ঢাকা, মঙ্গলবার 10 September 2019, ২৬ ভাদ্র ১৪২৬, ১০ মহররম ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পদক্ষেপ ব্যর্থ

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রতিবছরই নির্ধারণ করা হচ্ছে। কিন্তু লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না। রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে প্রতিবারই সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছাতে এবার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। অবশ্যই এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। কিন্তু প্রতিবারই ঘোষণা ঘোষণার মধ্যেই থেকে যাচ্ছে। রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকারের সকল পদক্ষেপ ব্যর্থ হচ্ছে। এক বছর হচ্ছে তো পরের বছর হচ্ছে না। চলতি অর্থবছরের আগস্টে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। গত জুন মাসে লক্ষ্য পূরণ না হলেও জুলাইয়ে এসে পূরণ হয়। পরের মাসে রফতানি আয়ে আবারও নিম্নগতি। জুলাই মাসে দেশ থেকে ৩৮৮ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হলেও আগস্টে তা ২৮৪ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। অর্থবছরটির দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) ৬৭৩ কোটি ২১ লাখ ৭ হাজার ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। এই আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে শূন্য দশমিক ৯২ শতাংশ কম। আর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কমেছে ১২ দশমিক ৪০ শতাংশ। একই সঙ্গে হোঁচট খেয়েছে প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের (২০১৯-২০) প্রথম জুলাই মাসে দেশ থেকে ৩৮৮ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হলেও আগস্টে তা ২৮৪ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। অর্থবছরটির দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) ৬৭৩ কোটি ২১ লাখ ৭ হাজার ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। এই আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে শূন্য দশমিক ৯২ শতাংশ কম। আর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কমেছে ১২ দশমিক ৪০ শতাংশ। এর আগের অর্থবছরগুলোরও প্রায় একই অবস্থা দেখা যায়। এ সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) পণ্য রফতানি করে মোট আয় করেছিল ৫১৪ কোটি ২২ লাখ ডলার, এ সময়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৬৬ কোটি ডলার। আয় কম হয় প্রায় ৫২ কোটি ডলার।  
ইপিবি’র প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে সব ধরনের পণ্য রফতানিতে বৈদেশিক মুদ্রার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৫৫০ কোটি মার্কিন ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষ রফতানি আয় অর্জিত হয়েছে ৪ হাজার ৫৩ কোটি ৫০ লাখ ৪ হাজার ডলার। চলতি অর্থবছর দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) রফতানির আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৬৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এই দুই মাসে রফতানি আয় এসেছে ৬৭৩ কোটি ২১ লাখ ৭ হাজার মার্কিন ডলার। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১২ দশমিক ৪০ শতাংশ কম। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে রফতানি আয় অর্জিত হয়েছিল ৬৭৯ কোটি ৫০ লাখ ২ হাজার ডলার। সে হিসেবে রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি কমেছে শূন্য দশমিক ৯২ শতাংশ।
ইপিবির তথ্যমতে, একক মাস হিসেবে আগস্টের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৮৫ কোটি ডলার। এই সময়ে দেশে রফতানি আয় এসেছে ২৮৪ কোটি ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৬ শতাংশ কম। এর আগের অর্থবছরে আগস্টে রফতানি আয় এসেছিল ৩২১ কোটি ডলার। সে হিসেবে চলতি অর্থবছরের আগস্টে রফতানি কমেছে ১১ শতাংশ। এর আগে, অর্থবছরটির প্রথম মাসে (জুলাই) ৩৮৮ কোটি ৭৮ লাখ ৬ হাজার ডলারের পণ্য রফতানি হয়। যে আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি এবং চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ বেশি ছিল।
ইপিবির তথ্য বলছে, আগস্ট মাসে প্রবৃদ্ধি ও লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করতে পারেনি দেশের তৈরি পোশাক খাত। চলতি অর্থবছরের দুই মাসে ৫৭১ কোটি ৬৪ লাখ ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছে। এই আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ কম। একই সঙ্গে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আয় কমেছে ১১ দশমিক ৪০ শতাংশ।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত দুই মাসে নিট পোশাক রফতানি থেকে আয় এসেছে ২৯২ কোটি ৮ লাখ ৫ হাজার ডলার। যা আগের বছরের একই সময়ের শূন্য দশমিক ২৭ শতাংশ বেশি। নিট পোশাকে প্রবৃদ্ধি সামান্য বাড়লেও লক্ষ্যমাত্রা কমেছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। অন্যদিকে ওভেন পোশাক রফতানি করে আয় হয়েছে ২৭৯ কোটি ৫৬ লাখ ৪ হাজার ডলার। যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় শূন্য দশমিক ৯৪ শতাংশ কম। পাশাপাশি ১৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা কমেছে ওভেনে।
ইপিবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে ১ দশমিক ৩২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে চামড়াজাত পণ্য রফতানিতে। এ খাত থেকে আয় এসেছে ১৮ কোটি ৫৪ লাখ ডলার। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রফতানি আয় বেড়েছে শূন্য দশমিক ৪৩ শতাংশ। যদিও গত অর্থবছর জুড়েই চামড়াজাত পণ্য রফতানিতে আয় ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। সম্প্রতি দেশের বাজারে গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম দামে বিক্রি হয়েছে কাচা চামড়া। গত দুই মাসে হোম টেক্সটাইল খাতে প্রবৃদ্ধি ও লক্ষ্যমাত্রা দুটোই কমেছে। এ সময় আয় এসেছে ১১ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। চলতি অর্থবরের দুই মাসে পাট ও পাটজাত পণ্যের রফতানি আয় কমেছে। একই সঙ্গে কমেছে লক্ষ্যমাত্রা। এ সময়ে এ খাত থেকে আয় এসেছে ১৩ কোটি ৫ লাখ ডলার। ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট মাস শেষে কৃষি পণ্য রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ও লক্ষ্যমাত্রা কোনটাই অর্জিত হয়নি। এ খাত থেকে আয় এসেছে ১৩ কোটি ৪৪ লাখ ডলার। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রফতানি আয় কমেছে ২৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ। অন্যদিকে আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি কমেছে ২৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
এদিকে সদ্য বিদায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৫৩ কোটি মার্কিন ডলার। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। সে ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় বেশি হয়েছে ৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ। তবে একক মাস হিসেবে জুনে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। এ মাসে রফতানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৬০ কোটি ডলার। আয় হয়েছিল ২৭৮ কোটি ডলার। এ ক্ষেত্রে আয় কম পাওয়া গেছে ২২ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এটা তার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ২৭ শতাংশ কম। এ ছাড়া ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রফতানি আয় ছিল ৩ হাজার ৬৬৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ ২০১৭-১৮ অর্থবছরের চেয়ে রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই-জুন মাসে নিটওয়্যার খাতে রফতানি আয় হয়েছে ১ হাজার ৬৮৮ কোটি ডলার। আর ওভেন খাতে রফতানি আয় এসেছে ১ হাজার ৭২৪ কোটি ডলার। পোশাকের দুই খাতে এসেছে ৩ হাজার ৪১৩ কোটি ডলার। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ২৬৮ কোটি ডলার। পোশাক খাতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় বেড়েছে ৪ দশমিক ৪২ শতাংশ।
তবে এর আগের ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশের রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। গত অর্থবছরে রফতানি থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল তিন হাজার ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার। আর আয় হয়েছিল তিন হাজার ৬৬৬ কোটি ৮১ লাখ মার্কিন ডলার। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ দশমিক ২২ শতাংশ কম। আর অর্থের পরিমাণে দাঁড়ায় আট কোটি ৩১ লাখ ডলার। এদিকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানিতে ধস নামে। এ খাতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রফতানি আয় কমে ২১ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
ইপিবির প্রতিবেদন বলছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সব ধরনের পণ্য রফতানিতে বৈদেশিক মুদ্রার আয় ছিল মোট তিন হাজার ৮৬৫ কোটি ৫৯ লাখ মার্কিন ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় হয়েছিল তিন হাজার ৬৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ দশমিক ২২ শতাংশ কম। বিদায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল তিন হাজার ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানিতে ধস নামে। এ খাতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রফতানি আয় কমে হয় ২১ দশমিক ৩৪ শতাংশ। প্রবৃদ্ধিও গত বছরের চেয়ে কমে ১২ দশমিক ০৩ শতাংশ। আয় হয়েছে ১০৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার। গত অর্থবছরে কৃষি পণ্য রপ্তানি ২২ শতাংশ বাড়লেও চা রফতানি কমেছে ৩৮ শতাংশ। শাকসব্জি রফতানি কমে ৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
রফতানিকারকরা বলছেন, রফতানি খাতে প্রবৃদ্ধি কিছ্টুা বাড়ছে। কিন্তু কোনো কোনো খাতে এখনও আয় ও প্রবৃদ্ধি বাড়ছে না। এটিই এখন আশঙ্কার বড় কারণ। আমাদের ন্যূনতম প্রবৃদ্ধি নিয়ে এগুলো চলবে না। মনে রাখা দরকার, সামনে ২০২১ সাল নাগাদ সার্বিক রফতানি খাত থেকে ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং এককভাবে তৈরি পোশাক খাত থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন তা অর্জন করতে হলে প্রতি মাসেই রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি থাকতে হবে ১১-১২ শতাংশ হারে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকার যে আগ্রহ নিয়ে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছেন সে অনুযায়ী আয় হচ্ছে না। রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে প্রতিবারই সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছাতে এবার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। অবশ্যই এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। কিন্তু প্রতিবারই ঘোষণা ঘোষণার মধ্যেই থেকে যাচ্ছে। রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকারের সকল পদক্ষেপ ব্যর্থ হচ্ছে। 
এ ব্যাপারে বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বর্তমানে পোশাক শিল্পকে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। আমরা এখন শতভাগ কমপ্লায়েন্স কারখানার দিকে হাঁটছি। ফলে রফতানিতে খুব সন্তোষজনক কিছু অর্জন করা যাচ্ছে না। প্রতিযোগী দেশগুলো আমাদের চেয়েও এগিয়ে গেছে। তাদের প্রবৃদ্ধি অনেক বেশি। তিনি বলেন, গ্যাস সংকটসহ নানাবিধ কারণে আমাদের পণ্য উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে। এ অবস্থায় সরকারকে আরও সহযোগী মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। রফতানির নতুন নতুন বাজার উদ্ভাবন করতে হবে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বর্তমানে সারাবিশ্বের অর্থনীতিতে একটি শ্লথগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমাদের দেশের রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে নন-ট্র্যাডিশনাল মার্কেটে রফতানি বাড়াতে হবে

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ