ঢাকা, শুক্রবার 30 August 2019, ১৫ ভাদ্র ১৪২৬, ২৮ জিলহজ্ব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

চেয়ার

মোহছেনা পারভীন : বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না। এই বিখ্যাত উক্তিটি মাথায় রেখে সবসময় বই কিনেছি। কিন্তু এখন আর আমি বই কিনি না। শুধু কিনি মোবাইলের কার্ড, প্রেসারের বড়ি আর ব্যাক পেইনের যত রকম মেডিসিন আছে এইসব। আজকাল এরই মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি। গতকাল ব্যাকপেইনের ট্রিটমেন্ট নিতে গিয়ে কিছু না বুঝেই পেইন প্রতিরোধক স্পেশাল চেয়ার কিনে এনেছি। প্রথমদিন আনন্দেই কাটলো। বারবার বসছি চেয়ারে। সবাইকে ডেকে এনে বসাচ্ছি। চেয়ারের নানা উপকারিতা বর্ণনা করছি। এভাবেই পার হলো সারাটা দিন।

পরের দিন সকাল থেকেই মনটা খারাপ। ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে চোখে পড়লো চেয়ারটি। যদিও চেয়ারটি দেখতে খুব সুন্দর। যে কেউ একবার চেয়ারটি দেখে জিজ্ঞেস করবে এত সুন্দর চেয়ার কোথায় পেলাম আমি। কিন্তু চেয়ারের দামের কথা মনে হলেই আমি আঁৎকে উঠি। পাঁচ হাজার টাকা এই বিশেষ চেয়ারটির দাম! বাচ্চাদের আমি ক্লাসে বাগধারা পড়াই। একটি বাগধারা ছিল এমন  ‘গরিবের ঘোড়া রোগ’। এর অর্থ হলো সামর্থের বাইরে কাজ করা। সারাদিন চিন্তা করলাম আমাকে ঘোড়া রোগে পেয়েছে। তা না হলে আমি কেন এত দামের চেয়ার কিনলাম। বারবার মনে হতে থাকল সেইসব মানুষদের কথা যাদের দুবেলা দুমুঠো খাবার জোটে না। নদী ভাঙনে মানুষ ভিটেবাড়ি ছাড়া। রোহিঙ্গাদের কথাও চিন্তা করলাম। বাসায় আমার ছেলের সাথে আমার চেয়ার কেনার বিষয়টি নিয়ে আলাপ করছিলাম। আমি বোঝাতে চাইলাম আমার ছেলেকে যে আমি খুব বেশি একটা ভুল করে ফেলেছি। ও বলল আমি মোটেও ভুল করিনি। কারণ আমি অসুস্থ। আমার উপকার হয় এমন বিষয়ের জন্য পয়সা খরচ মোটেই অনুচিত হয়নি। বরং ঠিক কাজটি করা হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে পাঁচ হাজার টাকার কষ্ট কিছুটা ভুলতে পেরেছি। কিন্তু পুরোপুরি স্বস্তি পাইনি। মনের মধ্যে অনেক কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে। স্কুলে কোনো খেলায় অংশগ্রহণ করতে না পারলেও চেয়ার সিটিং খেলায় অংশগ্রহণ করেছি। আহা কত ধাক্কাধাক্কি করেছি একটি চেয়ারের জন্য। একটু বড় হয়ে দেখেছি ক্ষমতার চেয়ারের জন্য কত রক্তারক্তি। কেউ চেয়ার একবার বাগে পেলে আর ছাড়তে চায় না। মনে হয় যেন এই চেয়ার তার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত।

ছোটবেলার চেয়ার সিটিং খেলার মধ্যে আর এখনকার এই ক্ষমতার খেলায় কোনো পার্থক্য নেই। আগেও চেয়ার যার দখলে সেই পুরস্কার পেতো। এখনও সেই পায় যার দখলে সেই বিশেষ চেয়ার। পাল্টে গেছে শুধু খেলার ধরন। স্কুলের খেলায় কোনো রক্ত ঝরার ব্যাপার নেই, নিছক প্রতিযোগিতা। আর ক্ষমতার চেয়ার খেলায় চলে রক্তের হোলি খেলা। কিন্তু আমি এই বিশেষ চেয়ারে বসে ভাবছি মানুষের জীবনের নেই এক সেকেন্ডের ভরসা। এই দীর্ঘ জীবনে ভালো কাজ কতটুকু করেছি তার হিসেব মেলাতে লাগলাম। দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। চিরস্থায়ী জীবনের জন্য কতটুকু করলাম। ভাবনা যেন শেষ হচ্ছে না। বুকশেল্ফ থেকে একটি বই নিলাম। বইটির নাম সুকুমারের লজ্জা। কিছুক্ষণ পড়ার পর মনে হলো বইটি আমার ইতিপূর্বে পড়া হয়েছিল। তবুও বইটি নাড়াচাড়া করছিলাম। আমাদের দেশের মানুষের অদ্ভুত কিছু কা-কারখানা দেখে সুকুমারের লজ্জা বইটির সার্থকতা অনুভব করলাম। কী বিচিত্র এই দেশ! ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে কেড়ে নেওয়া হয় নিরীহ, নির্দোষ মানুষের জীবন। আমাদের কিছুই বলার থাকে না।

আমাদের দেশকে ভালোবাসা অর্থ দেশের মানুষকে ভালোবাসা। তাই চেয়ারে বসে মানুষের জন্য ভালো কিছু করা যায় কিনা তাই নিয়ে জল্পনা কল্পনা শুরু করলাম। প্রথমেই ভাবলাম গল্প লিখে মানুষকে খুশি করার চেষ্টা করবো, না হয় কবিতা কিংবা ছড়া। প্রথমে একটি কবিতা আমার মাথায় এলো। কবিতাটি এরুপ-

অমানুষের বহুরূপ,

আর মানুষের এক রূপ,

কারণ সে শুধুই মানুষ।

তারপর একটি গল্পের নাম মাথায় আসলো। কিন্তু গল্পটির প্লট মাথায় আসলো না। গল্পটির নাম ‘আজব দেশে ডেঙ্গুর গজব’। কবিতা তিন লাইন লিখতে পারলাম কিন্তু গল্পটি লেখা হলো না। এরই মধ্যে মশার কামড় খেয়ে অবস্থা কাহিল। তবুও কয়েল জ¦ালিয়ে মশার হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করলাম। গল্পটি লেখার জন্য অনেক ভাবলাম। কীভাবে শুরু করবো। কোথায় শেষ করবো ইত্যাদি ইত্যাদি।

দরজায় একজন কড়া নাড়লো। আমার ভাতিজা দরজা খুলে দিলো। দারোয়ান এসে একটি মস্ত বড় কাঠাঁল আমাদের ডাইনিং টেবিলে রেখে গেলো। জানতে পারলাম এই কাঠাঁলটি আমার ভাগনে পাঠিয়েছে। আমি বললাম কাঁঠালটি ভেঙে আমাকে খেতে দিতে। যেহেতু কলমের আগায় লেখা আসছে না সেহেতু কাঁঠাল খেয়ে আপাতত একটু চাঙ্গা হয়ে নেই। তারপর দেখা যাবে কী হয়। কাঁঠাল দেখে এবং খেয়ে তো আমার মাথায় কাঁঠাল ভাঙ্গার অবস্থা। পুরো কাঁঠালটি নষ্ট। ফরমালিন যুক্ত। আহা। দেশটা যদি দুর্নীতিমুক্ত হতো কত ভালোই না হতো। বিশে^র বুকে দেশটি আরও এগিয়ে যেতে পারতো। আফসোস হলো আমার।

এমন সময় ব্যাকপেইনের গতি ক্রমশ বাড়তে লাগলো। ব্যথাটা যেন এখন আর ব্যাকে নেই বুকে এসে বিঁধলো। কবিতার আরও দু’একটি লাইন মাথায় আসলো। ‘আহা’ এমন যদি হতো, কোনো জবাবদিহিতা নেই, হেসে খেলে পার হয়ে যেতাম পুলসিরাত। পরকালের ভাবনায় পড়ে গেলাম আমি। পৃথিবী হচ্ছে পরকালের শস্যক্ষেত্র। এখানে যে যতো ভালো কাজ করবে, সে ততো পরকালে সুবিধা ভোগ করবে। তাই প্রতিদিন আমাদের ভালো কাজের নিয়ত করা উচিত। ছোট ছোট ভালো কাজ একদিন বৃহৎ কাজে পরিণত হবে। আমাদের মানুষগুলো সোনার মানুষে পরিণত হবে। 

এবার চেয়ারে বসে আমার একদিনের কাজের হিসেব কষলাম। আমি দেখলাম বিশেষ চেয়ারটিতে বসে কিছু কাজ করতে পারলাম যেমন, স্মার্ট ফোনে বেশি সময় ব্যয় করা উচিত নয়, এতে চোখ এবং ব্রেইনের ক্ষতি হয়Ñ বাচ্চাদের তা বোঝালাম। বড়দের যারা সময়ের অতিরিক্ত ঘুমায় তাদের বললাম অযথা ঘুম ভালো নয়।  মর্নিং ওয়াক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। টিফিন থেকে টাকা বাঁচিয়ে গরিবদের দান করতে হবেÑ দুই ভাতিজাকে বোঝালাম। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হালকা ব্যায়াম, ও হাঁটা উচিতÑ এ কথা বড় বোনদের বললাম। 

আমার অন্তরঙ্গ বান্ধবী এসেছিল আমাকে এবং আমার বিশেষ চেয়ারটিকে দেখতে। সঙ্গে নিয়ে এসেছিল অনেকগুলো আনার। যার একটিও ভালো না থাকার জন্য আমি খেতে পারলাম না। সে খুব কষ্ট পেয়েছিল। এত দাম দিয়ে ফলগুলো কিনলেন আর আমি খেতে পারলাম না বলে তার মুখম-লে লজ্জার ছাপ আমি দেখেছিলাম। আমি আমার বান্ধবীকে বলেছিলাম ধৈর্য ধরো। বিপদে ধৈর্য ধরতে হয়। একদিন দেখবে কিছু মানুষের দ্বারা সৃষ্ট আমাদের এই ভোগান্তি আর থাকবে না। হেসে হেসে আমি বললাম, সি.আর.পি থেকে কেনা এই বিশেষ চেয়ারে বসে আমি সেইসব নতুন প্রজন্মের আশায় তীর্থের কাকের মতো বসে আছি যারা সব ভেদাভেদ ভুলে আগামীর দেশটাকে সুন্দর করে গড়ে তুলবে। আমার কথা শুনে সে কিছুটা আশ^স্ত হলো। দেখলাম তার মুখ থেকে লজ্জার কালো রেখাটি কিছুটা সরে গিয়েছে। কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার পর আমার বান্ধবী চলে গেলো। 

আমি চেয়ারে বসে রইলাম। অদূর ভবিষ্যতের সুখের আশায় সব ব্যথা ভুলে গেলাম। হৃদয়ে এক নির্মল শান্তি অনুভব করলাম। অজান্তে হাত থেকে কলমটি পড়ে গেলে মেঝেতেÑ ছোট্ট নাতনি পড়ে যাওয়া কলমটি হাতে তুলে দিয়ে বললো, লেখো, গল্প লেখো। আমি তার স্বাপ্নিক দুটো চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কিন্তু কিছুই বলতে পারলাম না। বাচ্চাটি গুটি গুটি পায়ে হেঁটে চলে গেলো আমার রুম থেকে। আমি শুধু অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়েই রইলাম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ