ঢাকা, বৃহস্পতিবার 29 August 2019, ১৪ ভাদ্র ১৪২৬, ২৭ জিলহজ্ব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

চট্টগ্রাম বন্দরে ১৯ কোটি টাকা মূল্যের ৮টি মোবাইল ক্রেন ক্রয়ের কার্যাদেশ স্থগিত

চট্টগ্রাম ব্যুরো : চট্টগ্রাম বন্দরে প্রায় ১৯ কোটি টাকা মূল্যের ১০ টন ক্ষমতাসম্পন্ন ৮টি মোবাইল ক্রেন ক্রয়ের কার্যাদেশ স্থগিত করেছে। বন্দরে পিপিআর বিধি লঙ্গন করে পুনরায় ৮টি মোবাইল ক্রেন ক্রয়ের কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ ওঠেছে। ১০টি মোবাইল ক্রেন সরবরাহের কাজের চুক্তিতে জাল-জালিয়াতি ও প্রতারনার আশ্রয়ে জাল ব্যাংক পারফরমেন্স গ্যারান্টি ব্যবহারের মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার পরও ওই প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়ায় এমন অভিযোগ ওঠে। বোর্ড সভার সকল সদস্যদের উপস্থিতি না থাকা সত্ত্বেও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সব সদসস্যের দস্তখত না দিয়ে সাময়িক দায়িত্ব প্রাপ্ত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষরে দরপত্র অনুমোদন দেওয়ার দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তবে মামলা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে মনোনীত প্রতিষ্ঠান ইমকো ট্রেড হোল্ডিং (প্রা:) লিমিটেড এর সেই কার্যাদেশ স্থগিত করা হয়।
২০১৩ সালে ১০টন ক্ষমতা সম্পন্ন ১০টি মোবাইল ক্রেন ক্রয়ের জন্য দরপত্র আহবান করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ। এতে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইকম ট্রেড হোল্ডিং (প্রা:) লিমিটেড যোগ্য বিবেচিত হয়। দরপত্রের ধারাবাহিকতায় নোটিফিকেশন অব এওয়ার্ড অনুযায়ী  ওই বছরের ২১ আগষ্ট  চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্র্র্তৃপক্ষের তৎকালীন চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ ও ইকম ট্রেড হোল্ডিং (প্রা:) লি: এর পরিচালক মো: রফিকুল ইসলাম এর চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তি সম্পাদনের পূর্বে ইকম ট্রেড হোল্ডিং (প্রা:) লিমিটেড এর পক্ষে মালিক মো: রফিকুল ইসলাম ২০১৩ সালের ১৯ আগষ্ট  প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেড গুলশান শাখা, ঢাকার ২ কোটি ৭৮ লাক্ষ ৬৪ হাজার জাল ফারফরমেন্স গ্যারান্টি (নং-পিআরই/জিইউএল/পিজি/৪২/২০১৩ চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্র্র্র্র্র্তৃপক্ষের অফিসে দাখিল করেন।
এখানে মেসার্স ইকম ট্রেড হোল্ডিং (প্রা:) লিমিটেড এর পক্ষে চুক্তি সম্পাদন করেন উক্ত প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম, অন্যদিকে ব্যাংক গ্যারান্টি দাখিলকারী প্রতিষ্ঠান ইকম ট্রেড ইন্টারন্যশনাল এর মালিকও ওই রফিকুল ইসলাম। ওই জাল ব্যাংক গ্যারান্টি দাখিল সম্পর্কে জানাজানি হলে প্রতারনার অভিযোগে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করেন।
দুদকের অনুসন্ধানে প্রমাণ হয় , প্রতারণার আশ্রয়ে জাল জালিয়াতির মাধ্যমে ওই ভূঁয়া ব্যাংক পারফরমেন্স চট্টগ্রাম বন্দরে দাখিল করার অপরাধে মামলা করার জন্য বিগত ২০১৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর প্রধান কার্যালয়ের এক স্মারকে ( দুদক/বি: অনু ও তদন্ত-২/৩২-২০১৪/২৭৯৮৪) অনুমোদন সাপেক্ষে মামলা দায়ের করেন। দুর্নীতি দমন কমিশন সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১ এর উপ-পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম সিএমপি’র বন্দর থানায় দ: বি: ৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১ ধারায় প্রতারণার অভিযোগে  ২০১৫ সালের ৫ অক্টোবর মামলাটি (নং- ০৪/২০১৫) মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্তের পর ২০১৭ সালের ১২ জানুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। মামলাটি বর্তমান চট্টগ্রামের চীফমেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারধীন রয়েছে।
এদিকে দুদকের মামলায় অভিযুক্ত ও তদন্তে চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে প্রতারণার অভিযোগ প্রমান হওয়ায় আদালতে অভিযোগ পত্র দাখিল করা হয়েছে । তবে  এধরনের মামলা উচ্চ আদালত থেকে কোয়াশমেন্ট করা বা উচ্চ আদালতের আদেশ ব্যতীত যে কোন সরকারী ক্রয় ও সরবরাহ কাজে অংশ গ্রহন না করার বিধান রয়েছে। এ বিষয়ে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) এর ১২৭ এর (ক) ও (গ) ধারার বিধান মতে ওই প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পাদিত  চুক্তি বাতিল করা, প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভূক্ত করা ও সকল প্রকার ক্রয় সংক্রান্ত কাজে অংশগ্রহন থেকে বিরত রাখার বিধান থাকলেও অদৃশ্য কারণে এ ক্ষেত্রে তা করা হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারী পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) এর আওতায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ প্রায় ১৯ কোটি টাকা মূল্যের ১০ টন ক্ষমতা সম্পন্ন ৮টি মোবাইল ক্রেন ক্রয়ের টেন্ডার এক স্মারক (নং-  সিপিএ/জিসিই/১৪৭) মূলে দরপত্র আহ্বান করা হয়। টেন্ডারে ৪টি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহন করে, তিনটি প্রতিষ্ঠান যোগ্য বিবেচিত হয়। প্রাইজ ওপেন করে বন্দরের সাথে প্রতারণার দায়ে দুদকের মামলায় অভিযুক্ত ইকম হোল্ডিং (প্রা:) লিমিটেড এর এজেন্ট ইকম ট্রেড ইন্টারন্যশনাল এর দরপত্র বৈধ বিবেচনা করে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়।
এদিকে এ কাজের ক্ষেত্রে যে সময়ের মধ্যে সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে তা বন্দরের ইতিহাসে নজির বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। চলতি বছরের ১২ জুন প্রাইজ ওপেন করে ৬ দিনের মাথায় ১৮ জুন অনুমোদন দেয়া হয়। এত অল্পসময়ের মধ্যে কার্য সম্পাদনের কারণ খুজে পাচ্ছেনা সংশ্লিষ্টরা। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) এর বিধিতে ক্রয় সংক্রান্ত যে কোন দরপত্রের প্রাইজ ওপেন করে টেন্ডার কমিটির সব সদস্য যৌথভাবে মূল্যায়ন করে স্বাক্ষর করার নিয়ম রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভিন্নতার প্রমাণ পাওয়া যায়। দরপত্রের মূল্যায়ন রিপোর্টে প্রধান প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) ও প্রধান হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা ওই দিন উপস্থিত না থাকার কারণে স্বাক্ষর করেনি। উক্ত দুই কর্মকর্তার পরিবর্তে দৈনন্দিন কার্য পরিচালনার জন্য ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া বোর্ড সভায় সদস্য অর্থ উপস্থিত না থাকা সত্ত্বেও এত বড় আর্থিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরা।
বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে আইনি জটিলতা দেখা দিলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের নির্দেশে আইনগত মতামতের জন্য নথিটি চট্টগ্রাম বন্দরের আইন কর্মকর্তার নিকট প্রেরণ করা হয়। তিনি মামলা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ভিন্নমত পোষন করেন। ফলে ইমকো ট্রেড হোল্ডিং (প্রা:) লিমিটেড কার্যাদেশ স্থগিত করেন।
তবে গত ৮ আগস্ট পিপিআর এর ১২৭(৩) এর আলোকে উক্ত মামলার বিষয়ে ইমকো এন্ড ইন্টারন্যশনাল এর পরিচালকের নিকট ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) এক স্মারকে(নং-১৮.০৪.০০০০.৪৩১.০৭.০৫৫.১৯-৪৯১) পত্র প্রেরণ করেন। ইমকো ট্রেড ইন্টারন্যশনাল এর মালিক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম গত ২১ আগস্ট  লিখিত ব্যাখ্যা প্রদান করেন। এতে তিনি দুদকের দায়েরকৃত প্রতারনার মামলাটি চট্টগ্রামের ওই আদালেতে বিচারাধীন রয়েছে মর্মে উল্লেখ করেছেন।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, দুদকের মামলার অভিযুক্ত ও তদন্তে চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে প্রতারনার অভিযোগ প্রমান হওয়ায় আদালতে অভিযোগ পত্র দাখিল করা হয়েছে এবং মামলাটি চলমান রয়েছে। যার ফলে টেন্ডার স্থগিত করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ