ঢাকা, শুক্রবার 23 August 2019, ৮ ভাদ্র ১৪২৬, ২১ জিলহজ্ব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

কাশ্মীরে আজ জুমার নামাজের পর বিক্ষোভ মিছিলের ডাক

* পাক-ভারতের প্রতি উত্তেজনা না বাড়ানোর আহ্বান ফ্রান্সের

* টিয়ারশেলে নারী মৃত্যু ॥ মেয়েরা ভয়ঙ্কর আতংকে

সংগ্রাম ডেস্ক : ভারত শাসিত কাশ্মীরে আজ শুক্রবার জুমার নামাজের পর প্রতিবাদ বিক্ষোভের ডাক দেয়া হয়েছে। অপরদিকে পাক-ভারতের প্রতি উত্তেজনা না বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে ফ্রান্স। শ্রীনগরে নিজ ঘরে পুলিশের টিয়ারশেলে নিহত হয়েছেন এক গৃহবধূ। আর এ কারণে কাশ্মীরের মেয়েরা ভয়ংকর আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। ভারতের কমিউনিস্ট নেতা সীতারাম ইয়েচুরি বলেছেন কাশ্মীর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হওয়ায় মোদি এটাকে টার্গেট করেছেন। বিবিসি, রয়টার্স, এএফপি, ইন্ডিয়া টুডে।

বিবিসি বাংলা : ভারত-শাসিত কাশ্মীরে আজ শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর কারফিউ অমান্য করে প্রতিবাদ মিছিলে সামিল হওয়ার ডাক দিয়ে শ্রীনগরে হুরিয়ত নেতাদের নামে পোস্টার পড়েছে।

কাশ্মীর থেকে বিবিসি ও রয়টার্স সংবাদদাতারা নিশ্চিত করেছেন, শহরের কয়েকটি এলাকায় স্বাধীনতাকামী নেতাদের যৌথ সংগঠন ‘জয়েন্ট রেজিস্ট্যান্স লিডারশিপের'র নামে ওই ধরনের পোস্টার চোখে পড়ছে।

তবে যেহেতু ওই নেতারা এখনও আটক বা গৃহবন্দী, ফলে সত্যিই তারা ওই ডাক দিয়েছেন কি না তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

দুসপ্তাহ আগে শ্রীনগরেরই সৌরা এলাকায় শুক্রবারের নামাজের পর বেশ কয়েকশো মানুষ প্রতিবাদ বিক্ষোভে সামিল হয়েছিল, যে ভিডিও বিবিসিতে প্রকাশিত হলে তা আলোড়ন ফেলে দেয়।

আজ শুক্রবারের নামাজের আগেও নিরাপত্তাবাহিনী শ্রীনগর-সহ গোটা কাশ্মীরকে কঠোর নিরাপত্তা ও কারফিউতে মুড়ে রেখেছে।

গত ৫ আগস্ট ভারত সরকারের কাশ্মীরের স্বশাসন কেড়ে নেওয়ার বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ঘোষণার অনেক আগে থেকেই সেখানকার হুরিয়তপন্থী স্বাধীনতাকামী নেতাদের হয় গৃহবন্দী, নয় জেলে আটকে রাখা হয়েছিল।

ফলে সৈয়দ আলি শাহ গিলানি, মিরওয়াইজ ওমর ফারুক বা ইয়াসিন মালিকের মতো কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী নেতারা ‘জয়েন্ট রেজিস্ট্যান্স লিডারশিপ’ নামে যে যৌথ নেতৃত্ব গঠন করেছিলেন তাদের দিক থেকে এযাবত কোনও কর্মসূচীর ঘোষণা আসেনি।

কিন্তু ভারতের পার্লামেন্টে জম্মু ও কাশ্মীরকে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার দুসপ্তাহ পর অবশেষে সেই যৌথ নেতৃত্বের নামে পোস্টার পড়েছে - সাধারণ মানুষকে আহ্বান জানানো হয়েছে তারা যেন এই শুক্রবারের নামাজের পর বিপুল সংখ্যায় সরকার-বিরোধী প্রতিবাদ মিছিলে যোগ দেন।

শ্রীনগর থেকে বিবিসি উর্দুর রিয়াজ মাসরুর এদিন বলছিলেন, " পোস্টারগুলো যে হুরিয়ত নেতাদের সঠিক লেটারহেডে তা ঠিক বলা যাবে না, তবে সৌরা-সহ শ্রীনগরের কিছু এলাকায় সত্যিই এগুলো দেখা যাচ্ছে।"

"তবে ২০১৬তে বুরহান ওয়ানি নিহত হওয়ার পর জয়েন্ট রেজিস্ট্যান্স লিডারশিপ পোস্টারে যে ধরনের ক্যালেন্ডার বের করত - যে অমুক দিন হরতাল হবে, তমুক দিন বিক্ষোভ মিছিল - এই পোস্টারগুলোও অনেকটা সে ধরনের।"

"কিন্তু এগুলো আসলেই হুরিয়ত নেতাদের জারি করা আহ্বান কি না, তা যাচাই করার কোনও উপায় নেই।"

"কারণ তাদের শীর্ষ নেতৃত্বই শুধু নয় - দ্বিতীয় বা তৃতীয় সারির নেতারাও সবাই গত বেশ কয়েকদিন ধরে আটক, বাইরের জগতের সঙ্গে তাদের কোনওরকম যোগাযোগ করতে দেওয়া হচ্ছে না।"

"এই পটভূমিতে পোস্টারগুলো সত্যিই তাদের কিনা, এটা বলা খুব মুশকিল", বলছিলেন ওই বিবিসি সংবাদদাতা।

এদিকে রয়টার্স জানাচ্ছে, শ্রীনগরের দেওয়ালে সাঁটা এমনই একটি পোস্টারে লেখা হয়েছে, "প্রত্যেক কাশ্মীরী - তরুণ বা বৃদ্ধ, পুরুষ বা মহিলা - সবাইকে বলা হচ্ছে শুক্রবারের নামাজের পর বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দিতে।"

সেই প্রতিবাদ যে ‘হুকুমত’ বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে সেটাও।

শ্রীনগরে জাতিসংঘের যে সামরিক পর্যবেক্ষক গোষ্ঠীর (ইউএনএমওজি) কার্যালয় আছে, প্রতিবাদ মিছিল সেই অভিমুখে যাবে বলেও জানানো হয়েছে।

১৯৪৯ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে প্রথম যুদ্ধের পরই জাতিসংঘের এই কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল।

এখন এই পোস্টারের আহ্বানে কতটা সাড়া মিলবে তা স্পষ্ট নয়, কিন্তু নামাজ-পরবর্তী জমায়েত ঠেকাতে ভারতের নিরাপত্তা বাহিনী কোনও ঝুঁকি নিচ্ছে না।

রিয়াজ মাসরুর বলছিলেন, "কাশ্মীরে এক মাস বা দুমাস ধরে টানা কারফিউ বা ব্ল্যাকআউট কোনও নতুন ঘটনা নয়।"

"কিন্তু তার পরেও এবারের পরিস্থিতি অনেকটাই আলাদা, কারণ যোগাযোগের একটা রাস্তাকেও এবার ছাড় দেওয়া হয়নি।"

"আজ শুক্রবারের আগে সেই ফাঁস যেন আরও এঁটে বসেছে।"

" যে এলাকাতেই যাচ্ছি, মানুষ ঘিরে ধরে প্রশ্ন করছেন - এবার কি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ লাগবে? আরও কঠোর ক্র্যাকডাউন শুরু হবে? উত্তর কারওরই জানা নেই, আর সাধারণ মানুষও যেন নিরবিচ্ছিন্ন আতঙ্কের ঘেরাটোপে বন্দী!"

গত কয়েকদিনে কাশ্মীরের যেখানেই মানুষ জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখানোর চেষ্টা করেছে - নিরাপত্তা বাহিনী প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তা ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে।

চালানো হয়েছে পেলেট গান বা ছররা বন্দুকও, যাতে ঘায়েল হয়ে হাসপাতালে ভর্তি অনেকেই।

আজ শুক্রবারেও শ্রীনগরে এমন কোনও সংঘাত দেখা যাবে কি না, সেই আশঙ্কা রয়েছে পুরোদস্তুরই।

কাশ্মীর ইস্যুতে উত্তেজনা না বাড়াতে ভারত-পাকিস্তানের প্রতি আহ্বান ফ্রান্সের : কাশ্মীর সংকট ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় ইস্যু বলে মন্তব্য করেছের ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। একই সঙ্গে দেশটি রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে বিরোধ সমাধান এবং উত্তেজনা বাড়ায় এমন পদক্ষেপ থেকে উভয় দেশকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এখবর জানিয়েছে।

মঙ্গলবার কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কুরেশি সঙ্গে ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-ইয়েভেস লে ড্রায়ানের ফোনালাপে এই অবস্থানের কথা জানায় প্যারিস।

ফোনালাপে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাশ্মীর ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন। কাশ্মীরকে ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় ইস্যু উল্লেখ করে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী দ্বিপাক্ষিক রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে ইস্যুটির সমাধান দীর্ঘমেয়াদি শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানান।

ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সবগুলোকে পরিস্থিতি আরও নাজুক না করতে উত্তেজনা পরিহার করার আহ্বান জানিয়েছেন ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

পুলিশের টিয়ারশেলে নিজ ঘরেই প্রাণ হারালেন কাশ্মিরি নারী : জুমার নামাজের পরে নিজ ঘরে দুই সন্তানকে পড়াচ্ছিলেন কাশ্মিরের বাসিন্দা রফিক সাগুর স্ত্রী ফাহমিদা। একই সময়ে কাছেই একটি বিক্ষোভ দমনে পুলিশের ছোঁড়া টিয়ারগ্যাস ঢুকে পড়ে তাদের ঘরে। আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত্যু হয় ফাহমিদার। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি’র কাছে এভাবেই গত ৯ আগস্টের ওই ঘটনা বর্ণনা করেন রফিক। তবে গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা অচলাবস্থায় কোনও বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর জন্য নিরাপত্তা কর্মকর্তারা দায়ী নয় বলে দাবি করে আসছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।

গত ৫ আগস্ট (সোমবার) ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মধ্য দিয়ে কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। এর আগ মুহূর্তে জম্মু-কাশ্মিরে আধাসামরিক বাহিনীর অতিরিক্ত ৩৫ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়। পরে নতুন করে সেখানে নিয়োজিত হয় আধাসামরিক বাহিনীর আরও ৮ হাজার সদস্য। উপত্যকায় কারফিউ জারির পাশাপাশি টেলিফোন-ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ রাখা হয়েছে। এতসব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরেও সেখানে বিক্ষোভ ঠেকাতে পারছে না ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেওয়ার চার দিন পর কাশ্মিরের রাজধানী শ্রীনগরের উপশহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষের সময় নিজ ঘরে টিয়ারগ্যাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ফাহমিদা। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ৯ আগস্ট দুপুরে সেই মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি জানান, শ্রীনগরে নিজেদের বাড়িতে দুই সন্তানকে পড়াচ্ছিলেন তার স্ত্রী ফাহমিদা। কাছেই বিক্ষোভকারী ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ চলছিল। কিছুক্ষণ পরেই পুলিশ আবাসিক বাড়ি লক্ষ্য করে টিয়ারগ্যাস ও পিপার শেল নিক্ষেপ শুরু করে।

সাগু বলেন, ‘এত ঘন ধোঁয়ায় ঘর পূর্ণ হয়ে গেছিল যে আমরা পরস্পরকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। ক্যানিস্টার (টিয়ার গ্যাসের শেল) বিস্ফোরণের সময় তিনটি বড় ধরণের শব্দ হয়। কোনরকমে দুই সন্তানকে ঘরের বাইরে বের করে দিতে পারি আর চিৎকারের মধ্যে ও (স্ত্রী) দৌড়ে বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু পড়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে তাকে ঘরের বাইরে বের করে আনতে সক্ষম হই কিন্তু ততক্ষণে সে অজ্ঞান হয়ে গেছে আর মুখ দিয়ে গাঁজলা বের হতে শুরু করেছে। রফিক জানান, একটা মোটরসাইকেলে করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই কিন্তু ডাক্তাররা আর তার জ্ঞান ফেরাতে পারেনি।’

এএফপি’র হাতে পাওয়া মেডিক্যাল রিপোর্টে বলা হয়েছে, টিয়ারশেলের থেকে বিষাক্ত গ্যাস রফিকের স্ত্রীর ফুসফুসে ঢুকে পড়েছে। সেকারণেই সম্ভবত বিষাক্ত ফুসফুস ইঞ্জুরিতে তার মৃত্যু হয়েছে।

ভয়ঙ্কর আতঙ্কে কাশ্মীরী মেয়েরা : ভারতীয় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিল করার পর কেমন আছে কাশ্মীর? কেমন আছেন সেখানকার মেয়েরা!

গত ৫ অগস্ট ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল হয় কাশ্মীরে। বিশেষ মর্যাদা হারায় কাশ্মীর। আর তার পর থেকেই টানা বেশ কয়েক দিন দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল কাশ্মীর উপত্যকা। বন্ধ টেলিফোন, ইন্টারনেট।

পড়াশোনার জন্য কেরলে থাকতে হয় বছর কুড়ির তরুণী উজমা জাভেদকে। পরিবারের সঙ্গে ঈদ পালনের জন্য ওই সময়ে কাশ্মীরে ফিরেছিলেন উজমা। কিন্তু ঈদ তো দূরের, ঘরে ফিরে বন্দিদশাতেই ঈদ কেটে গেল উজমার। 

সংবাদ সংস্থাকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে উজমা জানিয়েছেন, ওই সময়টা সব চেয়ে বেশি সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে কাশ্মীরি মেয়েদেরই।

উজমা জানান, সে সময় প্রতিটা মুহূর্ত উৎকণ্ঠায় কেটেছে তার। শ্রীনগরে তাদের দোতলা বাড়ির জানালা থেকে বারবার চোখ চলে যেত রাস্তায়। এই বুঝি কিছু হলো। সুনসান রাস্তাঘাট। টহল দিচ্ছে আধা সামরিক বাহিনী। কেউ কেউ হয়তো আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাস্তা জুড়ে ছড়ানো কাঁটাতারের গ-ি পার করে বেরোতে পেরেছিল। কিন্তু ভয়ে আতঙ্কে কাঁটা হয়েছিলেন পরিজনেরা। বিশেষত বাড়ির মেয়েরা।

উজমা জানিয়েছেন, সব চেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা হয়েছে, আশপাশের বান্ধবীদের জন্য। প্রায় এক সপ্তাহ ওদের কোনো খবর পাননি তিনি। বললেন, ‘‘মুনাজা কী করছে, কেমন আছে, কোনো খবর পাচ্ছিলাম। তা-ও ছেলেরা কোনো ভাবে ঈদের নামাজের জন্য বাড়ির বাইরে বেরোতে পেরেছিলেন। আমাদের তো সেটুকুও সম্ভব হয়নি।’’

তিনি আরো বলেছেন, ‘‘বাবা বা ভাইকেও আমি বাড়ির বাইরে বেরোতে দিতে চাইছিলাম না সে সময়। কিন্তু কোনো উপায়ও ছিল না। বাড়ির নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস এবং রুটিটুকু আনার দরকারে বেরোতেই হচ্ছিল।’’ বাড়ির সামনেই তখন বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ বেধেছে বাহিনীর। মায়ের সঙ্গে একা বাড়িতে উজমা আতঙ্কে কাঁটা হয়েছিলেন। অনেক রাতে যখন বাবা ও ভাই ঘরে ফিরলেন, তত ক্ষণে উজমাকে নিয়ে ছুটতে হয়েছে হাসপাতালে। আতঙ্কে, উৎকণ্ঠায় সে দিন তার রক্তচাপ এমনই বেড়ে গিয়েছিল।

৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপ হলে সমাজে লিঙ্গসাম্য প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যে নারীদের অধিকারও সুরক্ষিত হবে, এমন দাবি করেছিল বিজেপি। তবে তার এক দিন পর থেকেই কাশ্মীরি মহিলাদের দিকে ছুটে এসেছে কুরুচিকর ইঙ্গিত, তা-ও আবার খোদ বিজেপি মন্ত্রীদের বক্তৃতাতেই।

শ্রীনগরের মেকআপ শিল্পী ২২ বছরের সামরিন বললেন, যে ভাবে কাশ্মীরি নারীদের পণ্যের মতো দেখা হচ্ছে ভারতে এবং তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশের ছবি ব্যবহার করে ভয় দেখানোর চেষ্টা চলছে এবং সম্মানহানিকর ইঙ্গিত করা হচ্ছে, তাতে প্রতি মুহূর্তে নিজেদের নির্যাতিত মনে হচ্ছে। আর সেই অনুভূতি কাশ্মীরের পুরুষদের আতঙ্কের চেয়েও বেশি ভয়াবহ।

শ্রীনগরের বাসিন্দা ২২ বছরের মিসবাহ রিহাসিও মনে করেন, বিজেপি যে ভাবে মুসলিম নারীদের রক্ষা করতে ‘মসিহা’ সাজার চেষ্টা করছে, তা আদতে সত্যি নয়। তার কথায়, আশা করি, ভারতের মানুষ একদিন বুঝতে পারবে, এই দলের কাশ্মীরি নারীদের সুরক্ষা দেয়ার কোনো ইচ্ছা বা প্রচেষ্টাই নেই।

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার কারণেই কাশ্মীর মোদির টার্গেট: সীতারাম 

জম্মু-কাশ্মীর ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য হওয়ার কারণেই তার বিশেষ মর্যাদা বাতিল করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদী) সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি। তিনি বলেন, সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীরকে ভারতের ফিলিস্তিনে পরিণত করতে চেষ্টা করছে মোদি সরকার। এ.কে গোপালান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডিজে এক আলোচনায় তিনি এসব মন্তব্য করেন।

গত ৫ আগস্ট ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মধ্য দিয়ে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। জম্মু-কাশ্মীরকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করতে পার্লামেন্টে একটি বিলও পাস করা হয়েছে। এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে কাশ্মীরজুড়ে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত সেনা। গ্রেফতার করা হয়েছে স্থানীয় কয়েকশ’ নেতাকর্মীকে। তাদের মুক্তি দাবি করে আসছে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি।

বাতিলকৃত ৩৭০ অনুচ্ছেদের ৩৫ (এ) ধারা অনুযায়ী, কাশ্মীর যে ‘বিশেষ মর্যাদা’র অধিকারী ছিল, তার কারণে কাশ্মীরের বাইরের কোনও ভারতীয় নাগরিকের সেখানকার ভূমি ক্রয়ের অধিকার ছিল না। একইরকম ‘বিশেষ অধিকার’ রয়েছে সে দেশের আরও কয়েকটি রাজ্যেও। পার্টির নেতা সীতারাম সেই প্রসঙ্গে বলেন, জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের অজুহাত হিসেবে তথ্যবিকৃতির পাশাপাশি ভুল প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের অপর ১০টি ধারায় ভারতের অন্যান্য কয়েকটি রাজ্যও বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। উত্তর পূর্বাঞ্চলের অধিকাংশ রাজ্য- অন্ধ্র প্রদেশ, তেলেঙ্গানা ও গুজরাটের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। কেবল জম্মু-কাশ্মীরেই নয়, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরখান্ড ও সিকিমেও অন্য কোনও রাজ্যের মানুষ ভূমির মালিকানা নিতে পারে না।‘

রাজ্যসভার সাবেক এই আইনপ্রণেতা অভিযোগ করেন, ‘এটা কেবল জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার প্রশ্ন না। ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য হওয়ায় একে টার্গেট করা হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে সাম্প্রদায়িক এজেন্ডা। এই কারণেই সংবিধানে থাকা ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও মৈত্রীতন্ত্রের মূলনীতিতে আঘাত হানছে তারা।‘

সীতারাম অভিযোগ করেন, কাশ্মীরে আরও হিন্দু বসতি স্থাপনের মাধ্যমে জনমিতির পরিবর্তন করাই সরকারের পরিকল্পনা। তারা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যকে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যে পরিণত করতে চায়। আজ তারা ঠিক ইসলায়েলের আদর্শ অনুসরণ করছে। ‘আমরা জম্মু-কাশ্মীরকে ভারতের ফিলিস্তিনে পরিণত করতে অনুমতি দিতে পারি না, কেবল এই কারণেই এই দিন (২২ আগস্ট) আন্দোলন শুরু হবে। আমরা এমন ধরনের কাজের অনুমতি দিতে পারি না যে, ফিলিস্তিনের জনগণের সঙ্গে ইসরায়েল যেমন ব্যবহার করছে; আমাদের দেশে... জনগণের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।’ বলেন তিনি।

কাশ্মীরে ফের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন, গুলি চালিয়েছে পাকিস্তান 

পাকিস্তান বার বার সীমান্তে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ করেছে ভারত। 

বুধবার বিকেলেও কাশ্মীরে গুলি চালিয়েছে পাক সেনারা। 

ইন্ডিয়া ট্যুডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জম্মু-কাশ্মীরের রাজৌরি জেলার সুন্দেরবানি সেক্টরে বুধবার দুপুর ৩টা ৪৫ মিনিটে বিনা উস্কানিতে গুলি চালাতে থাকে পাক সেনারা। পাল্টা জবাব দিয়েছে ভারতীয় সেনারাও।

পাক সেনারা হালকা অস্ত্র দিয়ে গুলি চালিয়েছে এবং মর্টার ও গোলাবর্ষণ করেছে। এর আগে গত মঙ্গলবার সকালেও কাশ্মীরের কৃষ্ণা ঘাঁটিতে পাকিস্তানের হামলায় এক ভারতীয় জওয়ান নিহত হয়েছেন।

পাক সেনাদের গোলাগুলিতে আহত হয়েছেন আরও চারজন। তবে পাকিস্তানের সেনা মুখপাত্র এক টুইট বার্তায় দাবি করেছেন যে, কৃষ্ণা ঘাঁটিতে ভারতের এক সেনা কর্মকর্তাসহ ৫ জওয়ান নিহত হয়েছেন। পাকিস্তানের এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করে ভারতীয় সেনাবাহিনী জানিয়েছে, পাকিস্তান মিথ্যা বলছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ