ঢাকা, মঙ্গলবার 20 August 2019, ৫ ভাদ্র ১৪২৬, ১৮ জিলহজ্ব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

অবাধ ব্যবহারে বাড়ছে চোখের সমস্যা আহার নিদ্রা আচার-ব্যবহার এলোমেলো

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : আজকাল অনেক শিশু-কিশোরদের হাতেই স্মার্টফোন দেখা যায়। আগে মাঠে খেলতে যাওয়ার বদলে শিশুরা ঘরবন্দী হয়ে টেলিভিশনে কার্টুন দেখায় বুঁদ হয়ে থাকত। বর্তমানে এর বদলে তারা স্মার্টফোনে বিভিন্ন গেম খেলা, ইউটিউবে গান শোনা ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। অনেক মা শিশুকে খাবার খাওয়ানোর সময় হাতে স্মার্টফোন দিয়ে অনবরত নাচ-গানে ব্যস্ত রাখে শিশুকে। আধুনিকা মায়েদের ভাষ্য- স্মার্টফোনে গান শুনতে না দিলে বা ভিডিও দেখতে না দিলে বাচ্চারা খেতে চায় না। আবার শর্তসাপেক্ষে মায়েরা শিশুদের স্মার্টফোন ব্যবহার করতে দেন। যেমন- এ কাজটা করতে পারলে মোবাইলে গেম খেলতে দেব, এই হোমওয়ার্কটা শেষ হলে মোবাইলে গান শুনতে দেব ইত্যাদি। মায়েদের এ খামখেয়ালির কারণে শিশুদের ওপর যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে, সে সম্পর্কে তারা উদাসীন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোটবেলা থেকে স্মার্টফোন, ট্যাবে ভিডিও গেমসের আসক্তি শিশুদের চোখের বিভিন্ন ধরনের সমস্যাসহ নানা ধরনের মানসিক সমস্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এসবের জন্য খেলার মাঠ বন্ধ হয়ে যাওয়া, লেখাপড়ার বাড়তি চাপ, সূর্যের আলোয় শিশুর না আসা, দিগন্তে সবুজের দিকে তাকিয়ে না থাকাকেই দায়ী করা হচ্ছে। তারা আরো বলছেন, শিশুদের যে সময় দূরের দৃষ্টি তৈরি হওয়ার কথা, সে সময়ই তারা মোবাইল ফোনের কিংবা ট্যাবের স্ক্রিনে দৃষ্টিকে আটকে রাখছে। যে কারণে দূরের দৃষ্টি প্রসারিত হতে পারছে না। বংশগত কারণেও এই ক্ষীণ দৃষ্টি হতে পারে, তবে স্ক্রিন অ্যাক্টিভিটি, রোদে খেলাধুলা না করা শিশুদের মাইয়োপিয়ার অন্যতম কারণ।
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, আমরা বিভিন্ন স্কুলে শিশুদের চোখ পরীক্ষা করে থাকি। এতে দেখা যাচ্ছে গ্রামের চেয়ে শহরের শিশুদের চোখের সমস্যাটা বেশি। তবে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। শিশু যদি টিভির সামনে গিয়ে টিভি দেখে, বোর্ডের লেখা ঝাপসা দেখে তাহলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। ক্ষীণ দৃষ্টির চিকিৎসা মূলত চশমা ও কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার এবং ল্যাসিক করানো।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আনিসুর রহমান আনজুম বলেন, শিশুদের খেলার জায়গা নেই। তারা চার দেয়ালে আবদ্ধ থাকে। ঘরে বসে বসে তারা ট্যাব, মোবাইল ফোন এবং ল্যাপটপের স্ক্রিনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। আমরা খাওয়া-দাওয়ার কথা বলি, কিন্তু সেটা অতো গুরুত্বপূর্ণ নয়। স্কুলে মাঠ নেই এটাও শিশুদের এই ক্ষীণ দৃষ্টির একটি কারণ। যেখানে মাঠ আছে সেখানেও শিশুরা খেলছে না। তিনি আরো বলেন, শিশুদের রোদে মাঠে খেলতে দিতে হবে এবং ট্যাব মোবাইল ফোনের স্ক্রিন থেকে দূরে রাখতে হবে। তবে মাঝে মধ্যে ডেক্সটপে বসতে পারে। কারণ ডেক্সটপে চোখের ওপর চাপ অনেক কম পড়ে।
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী বলেন, এই প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন গড়ে আমরা ২৫০ জন রোগী দেখি। এর মধ্যে ক্ষীণ দৃষ্টি বা মাইয়োপিয়ার আত্রুান্ত শিশু আসে গড়ে ৫০ জন। যারা বিভিন্ন ধরনের চশমাজনিত ত্রুটি নিয়ে আসেন। তিনি বলেন, যারা দূরে দেখতে পারে না, এ ধরনের চোখের ত্রুটিকে বলে ক্ষীণ দৃষ্টি বা মাইয়োপিয়া, যে শিশুরা দূরেও কম দেখে কাছেও কম দেখে, এ ধরনের ত্রুটিকে বলা হয় ‘হাইপারমেট্টপিয়া’, আরেক ধরনের চোখের সমস্যা নিয়ে শিশু আসে, যাদের আমরা বলি ‘এস্টিগমেটিজম’, যাদের সিলিন্ডার পাওয়ার বা এঙ্গেল পাওয়ারে ত্রুটি থাকে। এই তিন ধরনের ত্রুটি নিয়ে শিশুরা আমাদের কাছে বেশি আসে। এ ধরনের শিশুদের যদি স্কুল শুরুর আগেই চোখ পরীক্ষা করানো যায় তাহলে তাদের এ ধরনের ত্রুটি ভালো হয়ে যায়। এই চিকিৎসক আরো বলেন, অনেক অভিভাবক জিজ্ঞেস করেন, ভবিষ্যতে বাচ্চা চশমা ছাড়া কি দেখতে পারবে? এটা নির্ভর করে চশমা ব্যবহারের ওপর। তবে আমাদের টার্গেট থাকে চশমা দিয়ে যেন শিশু ভালো দেখতে পারে। এজন্য আমরা চশমা ব্যবহারে উৎসাহিত করছি। আজকাল শিশুরা অনেক বেশি গ্যাজেট ব্যবহার করছে। ফলে গ্রামের চেয়ে শহরের বাচ্চাদের এ ধরনের চোখের সমস্যা বেশি দেখা দিচ্ছে। এ বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। টেকনোলজি শিশু ব্যবহার করবে তবে সেটা এক ঘণ্টার বেশি অবশ্যই নয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছোটবেলা থেকেই স্মার্টফোনের সঙ্গে অভ্যস্ত হওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রাইমারি লেভেল থেকেই মায়ের ফোন নিয়ে স্কুলের বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে কারণে অকারণে কথা বলছে। হায়ার সেকেন্ডারি লেভেলে তো তা ফেসবুক কিংবা মেসেঞ্জার পর্যন্ত যায়। অবশ্য মায়েদের ফেসবুক-মেসেঞ্জার আইডি থেকেই তারা তাদের তথাকথিত যোগাযোগ চালিয়ে যায়। এটা নাকি তাদের সময় কাটানোর রসদ। এর ফলে কিশোর বয়সেই ছেলেমেয়েরা এমন অনেক বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছে, যা তাদের বিভিন্ন অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অল্প বয়সে প্রেম, ব্রেক-আপসহ নানা ধরনের অশ্লীলতায়ও জড়িয়ে পড়ছে কিশোর-কিশোরীরা। অভিভাবকরা যখন সন্তানদের ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করতে যান, ততদিনে খুব দেরি হয়ে যায়। তখনই সন্তানদের সঙ্গে অভিভাবকদের সম্পর্কে দূরত্ব বাড়তে থাকে, যা কখনই কাম্য নয়। সন্তানদের স্মার্ট সাজাতে গিয়ে, যুগের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সুযোগ দিতে গিয়ে অভিভাবকরা যে কী পরিমাণ ভুল পথ দেখাচ্ছেন সন্তানদের, এ সম্পর্কে তারা নিজেরাও হয়তো অবগত নন। মনে রাখতে হবে, শুধু স্মার্টফোন-ল্যাপটপ থাকলেই আধুনিক হওয়া যায় না। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ বুঝেশুনে নিতে পারা আর সময়ের সঙ্গে নিজের যোগ্যতা বৃদ্ধি করাটাই হচ্ছে আধুনিকতার সংজ্ঞা। প্রত্যেক অভিভাবকের স্মার্টফোনের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে ভাবা উচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. এমাজউদ্দিন বলেন, শিশুকে ছোটবেলা থেকে যে শিক্ষা দেয়া হয়, যে আচরণে অভ্যস্ত করা হয়, তাই তারা গ্রহণ করে। পরিবারই একজন মানুষের জীবনের প্রথম পাঠশালা। তাই সুশিক্ষাটা যেন পরিবার থেকে নিশ্চিত হয়, সেটা খেয়াল রাখতে হবে। স্মার্টফোন আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিস। কিন্তু সেটিকে যেন অপব্যবহার করা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
রাজধানীর জাতীয় চক্ষু ইনস্টিটিউটে গিয়ে দেখা যায়, মাত্র ৭ বছর বয়স থেকেই মাইয়োপিয়া বা চোখের ক্ষীণ দৃষ্টি রোগে আক্রান্ত হয় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী অনিমা রশীদ। ১০ বছরের অনিমার সমস্যা দূরের বস্তু ঝাপসা দেখে। এ সমস্যা নিয়ে মাঝে-মধ্যেই তাকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়। চিকিৎসক বলেছেন, দিনের বেশির ভাগ সময় স্মার্টফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখার কারণে ক্ষীণ দৃষ্টিতে আক্রান্ত হয়েছে অনিমা। অনিমা বলে, ফোনে ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিও দেখি, গেমস খেলি। অনিমার বাবা আতিকুর রহমান বলেন, মেয়ে প্রথমে চোখ কুচকিয়ে টিভি দেখতো। টিভি দেখতে দেখতে মাঝে মধ্যে টিভির সামনে চলে যেত। টিভিতে কার্টুন দেখা শেষ হলে কিংবা টিভি বন্ধ করে দিলে, চুপি চুপি ওর মায়ের মোবাইল ফোন অথবা আমার ফোন নিয়ে গেমস খেলতে শুরু করতো। এখন ক্লাসে পেছনে বসলে বোর্ডের লেখা ঝাপসা দেখে।
দেশে অনিমার মতো শিশুদের চোখের ক্ষীণ দৃষ্টির সমস্যা উদ্বেগজনক ভাবে বাড়ছে। এক দশক আগেও ৮ থেকে ১০ বছরের শিশুদের এমন অবস্থা দেখা না গেলেও, বর্তমানে স্মার্টফোন আর ট্যাবের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে শিশুদেরও বর্তমানে এই রোগে আত্রুান্ত হতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের চোখে অতিরিক্ত স্ক্রিন অ্যাক্টিভিটি বড়দের চোখের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করে। তারা জানান, গ্রামের চেয়ে শহরের শিশুদের চোখে এই সমস্যা বেশি দেখা দিচ্ছে। এর কারণ অতিরিক্ত ডিভাইস ব্যবহার করা। দীর্ঘ সময় চোখ স্ক্রিনে রাখার ফলে, স্ক্রিন থেকে আসা রশ্মি শিশুদের চোখের ক্ষতি করছে এবং চোখ স্থির হয়ে থাকার কারণে চোখ শুকনো হয়ে যায়, ফলে চোখের বিভিন্ন ত্রুটি দেখা দেয়। সরেজমিন রাজধানীর প্রিপারেটরি স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, একটি ক্লাসে ২৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৯ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন কারণে চোখে চশমা ব্যবহার করছে। এদের একজন শারাকা ইকবাল বলে, আমি ৩ বছর ধরে চশমা ব্যবহার করছি। আরেকজন শিক্ষার্থী মাহবুব বলে, আমি বোর্ডের লেখা ঝাপসা দেখি। সে কারণে চশমা দিয়েছে ডাক্তার। আমি আগে অনেক বেশি মোবাইলে গেমস খেলতাম। ডাক্তার নিষেধ করার পর এখন বেশি খেলি না।
সূত্র মতে, বিশ্ব এখন আধুনিকতায় ভরপুর। যত দিন যাচ্ছে, ততই আধুনিকতা বাড়ছে। প্রযুক্তিকে ঘিরে বদলে যাচ্ছে বিশ্ব। এখন কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট- তথ্যপ্রযুক্তির কারণেই বিশ্ব আজ একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে। আর বিশ্ব যেভাবে আধুনিকতার স্বাদ উপভোগ করছে, তেমনি তরুণ-তরুণীদের ধ্বংসের দিকেও নিয়ে যাচ্ছে। আজকাল তরুণ-তরুণীরা বিভিন্নভাবে গেম আসক্ত হয়ে পড়ছে। গেমের কারণে ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ায় মনোযোগ কমে যাচ্ছে। এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে ঠিক সময় খাওয়া-দাওয়া, ঘুম ও আচার-ব্যবহার। কিছুদিন ধরে কয়েকটি গেম খুবই জনপ্রিয়তা লাভ করেছে তরুণ-তরুণীদের কাছে। যেমন- পাবজি, ফি-ফায়ার, ক্লাস অফ ক্লেন ও ক্রসফায়ার। এ গেমগুলো তরুণ-তরুণীদের বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। যতই দিন যাচ্ছে, তাদের আচার-ব্যবহার ও চিন্তাশক্তি খেই হারিয়ে ফেলছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ