ঢাকা, রোববার 1 September 2019, ১৭ ভাদ্র ১৪২৬, ১ মহররম ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

বঙ্গবন্ধুর বাকশাল কার্যকর করা গেলে বাংলাদেশ অনেক আগেই বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসনে থাকতো -শেখ হাসিনা

স্টাফ রিপোর্টার : আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর বাকশাল কার্যকর করা গেলে বাংলাদেশ অনেক আগেই বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসনে থাকতো । গতকাল শনিবার  বিকেল গণভবনে শোক দিবস উপলক্ষে ছাত্রলীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ অনেকে বাকশাল-বাকশাল বলে গালি দেয়, আসলে বাকশালটা কী ছিলো? এটা ছিলো কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ। এই বাংলাদেশ ছিলো কৃষি প্রধান দেশ। কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে খাদ্য উৎপাদন করে আর শ্রমিকের শ্রমের মধ্য দিয়ে এদেশের অর্থনীতি গড়ে ওঠে। এই কৃষক-শ্রমিককে এক করে  সমগ্র বাংলাদেশকে ঐক্যবদ্ধ করে অর্থনৈতিক মুক্তির ডাক দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।
তিনি  বলেন, আমাদের দেশে ১৯টা জেলা ছিলো। এই ১৯টা জেলাকে ভাগ করে তিনি ৬০টি জেলায় রূপান্তর করেন। তার মানে প্রতিটি মহকুমা পর্যায়ক্রমে জেলায় রূপান্তর করা হয়। এই মহকুমাগুলোকে জেলায় রূপান্তর করা হয় যেন, সেগুলো অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে ওঠে এবং তৃণমূলের মানুষ সেটার সুফল পায়। সে পদক্ষেপ তাই তিনি নিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘গণতন্ত্রকে-ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রীকরণ করে একদম তৃণমূল পর্যন্ত যেন সেটা পৌঁছে যায় সে ব্যবস্থা করেছিলেন। একজন সাধারণ মানুষ তার যেন বলার সুযোগ থাকে, কাজ করার সুযোগ থাকে সে পদ্ধতি তাই তিনি বেছে নিয়েছিলেন।  যারা জমিতে শ্রম দিবে তারা উৎপাদিত পণ্যের একটি অংশ পাবে, যারা জমির মালিক তারা একটা অংশ পাবে এবং কো-অপারেটিভের মাধ্যমে সরকারের কাছে একটা অংশ আসবে। যেন কখনো কেউ বঞ্চিত না হয়। অন্তত যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলায় তারা যেন ন্যায্য মূল্য পায়, তারা যেন ভালোভাবে বাঁচতে পারে।’’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের কৃষি পদ্ধতিটাকে যান্ত্রিকীকরণ করে আধুনিকীকরণ করার কথাই তিনি বলেছিলেন। সাথে সাথে শিক্ষাকে তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। প্রাইমারি শিক্ষাকে অবৈতনিক করেছিলেন। উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি বিশেষ সুযোগ এর ব্যবস্থা এবং নীতিমালা প্রণয়ন করেছিলেন। সকল শ্রেণী পেশার মানুষ যেন সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে, তিনি সে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। প্রত্যেকটা ইউনিয়নে ১০ বেডের হাসপাতাল করে প্রত্যেকের দোরগোড়ায় চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়ার কাজ তিনি শুরু করেছিলেন।
জাতির পিতা যে কর্মসূচিগুলোর ঘোষণা দিয়েছিলেন, এগুলো যদি তিনি বাস্তবায়ন করে যেতে পারতেন তাহলে বাংলাদেংশ অনেক আগেই বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে আসীন হতো বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, নীতি-আদর্শ না থাকলে নেতা হওয়া যায় না। হওয়া গেলেও তা সাময়িক। সেই নেতৃত্ব দেশকে কিছু দিতে পারে না। মানুষের ভালবাসা-আস্থা অর্জন করতে হবে। এটিই রাজনীতিকের জীবনের একমাত্র সম্পদ।
গণভবনে অনুষ্ঠিত এই সভায় প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, শোককে বুকে নিয়ে, ব্যথা-বেদনা বুকে চেপে রেখে নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করেছি আমরা। ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া রাখিনি। যে জাতির জন্য বাবা জীবন দিয়ে গেছেন, তাদের জন্য কতটুকু করতে পেরেছি, সেই বিবেচনা করেছি। যদি নিজেকে বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হিসেবে গড়ে তুলতে হয় তাহলে তার মতো ত্যাগী কর্মী হিসেবে দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু যাদের ভালবাসতেন তাদের কল্যাণ করা সন্তান হিসেবে আমাদের দায়িত্ব। ৩২ নম্বরে যখন বাবাকে হত্যা করা হয়, খুনিরা মাকে বলেছিল, চলেন। তিনি একপাও নড়তে রাজি হননি, জীবন ভিক্ষা চাননি। বীরের মতো বুক পেতে দিয়েছিলেন বুলেটের সামনে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বড় সন্তান হিসেবে বাবার স্বপ্ন, লক্ষ্য আমি জানতাম। সেগুলো সামনে নিয়েই আমার পথচলা শুরু। স্বাধীনতার পর অনেকেই বলেছিল, এদেশের কোনও ভবিষ্যৎ নেই, ব্যর্থ রাষ্ট্র হবে। আমার জেদ ছিল বাংলাদেশকে এমনভাবে গড়ে তুলবো যাতে বিশ্ববাসী বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে দেখে!
বঙ্গবন্ধুর লেখা ও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রকাশিত নথিপত্র ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের পড়ার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আরও একটি বইয়ের কাজ চলছে। ১৯৫২ সালে শান্তি সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু চীনে গিয়েছিলেন। পুরো পাকিস্তান থেকে প্রতিনিধিদলের সঙ্গে গিয়েছিলেন তিনি। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশ কীভাবে সেখানে বিপ্লব করেছে, সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রা তিনি দেখেছেন, অনুভব করেছেন এবং লিখেছেন।
দীর্ঘ সংগ্রামের পথে অনেক দালাল ছিল, যারা পাকিস্তানপ্রেমী ছিল, তারা বাংলার মানুষের ভালো চায়নি মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের একাত্তরের ভূমিকা সবার জানা। তাদের বিচার জাতির পিতা শুরু করেছিলেন। তিনি বেঁচে থাকলে ১০ বছরের মধ্যে উন্নত ক্ষুধামুক্ত সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে উঠতো।
বাকশালের কর্মকা- কেন জরুরি ছিল তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকে ‘বাকশাল’, ‘বাকশাল’ বলে গালি দেয়। এটি কী ছিল? বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিপ্রধান। কৃষকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এবং শ্রমিকরা হাত দিয়ে অর্থনীতি গড়ে তোলে। সমগ্র বাংলাদেশকে ঐক্যবদ্ধ করে অর্থনৈতিক মুক্তির ডাক দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯ জেলাকে ৬০ জেলায় রূপান্তর করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলে তৃণমূলের কাছে উন্নয়নের সুফল পৌঁছানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
’৭৫-এর স্মরণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেদিন তারা ছোট্ট রাসেলকেও ছাড়েনি, যাতে রক্তের উত্তরাধিকারী একজনও জীবিত না থাকে। আমার ভাড়াবাসাতেও আক্রমণ চালিয়েছিল তারা। আমরা অল্প সময়ের জন্য দেশের বাইরে গিয়েছিলাম। আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য একই দিনে আমরা পরিবারের সবাইকে হারিয়েছি।
বাঙালি জাতি ছিল চিরদিন শোষিত-বঞ্চিত, নির্যাতিত-নিপীড়িত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে বাংলাদেশ সবসময় অবহেলিত ছিল, ক্ষুধার অন্ন পেতো না, শিক্ষা-চিকিৎসা পেতো না, থাকার ঘরবাড়ি ছিল না, সেই মানুষগুলোর জীবন বদলে দিতে চেয়েছিলেন শেখ মুজিব। ছাত্রাবস্থায় গরীব ছাত্রদের সহায়তা করতেন। সবসময় দেশকে স্বাধীন করে মানুষের উন্নয়নের চিন্তা করতেন।
বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের অবদান বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার (বঙ্গবন্ধু) পাশে আমার মা সবসময় ছিলেন। প্রকাশ্যে রাজনীতিতে আসেননি, ছবি তোলেনি, নাম ছাপেননি। বাবার সঙ্গে থেকে প্রতিটা কাজে সহায়তা করেছেন। সাধ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছেন। বছরের পর বছর বাবা যখন কারাগারে, মা অপেক্ষা করেছেন। পাশে থেকে সহযোগিতাও করেছেন। এমনকী ছদ্মবেশে ছাত্রনেতাদের কাছে নির্দেশ পৌঁছে দিতেন, নির্দেশনাও দিতেন। তিনি ছিলেন সবচেয়ে বড় গেরিলা। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা গোয়েন্দা সংস্থার লোক থাকতো। তারা কোনোদিন ধরতে পারেনি আমার মা কোথায় কীভাবে যাচ্ছেন। প্রত্যেক আন্দোলন কীভাবে সফল করতে হয়, তা মায়ের কাছ থেকে শিখেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিন সকাল থেকেই উৎসাহী নেতাকর্মীরা গণভবনের সামনে হাজির হতে থাকেন। বিকালে আলোচনার সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে ছাত্রলীগের নানা কর্মকা- তুলে ধরা হয়। দেখানো হয় ছাত্রলীগের কর্মীদের বানানো মোবাইল গেমের প্রোমো। এসময় সঞ্চালক ছাত্রলীগের সাধারণ নম্পাদক গোলাম রাব্বানী ছাত্রলীগের নিউজ পোর্টাল বিএসএলনিউজের বিষয়ে অবহিত করেন। তিনি বলেন, আগামীতে সারাদেশে ১১০টি সাংগঠনিক ইউনিটের সামাজিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিবেচনা করে ‘বেস্ট ইউনিট অব দ্য মান্থ’ ও ‘বেস্ট অ্যাক্টিভিস্ট অব দ্য মান্থ’ পুরস্কার ঘোষণা দেওয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ