ঢাকা, বৃহস্পতিবার 29 August 2019, ১৪ ভাদ্র ১৪২৬, ২৭ জিলহজ্ব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

খুলনায় ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভুয়া রিপোর্টের ছড়াছড়ি

খুলনা অফিস : খুলনায় ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে ভুয়া রিপোর্টের ছড়াছড়ি। অধিকাংশ প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার সেবার পরিবর্তে অসহায় গরিব রোগীদের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছে অর্থ। অভিযোগ রয়েছে, সন্ধানী ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসক সুকুমার সাহা প্যাথলজি ও চিকিৎসক অশোক কুমার পাল আলট্রাসনোগ্রাম এর দায়িত্ব পালন করে থাকেন। ডা. সুকুমার সাহা শহীদ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে এবং ডা. অশোক কুমার পাল খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চাকরিরত। সন্ধানী ডায়াগনস্টিক সেন্টারে প্রতিদিন ৩শ’ থেকে সাড়ে ৩শ’ রোগীর পরীক্ষা করা হয়। সরকারি হাসপাতালে চাকরি করে এত রিপোর্ট করা এ দুই ডাক্তারের পক্ষে সম্ভব নয় বলে মনে করেন খুলনার অভিজ্ঞজনরা। সন্ধানীর মতো এ রকম অভিযোগ রয়েছে নগরীর অন্যান্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধেও। এ সকল প্রাইভেট সেবামূলক প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স প্রাপ্তির ও পরিচালনার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রাণালয় থেকে যে শর্তাবলী মানার কথা ছিল, তারা তা মানছেন না।
সন্ধানী ডায়াগনস্টিক সেন্টারের একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রিপোর্টে অনেক সময় লাগে তাই ডা. সুকুমার সাহা ও ডা. অশোক কুমার পাল সাদা প্যাডে সিল এবং সাক্ষর করে রেখে যান। পরে রোগীর টেস্ট রিপোর্ট ওই প্যাডে বসিয়ে দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে তদন্ত করলে এর সত্যতা বেরিয়ে আসবে বলে তিনি দাবি করেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের সবুজ সঙ্কেতে ক্ষমতার জোরে খুলনায় বেপোরোয়াভাবে এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্রাইভেট ক্লিনিকের মালিকরা অবাধে ব্যবসা চালিয়ে রোগীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা।
জানা যায়, খুলনা সন্ধানী ডায়াগনস্টিক সেন্টারে প্রতিদিন রোগীদের প্যাথলজি পরীক্ষা করে প্রায় ৩শ’ থেকে সাড়ে ৩শ’ জন রোগীর। একজন রোগীর একটা পরীক্ষা করতে সময় প্রয়োজন ১৫ থেকে ২০ মিনিট এবং আল্ট্রাসনো রিপোর্ট করতে সময় লাগে প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট। সব মিলিয়ে অন্তত ৩শ’ রোগীর রিপোর্ট করতে প্রায় ২ দিনের বেশি সময় লাগে। অথচ, প্রতিদিন পরীক্ষার রিপোর্ট তারা কয়েক ঘন্টায় ডেলিভারি করছে। রোগীর হাতে গত ১৬ আগস্ট সন্ধানী ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রেজাউল নামের এক ডেঙ্গু রোগীর প্লাটিলেট রিপোর্ট ভুল দেওয়ার জন্য ও রোগীর স্বজনদের অভিযোগের ভিত্তিতে বেসরকারি হাসপাতাল সন্ধানী ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সহকারী ল্যাব এ্যাসিস্ট্যান্ট অশিষ রায় ও তার ভাই দেবাশিষ রায়কে গ্রেফতার করে সোনাডাঙ্গা থানা পুলিশ।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী মুন্না হোসেন (২২) বলেন, তিনি টিকিট জমা দিয়ে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় একজন মহিলা দালাল এসে বলেন এখানে অনেক রোগী, অনেক ভিড়। আপনি মাত্র ১০০ টাকা ভিজিটে খুলনা মেডিকেলের বড় ডাক্তার দেখাতে পারবেন, আসেন, রোগীও ভাবলেন মাত্র ১০০ টাকার জন্য অনেক সময় অপেক্ষায় থাকতে হবে- মহিলার কথায় রাজি হয়ে যান। দালাল নিয়ে যায় মেডিকেলের সামনে উদয়ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। সেখানে খুলনা মেডিকেলের প্রাক্তন আর,এম,ও চিকিৎসক মাহাবুুব আলম ফারাজীর কাছে। তিনি আমার সমস্যা শুনেই কোনো প্রকার ওষুধ না দিয়ে প্রেসক্রিপসনে অনেক প্রকার পরীক্ষা দেন এবং উদয়ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করতে বলেন। ৩০% কমিশনে আমার কাছে পরীক্ষা বাবদ খরচ ৯০০০ টাকা চায়। আমার কাছে তখন টাকা না থাকায় পরবর্তীতে আমি ওইখানে পরীক্ষা না করে কম খরচে ওই পরীক্ষা খুলনা মেডিকেল থেকে করে এনে চিকিৎসক এর কাছে যাই। তিনি আমার ওপর উত্তেজিত হয়ে বলেন, এই রিপোর্ট আমি দেখি না। এই রিপোর্ট সঠিক না। পরবর্তীতে আমি বুঝতে পারি ১০০ টাকার কম ভিজিট রোগীদের জন্য একটি ফাঁদ। সেখানে কোনোভাবে রোগীদের নিয়ে পৌঁছালেই বিনা প্রয়োজনে কয়েক হাজার টাকার পরীক্ষা দেন এবং এই কমিশন টাকার বড় অংশ চিকিৎসক ও দালাল পায়।
তাছাড়া বর্তমান সময়ে সরকারি নিয়ম নীতি উপেক্ষা করে খুলনায় প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক মালিকদের চলছে রোগীদের সাথে প্রতারণা। চালিয়ে যাচ্ছে রমরমা বাণিজ্য। প্রতিদিন সকাল থেকে খুলনা মেডিকেলের সামনে দেখা যায় মহিলা দালালদের আনাগোনা। তথ্য মতে, শুধু উদয়ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রয়েছে প্রায় ৭০ জনের মত দালাল। এছাড়া আশেপাশের ডায়াগনস্টিক সেন্টার পপুলার, হেলথ গার্ডেন, জোহরা মেমরিয়াল, সুগন্ধা ডায়াগনস্টিক, বিশ্বাস ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ইনেভেস্টিগেসন সেন্টার এবং নগরীর আশপাশের প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক ল্যাবকন ডায়াগনস্টিক, লাইফ কেয়ার ডায়াগনস্টিক, অঙ্কুর ডায়াগনস্টিক, শেখ ডায়াগনস্টিক। এছাড়াও মহানগরী ও তার আশপাশ এলাকা থেকে নাম না জানা অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বেসরকারি হাসপাতাল থেকে প্রতিদিন সকাল থেকে, খুলনা মেডিকেল, সদর হাসপাতাল, আবু নাসের হাসপাতালে থাকে সক্রিয় দালাল চক্র এবং এসব দালালদের বিরুদ্ধে র‌্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে আটক হলেও কয়েকদিন পর জামিনে বের হয়ে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে এবং তথ্য মতে এসকল দালালদের প্রত্যেকে মাসিক বেতন ও ৪০% কমিশনের লোভে অসহায় দরিদ্র রোগীদের সাথে প্রতারণা করে আসছে।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) সৈয়দ জাহাঙ্গির বলেন, দালাল চক্র এখনও সক্রিয় রয়েছে। দায়িত্বে আসার পর কয়েকটি অভিযোগ শুনেছি। বিষয়টি নিয়ে অবশ্যই খুলনা মেডিকেলের পরিচালক ও আবু নাসের হাসপাতালের পরিচালকের সাথে কথা বলব এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে তৎপর হবো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ