ঢাকা, শুক্রবার 23 August 2019, ৮ ভাদ্র ১৪২৬, ২১ জিলহজ্ব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আবারও আটকে গেল রোহিঙ্গা  প্রত্যাবাসন ॥ ফিরতে চার শর্ত  রোহিঙ্গাদের

 

 

স্টাফ রিপোর্টার : প্রস্তুতির পরও রোহিঙ্গাদের অনিচ্ছার কারণে আবারও আটকে গেল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, প্রত্যাবাসনের জন্য কাউকে না পাওয়াটা দুঃখজনক, তবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়নি, আগামীতেও চলবে। কাউকে পাওয়া গেলে পাঠানো হবে। তবে নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকত্বসহ চারটি শর্ত দিয়েছেন রোহিঙ্গারা। 

গতকাল বৃহস্পতিবার শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের (আরআরআরসি) কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম সাংবাদিকদের বলেন, রোহিঙ্গারা রাজি না হওয়ায় প্রত্যাবাসন সম্ভব হচ্ছে না। এর আগে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুতি নেয় বাংলাদেশ। ঘুমধুম ট্রানজিট পয়েন্ট প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি জোরদার করা হয় সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রসঙ্গত, প্রত্যাবাসনের জন্য ৩ হাজার ৫৪০ জন রোহিঙ্গাকে ছাড়পত্র দেয়া হয়। ইউএনএইচসিআর এবং শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের প্রতিনিধিরা ক্যাম্পে গিয়ে রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার নেন। এর আগে গত বছর নভেম্বর মাসে একই রকমের একটি প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ ভেস্তে যায়।

এ দিকে গতকাল দুপুর আড়াইটার দিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, প্রত্যাবাসনের জন্য কাউকে না পাওয়াটা দুঃখজনক, তবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়নি, আগামীতেও চলবে। কাউকে পাওয়া গেলে পাঠানো হবে। তিনি বলেন, আমরা আশা করেছিলাম আজ থেকে স্বল্প আকারে হলেও প্রত্যাবাসন শুরু হবে। তবে এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি। কিন্তু আমরা আশা ছাড়িনি। আমরা এখনো প্রত্যাবাসন ইস্যুতে ত আশায় বুক বেঁধে আছি। আজকের বিষয়টি দুঃখজনক। পরবর্তী সময়ে কী করব, আমরা বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে জানাব।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যারা প্রত্যাবাসন ঠেকাতে প্রচার চালিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রোহিঙ্গাদের আরামের জীবন থেকে আরাম কমানো হবে, যাতে তারা ফিরতে রাজি হয়।

রোহিঙ্গা সমস্যা মিয়ানমারের সৃষ্টি এবং এ সংকটের সমাধান তাদের কাছেই উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, আমরা জোর করে কাউকে পাঠাব না। আমরা স্বেচ্ছায় নিরাপদ প্রত্যাবাসন চাই। রোহিঙ্গা সংকটের মূলে আস্থার অভাব রয়েছে। এজন্য আমরা সবশেষ চতুর্থ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে প্রস্তাব করেছিলাম, আস্থা তৈরির জন্য কক্সবাজারের একাধিক শিবিরে যেসব রোহিঙ্গা মাঝি বা নেতা রয়েছেন তাদের রাখাইন নিয়ে ঘুরিয়ে দেখানো হোক, যেন রোহিঙ্গাদের মধ্যে আস্থার যে অভাব আছে তা দূর হয়।

তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে না যাওয়ার জন্য শিবিরগুলোতে অনেক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রচারণা চালাচ্ছে। চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ঢাকার পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, আমরা এখন চিন্তা করেছি, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জন্য একটি কমিশন গঠন করব, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা থাকবেন।

এ দিকে গতকাল বৃহস্পতিবার শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের (আরআরআরসি) কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম সাংবাদিকদের বলেন, রোহিঙ্গারা রাজি না হওয়ায় প্রত্যাবাসন সম্ভব হচ্ছে না।

মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত ২৯০ জনের সাক্ষাৎকার সম্পন্ন হয়। তারা প্রত্যেকেই বলেছেন, মিয়ানমারে ফেরত যাবেন না। এখন পর্যন্ত একজনও রাজি হয়নি। ফলে কাউকে নেওয়া যাচ্ছে না। তবে সাক্ষাৎকার চলমান থাকবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ব্যর্থ কিনা জানতে চাইলে আবুল কালাম বলেন, এটা ব্যর্থ বলতে পারেন না। সব পরিবারের সাক্ষাৎকার চলবে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলবে এটা। তিনি আরও বলেন, ঘুমধুম ট্রানজিট পয়েন্টে প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি ৫টি বাস ও ২টি ট্রাক সকাল থেকে টেকনাফের শালবন ক্যাম্পে থাকবে। এ প্রক্রিয়াকে নিরাপদ করতে ক্যাম্প ও সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

চার শর্ত রোহিঙ্গাদের: নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকত্বসহ চারটি শর্ত দিয়েছেন রোহিঙ্গারা। গতকাল দুপুর ২টার দিকে টেকনাফের নয়াবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এক সাংবাদিক  সম্মেলনে একথা জানানো হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা ও আরকানা রোহিঙ্গা সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ উল্লাহ বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নাগরিকত্ব দেওয়া, জমিজমা ও ভিটেমাটির দখল এবং সেদেশে ক্যাম্পে যে এক লাখ ২৮ হাজার রোহিঙ্গাকে রাখা হয়েছে তাদের বাসস্থানে ফিরিয়ে দিতে হবে। 

তিনি বলেন, এই চার শর্ত মানলে আমরা মিয়ানমারে ফেরত যাব। শর্ত মানলে আমরা আজই সেখানে যাব। আমরা সবসময়ই রাজি আছি। তবে শর্ত না মানলে যাব না। 

সৈয়দ উল্লাহ দাবি করেন, তিনি ৯০ ভাগ রোহিঙ্গার দাবি উপস্থাপন করেছেন। এ সময় চারটি ক্যাম্পের দলনেতা, ইমাম ও সোসাইটির সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও ক্যাম্পের চেয়ারম্যানরা ছিলেন না।

বৃহস্পতিবারই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে দুপুর পর্যন্ত তাদের অনাগ্রহের কারণে তা শুরু করা যায়নি।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে বর্তমানে ১১ লাখের অধিক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছেন। তাদের বেশির ভাগই মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর বর্বর অভিযান থেকে জীবন বাঁচাতে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। পরে নানা প্রক্রিয়া শেষে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে চুক্তি হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিদিন ৩০০ রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবে মিয়ানমার। দুই বছরের মধ্যে সবাইকে ফেরত নেয়া শেষ হয়ার কথা। কিন্তু দুবছরে একটা লোকও যাইনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ