ঢাকা, বৃহস্পতিবার 29 August 2019, ১৪ ভাদ্র ১৪২৬, ২৭ জিলহজ্ব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

স্বর্ণের মূল্য

দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের স্বর্ণের বাজার শুধু অস্থিতিশীল হয়ে ওঠেনি, তথ্যাভিজ্ঞরা এই বাজারকে ‘পাগলা ঘোড়ার’ সঙ্গেও তুলনা করতে শুরু করেছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় বিধানের নামে স্বর্ণের মূল্য বেড়ে চলেছে লাগামহীনভাবে। বিগত মাত্র দেড় মাসের মধ্যে মূল্য বাড়ানো হয়েছে ছয়বার। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতি ভরি ভালো মানের তথা ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের মূল্য যেখানে ছিল ৪৮ হাজার ৯৮৮ টাকা সেখানে গত ২৮ আগস্ট সর্বশেষ বৃদ্ধির পর একই স্বর্ণের মূল্য দাঁড়িয়েছে ৫৮ হাজার ২৮ টাকা।
অর্থাৎ মাত্র সাত মাসের মধ্যে প্রতি ভরিতে মূল্য বেড়ে গেছে নয় হাজার টাকা। এ নিয়ে চলতি মাসে চতুর্থবার এবং আগের মাসের শেষ ১৫ দিনে দ্বিতীয়বারের মতো মূল্য বেড়েছে। ২৬ আগস্ট পর্যন্তও ২২ ক্যারেটের যে স্বর্ণের মূল্য ছিল ৫৬ হাজার ৮৬২ টাকা একদিনের ব্যবধানে এবং এক ধাপেই তার মূল্য বেড়ে গেছে এক হাজার ১৬৬ টাকা। একইভাবে বেড়েছে ২১ ও ১৮ ক্যারেটের এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের মূল্যও।
ওদিকে আন্তর্জাতিক বাজারেও স্বর্ণের মূল্য বেড়ে চলেছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে। খবরে জানানো হয়েছে, ২০১৩ সালের মে মাসের পর সবচেয়ে বেশি পরিমাণে বেড়ে ২৬ আগস্ট প্রতি আউন্স স্বর্ণের মূল্য পৌঁছেছে ৫২৬ মার্কিন ডলারে। এই বৃদ্ধির শুরু হয়েছে গত জুলাই মাস থেকে আর চলতি মাস আগস্টে বেড়েছে বেশি হারে। উল্লেখ্য, গত ১০ বছরের মধ্যে ২০১১ সালের শেষদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য সবচেয়ে বেশি বেড়ে উঠেছিল এক হাজার ৯০০ ডলারে। সে সময় বাংলাদেশের বাজারে প্রতি ভরি স্বর্ণের মূল্য ৬৪ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এরপর ২০১৩ সাল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে যেমন বাংলাদেশের বাজারেও তেমনি মূল্য কমতে থাকে এবং ২০১৬ সালের শুরুর দিকে প্রতি ভরি ৪১ হাজার টাকায় নেমে আসে। ৪১ হাজার টাকা ভরির একই স্বর্ণ মাত্র দু’বছরের মাথায় বেড়ে ৫৮ হাজার ২৮ টাকায় উঠে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যাকালে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছেন, গত ছয় মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের মূল্য বেড়েছে প্রায় আড়াইশ’ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ প্রায় ২১ হাজার টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারের এই বৃদ্ধির সঙ্গে সমন্বয় করেই ‘বাধ্য হয়ে’ বাংলাদেশে দফায় দফায় মূল্য বাড়াতে হয়েছে।
অন্যদিকে স্বর্ণ ব্যবসার বিষয়ে তথ্যাভিজ্ঞরা কিন্তু জুয়েলার্স সমিতির যুক্তিকে গ্রহণযোগ্য বলে স্বীকার করেননি। তারা বলেছেন, দেশের অভ্যন্তরে বছরে ২০ থেকে ৪০ টন পর্যন্ত স্বর্ণের প্রয়োজন হয়, যার বেশির ভাগ তথা প্রায় সম্পূর্ণটুকুই আসে প্রবাসী ও বিদেশ ফেরৎ বাংলাদেশিদের কাছ থেকে। অর্থাৎ জুয়েলার্স সমিতির সাধারণ সম্পাদক বললেও বাস্তবে এদেশের ব্যবসায়ীদের আন্তর্জাতিক বাজার থেকে স্বর্ণ আমদানি করতে হয় না বললেই চলে। তাছাড়া ব্যক্তিগতভাবে কেনার সময়ও প্রবাসী বিক্রেতাদের তারা আন্তর্জাতিক বাজার দরে মূল্য দেন না বরং কেনেন অনেক কম মূল্যে।
কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করার সময় একই ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারের অজুহাত দেখিয়ে বেশি মূল্য আদায় করেন। অর্থাৎ কেনার এবং বিক্রি করার উভয় ক্ষেত্রেই এদেশের ব্যবসায়ীরা ব্যাপকভাবে লাভবান হন। শুধু তা-ই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে যখন মূল্য কমে বা কমতে থাকে তখন কিন্তু ব্যবসায়ীরা কথিত সমন্বয় বিধানের কথাটা ভুলে যান। কমানোর সময় তারা ধীরে চলার কৌশল অবলম্বন করেন। মুদ্রার বিনিময় হারের প্রতিও তারা উপেক্ষা দেখান। যার ফলেও ক্ষতিগ্রস্ত হন এদেশের সাধারণ ক্রেতারা।
সমগ্র এ প্রেক্ষাপটেই তথ্যাভিজ্ঞরা মনে করেন, সাধারণ মানুষসহ বৃহত্তর জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থেই সরকারের উচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বাড়ানো এবং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। বিক্রির জন্য ঠিক কি পরিমাণ স্বর্ণ তারা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বৈধ পন্থায় আমদানি করেন এবং প্রবাসী ও বিদেশ ফেরৎ বাংলাদেশিদের কাছ থেকে কেনা স্বর্ণের পরিমাণ কত- তা যেমন তদন্ত করে দেখা দরকার তেমনি দরকার অবৈধ কেনাবেচার ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাও।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ