ঢাকা, বৃহস্পতিবার 19 September 2019, ৪ আশ্বিন ১৪২৬, ১৯ মহররম ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

মহামারির আকারে ছড়িয়ে পড়ছে ওষুধ প্রতিরোধী নতুন সুপারবাগ ‘‘ক্যানডিডা অরিস’’

ছবি: গেটি ইমেজ

সংগ্রাম অনলাইন ডেস্ক: বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে ওষুধ প্রতিরোধী নতুন সুপারবাগ। ফলে মহামারির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিবিসির লেনা সিরিকের প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ক্যানডিডা অরিস’ হচ্ছে ওষুধ প্রতিরোধী ফাঙ্গাস বা ছত্রাক। ১০ বছর আগে এটি আবিষ্কার হয়েছিলো। হাসপাতালে থাকা অণুজীবের মধ্যে এখন বিশ্বের সবচেয়ে আতঙ্কজনক নামগুলোর মধ্যে এই ক্যানডিডা অরিস।

এই ফাঙ্গাসের আক্রমণে বিশ্বজুড়ে মহামারি দেখা দেয়ার উপক্রম হয়েছে। গবেষণা বলছে, তাপমাত্রা বাড়ার কারণেই বৃদ্ধি পাচ্ছে এর সংক্রমণের হার।

ক্যানডিডা অরিস কী?

ক্যানডিডা অরিস বা সি. অরিস হচ্ছে এক ধরনের ইস্ট বা ফাঙ্গাস। যা মানব দেহে সংক্রমণ তৈরি করতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বেশিরভাগ সময়ই ক্যানডিডা ছত্রাক আমাদের ত্বকে কোন ধরনের ক্ষতি না করেই বসবাস করে। তবে আমরা যদি অসুস্থ হই, কিংবা সংবেদনশীল কোন স্থান, যেমন রক্তস্রোত বা ফুসফুসে চলে গেলে এটি সংক্রমণ তৈরি করতে পারে।

২০০৯ সালে জাপানের টোকিও মেট্রোপলিটন গেরিয়াট্রিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক রোগীর কানের ভেতর প্রথম পাওয়া যায় ক্যানডিডা অরিস ছত্রাক।

এর সংক্রমণ বেশ মারাত্মক। সারা বিশ্বে যারা ক্যানডিডা অরিসে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের ৬০ ভাগই মারা গেছেন। এই ছত্রাক সাধারণত ওষুধ প্রতিরোধী হওয়ায় এর সংক্রমণ ঠেকানো কঠিন।

ওষুধ প্রতিরোধী অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে অনেক দেশে গবেষণা চলছে। গবেষণায় বলা হচ্ছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্যানডিডা অরিস মানব দেহে রক্তপ্রবাহে সংক্রমণ তৈরি করে। এছাড়া শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যবস্থা, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র, দেহের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অঙ্গ এবং ত্বকেও সংক্রমণ তৈরি করতে পারে। অনেক সময়ই এই সংক্রমণকে অন্য কোন অসুস্থতা বলে ভুল করা হয়। ফলে দেওয়া হয় ভুল চিকিৎসা।

এক গবেষণায় পাওয়া গেছে, বেশিরভাগ ছত্রাকই কম তাপমাত্রায় মাটিতে বসবাস করতে পছন্দ করে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্যানডিডা অরিস ছত্রাক বেশি তাপমাত্রায় বেঁচে থাকতে পারে। ফলে মানুষের দেহে তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস হওয়ায় তাদের জন্য মানব দেহে বেঁচে থাকা সহজ।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ক্যানডিডা অরিসের সংক্রমণ সচরাচর খুব একটা হয় না। তবে আপনি যদি দীর্ঘ দিন ধরে হাসপাতাল কিংবা নার্সিং হোমে থাকেন। চিকিৎসার কারণে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে হয়, তাহলে ক্যানডিডা অরিসের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। কারণ ক্যানডিডা অরিসের সংক্রমণরোধী ভালো ব্যাকটেরিয়াও মেরে ফেলে অ্যান্টিবায়োটিক।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র সিডিসি বলছে, এর ঝুঁকি কমাতে হলে ক্যানডিডা অরিসের সংক্রমণের শিকারে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কারা রয়েছে সেটা বের করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর জানিয়েছে, ধীরে ধীরে বিশ্বের অনেক দেশেই ক্যানডিডা অরিসের সংক্রমণের খবর মিলছে। ইউরোপের বেশিরভাগ দেশেই এই ছত্রাকের সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। সবশেষ চলতি বছরের এপ্রিলে গ্রিসে এই সংক্রমণের খবর মেলে।

রোগ নিয়ন্ত্রণ প্র্যাকটিশনার ও ইউসিএল ক্লিনিক্যাল লেকচারার ডা. এলাইন ক্লাউটম্যান-গ্রিন বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের বেশ কিছু হাসপাতালে এই ছত্রাকের সংক্রমণ মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে। এ জন্য পাবলিক হেলথ ইংল্যান্ডের কাছে সহায়তা চাওয়া হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘হাসপাতালের পরিবেশে বেঁচে থাকে এই ছত্রাক। তাই একে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে।’

ইংল্যান্ডের জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় সংক্রমণ পরিসেবা বিভাগের মেডিক্যাল অণুজীববিজ্ঞানী ডা. কলিন ব্রাউন বলেন, ‘ক্যানডিডা অরিসের সংক্রমণ ঠেকাতে বিশেষজ্ঞ মতামত ও সংক্রমণ প্রতিরোধী নানা ব্যবস্থা নিয়ে জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সঙ্গে জনস্বাস্থ্য বিভাগ কাজ করছে।’

সংক্রমণ হয়েছে কিনা তা নিয়ে কি চিন্তিত হওয়া উচিত?

সাধারণত সি. অরিসের সংক্রমণ সচরাচর খুব একটা হয়না।

তবে আপনি যদি দীর্ঘ সময় ধরে হাসপাতাল কিংবা নার্সিং হোমে থাকেন, এবং চিকিৎসার কারণে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে হয় তাহলে সি. অরিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।

কারণ অ্যান্টিবায়োটিক সি. অরিসের সংক্রমণরোধী ভাল ব্যাকটেরিয়াও মেরে ফেলে।

যেসব রোগীদের দীর্ঘদিন ধরে থাকেত হয় তাদের ক্যানডিডা অরিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে

২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে ৬০ জন রোগী সি. অরিসের সংক্রমণের শিকার হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর জানিয়েছে, ধীরে ধীরে বিশ্বের অনেক দেশেই সি. অরিসের সংক্রমণের খবর মিলছে।

ইউরোপের বেশিরভাগ দেশেই এই ছত্রাকের সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। সর্বশেষ চলতি বছরের এপ্রিলে গ্রিসে এই সংক্রমণের খবর মেলে।

সি. অরিস সাধারণ ওষুধ প্রতিরোধী কেন?

যেসব রোগীরা সি. অরিসে আক্রান্ত হয়েছেন তাদের বেশিরভাগের মধ্যেই ফ্লুকোনজলের মতো সাধারণ ছত্রাক রোধী ওষুধ আর তেমন কাজ করছে না বলে প্রতিপন্ন হয়েছে।

এর মানে হচ্ছে, এসব ওষুধ সি. অরিস নিয়ন্ত্রণেও কাজ করে না।

এ কারণে সি. অরিসের সংক্রমণের চিকিৎসায় অপেক্ষাকৃত কম প্রচলিত ছত্রাক রোধী ওষুধ ব্যবহার করা হয়। তবে এসব ওষুধের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধী ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে সি. অরিস।

ডিএনএ পরীক্ষায় পাওয়া যায় যে, সি. অরিসের ছত্রাক রোধী ওষুধ প্রতিরোধক জিনের সাথে সি. আলবেনিয়ান্সের জিনের বেশ মিল রয়েছে।

তার মানে হচ্ছে, ওষুধ প্রতিরোধী জিনগুলো এক প্রজাতি থেকে আরেক প্রজাতিতে ছড়িয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের হাসপাতালের আইসিইউতে পাওয়া গেছে সুপার বাগের অস্তিত্ব

সংক্রমণের সংখ্যা বৃদ্ধিকে জলবায়ু পরিবর্তন কিভাবে প্রভাবিত করেছে?

এক গবেষণায় পাওয়া গেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সি. অরিস ছত্রাক বেশি তাপমাত্রায় বেঁচে থাকতে বাধ্য হওয়ায় এর সংক্রমণের হার বেড়ে গেছে।

বেশিরভাগ ছত্রাকই কম তাপমাত্রায় মাটিতে বসবাস করতে পছন্দ করে। কিন্তু বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায়, উচ্চ তাপমাত্রার সাথে খাপ-খাইয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে সি. অরিস।

আর এর কারণে, মানুষের দেহে তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস হওয়ায় তাদের জন্য মানব দেহে বেঁচে থাকা সহজ।

সংক্রমণের সংখ্যা কমাতে কী করা যেতে পারে?

সংক্রমণের সংখ্যা কমাতে হলে প্রথমেই সনাক্ত করতে হবে যে, এই ছত্রাকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে কারা রয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা দানকারী কর্মীদের জানতে হবে যে, যারা চিকিৎসার জন্য দীর্ঘদিন হাসপাতাল কিংবা নার্সিংহোমে কাটান, তারাই এ ধরণের সুপার বাগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি থাকেন।

সব হাসপাতালে সি. অরিস একইভাবে সনাক্ত করা হয় না। অনেক সময় এর সংক্রমণকে মুখ ও গলায় ক্ষতের মতো সাধারণ ছত্রাকের সংক্রমণ বলে মনে করা হয় এবং ভুল চিকিৎসা দেয়া হয়।

উন্নত চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হলে প্রাথমিক পর্যায়েই সি. অরিসের সংক্রমণ সনাক্ত করা সম্ভব। আর এর ফলে সঠিক চিকিৎসা দেয়ার মাধ্যমে অন্য রোগীদের মধ্যে এর সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব।

সি. অরিস বেশ শক্তিশালী এবং এটি খোলা পরিবেশে অনেক দিন ধরে বেঁচে থাকতে পারে।

সাধারণ ডিটারজেন্ট এবং সংক্রমণরোধী রাসায়নিক দিয়ে একে মেরে ফেলা যায় না।

যেসব হাসপাতালে এই সুপার বাগের সংক্রমণ ধরা পড়েছে সেখানে উপযুক্ত পরিষ্কারক রাসায়নিক ব্যবহার করে এর সংক্রমণ রোধ করা যেতে পারে।

সূত্র: বিবিসি

ডিএস/এএইচ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ