ঢাকা, শুক্রবার 30 August 2019, ১৫ ভাদ্র ১৪২৬, ২৮ জিলহজ্ব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বিজ্ঞান নিয়ে সাহিত্য

আখতার হামিদ খান : জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার মধ্যে দুটো গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলো সাহিত্য ও বিজ্ঞান। বলা হয়ে থাকে, একজন বিজ্ঞানী যদি কোনো আবিষ্কার নাও করতে পারেন তবু ক্ষতি নেইÑ কেননা তার উদ্ভাবক হবে পরবর্তীতে অন্য কেউ কিন্তু একজন সাহিত্যিকÑ সাহিত্যের সেই সৃষ্টির ¯্রষ্টা তিনি কেবল নিজেই, অন্য কারো হাতে সে সৃষ্টি সম্ভব নয়। উপরোক্ত ধারণা হতে সাহিত্যের গুরুত্বও অনুধাবন করা যায়।

আর এই বিজ্ঞান ও সাহিত্যের যৌথ মিলন ঘটেছে সাহিত্যের এক নতুন ধারা সায়েন্স ফিকশনে। মেরী শেলীকেই বলা যায় সায়েন্স ফিকশনের প্রথম অবতারক। সায়েন্স ফিকশনের জগতে এরপর একে একে এসেছেন স্যার এইচ জি ওয়েলম, জুল ভার্ণ, রবার্ট সিলভার বার্কা, আইজাক, আসিমভ, আর্থার সি ক্লার্ক প্রমুখ। বর্তমানের উল্লেখযোগ্য সায়েন্স ফিকশন লেখকরা হলেন আতানাসিও, ব্রায়ান এলডিস, আয়ান ওয়াটসন। ফ্রাঙ্ক পটভূমি হিসেবে এসব লেখকদের কেউ কেউ বেছে নিয়েছেন অতীতকে, কেউ ভবিষ্যতকে। বর্তমানকেও ব্যবহার করে আগামী পৃথিবীর বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ সাধনের রাস্তাটিকেও নির্দেশ করেছেন অনেকে।

কারো কারো লেখায় এসেছে বিজ্ঞানের প্রযুক্তিগত কলা-কৌশল। আর কেউ কেউ সায়েন্স ফিকশনের মধ্য দিয়ে বলতে চেয়েছেন বিশ্ব-জগৎ ও আমাদের সৃষ্টি প্রক্রিয়া ও ¯্রষ্টার রহস্যময়তার কথা। প্রযুক্তিগত কলা-কৌশল বর্ণনায় কেউ কেউ হয়তো পুরো মাত্রায় নির্ভর করেছেন কল্পনা শক্তির উপরে। আর তাদের সেই কল্পনার ডানা সম্ভব অসম্ভবের দ্বিধা দ্বন্দ্বে না দুলে নীরবে ইচ্ছে মতো ডানা মেলে দিয়েছে। হয়তো পুরো মাত্রার বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেটা সম্ভব নয় তবু তাদের কল্পনা সেই সম্ভাবনাকে অবলীলায় অবজ্ঞা করেছে। আবার কেউ কেউ নজর দিয়েছেন বিজ্ঞান সম্মত কল্পনার দিকে। বিজ্ঞানকে ভিত্তি করেই তারা তাদের কল্পনার প্রয়াস পেয়েছেন।

১৮৬৫ সালের দিকে জুল ভার্নের বিখ্যাত গল্প “ঋৎড়স ঞযব ঊধৎঃয ঞড় ঞযব গড়ড়হ”. প্রথম প্রকাশিত হয়। এ গল্পটিতে অভিযাত্রীসহ একটি বড় আকারের কামানের গোলার (যা প্রক্ষেপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল) চন্দ্রে প্রেরণের প্রয়াস চমৎকারভাবে প্রকাশ পেয়েছে। বর্ণনাটি এতোই বাস্তব সম্মত হয়েছিল যে পাঠক মাত্রই বিস্ময় বোধ করেনÑ সত্যিই কি এ ঘটনাটি ঘটেছিল আর সত্যিই কি জুল ভার্ন ছিল তার প্রত্যক্ষদর্শী! এবার ব্যাপারটি আলোচনা করা যাক।

পৃথিবী হতে যখন কোনো বস্তুকে ওপরে ছোঁড়া হয় তখন স্বাভাবিক নিয়মেই তা পৃথিবীতে ফিরে আসে। কিন্তু কেন? এর কারণ অভিকর্ষ শক্তি বা বল। পৃথিবী সব বস্তুকেই তার নিজের দিকে আকর্ষণ করে। যে বলে এটি বস্তুটিকে আকর্ষণ করে তা-ই অভিকর্ষ। তাহলে প্রশ্ন জাগে, পৃথিবী হতে এমন কোনো বস্তুকে কি ছোঁড়া সম্ভব, যাতে করে তা পৃথিবীর অভিকর্ষ বলকে উপেক্ষা করতে সম্ভব। তা হলেই তো তা আর কোনোদিন পৃথিবী পৃষ্ঠে ফিরে আসবে না।

এখনও পর্যন্ত গতিবেগ অর্জন সম্ভব হয়নি তাই এটা নিশ্চিত যে, জুল ভার্নের সেটাও কোনো সত্য ঘটনা ছিল না। তবে তার কল্পনা প্রসূত যে ধারণা গল্পটিতে বিধৃত হয়েছিল আশ্চর্য হলেও সত্যি তার অনেক কিছুই পরবর্তীতে প্রথম উপগ্রহ প্রেরণের সাথে সাদৃশ্য প্রদর্শন করে। 

শব্দের বেগ সম্পর্কিত জ্ঞানের সাহায্যে দূরবর্তী যে কোনো স্থানের প্রকৃত দূরত্ব নির্ণয় করা যায়। তবে এক্ষেত্রে যে জিনিসটা অতীব লক্ষণীয় তা হলো স্থানদ্বয়ের একটি হতে উৎপন্ন শব্দ অন্যটিতে পৌঁছার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এভাবে দূরত্ব নির্ণয় জুল ভার্নের ‘জার্নি টু দি সেন্টার অব দি আর্থ’ গল্পেও পরিলক্ষিত হয়। গল্পকারের বর্ণনায় আইসল্যান্ডের ¯্রেেফল পর্বতের জ্বালামুখ দিয়ে পৃথিবীর কেন্দ্রে যাত্রার এক পর্বে অধ্যাপক আর তার ভাগ্নে একে অপরকে হারিয়ে ফেলে। নি¤েœ তাদের কথোপকথনের একটি অংশ তুলে ধরা হলো যা পাঠককে অনুধাবন করতে সাহায্য করবেÑ কিভাবে শব্দ বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে তারা একে অপরকে খুঁজে পেয়েছিল।

সাড়া পাবার আশায় আঙ্কেল যখন ‘কাকা কাকা’ বলে ডাকছিল তখন তার সেই সম্বোধন পৌঁছে অধ্যাপকের কানে।

‘কাকা!’

বেশ কিছু সময় অতিক্রান্তে উত্তর পেলাম।

‘আঙ্কেল!’

‘কোথায় তুই?’

‘জানি না। তবে আমাদের প্রথমেই জানা উচিত কতোটা দূরত্বে রয়েছি আমরা।’

‘ঠিক আছে। সেই ক্রোনোমিটারটি নিশ্চয়ই তোর কাছে আছে?’

‘হ্যাঁ’।

‘তাহলে ওটা নে। তোর নাম ধরে ডাক দে সাথে সাথে ক্রোনোমিটারে সময় দেখে নে। তোর নাম আমার কানে পৌঁছার সাথে সাথে আমিও তা উচ্চারণ করবো। আমার উচ্চারণ শোনার সাথে সাথে আমার সময়টা দেখে নে। এই দু’সময়ের বিয়োগ ফলের অর্ধেকই হলো তোর কাছ থেকে আমার শব্দ পৌঁছার প্রয়োজনীয় সময়কাল।’

‘ঠিক আছে কাকা।’

‘তাহলে শুরু কর।’

আমি দেয়ালে মুখ রেখে আঙ্কেল বলে ডাকলাম। ঠিক চল্লিশ সেকেন্ড পরে ছোট কাকার শব্দ শোনা গেল।

‘চল্লিশ সেকেন্ড।’

‘তাহলে তোর ওখান হতে এখানে শব্দ পৌঁছতে সময় লেগেছে বিশ সেকেন্ড। শব্দের বেগ যেহেতু এগারোশ বিশ ফুট/সেকেন্ড তাহলে আমাদের মধ্যবর্তী ব্যবধান হলো বাইশ হাজার চারশ ফুট অর্থাৎ সোয়া চার মাইল।

জুল ভার্নের গল্পের ও স্তবকটি হতেই আমরা শব্দের বেগ নির্ণয়ের কায়দা রপ্ত করতে পারি। এখন উপরোক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করে সহজেই নি¤েœর প্রশ্নের উত্তর দেয়া সম্ভব।

প্লাটফর্মে অপেক্ষমাণ ব্যক্তি স্টেশন হতে বহুদূরে কোনো ট্রেনের ধোঁয়া দেখার চার সেকেন্ড পরে হুইসেলের শব্দ শুনতে পেলো। স্টেশন হতে ট্রেনের দূরত্ব কত?

আতশী কাচ আমরা প্রায় সবাই দেখেছি। এতে সব কিছু বেশ বড়সড় দেখায়। আতশী কাচে যে জিনিসটা কাজ করে তা হলো একটি উত্তল লেন্স। সূর্য কিরণকে ব্যবহার করে আতশী কাচের সাহায্যে আগুন জ্বালানো হরহামেশাই ঘটছে। কিন্তু যদি এক টুকরো বরফকে আতশী কাচ হিসেবে ব্যবহার করে আগুন ধরাবার কথা কাউকে বলা হয় তাহলে তিনি তা ভাবতেও পারবেন না। কিন্তু আসলেই তা সম্ভব। অতি স্বচ্ছ এক টুকরো বরফ উত্তল লেন্স বা আতশী কাচ হিসেবে কাজ করতে পারে। এরকম বরফ টুকরোর ব্যবহার প্রথম পরিলক্ষিত হয় জুল ভার্নের ঞযব অফাবহঃঁৎব ড়ভ ঈধঢ়ঃধরহ ঐধঃবৎঁং গল্পে। হিমাংকের আটচল্লিশ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার নিচে যখন আগুন ধরানোর জন্য হাতের কাছে তেমন কিছুই নেই তখনই ডাঃ ক্লাবোন্নি বরফ টুকরো দিয়ে আগুন ধরানোর ব্যবস্থা করলেন।

‘ডাক্তার, চরম দুর্ভাগ্য আমাদের।’

‘হ্যাঁ, ক্যাপ্টেন।’

‘আগুন ধরানোর জন্য একটা স্পাই গ্লাসও নেই সাথে। খুবই দুর্ভাগ্য! তবে সূর্য কিরণ রয়েছে যথেষ্ট।’

‘তাহলে তো আমাদের কাঁচা মাংস খেতে হবে।’

‘হ্যাঁ। তবে আমার মাথায় একটু বুদ্ধি এসেছে।’

‘কি বুদ্ধি? অনুসন্ধানী দৃষ্টি হ্যাটেরাসের চোখে।’

তাহলে নিশ্চয়ই আমরা আগুন ধরাতে পারবো।

ইতস্তত করলেন ডাক্তার, যদিও আমাদের কাছে আতশী কাচ নেই সেট বানিয়ে তো নেয়া যায়।’

‘কিভাবে? বোসান বললো।’

‘এক টুকরো বরফ হতে।’

‘তুমি কি তাই ভাবো?’

‘কেন নয়?’

‘টিন্ডারের (এক ধরনের কা- বা জ্বালানি কার্যে ব্যবহৃত হয়) ওপর আমরা সূর্যের আলোটা ফেলবো। আর এক টুকরো বরফই তা করতে পারে। পরিষ্কার পানির বরফ হলে সবচেয়ে ভালো হয়। কারণ সেটা বেশি স্বচ্ছ হবে আর সহজে ভাঙবেও না।’

‘মনে হয় ঐ টুকরোটা সবচেয়ে ভালো হবে।’

কয়েক হাত দূরে একটা বরফের চাঁই দেখিয়ে বললো বোসান।

‘ঠিক আছে। কুড়ালটা নিয়ে যাও।’

ডাক্তার বোসানকে এক ফুট ব্যাসার্ধের এক খ- বরফ কাটতে বললেন। বোসান তাই করলো। ছুরি দিয়ে চেঁছে শেষে হাত দিয়ে সম্মুখ ভাগটা ঘসে নিলেন ডাক্তার। সূর্যের প্রখর কিরণকে ফোকাস করার কয়েক সেকেন্ড পরেই কাগজটা জ্বলতে শুরু করলো।

জুল ভার্নের এ গল্পে অসম্ভব কিছু ছিল না। ১৭৬৩ সালে ইংল্যান্ডে প্রথম সাফল্যজনকভাবে এটা করা হয়। সেই থেকেই বরফকে আতশী কাচ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ জাতীয় বরফ তৈরির একটি সহজ পন্থাও রয়েছে। উপযুক্ত আকৃতির একটি পানি রাখার পাত্রে পরিষ্কার পানি নিয়ে বরফ তৈরি করি। বলের নিচে সামান্য তাপ দিয়ে বরফ টুকরো বের করে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে আতশী কাচ। তবে খোলা বায়ুতে এবং পরিষ্কার তুষারাচ্ছন্ন দিনেই বরফের এ ধরনের ব্যবহার পাওয়া যাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ