীর চমৎকার ইন্টোরিয়র ডিজাইন করা ঘরে এগুলোর উপস্থিতি ঈর্ষনীয়। সব শ্রেণীর মানুষের মধ্যেই বাঁশ, কাঠ, পাট ও মাটির আসবাবপত্রের চাহিদা ব্যাপক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের দোয়েল চত্তর সংলগ্ন ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির পশ্চিম পাশে রাস্তার কোল ঘেষে রয়েছে এমনই চোঁখ জুড়ানো পণ্যের পসরা সাজানো একঝাঁক দোকান। চার রাস্তার মোড়ে সৌন্দর্য, শিল্প ও শৌখিনতার প্রতিবিম্ব হিসেবে অবস্থান করছে বেশ কিছু উপহার ও গৃহস্থালী ডেকোরেশনের কাজে ব্যবহৃত সামগ্রীর দোকান। মেয়েদের হাতে চুড়ি, গয়নার বাক্স থেকে শুরু করে হ্যান্ডব্যাগ, ব্রেসলেট, গলার নেকলেস, ফুলের টব, মাটির হাড়ি, দেয়ালে টাঙানোর জন্য ভাস্কর্যসহ হাজারো রকমের পণ্যের সন্ধান পাবেন এখানে। প্রিয় মানুষকে উপহার দেয়া কিংবা নিজের ড্রয়িং-লিভিং রুম সাজানো-উদ্দেশ্য আপনার যাই হোক না কেনো সাধ্যের মাঝে সবকিছুর সমাধান পাবেন এই জায়গায়। কার্জন হলের ঠিক উল্টো পাশে অবস্থিত এই কারুশিল্পের দোকানগুলোতে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ সামগ্রীই ঢাকার আশেপাশের অঞ্চলের ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের শিল্পীদের হাতে তৈরী। ফলাফল হিসেবে এখান থেকে আপনি যাই কিনবেন তার একটা বড় অংশ সরাসরি পৌঁছে যাবে এসব এক্সেপশনালি ট্যালেন্টেড, আর্টিস্টিক অথচ হীনদরিদ্র মানুষদের হাতে।
মৃৎশিল্প ও হ্যান্ডিক্রাফটের স্বর্গ এই শোপিসের দোকানগুলোতে মূলত বাঁশ, কাঠ, মাটি ও পাটের তৈরী শোপিস বিক্রি করা হয়। এসকল পণ্যের মধ্যে পাটের তৈরী দোলনা, টেবিল ম্যাট, ফ্লোর ম্যাট, পর্দা, ব্যাগ, মাটির তৈরী চুড়ি, ফুলদানী, কাচের গয়না, কাঠের চিরুনি, একতারা, আয়না, জুয়েলারি বক্স ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। দাম সর্বনি¤œ ৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২০০০ টাকা পর্যন্ত। সপ্তাহে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত এসব দোকান খোলা থাকে। যদি কম খরচে মানসম্মত, শৈল্পিক পণ্যের সাহায্যে ঘর সাজাতে চান কিংবা প্রিয় মানুষকে খুশি করতে চান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বর হতে পারে আপনার জন্য উপযুক্ত জায়গা।
এখানের দোকানগুলোতে এমন অনেক জিনিস পাবেন যা আপনার ঘরে এনে দেবে বাঙালিয়ানা। এখানকার মাটির জিনিসগুলোতে পাবেন টেরাকোটার কাজ। রয়েছে পোড়া মাটির একহারা গড়নে  শৈল্পিকতার সংমিশ্রণ। আগে মাটির জিনিস শুকনো খাবার রাখার কাজে ব্যবহার করলেও যুগের হাওয়া বদলের সঙ্গে এখন মাটি দিয়ে তৈরি হচ্ছে অনেক কিছু। ঘরের সাজসজ্জার জিনিস থেকে শুরু করে নিত্যদিনের ব্যবহারের জিনিসসহ গায়ের গহনাও তৈরি হচ্ছে মাটি দিয়ে।                                                                                                                   
এখানকার ব্যবসায়ী মতিউর রহমান বলেন, আমাদের এখানে মাটির তৈরি টব, ফুলদানি, ওয়ালম্যাট, শোপিস, নানা কারুকাজের আয়নার জন্য মাটির ফ্রেম, খাবারের পাত্র, মেয়েদের জন্য মাটির তৈরি নানা গহনা ইত্যাদি পাওয়া যায়। তিনি জানান, কিছু জিনিস আসে পটুয়াখালী, শরীয়তপুর থেকে। কিছু আসে ঢাকার সাভার ও অন্যান্য জায়গা থেকে। সরাসরি কুমারদের কাছ থেকে পণ্যগুলো নিয়ে আসায় জিনিসগুলোর মান ভালো হয় এবং দামও কম বলে দাবি তার। আরেক ব্যবসায়ী হাবিব তালুকদার জানান, এ মার্কেটে দেশীয় ক্রেতাদের পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতারও সমাগম হয়। তারা তাদের পছন্দ মত বিভিন্ন পন্য এখান থেকে সংগ্রহ করে। এ মার্কেটের পণ্য দ্রব্যের দেশের বাইরেও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তারমধ্যে বেতের তৈরী ঝুড়ি ও পাটের ব্যাগ অন্যতম। ১৯৯৬ সালে ঢাকা মহানগরী মৃৎশিল্প ব্যবসায়ী বহুমুখী সমিতির সাথে সম্পৃক্ত হয়। স্বল্প পুঁজি, দেশীয় কাঁচামাল ও সহজে তৈরী করা যায় বলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বেশ স্বস্তি দেখা যায়। আমাদের দেশের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নানা রকম স্বল্প মেয়াদী ঋণের ব্যবস্থা রেখেছে এসব ব্যবসায়ের সাথে জড়িতদের জন্য। দেশের ঐতিহ্য রক্ষায় এ সমস্ত পণ্যদ্রব্য ব্যবহারে সঠিক প্রচার ও প্রসারের ব্যবস্থা করা গেলে হয়তো হারিয়ে যেতে বসা এ হস্তশিল্প তার পুরোনো রূপ ফিরে পাবে বলে জানান এখানকার ব্যবসায়ীরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ