ঢাকা, শনিবার 31 August 2019, ১৬ ভাদ্র ১৪২৬, ২৯ জিলহজ্ব ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

প্রতিটি গুমের তদন্ত ও বিচার একদিন হবেই -রিজভী

স্টাফ রিপোর্টার : স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশে গুমের ঘটনার সূত্রপাত ঘটে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, গুমের সাথে জড়িত ব্যক্তি ও তাদের মদদদানকারীরাও বিচারের আওতার বাইরে থাকবে না। প্রতিটি গুমের তদন্ত ও বিচার একদিন হবেই। গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।
প্রসঙ্গত, ২০১০ সালে ইউনাইটেউ নেশানস্ জেনারেল এসেম্বেলিতে রেজুলেশন ৬৫/২০৯ এর মাধ্যমে সারা বিশ্বে সংঘটিত গুম/ঊঘঋঙজঈঊ উওঝঅচচঊঅজঅঘঈঊ বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। একই রেজুলেশনে গুম সংক্রান্ত ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দি প্রকেটশন অব অল পার্সন ফ্রম এনফোর্স ডিজএ্যাপেয়ারেন্স’ হিসাবে পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এর প্রেক্ষিতে ২০১১ সাল থেকে আজকের দিনটিকে বিশ্বের সকল দেশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করে আসছে।
রিজভী বলেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ গঠন করার পর থেকে এখন পর্যন্ত সারাদেশে গুম হওয়া মানুষের সংখ্যা ১২০৯ জন। যার ভিতর আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গুমের সংখ্যা ৭৮১ জন। এদের মধ্যে রয়েছেন-জনপ্রতিনিধি সাবেক এমপি এম ইলিয়াস আলী, সাইফুল ইসলাম হিরু, কাউন্সিলর চৌধুরী আলম, লাকসাম বিএনপি নেতা হুমায়ুন কবির পারভেজ, সুমন, ছাত্রনেতা জাকির, নিজামুদ্দিন মুন্না, তারিকুল ইসলাম ঝন্টু, আদনান চৌধুরী, মোঃ সোহেল, খালিদ হোসেন সোহেল, স¤্রাট মোল্লা, মাহবুব হাসান সুজনসহ বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের শত শত নেতাকর্মী। বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদকে দুই মাস গুম করে রাখার পর অন্য দেশে ফেলে দিয়ে এসেছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী।
রিজভী উল্লেখ  করেন, গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা এখনও পথ চেয়ে বসে আছেন, ছোট শিশুরা অপেক্ষা করছে বাবা ফিরে আসবে সেই আশায়, সন্তানের দু:শ্চিন্তায় অনেকের বাবা-মা দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। নিখোঁজ সুমনের মা চোখের পানি ফেলতে ফেলতে অন্ধ হয়ে গেছেন। গুমের শিকার প্রতিটি পরিবারের কান্না-আহাজারী আর প্রতীক্ষার দিবানিশি শেষ হচ্ছে না।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব বলেন, গত ২২ জুন একটি পত্রিকার সূত্র ধরে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয় যে, গত কয়েক বছরে যে সব মানুষ নিখোঁজ হয়েছে তার বেশীর ভাগই বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি‘র সদস্য। এদের ভিতর আরো আছেন মানবাধিকার কর্মী, যারা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমালোচনায় সোচ্চার ছিলেন। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০০৯ সালের শুরু থেকে ২০১৮ সালের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ৫০৭টি জোরপূর্বক গুম প্রামান্য দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেছে নাগরিক সমাজ বিষয়ক গ্রুপগুলো। গুম হয়ে যাওয়া মানুষের ভিতর ২৮৬ জন জীবিত ফিরেছেন ঘরে। ৬২ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে মৃত অবস্থায়। বাকী ১৫৯ জন মানুষ আজও নিখোঁজ। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে ২০১৪ থেকে ২০১৯ (জুলাই) পর্যন্ত ৩৪৪ জন গুমের শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে ৪৪ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে, ৬০ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে এবং ৩৫ জন ফেরত এসেছে। এসব ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবার, স্বজন বা প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেছেন যে, বিশেষ বাহিনী-র‌্যাব, ডিবি পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের পরিচয়ে সাদা পোশাকে ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের তুলে নেওয়া হচ্ছে।বেশীর ভাগ গুমের জন্য সন্দেহ করা হয়-পুলিশ, ডিবি পুলিশ ও র‌্যাবকে।
বাংলাদেশে বর্তমানে গুমের ধারাবাহিকতা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, যা শুরু হয়েছিল ১৯৭২ থেকে ৭৫ সালে। গণতন্ত্রের অকাল প্রয়াণ ঘটানোর জন্যই গুমের মতো অমানবিক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে ক্ষমতাসীনরা। গণতন্ত্র হত্যায় রাষ্ট্রের এই নিষ্ঠুর চেহারা দেখে জনগণ শোক জানাতেও ভয় পাচ্ছে। গুম একটি ভয়ঙ্কর মানবতাবিরোধী অপরাধ। গুমকে ব্যবহার করা হচ্ছে সুদুরপ্রসারী উদ্দেশ্য নিয়ে, বিরোধী দল ও মতকে নির্মূল করে রাষ্ট্র-সমাজে একমাত্রিকতা, কর্তৃত্ববাদী ও একদলীয় শাসন ব্যবস্থাকে দীর্ঘস্থায়ী করাই এর মূল লক্ষ্য। মানুষের কঙ্কাল দিয়েই নিষ্ঠুর একদলীয় শাসন কায়েম হয়। এই কারণেই ভিন্ন মত, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসনসহ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশকে সর্বশক্তি দিয়ে রুদ্ধ করা হয়েছে। চিরদিনের জন্য নিখোঁজ হওয়ার ভয়ে মানুষ বিদ্যমান দু:শাসনের বিরুদ্ধে যাতে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে না পারে সেজন্য বর্তমান সরকার গুমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। গুম আদিম বন্য ব্যবস্থা। এই নিষ্ঠুর কাজের সাথে যারা জড়িত তারা হিংস্র প্রাণীর সাথেই তুলনীয়। 

বিএনপির এই সিনিয়র নেতা বলেন, জোরপূর্বক বা যেকোন ধরণের গুম বন্ধ করতে সরকারের প্রতি জাতিসংঘ ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন সংস্থা আহবান জানিয়েছে। দুঃখের সাথে বলতে হয়-আওয়ামী লীগ সরকারের নীতি নির্ধারক থেকে শুরু করে প্রথম সারির মন্ত্রীরা পর্যন্ত সেই আহবানকে উড়িয়ে দিয়েছে। তারা সব সময়ই গুমের তথ্য প্রমাণসমুহকে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা বলে এড়িয়ে চলে। এ বিষয়ে গত ২৯ আগষ্ট ২০১৯ তারিখে দৈনিক কালের কন্ঠে প্রকাশিত ‘তাগিদ দিয়েও সাড়া পাচ্ছে না জাতিসংঘ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে অসহযোগিতার অভিযোগ করা হয়। এ প্রতিবেদনে বলা হয়, জোরপূর্বক নিরুদ্দেশ বা গুমের অভিযোগের বিষয়ে তথ্য চেয়ে ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারকে অন্ততঃ ১০ দফা চিঠি ও তাগিদ পাঠিয়েছে গুম বিষয়ক জাতি সংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ। গত বছরের ৬ জুন জাতিসংঘের ৭ জন স্পেশাল রিপোর্টার বাংলাদেশকে পাঠানো চিঠিতে মাদক বিরোধী অভিযানে বেশ কিছু গুম হওয়ার অভিযোগ তুলে ধরে এ বিষয়ে জানতে চান। সে চিঠির কোন আনুষ্ঠানিক জবাব আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেয়া হয়নি। এর আগের এবং পরের চিঠিগুলোর বিষয়েও স্পষ্ট কোন উত্তর আজ অবধি দেয়া হয়নি। উক্ত প্রতিবেদনে নিরাপত্তা বাহিনী ও আধা সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রায়ই গুম, আটক, এমনকি বিচার বহির্ভুত হত্যার বিষয়ে জানতে চেয়ে ২০১১ সালের ৪ মে বাংলাদেশ সরকারের কাছে ওয়ার্কিং গ্রুপের চিঠি পাঠানোর তথ্য আছে। ২০১৬ সালের ৯ মার্চ গুমের হার ক্রমেই বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ এবং ২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী গুরুতর মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ হিসেবে জানতে বাংলাদেশকে পুনরায় চিঠি দেয়া হয়। সর্বশেষ ২৯ জুন আরেকটি চিঠি প্রদান করা হয়। এমনকি ২০১৩ সালের ১২ মার্চ ওয়ার্কিং গ্রুপ পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশে আসার আগ্রহ প্রকাশ করে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের আমন্ত্রণ পত্র পাঠানোর অনুরোধ করে। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ২৭ অক্টোবর, ২০১৫ সালের ২৭ নভেম্বর, ২০১৬ সালের ১৮ নভেম্বর এবং চলতি বছর ১৮ জানুয়ারী আমন্ত্রণ পাঠানোর অনুরোধ করে চিঠি পাঠালেও বাংলাদেশ থেকে কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।
মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন এশিয়ান লিগ্যাল রিসোর্স সেন্টার (এএলআরসি) এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে অন্ততঃ ৪৩৫ জনকে গুম করেছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। লোকজনকে তুলে নেয়া ও গুমের সাথে জড়িত হিসেবে ডিবি, গোয়েন্দা বিভাগ, পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসিইউ) ও র‌্যাবের নাম উঠে এসেছে। একই প্রতিবেদনে নাগরিকদের তুলে নেয়া ও গুমের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ বার বার অস্বীকার করে আসছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীগুলো।
দৈনিক যুগান্তর ৩১.০৮.২০১৮ তারিখের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, নিখোঁজ হওয়ার কয়েক সপ্তাহ/মাস পরে এক চতুর্থাংশ মানুষকে পাওয়া যাচ্ছে বন্দী অবস্থায়, তাদের বিরুদ্ধে আনা হচ্ছে নানা রকম বানোয়াট ফৌজদারী অভিযোগ। বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে যারা ঘরে ফিরছেন তারা ভয়ে কেউ মুখ খুলছেন না।
তবে সাংবাদিক বন্ধুরা, মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে করুণ কাহিনী হচ্ছে গুমের কাহিনী। কোন অপরাধই চিরদিনই শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারে না, কোন না কোন দিন এর বিচার হয়। বিচার হয় এজন্যই যে, রাষ্ট্র নির্দেশিত গুম-ক্রসফায়ার কোন সমাজেরই কল্যাণ সাধন করতে পারে না। দায়ী ব্যক্তিদের বিচার না হলে সেই রাষ্ট্র ক্রমে দানব থেকে মহাদানবে পরিণত হয়ে একসময় সার্বিক ধ্বংস অনিবার্য করে তুলে ক্ষতি করে দেশ ও জনগোষ্ঠীর। যেমন-হিসেন হেব্রে প্রায় ৮ বছর আফ্রিকার চাদ এর রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ৮ বছরে হত্যা, নির্যাতন, গুমসহ অসংখ্য অপকর্ম করেছিল, তারও যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়েছিল। আর্জেন্টিনার ক্ষমতাবাদ জেনারেল রেনাল বিগনান যিনি অনেক রক্ত ঝরিয়েছেন তাকেও বিচারের মুখোমুখি হয়ে শাস্তি পেতে হয়েছে। গুয়েতেমালার হত্যা-গুমের হোতা ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উর্ধতন কর্মকর্তারাও বিচারের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। বাংলাদেশেও গুমের ইতিহাস সৃষ্টি করেছে আওয়ামী সরকার। রাষ্ট্রীয় মদদ ছাড়া কাউকে গুম করা অসম্ভব। গুম ও ক্রসফায়ারের মতো গুরুতর অপরাধের ঘটনাগুলো সমাজে, সংবাদ মাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি হলেও তাতে সরকারের টনক নড়ে না। সুতরাং এতেই বোঝা যায় এতসব গুমের হোতা কারা। গুমের সাথে জড়িত ব্যক্তি ও তাদের মদদদানকারীরাও বিচারের আওতার বাইরে থাকবে না। প্রতিটি গুমের তদন্ত ও বিচার একদিন হবেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ