ঢাকা, বৃহস্পতিবার 29 August 2019, ১৪ ভাদ্র ১৪২৬, ২৭ জিলহজ্ব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

স্থায়ী জামিন পেলেন ফেনীর ৪ সাংবাদিক

ফেনী সংবাদদাতা : ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার দায়ে প্রত্যাহার হওয়া পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম সরকারের রোষাণলের শিকার ফেনীর চার সাংবাদিককে ৮টি মামলায় স্থায়ী জামিন দিয়েছেন জেলা ও দায়রা জজ আদালত।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গতকাল বুধবার দুপুরে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করেন সাংবাদিকরা। জেলা ও দায়রা জজ সাঈদ আহম্মদ তাদের স্থায়ী জামিন আদেশ দেন। জামিন আবেদনের পক্ষে ছিলেন এডভোকেট আক্রামুজ্জামান। এছাড়া সিনিয়র আইনজীবী আবু তাহের, লক্ষণ বণিক, জাহিদ হোসেন খসরু, নুর হোসেন, নুরুল আমিন খান, আশ্রাফুল হক, শাহজাহান সাজু, মিজানুর রহমান সেলিম, গাজী তারেক আজিজ, এমদাদ হোসেন, এমদাদুল হক মাসুদ ও সিরাজুল ইসলাম মিন্টু সহ বিপুল সংখ্যক আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) হাফেজ আহম্মদ।
এর আগে ২ জুলাই হাইকোর্টের বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খানের বেঞ্চ চার সপ্তাহের জামিন দেন। আদালতে জামিন আবেদনের পক্ষে ছিলেন মোহাম্মদ কামাল হোসেন, মোহাম্মদ মহসিন কবির, আজিজুর রহমান ও এসএম সালেহ আহমেদ।
নুসরাত হত্যার রহস্য উদঘাটন ও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা তুলে ধরতে সক্রিয় ভূমিকার কারণেই এসপি জাহাঙ্গীর অনৈতিকভাবে ‘খেদ মিটিয়েছেন’ পেশাদার সাংবাদিকদের ওপর।
গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলার হাতে যৌন নিপীড়নের শিকার হন ওই প্রতিষ্ঠানের আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত। সেদিনই স্থানীয় জনতা অধ্যক্ষকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করে। এ ঘটনায় নুসরাতের মা শিরীন আক্তার বাদী হয়ে থানায় অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। তবে মামলা প্রত্যাহার করতে নুসরাত ও তার পরিবারকে হুমকি-ধমকি দেন অধ্যক্ষের সহযোগীরা। একপর্যায়ে ৬ এপ্রিল পরীক্ষার আগ মুহূর্তে মাদরাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল মৃত্যু হয় নুসরাত রাফির।
প্রথমে ঘটনাটিকে ‘আত্মহত্যা’ বলে প্রচার করেন সোনাগাজী মডেল থানার প্রত্যাহার হওয়া ওসি (বর্তমানে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেফতার) মোয়াজ্জেম হোসেন। তার পক্ষে অবস্থান নেন পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম সরকার। ঘটনাটি নিয়ে যখন দেশ-বিদেশের গণমাধ্যম সরব হয়, এমনকি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন নুসরাতের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা ও ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারে নির্দেশ দেন, তখনও বিস্ময়কর নির্লিপ্ততা দেখান এসপি জাহাঙ্গীর সরকার। সোনাগাজীতে পর্যন্ত যাননি তিনি।
মামলায় সিরাজ উদ-দৌলাসহ কয়েকজনকে আসামি করতে এসপি-ওসি টালবাহানা করেন বলে নুসরাতের পরিবারের পক্ষ থেকে তখন অভিযোগ ওঠে। শুধু তা-ই নয়, পুলিশ সদর দপ্তরেও তিনি (এসপি) ওসির পক্ষে সাফাই গেয়ে চিঠি লিখেন। তাদের পক্ষপাতমূলক ভূমিকা প্রকাশ পেলে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) স্থানান্তরের পর ঘটনায় জড়িতরা একে একে  গ্রেফতার হতে থাকেন। বেরিয়ে আসে ঘটনার মূল রহস্য। একপর্যায়ে পুলিশ সদরদপ্তরের তদন্তে এসপি-ওসিসহ চার পুলিশ কর্মকর্তা দোষী সাব্যস্ত হন। ওসি মোয়াজ্জেমকে বরখাস্ত করে রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়। আর এসপি জাহাঙ্গীর সরকারকে প্রত্যাহার করে সংযুক্ত করা হয় পুলিশ সদরদপ্তরে। অপর দুইজনকেও প্রত্যাহার করে পার্বত্য এলাকায় সংযুক্ত করা হয়।
জেলা পুলিশের বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এসপি জাহাঙ্গীর ফেনী ছাড়ার আগে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। এ সময় তিনি এ ঘটনায় তাকে নিয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে কয়েকজন সাংবাদিককে হেনস্থা করার পরিকল্পনা নেন। তাদের নাম সংবলিত একটি তালিকা সংশ্লিষ্ট থানার ওসিদের ধরিয়ে দেন। বিভিন্ন তদন্তাধীন মামলায় সেই সাংবাদিকদের নাম চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন। কয়েকজন ওসি কৌশলে এড়িয়ে গেলেও অন্যদের এসিআর আটকে রাখার ভয় দেখিয়ে আদালতে চার্জশিট দাখিলের জন্য চাপ দেন এসপি জাহাঙ্গীর সরকার। ১২ মে সন্ধ্যায় তার বদলি আদেশ আসার পর তিনি রাতে জরুরি ভিত্তিতে ওসিদের ডেকে চাপ প্রয়োগ করে কয়েকটি চার্জশিট তৈরি করান এবং তা দাখিলে বাধ্য করেন বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ওসি জানান। এমনকি বিষয়টি গোপন রাখতেও কোর্ট পরিদর্শকসহ অন্যদের নির্দেশ দেন তিনি। সাংবাদিকরা হলেন দৈনিক ফেনীর সময় ও সাপ্তাহিক আলোকিত ফেনী সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন, দৈনিক অধিকার প্রতিনিধি ও অনলাইন পোর্টাল ফেনী রিপোর্ট’র সম্পাদক এসএম ইউসুফ আলী, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কমের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট সোলায়মান হাজারী ডালিম এবং দৈনিক সময়ের আলো প্রতিনিধি ও দৈনিক স্টার লাইনের স্টাফ রিপোর্টার মাঈন উদ্দিন পাটোয়ারী।
ফেনীতে ১১ পুলিশ পরিদর্শক রদবদল
ফেনী জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয় ও সার্কেল অফিসসহ ৬ থানায় কর্মরত ১১ পুলিশ পরিদর্শককে জেলার বিভিন্ন থানায় রদবদল করা হয়েছে। সোমবার পুলিশ সুপার খোন্দকার নূরুন্নবী, পিপিএম-বিপিএম এ আদেশ দেন।
জেলা পুলিশ সূত্র জানায়, ফেনী মডেল থানার ইন্সপেক্টর (অপারেশন) মো: মাহবুবুর রহমানকে পরশুরাম থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) হিসেবে বদলী করা হয়। ছাগলনাইয়ার ঘোপাল তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মোহাম্মদ আলীকে ফেনী মডেল থানার ইন্সপেক্টর (অপারেশন), জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ইন্সপেক্টর মো: শহিদুল ইসলামকে ঘোপাল তদন্ত কেন্দ্রে, পুলিশ কন্ট্রোল রুমের ইনচার্জ তাপস কুমার বড়–য়াকে ফুলগাজী থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত), সদর সার্কেল অফিসের পুলিশ পরিদর্শক পার্থ প্রতিম দেবকে দাগনভূঞা থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত), লাইন ও আর ইন্সপেক্টর মো: আদিল মাহমুদকে ছাগলনাইয়া থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত), ছাগলনাইয়া থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) সুদ্বীপ রায়কে ফেনী শহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ, ফেনী শহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সুজন হাওলাদারকে পুলিশ অফিস অপরাধ শাখায়, দাগনভূঞা থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মো: ছমিউদ্দিনকে ছাগলনাইয়া সার্কেল অফিসে, ছাগলনাইয়া সার্কেল অফিসের পরিদর্শক মো: লোকমান হোসেনকে ফেনী সদর সার্কেল অফিসে, লাইন ও আর এর ইন্সপেক্টর এএনএন নুরুজ্জামানকে জেলা গোয়েন্দা শাখার ইন্সপেক্টর হিসেবে বদলী করা হয়।
ছাগলনাইয়ায় সীমান্তহাট
পরিদর্শনে জেলা প্রশাসক
ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের মোকামিয়া গ্রামে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত হাট গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে পরিদর্শন করেছেন জেলা প্রশাসক মো: ওয়াহিদুজজামান। এসময় ফেনীস্থ-৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো: নাহিদুজজামান, পুলিশ সুপার খোন্দকার নুরুন্নবী, সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (ছাগলনাইয়া সার্কেল) নিশান চাকমা, ছাগলনাইয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ হোসেন পাটওয়ারী, ছাগলনাইয়া থানার ওসি (তদন্ত) সুদ্বীপ রায় পলাশ ও রাধানগর ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল হক চৌধুরী মাহবুব প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ