ঢাকা, বৃহস্পতিবার 12 September 2019, ২৮ ভাদ্র ১৪২৬, ১২ মহররম ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

৬ কোটি জনগোষ্ঠীর জীবন জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে

মুহাম্মদ নূরে আলম : দেশে হিমায়িত গরুর গোশত আমদানি হলে ১ কোটি ৬১ লাখ গবাদিপশু পালনকারী ছোট বড় খামারের সাথে জড়িত প্রায় ৬ কোটি জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা বিপন্ন হবে। গোশতের জন্য উৎপাদিত ৯০ লাখ গরু-মহিষ এবং ১ শত ৪০ লাখ ছাগল-ভেড়া গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা সঞ্চালনে সহায়তা করে প্রতি বছর। এ সঞ্চালনের ন্যূনতম ৭০ শতাংশ প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা দরিদ্র-অতিদরিদ্র খামারীদের মাঝে হয়ে থাকে। দেশে ৪ লাখ ৪২ হাজার ৯৯১টি নিবন্ধিত গরু মোটাতাজারণ খামার ও ৫৯ হাজার ২৭৪টি ডেইরি খামার রয়েছে। দেশে প্রায় ১ লাখ ৫১ হাজার গোশতের দোকানে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। বছরে ১৮ হাজার কোটি বর্গ ফুট চামড়া উৎপাদন শিল্প পর্যায়ক্রমে বন্ধ হয়ে যাবে। দেশের প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসবে। বাংলাদেশের প্রায় ৮৬ লাখ হেক্টর আবাদি জমির অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ৫ শতাংশ জৈব পদার্থের তুলনায় গড়ে মাত্র ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ জৈব পদার্থ রয়েছে। জৈব পদার্থ মাটির প্রাণ। যার অভাবে দেশে খাদ্য উৎপাদন বিপুলভাবে ব্যাহত হবে। দেশে গবাদিপশু প্রতি বছর প্রায় ১২ কোটি মেট্টিক টন গোবর সার উৎপাদন করে। যার ৮৩ শতাংশ গরু-মহিষ উৎপাদন করে। সাধারণ খামারীদের বক্তব্য, জনস্বার্থে হিমায়িত গরুর গোশত আমদানির উদ্যোগ বাস্তবায়ন না করার জন্য সরকারকে অনুরোধ করছি। বিগত কয়েক বছরে প্রাণিসম্পদ খাতে প্রভূত উন্নতি হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য এবং বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরীফ আহমেদ চৌধুরী তার এক গবেষণা প্রবন্ধে এইসব তথ্য তুলে ধরেন।
সাম্প্রাতিক সময়ে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের ফলে দেশ গোশত উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এসময়ে যখন গোশত রপ্তানির উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন তখন গোশত আমদানির প্রস্তাবনা সার্বিক বিবেচনায় অগ্রহণযোগ্য। তাছাড়া, সরকার সম্প্রতি দেশে দুধ ও গোশত বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তায় ৪২০০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এদেশে, বর্ধিতহারে হিমায়িত গোশত আমদানি অব্যাহত থাকলে এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য নিশ্চিত বিফলে যাবে। এদেশে মাংসের প্রায় ৪৫ শতাংশ আসে পোল্ট্রি খাত হতে। গোশত রপ্তানীকারক দেশসমূহ এদেশের গরু-মহিষের বাজার দখল করার সাথে সাথে বাণিজ্যিক পোল্ট্রি শিল্পের দিকে নজর দেবে। বাংলাদেশের তুলনায় অনেক সস্তায় উৎপাদিত পোল্ট্রি মিট আমাদের বাজারে প্রবেশ করলে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ ও প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানকারী এখাতও ধ্বংসের মুখোমুখি হবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে ৪ লাখ ৪২ হাজার ৯৯১টি নিবন্ধিত গরু মোটাতাজারণ খামার ও ৫৯ হাজার ২৭৪টি ডেইরি খামার রয়েছে। তাছাড়াও সারাদেশে রয়েছে অসংখ্য অনিবন্ধিত খামার। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পারিবারিক খামারের পাশাপাশি এসব বাণিজ্যিক খামার এখন দেশের বিফ ক্যাটেল সরবরাহের প্রধান যোগানদাতা।
বাংলাদেশের স্বার্থে বিদেশ থেকে হিমায়িত গরুর গোশত আমদানি প্রক্রিয়া বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট ১০টি অ্যাসোসিয়েশন। গত সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রাণী বিজ্ঞানী ও প্রাণীজ খাদ্য বিশেষজ্ঞরা কিছু সুপারিশ প্রস্তাব করেন: ১.গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা, বৈশি^ক পরিবেশ সংরক্ষণ ও জাতীয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা তথা জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে এদেশে হিমায়িত গোশত আমদানি বন্ধ করা। প্রয়োজনে এ বিষয়ে ডাব্লিউ টি ও’র বিশেষ ব্যবস্থাধীন দেশীয় খামারীর স্বার্থ সংরক্ষণে উদ্যোগ গ্রহণ করা। ২.বাংলাদেশে গুণগত ও পরিমাণগত মানসম্পন্ন হাড়বিহীন গোশত উৎপাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করা। এর ফলে স্থানীয় বাজারে এসব গোশতের চাহিদা স্থানীয়ভাবে মেটানো সম্ভব হবে।
৩.বাংলাদেশ থেকে গোশত রপ্তানীর ক্ষেত্রে দেশের সংশ্লিষ্ট পরিবেশ নিশ্চিত করা। গোশত রপ্তানির ক্ষেত্রে উদ্যোগ নিশ্চিত করা। ৪. দেশে জনস্বাস্থ্য, জীব-নিরাপত্তা ও
স্যানিটারি-ফাইটো স্যানিটারি কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতকল্পে গোশত ও মাংসজাত পণ্যের আমদানি/রপ্তানীর ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে সম্পৃক্ত করা।
এনিমেল হেলথ কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আহকাব) সভাপতি ডা.নজরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের ১৬ কোটি ভোক্তার প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে স্বাবলম্বিতা অর্জনের ক্ষেত্রে এদেশের আপামর খামারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। জনপ্রতি দৈনিক ১২০ গ্রাম মাংসের চাহিদা হিসেবে বার্ষিক মাংসের চাহিদা ৭২ দশমিক ৯৭ লাখ মেট্রিক টন। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি থেকে মোট গোশত উৎপাদিত হয়েছে ৭৫ দশমিক ১৪ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ ২ দশমিক ১৭ লাখ মেট্রিক টন উদ্বৃত্ত। এর মধ্যে গরু-ছাগলের গোশত মোট উৎপাদনের ৫৫ শতাংশ। সরকারি তথ্যমতে আমরা ইতোমধ্যে প্রাণিজ আমিষে স্বাবলম্বিতা অর্জনে সক্ষম হয়েছি। দেশের বৃহত্তর জনগণের স্বার্থে আমরা হিমায়িত গরুর গোশত আমদানির প্রক্রিয়াটি বন্ধ করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানায়।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে আরও জানাযায়, বাংলাদেশ এখন গোশত উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। জনপ্রতি দৈনিক ১২০ গ্রাম গোশতের চাহিদা হিসাবে দেশে গোশতের চাহিদা বছরে মোট ৭২ দশমিক ৯৭ লাখ টন। বিগত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগী থেকে মোট গোশত উৎপাদিত হয়েছে ৭৫ দশমিক ১৪ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ উদ্বৃত্ত উৎপাদন হয়েছে ২ দশমিক ১৭ লাখ টন। এরমধ্যে গরু-ছাগলের গোশত মোট মাংসের প্রায় ৫৫ শতাংশ ভাগ।
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরীফ আহমেদ চৌধুরী তার এক গবেষণা প্রবন্ধে বলেন, বাংলাদেশের প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ গোশত উৎপাদিত হয় ভূমিহীন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারী শূণ্য থেকে-২.৪৯ একর আকারের খামারে, যা কৃষির অন্যান্য উপ-খাত বিশেষতঃ ফসল খাতের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ফসলের বিভিন্ন উপজাত, যেমন: খড়, কুড়া, ভুষিই মূলত এধরনের খামারে প্রাণির প্রধান খাদ্য। আবার এসব খামারের গোবর-আবর্জনা উক্ত খামারে ফসলী জমির জৈব সারের প্রধান উৎস। এভাবে পুষ্টির পুনঃচক্রায়নের মাধ্যমে এসব পরিবেশবান্ধব প্রাণির খামার দীর্ঘদিন যাবৎ এদেশে টিকে আছে। সম্প্রতি এদেশে গরু মোটাতাজাকরণে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারী আকারের বাণিজ্যিক খামার গড়ে উঠেছে যা বছরব্যাপি মোট সরবরাহের প্রায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত সরবরাহ করে। এসব খামারে ৫ থেকে ১২জন পর্যন্ত লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। এভাবে প্রাণিসম্পদ খাত দেশের মোট জনসংখ্যার প্রত্যক্ষভাবে ২০ শতাংশ এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ শতাংশ লোকের কর্মসংস্থান করে।
ড. শরীফ আহমেদ চৌধুরী আরও বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ২৫৭ দশমিক ২৪ লাখ গরু-মহিষ ও ২৯৮ দশমিক শূণ্য লাখ ছাগল-ভেড়া রয়েছে। এবছর কোরবানীযোগ্য গবাদিপশুর মধ্যে ৪৫ দশমিক ৮২ লাখ গরু-মহিষ এবং ৭২ দশমিক শূন্য লাখ ছাগল-ভেড়া দেশে উৎপাদিত হয়েছে। বছরের অন্যান্য সময়েও মাংসের জন্য প্রায় সমপরিমাণ গরু-ছাগল উৎপাদন হয়। অর্থাৎ সারাবছর প্রায় ৯০ লাখ গরু-মহিষ এবং ১৪০ লাখ ছাগল-ভেড়া গোশতের জন্য খামারীগণ উৎপাদন করেন। এ পরিমাণ গরু-মহিষ ও ছাগল-ভেড়া পালনের মাধ্যমে প্রায় ৩৭ লাখ দরিদ্র খানার বছরব্যাপী স্বকর্মসংস্থান হয়ে থাকে। এ সকল ক্ষুদ্র, মাঝারী ও বাণিজ্যিক খামার কৃষক পরিবারের আয়, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে আপদকালীন সম্পদ হিসাবে ভূমিকা রাখছে। এসব খামারীর অক্লান্ত ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় দেশ এখন মাংসে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তবে নিকট অতীতেও এ অবস্থা ছিল না।
 দেশের প্রাণীজ খাদ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, নব্বইয়ের দশকে এদেশে জবাইকৃত ৭০ শতাংশ গরু-মহিষ আসতো দেশের বাইরে থেকে। হাড়-জিরজিরে, বয়সের ভারে ন্যূজ বলদ টেনে হিঁচড়ে কসাইখানায় নেয়ার দৃশ্য এখনও আমাদের স্মৃতিতে ভেসে উঠে। বর্তমান শতাব্দীর শুরু থেকে এদেশে গরু মোটাতাজাকরণ শুরু হয়। ভারতের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ফলে ২০১৪ সাল থেকে সীমান্ত পথে অবৈধভাবে গরু অনুপ্রবেশ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। তখনই প্রথম বাংলাদেশের খামারীগণ পবাদিপশু পালনে লাভের মুখ দেখেন। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের ফলে এদেশে অসংখ্য ক্ষুদ্র, মাঝারী ও বাণিজ্যিক খামার গড়ে উঠেছে।
ড. শরীফ আহম্মদ চৌধূরী বলেন, প্রাণিসম্পদ খাতের এই বিকাশমান ধারার বিপরীতে সম্প্রতি বেশ কিছু নেতিবাচক ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে রয়েছে তরল দুধে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্যের উপস্থিতি বিষয়ক প্রচারণা, কোরবানির চামড়া ক্রয়-বিক্রয় বিপর্যয় এবং সর্বশেষ হ্রাসকৃত শুল্কে আরো অধিকহারে গোশত আমদানির উদ্যোগ। স্বল্পমূল্যে আমদানিকৃত মাংসের ফলে দেশীয় গবাদিপশু উৎপাদনে তথা বাংলাদেশে গোশত উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে অবশ্যই ঋণাত্মক প্রভাব পড়বে। এছাড়াও জাতীয় কৃষি অর্থনীতিতে, জনগণের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায়, পরিবেশের উপর এবং সামাজিক ক্ষেত্রে এর প্রভাব হতে পারে মারাত্মক।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে গোশতের জন্য উৎপাদিত ৯০ লাখ গরু-মহিষ এবং ১৪০ লাখ ছাগল-ভেড়া গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা সঞ্চালনে সহায়তা করে। এ সঞ্চালনের ন্যূনতম ৭০শতাংশ প্রায় ৩৮ হাজার কোটি দরিদ্র-অতিদরিদ্র খামারীদের মাঝে হয়ে থাকে। এই অর্থ সংশ্লিষ্ট খানার জীবিকা, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাসহ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়ের অন্যতম উৎস। গোশত আমদানি বৃদ্ধি করা হলে এসব খামারীর জীবন-জীবিকা মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। তাছাড়া সম্প্রতি গড়ে উঠা গরু-ছাগলের বাণিজ্যিক খামারসমূহ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে যা এসব খামারে কর্মরত লাখ লাখ মানুষকে বেকারত্বের দিকে ঠেলে দিবে। সামগ্রিকভাবে একথা বলাই যায়, গোশত আমদানি ধীরে ধীরে এদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাযায়, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যখাতে প্রভাব, দেশে উৎপাদিত এবং জবাইকৃত গরু-মহিষ ও ছাগল-ভেড়া শুধু মাংসই উৎপাদন করে না বরং চামড়াসহ অন্যান্য বাড়িতে তৈরী পণ্য উৎপাদন করে। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৮ কোটি বর্গফুট গরু-মহিষ এবং ছাগল-ভেড়ার চামড়া উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত করে জুলাই-অক্টোবর ২০১৯-এ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানীর মাধ্যমে বাংলাদেশ আয় করে প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা যা বাৎসরিক হিসাবে প্রায় ৮ হাজার ৭০০ কোটি। অধিকহারে গোশত আমদানির ফলে বাংলাদেশের অন্যতম অর্থকরী চামড়াখাত মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখামুখি হতে পারে। এরফলে রপ্তানী আয় কমার পাশাপাশি এখাতে কর্মরত প্রায় ৫৬ লাখ জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে।
কৃষিক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশের প্রায় ৮৬ লাখ হেক্টর আবাদি জমির অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ৫ শতাংশ জৈব পদার্থের তুলনায় গড়ে মাত্র ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ জৈব পদার্থ রয়েছে। জৈব পদার্থ মাটির প্রাণ। যার অভাবে দেশে খাদ্য উৎপাদন বিপুলভাবে ব্যাহত হবে। এদেশে গবাদিপশু প্রতি বছর প্রায় ১২ কোটি মেট্টিক টন গোবর সার উৎপাদন করে। যার ৮৩
শতাংশ গরু- মহিষ উৎপাদন করে। এই গোবরই বাংলাদেশের চাষকৃত জমির অন্যতম জৈব পদার্থের উৎস। অধিকহারে গোশত আমদানির ফলে এদেশের গবাদিপশুর উৎপাদন কমবে ফলে জমিতে জৈব পদার্থ সরবরাহের হার কমতে থাকবে। ফলশ্রুতিতে দেশে খাদ্য উৎপাদন কমে যাবে যা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তাকে বিপন্ন করবে।
প্রাণিসম্পদ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য শিল্পখাতে বিরূপ প্রভাব। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ খাতের খাদ্য, ওষুধ এবং সংশ্লিষ্ট মেশিনারিজ খাতে ক্ষুদ্র থেকে মাঝারী অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ বৃহদাকার অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। একইভাবে ছোট বড় প্রায় ২২৬ ফিড মিলে ৪০ লাখ টন প্রাণীর খাদ্য উৎপাদন ৪৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে এবং বিনিয়োগ হচ্ছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। এদেশে প্রায় ১ লক্ষ ৫১ হাজার গোশতের দোকানে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। সম্ভাবনাময় গোশত খাতকে সামনে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে গড়ে উঠেছে বেঙ্গলমিট, দেশীমিট এবং আরো বেশকিছু মিট প্রসেসিং ইন্ডাষ্ট্রিজ যেখানে কয়েক হাজার লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। এছাড়াও ভেটেরিনারি, টিকা ও ঔষধ সংশ্লিষ্ট প্রায় ৭০০ কোম্পানি দেশে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা মূল্যের ব্যবসা করছে, যেখানে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষিত লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। বিদেশ থেকে গোশত আমদানির মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠিত শিল্প খাত ও পেশাসহ বিকাশমান শিল্পের অপমৃত্যু হতে পারে, বেকার হতে পারে লাখ লাখ মানুষ।
জীব বৈচিত্র্য ও পরিবেশের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশে গবাদিপশু পালন এদেশের গ্রামীণ কৃষি ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানে কৃষিখাতে বিভিন্ন উপজাত যেমন খড়, ক্ষুদ, কুড়া, ভূষিসহ ঘাস-লতাপাতা খাইয়ে এদেশের গরু-মহিষ, ছাগল-ভেড়া পালন করা হয়। আবার গরু-মহিষের গোবর জ¦ালানী হিসাবে ব্যবহারসহ ফসলের জমিতে জৈবসার হিসাবে প্রয়োগ করা হয়। এ পদ্ধতিটি তুলনামূলকভাবে পরিবেশ বান্ধব এবং টেকসই। বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি জলবায়ূ পরিবর্তনজনিত ক্ষতির সম্মুখীন দেশের মধ্যে অন্যতম, সেখানে চরম পরিবেশ বিধ্বংসী প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত গোশত বাংলাদেশে আনয়ন আমাদের নিজেদের পায়ে নিজে কুড়াল মারার সামিল।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুসারে, ২০১৭-১৮ অর্থ-বছরে বাংলাদেশে গোশত আমদানি হয়েছিল ২৪ লাখ ৭৯ হাজার ডলার এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরে গোশত আমদানি হয়েছিল ৭ লাখ ২৮ হাজার ডলার। এর মধ্যে ভারত হতে আমদানি হয়েছিল সর্বোচ্চ পরিমাণ। চলতি ২০১৯ বছরে এপ্রিল-জুলাই মেয়াদে ভারত হতে মোট গোশত আমদানি হয়েছে ৫৪৭ টন। এ হারে আমদানি করা হলে ভারত হতে বছরে গোশত আমদানির পরিমাণ হবে প্রায় ১ হাজার ৮৬১ টন। বিগত বছরে ব্রাজিল সহ অন্যান্য দেশ থেকে যে পরিমাণ গোশত আমদানি করা হয়েছিল তা যদি চলতি বছরেও করা হয় তবে বছর শেষে মোট আমদানিকৃত গোশত পরিমাণ হবে প্রায় ২৫০০-৩০০০ টন। এর অর্থ দাঁড়ায় শুধু এবছরেই ১০-১২ হাজার মানুষের কর্ম-সংস্থান থেকে দেশ বঞ্চিত হবে। ব্রাজিল বা অন্যান্য দেশ থেকে প্রতিবছর যে হারে গোশত আমদানি বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে এদেশের নিজস্ব গবাদিপশুর উৎপাদন ব্যবস্থা অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে। বৃদ্ধি পাবে বেকারত্ব, ধ্বংস হবে গ্রামীণ অর্থনীতি যা এদেশকে সামগ্রিকভাবে পিছনে ঠেলে দিবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ